স্পোর্টস ডেস্ক :
১০ ওভার তখন সবে শেষ হয়েছে। অদ্ভুতুড়ে এক ইনিংস খেলে আউট হয়ে গেলেন তানজদ হাসান। দল তখন প্রবল চাপে। লক্ষ্য মনে হচ্ছিল নাগালের বাইরে। কিন্তু তাওহিদ হৃদয় আর পারভেজ হোসেন ইমন হয়তো ভাবলেন, এ এমন কী! অসাধারণ পাল্টা আক্রমণে চোখের পলকে খেলার মোড় বদলে দিলেন দুজন। পরে শামীম হোসেন খেললেন চোখধাঁধানো কিছু শট। রান তাড়ার মাঝামাঝি পর্যন্ত মিইয়ে থাকা দল অবিশ্বাস্যভাবে দুই ওভার বাকি রেখেই জিতে গেল রেকর্ড গড়ে।
তিন ম্যাচ টি-টোয়েন্টিতে সিরিজের প্রথমটিতে নিউ জিল্যান্ডকে ৬ উইকেটে হারাল বাংলাদেশ।
সোমবার (২৭ এপ্রিল) চট্টগ্রামের বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান স্টেডিয়ামে কাটেনে ক্লার্ক ও ডেন ক্লেভারের ফিফটিতে কিউইরা ২০ ওভারে তোলে ১৮২ রান। বাংলাদেশ সেই লক্ষ্য তাড়া করে ফেলে তুড়ি বাজিয়েই। হৃদয় অপরাজিত থাকেন ২৭ বলে ৫১ রান করে। কার্যকর ছোট্ট ঝড়ে ১৪ বলে ২৮ করেন পারভেজ। ফিনিশার শামীম নিজের সেরা ব্যাটিংয়ের ঝলক দেখিয়ে ১৩ বলে অপরাজিত থাকেন ৩১ রানে। প্রথম ১০ ওভারে ৭৭ রান করা দল পরের ৮ ওভারে তোলে ১০৬ রান।
দেশের মাঠে বাংলাদেশের রান তাড়ায় জয়ের কীর্তি এটি। গত নভেম্বরে এই মাঠেই আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ১৭১ রান তাড়ায় জয় ছিল আগের রেকর্ড।
১৮৩ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে বাংলাদেশ শুরু থেকেই আগ্রাসী মেজাজ দেখায়। ওপেনার সাইফ হাসান ও তানজিদ হাসান তামিমের ব্যাটে দলীয় স্কোর দ্রুত ৪৪ রানে পৌঁছে যায়। কিন্তু ষষ্ঠ ওভারের তৃতীয় বলে ন্যাথান স্মিথের বলে ডিপ মিড উইকেটে বেভন জ্যাকবসের হাতে ক্যাচ তুলে দিয়ে সাইফ ফিরে যান। তার ব্যাট থেকে আসে ১৬ বলে ১৭ রান।
সাইফের বিদায়ের পর ক্রিজে এসে লিটন দাস তানজিদকে সঙ্গে নিয়ে রানের গতি ধরে রাখার চেষ্টা করেন। তবে নবম ওভারের পঞ্চম বলে ইশ সোধির মিডল স্টাম্প লক্ষ্য করে ছোড়া বলটি পুল করতে গিয়ে লিটন মিস করেন। বল সরাসরি মিডল স্টাম্পে আঘাত করে। ১৫ বলে ২১ রান (২ চার ও ১ ছক্কা) করে তিনি সাজঘরে ফিরলেন।
লিটনের আউটের পর উইকেটে আসেন তাওহীদ হৃদয়, তাকে নিয়ে লড়াইয়ের চেষ্টা চালান তানজিদ। তবে উইকেটে থিতু হয়ে ইনিংস লম্বা করতে পারেননি এই বাঁহাতি ব্যাটার। দলীয় ৭৭ রানে ২৫ বলে ২০ করে প্যাভিলিয়নের পথ ধরেন তিনি।
চাপ সামলে হৃদয়-ইমনের ব্যাটে ঘুরে দাঁড়ায় বাংলাদেশ। এই দুই জনের ফিফটি রানের জুটিতে বাংলাদেশ এখন সঠিক পথে এগোচ্ছে। তবে দলীয় ১৩৪ রানে ইমন ২৮ করে বিদায় নিলে ভাঙে এই জুটি।
ইমন আউট হলেও হৃদয় টিকে ছিলেন শুরু থেকেই। তার সঙ্গে যোগ দেন শামীম। ১৬তম ওভারেই খেলার মোড় ঘুরে যায়, আসে ১৮ রান। শামীমের দারুণ এক নো-লুক শটে উড়ে যায় বিশাল ছক্কা, গ্যালারিতে উল্লাসের ঢেউ। তখন ২৪ বলে দরকার ছিল ৩০ রান। অনেকের কাছে সহজ মনে হলেও চাপের মুহূর্তে এমন সমীকরণ মেলানো সহজ নয়।
কিন্তু শামীম-হৃদয় জুটি কোনো বেগই পাননি। ১৭তম ওভারে বৃষ্টির মতো রান ঝরে ২৫ রান। শামীম একের পর এক দর্শনীয় ছক্কা হাঁকিয়ে প্রতিপক্ষের বোলিং আক্রমণ ভেঙে দেন।
শেষ ৩ ওভারে তখন মাত্র ৫ রান বাকি। হৃদয় নিজের ফিফটি তুলে নেন সুন্দরভাবে। আর ২ ওভার বাকি থাকতেই বাংলাদেশ পৌঁছে যায় জয়ের বন্দরে। হৃদয় অপরাজিত থাকেন ২৭ বলে ৫১ রান করে। আর শামীম খেলেন ঝোড়ো ১৩ বলে ৩১ রানের ইনিংস।
নিউজিল্যান্ডের হয়ে দুটি উইকেট পেয়েছেন ইশ সোধি। আর একটি করে উইকেট নেন নাথান স্মিথ ও জশ ক্লার্কসন।
এর আগে টস জিতে নিউজিল্যান্ডকে প্রথমে ব্যাট করার আমন্ত্রন জানান বাংলাদেশ অধিনায়ক লিটন দাস। আগে ব্যাট করতে নেমে শুরুতেই ধাক্কা খায় নিউজিল্যান্ড। দ্বিতীয় ওভারেই উইকেট শিকারের আনন্দে মেতে উঠে বাংলাদেশ শিবির। ফিল্ডার তাওহিদ হৃদয়ের সরাসরি থ্রোতে রান আউট হয়ে খালি হাতে ফিরেন ওপেনার টিম রবিনসন।
দলীয় ১১ রানে প্রথম উইকেট পতনের পর দ্বিতীয় উইকেটে জুটি বেঁধে বাংলাদেশ বোলারদের উপর চড়াও হন আরেক ওপেনার কাটেনে ক্লার্ক ও ডেন ক্লিভার। পাওয়ার প্লে’তে ৬১ রান তুলেন তারা।
স্পিনার রিশাদ হোসেনের করা দশম ওভারের তৃতীয় বলে টি-টোয়েন্টিতে দ্বিতীয় হাফ-সেঞ্চুরির স্বাদ নেন ক্লিভার। ঐ ওভারের চতুর্থ ডেলিভারিতে লেগ বিফোর আউট হয়ে থামেন ক্লিভার। ২৮ বলে ৭টি চার ও ১টি ছক্কায় ৫১ রান করেন তিনি।
দলীয় ৯৯ রানে ক্লিভার ফেরার পর টি-টোয়েন্টিতে প্রথম হাফ-সেঞ্চুরির স্বাদ নেন ক্লার্ক। কিন্তু ক্লার্কও ইনিংস বড় করতে পারেননি। রিশাদের বলে হৃদয়কে ক্যাচ দিয়ে আউট হন ৭ চার ও ১ ছক্কায় ৩৭ বলে ৫১ রান করা ক্লার্ক। দ্বিতীয় উইকেটে ৫০ বলে ৮৮ রান যোগ করেন ক্লার্ক ও ক্লিভার।
এরপর মিডল অর্ডারে দ্রুত দুই উইকেট হারায় নিউজিল্যান্ড। বেভন জ্যাকবসকে ১ রানে তানজিম হাসান এবং ডিন ফক্সক্রফটকে ৩ রানে আউট করেন স্পিনার মাহেদি হাসান। এতে ১৫ ওভার শেষে ৫ উইকেটে ১৩০ রান তুলে নিউজিল্যান্ড।
ষষ্ঠ উইকেটে ১৭ বলে ৩২ রান যোগ করে নিউজিল্যান্ডকে বড় সংগ্রহের পথ দেখান এ ম্যাচের অধিনায়ক নিক কেলি ও জশ ক্লার্কসন। ১৮তম ওভারে দলকে ১৬২ রানে রেখে বাংলাদেশের পেসার শরিফুল ইসলামের শিকার হন কেলি। ৫ চার ও ১ ছক্কায় ২৭ বলে ৩৯ রান তুলেন তিনি।
ইনিংসের শেষ ১৩ বলে ২০ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটিতে নিউজিল্যান্ডকে ২০ ওভারে ৬ উইকেটে ১৮২ রানের সংগ্রহ এনে দেন ক্লার্কসন ও নাথান স্মিথ। ২টি চার ও ১টি ছক্কায় ১৪ বলে অপরাজিত ২৭ রান করেন ক্লার্কসন। ২ রানে অপরাজিত থাকেন স্মিথ।
বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণে পেসাররা বেশ খরুচে ছিলেন। শরিফুল ইসলাম ৪ ওভারে ৩৬ রান দিয়ে ১টি উইকেট নেন, তানজিম সাকিব ৪০ রান খরচ করে একটি উইকেট পান, আর রিপন মণ্ডল উইকেটশূন্য থেকে দেন ৩৯ রান। স্পিন বিভাগে শেখ মেহেদী ১টি এবং রিশাদ হোসেন ২টি উইকেট তুলে নেন, যা কিছুটা স্বস্তি এনে দেয়।
স্পোর্টস ডেস্ক 
























