ইংল্যান্ডকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বার ফাইনালে আর্জেন্টিনা

  • স্পোর্টস ডেস্ক
  • প্রকাশের সময় : ০৯:৩৮:৪২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬
  • ১৭৫ জন দেখেছেন

স্পোর্টস ডেস্ক :

টানা দ্বিতীয়বার ফাইনালে উঠল আর্জেন্টিনা। আটলান্টা স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইউরোপের অন্যতম পরাশক্তি ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারায় দলটি।

ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ের দুই ও চার নম্বর দলটির মধ্যকার হাইভোল্টেজ ম্যাচটির দুই অর্ধের গল্প পুরোই ভিন্ন। এখানে প্রথমার্ধে ফুটবলের রূপটা ছিল কুৎসিত। সত্যিকার ফুটবল তখন হয় যৎসামান্য। দুই দলই মেতে ওঠে শারীরিক শক্তি নির্ভর লড়াইয়ে। হতে থাকে ফাউলের পর ফাউল; এই সময়ে ফাউল হয় ১৯টি।

তবে পরের অর্ধের গল্পটা সুন্দর ফুটবলের। যেখানে ধাক্কা খেয়ে পাল্টে যায় আর্জেন্টিনা। আক্রমণের পর আক্রমণে প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করে তুলে নিল দারুণ এক জয়।

বিপরীতে, আরও একবার খেই হারিয়ে ব্যর্থতার গল্প লিখল ইংল্যান্ড। ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপ জয়ীদের দ্বিতীয়বার ফাইনালে খেলতে না পারার হতাশার যাত্রা দীর্ঘায়িত হলো আরও।

পুরো ম্যাচে প্রায় ৬৫ শতাংশ সময় বল দখলে রেখে, গোলের জন্য ১৫টি শট নিয়ে পাঁচটি লক্ষ্যে রাখতে পারে আর্জেন্টিনা। ইংলিশদের পাঁচ শটের দুটি লক্ষ্যে ছিল।

প্রথম ৪৫ মিনিটে আর্জেন্টিনা ফাউল করে ১২টি, ইংল্যান্ড সাতটি। দুই দলেরই একজন করে দেখেন হলুদ কার্ড।

গোলের জন্য আর্জেন্টিনা দুটি ও ইংল্যান্ড একটি শট নেয়, যদিও কারো শটই ছিল লক্ষ্যে।

খেলা শুরুর পর থেকেই দুই দল শারীরিক লড়াইয়ে নেমে পড়ে। মাত্র দ্বিতীয় মিনিটেই জুদ বেলিংহ্যামকে ট্যাকল করে ফাউল করেন লিয়ান্দ্রো পারেদেস। এরপর মেসি, বেলিংহ্যাম, অ্যান্ডারসন ও এনজো ফার্নান্দেজকে ঘিরে মাঝমাঠে কয়েকবার উত্তেজনা তৈরি হয়।

প্রথম ১০ মিনিটেই আর্জেন্টিনা চারটি ফাউল করে, যা চলতি বিশ্বকাপে কোনো দলের প্রথম ১০ মিনিটে যৌথভাবে সর্বোচ্চ ফাউলের রেকর্ড।

প্রথমার্ধের বড় একটি সময় দুই দলই একে অপরকে আটকে রাখে মাঝমাঠে। ২০ মিনিট পেরিয়ে গেলেও কোনো দলই উল্লেখযোগ্য শট নিতে পারেনি।

ইংল্যান্ড কিছুটা বেশি সংগঠিত ফুটবল খেললেও হ্যারি কেইন কার্যত ম্যাচের বাইরে ছিলেন। প্রথম ২৮ মিনিটে ইংলিশ অধিনায়কের বল স্পর্শের সংখ্যা ছিল মাত্র চারটি, যা মাঠের সব খেলোয়াড়ের মধ্যে সবচেয়ে কম।

ইংল্যান্ডের মিডফিল্ডার এলিয়ট অ্যান্ডারসন পুরো প্রথমার্ধে মেসিকে ছায়ার মতো অনুসরণ করেন। কয়েকবার বল কেড়ে নেওয়ার পাশাপাশি শক্ত ট্যাকলও করেন তিনি।

৩৭ মিনিটে মেসি ড্রিবল করে কয়েকজনকে কাটিয়ে এগোতেই অ্যান্ডারসনের করা ট্যাকলে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক। সঙ্গে সঙ্গে দুই দলের খেলোয়াড়রা রেফারিকে ঘিরে ধরেন। কিছুক্ষণ উত্তেজনা চললেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন রেফারি ইসমাইল এলফাথ। এই ফাউলের জন্য ম্যাচের প্রথম হলুদ কার্ড দেখেন অ্যান্ডারসন।

৩২ মিনিটে জুদ বেলিংহ্যামের দুর্দান্ত দৌড়ে পাওয়া ফ্রি-কিক থেকে ইংল্যান্ড প্রায় এগিয়েই গিয়েছিল। ডেকলান রাইসের দারুণ ভাসানো বলে জন স্টোনস লিসান্দ্রো মার্তিনেজকে পরাস্ত করে হেড করেন। তবে বল জালের পাশ ঘেঁষে বাইরে চলে যায়।

অন্যদিকে ৩৯ মিনিটে আর্জেন্টিনার সেরা সুযোগ আসে মেসির বুদ্ধিদীপ্ত ফ্রি-কিক থেকে। ছোট পাসে খেলা শুরু করে পারেদেসের কাছ থেকে বল ফেরত পান মেসি। তার শট হ্যারি কেইনের গায়ে লেগে ফিরে আসে এনজো ফার্নান্দেজের কাছে। দূরপাল্লার জোরালো শটে গোলের খুব কাছাকাছি পৌঁছে যান তিনি, কিন্তু বল অল্পের জন্য পোস্টের ওপর দিয়ে বাইরে চলে যায়।

৪২ মিনিটে পাল্টা আক্রমণে উঠতে থাকা মর্গান রজার্সকে টেনে থামিয়ে দেন লিসান্দ্রো মার্তিনেজ। এতে ম্যাচে আর্জেন্টিনার প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে হলুদ কার্ড দেখেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের এই ডিফেন্ডার।

প্রথমার্ধে গোল না হলেও উত্তেজনার কোনো কমতি ছিল না। দুই দলই রক্ষণে ছিল দারুণ শৃঙ্খলাবদ্ধ, তবে আক্রমণে শেষ মুহূর্তের ধারালো স্পর্শের অভাব ছিল স্পষ্ট। রেফারি তিন মিনিট অতিরিক্ত সময় যোগ করলেও সেই সময়েও গোলের দেখা মেলেনি। ফলে বিরতিতে গোলশূন্য সমতায় মাঠ ছাড়ে দুই বিশ্বশক্তি।

দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হতেই দৃশ্যপট বদলের আভাস মেলে। প্রতিপক্ষের দুর্বল আক্রমণ রুখে, পাল্টা আক্রমণে ডি-বক্সে ঢুকে জোরাল শট নেন হুলিয়ান আলভারেস, ঝাঁপিয়ে আটকান গোলরক্ষক। ফিরতি বল পেয়ে একজনকে কাটিয়ে আবার শট নেন আতলেতিকো মাদ্রিদ ফরোয়ার্ড, বল আরেকজনের পায়ে লেগে বাইরে যায়।

অবশেষে ৫৫তম মিনিটে ম্যাচের ডেডলক ভাঙতে পারে ইংল্যান্ড। প্রতি-আক্রমণে উড়ে আসা বল প্রথমে আটকানোর সুযোগ পেয়েও পারেননি নিকোলাস তালিয়াফিকো। তার ব্যর্থতায় সতীর্থ ঘুরে বল পেয়ে ডান দিক থেকে গোলমুখে দারুণ ক্রস বাড়ান রজার্স, আর নিখুঁত টোকায় বল জালে পাঠান গর্ডন। তার সঙ্গেই লেগে ছিলেন নাউয়েল মলিনা, কিন্তু বলের গতি-প্রকৃতি বুঝতেই পারেননি এই রাইট-ব্যাক।

বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনালে ইংল্যান্ডের চতুর্থ গোলদাতা হলেন গর্ডন।

তিন মিনিটের মধ্যে দারুণ এক আক্রমণ শাণায় আর্জেন্টিনা। বল পায়ে ডি-বক্সে ঢুকে পড়েছিলেন দলে ফেরা সিমেওনে, তবে তার শট নেওয়ার আগমুহূর্তে দারুণ ক্ষিপ্রতায় অসাধারণ এক ট্যাকলে দলকে বিপদুমক্ত করেন ডিফেন্ডার জেড স্পেন্স।

দ্বিতীয় হাইড্রেশন ব্রেকের আগে গোল প্রায় পেয়েই যাচ্ছিল বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। কিন্তু মেসির ক্রসে নিকোলা হন্সালেসের হেড দারুণ নৈপুণ্যে আটকে দেন জর্ডান পিকফোর্ড।

এই বিরতি থেকে ফেরার পর, আর্জেন্টাইনদের মরিয়া ভাব ফুটে উঠতে থাকে। দুর্ভাগ্য বাধা হয়ে না দাঁড়ালে, ৭৬তম মিনিটে গোল পেতে পারতো তারা। বদলি নেমে দারুণ এক ক্রস বাড়ান রদ্রিগো দেল পল, ডাইভিং হেড করেন আলেক্সিস মাক আলিস্তের, কিন্তু বল লাগে পোস্টে।

অনেক প্রচেষ্টা নষ্ট হওয়ার পর, ৮৫তম মিনিটে একক প্রচেষ্টায় অসাধারণ গোলে সমতা টানেন ফের্নান্দেস। ডান দিক থেকে মেসির পাস ডি-বক্সের অনেকটা বাইরে পেয়ে জোরাল শট নেন চেলসি মিডফিল্ডার, বল হাওয়ায় ভেসে খুঁজে নেয় ঠিকানা।

গোলটি যেন ইংল্যান্ড শিবিরে জোর ধাক্কা হয়ে আসে। আবার ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার তেমন মরিয়া চেষ্টাই দেখা যায়নি তাদের মধ্যে। আর যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে পিছিয়ে পড়ার পর পুরোপুরিই খেই হারিয়ে ফেলে তারা।

মাক আলিস্তেরের আরেকটি শট পোস্টে প্রতিহত হলে হয়তো হাফ ছেড়েছিল ইংল্যান্ড; তবে সেটা কেবলই মুহূর্তের জন্য। ডান দিকে বল পেয়ে ডি-বক্সে দারুণ ক্রস বাড়ান মেসি এবং অরক্ষিত মার্তিনেস নিখুঁত হেডে গড়ে দেন ব্যবধান।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এই নিয়ে তৃতীয় জয় পেল আর্জেন্টিনা, এবং কাকতালীয় ব্যাপার- তিনটিই তাদের নীল জার্সি (অ্যাওয়ে) পরে এবং তিনটিই বিশ্বকাপে!

একই সঙ্গে বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনালে শতভাগ সাফল্যের ধারাও ধরে রাখল লাতিন আমেরিকার দলটি; তিনবারের বিশ্বকাপ জয়ীরা ছয় ম্যাচ খেলে জিতল ছয়টিতেই।

পুরো নকআউট পর্বজুড়েই কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছে লিওনেল স্কালোনির দল। কেপ ভার্দে, মিশর ও সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে লড়াই করে এগিয়ে আসার পর সেমিফাইনালেও পিছিয়ে পড়েছিল তারা। তবে প্রতিবারের মতো এবারও শেষ মুহূর্তে ঘুরে দাঁড়িয়ে নিজেদের মানসিক দৃঢ়তার প্রমাণ দিয়েছে আলবিসেলেস্তেরা।

এবার ফাইনালে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ স্পেন। আগামী রোববারের লড়াইয়ে শিরোপা ধরে রাখতে পারলে ইতিহাসের মাত্র তৃতীয় দল হিসেবে টানা দুটি বিশ্বকাপ জয়ের কীর্তি গড়বে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।

জনপ্রিয় খবর

আবহাওয়া

ঢাকা-সিলেট রুটে আসছে বিরতিহীন ‘টাঙ্গুয়ার এক্সপ্রেস’

ইংল্যান্ডকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বার ফাইনালে আর্জেন্টিনা

প্রকাশের সময় : ০৯:৩৮:৪২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬

স্পোর্টস ডেস্ক :

টানা দ্বিতীয়বার ফাইনালে উঠল আর্জেন্টিনা। আটলান্টা স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইউরোপের অন্যতম পরাশক্তি ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারায় দলটি।

ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ের দুই ও চার নম্বর দলটির মধ্যকার হাইভোল্টেজ ম্যাচটির দুই অর্ধের গল্প পুরোই ভিন্ন। এখানে প্রথমার্ধে ফুটবলের রূপটা ছিল কুৎসিত। সত্যিকার ফুটবল তখন হয় যৎসামান্য। দুই দলই মেতে ওঠে শারীরিক শক্তি নির্ভর লড়াইয়ে। হতে থাকে ফাউলের পর ফাউল; এই সময়ে ফাউল হয় ১৯টি।

তবে পরের অর্ধের গল্পটা সুন্দর ফুটবলের। যেখানে ধাক্কা খেয়ে পাল্টে যায় আর্জেন্টিনা। আক্রমণের পর আক্রমণে প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করে তুলে নিল দারুণ এক জয়।

বিপরীতে, আরও একবার খেই হারিয়ে ব্যর্থতার গল্প লিখল ইংল্যান্ড। ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপ জয়ীদের দ্বিতীয়বার ফাইনালে খেলতে না পারার হতাশার যাত্রা দীর্ঘায়িত হলো আরও।

পুরো ম্যাচে প্রায় ৬৫ শতাংশ সময় বল দখলে রেখে, গোলের জন্য ১৫টি শট নিয়ে পাঁচটি লক্ষ্যে রাখতে পারে আর্জেন্টিনা। ইংলিশদের পাঁচ শটের দুটি লক্ষ্যে ছিল।

প্রথম ৪৫ মিনিটে আর্জেন্টিনা ফাউল করে ১২টি, ইংল্যান্ড সাতটি। দুই দলেরই একজন করে দেখেন হলুদ কার্ড।

গোলের জন্য আর্জেন্টিনা দুটি ও ইংল্যান্ড একটি শট নেয়, যদিও কারো শটই ছিল লক্ষ্যে।

খেলা শুরুর পর থেকেই দুই দল শারীরিক লড়াইয়ে নেমে পড়ে। মাত্র দ্বিতীয় মিনিটেই জুদ বেলিংহ্যামকে ট্যাকল করে ফাউল করেন লিয়ান্দ্রো পারেদেস। এরপর মেসি, বেলিংহ্যাম, অ্যান্ডারসন ও এনজো ফার্নান্দেজকে ঘিরে মাঝমাঠে কয়েকবার উত্তেজনা তৈরি হয়।

প্রথম ১০ মিনিটেই আর্জেন্টিনা চারটি ফাউল করে, যা চলতি বিশ্বকাপে কোনো দলের প্রথম ১০ মিনিটে যৌথভাবে সর্বোচ্চ ফাউলের রেকর্ড।

প্রথমার্ধের বড় একটি সময় দুই দলই একে অপরকে আটকে রাখে মাঝমাঠে। ২০ মিনিট পেরিয়ে গেলেও কোনো দলই উল্লেখযোগ্য শট নিতে পারেনি।

ইংল্যান্ড কিছুটা বেশি সংগঠিত ফুটবল খেললেও হ্যারি কেইন কার্যত ম্যাচের বাইরে ছিলেন। প্রথম ২৮ মিনিটে ইংলিশ অধিনায়কের বল স্পর্শের সংখ্যা ছিল মাত্র চারটি, যা মাঠের সব খেলোয়াড়ের মধ্যে সবচেয়ে কম।

ইংল্যান্ডের মিডফিল্ডার এলিয়ট অ্যান্ডারসন পুরো প্রথমার্ধে মেসিকে ছায়ার মতো অনুসরণ করেন। কয়েকবার বল কেড়ে নেওয়ার পাশাপাশি শক্ত ট্যাকলও করেন তিনি।

৩৭ মিনিটে মেসি ড্রিবল করে কয়েকজনকে কাটিয়ে এগোতেই অ্যান্ডারসনের করা ট্যাকলে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক। সঙ্গে সঙ্গে দুই দলের খেলোয়াড়রা রেফারিকে ঘিরে ধরেন। কিছুক্ষণ উত্তেজনা চললেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন রেফারি ইসমাইল এলফাথ। এই ফাউলের জন্য ম্যাচের প্রথম হলুদ কার্ড দেখেন অ্যান্ডারসন।

৩২ মিনিটে জুদ বেলিংহ্যামের দুর্দান্ত দৌড়ে পাওয়া ফ্রি-কিক থেকে ইংল্যান্ড প্রায় এগিয়েই গিয়েছিল। ডেকলান রাইসের দারুণ ভাসানো বলে জন স্টোনস লিসান্দ্রো মার্তিনেজকে পরাস্ত করে হেড করেন। তবে বল জালের পাশ ঘেঁষে বাইরে চলে যায়।

অন্যদিকে ৩৯ মিনিটে আর্জেন্টিনার সেরা সুযোগ আসে মেসির বুদ্ধিদীপ্ত ফ্রি-কিক থেকে। ছোট পাসে খেলা শুরু করে পারেদেসের কাছ থেকে বল ফেরত পান মেসি। তার শট হ্যারি কেইনের গায়ে লেগে ফিরে আসে এনজো ফার্নান্দেজের কাছে। দূরপাল্লার জোরালো শটে গোলের খুব কাছাকাছি পৌঁছে যান তিনি, কিন্তু বল অল্পের জন্য পোস্টের ওপর দিয়ে বাইরে চলে যায়।

৪২ মিনিটে পাল্টা আক্রমণে উঠতে থাকা মর্গান রজার্সকে টেনে থামিয়ে দেন লিসান্দ্রো মার্তিনেজ। এতে ম্যাচে আর্জেন্টিনার প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে হলুদ কার্ড দেখেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের এই ডিফেন্ডার।

প্রথমার্ধে গোল না হলেও উত্তেজনার কোনো কমতি ছিল না। দুই দলই রক্ষণে ছিল দারুণ শৃঙ্খলাবদ্ধ, তবে আক্রমণে শেষ মুহূর্তের ধারালো স্পর্শের অভাব ছিল স্পষ্ট। রেফারি তিন মিনিট অতিরিক্ত সময় যোগ করলেও সেই সময়েও গোলের দেখা মেলেনি। ফলে বিরতিতে গোলশূন্য সমতায় মাঠ ছাড়ে দুই বিশ্বশক্তি।

দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হতেই দৃশ্যপট বদলের আভাস মেলে। প্রতিপক্ষের দুর্বল আক্রমণ রুখে, পাল্টা আক্রমণে ডি-বক্সে ঢুকে জোরাল শট নেন হুলিয়ান আলভারেস, ঝাঁপিয়ে আটকান গোলরক্ষক। ফিরতি বল পেয়ে একজনকে কাটিয়ে আবার শট নেন আতলেতিকো মাদ্রিদ ফরোয়ার্ড, বল আরেকজনের পায়ে লেগে বাইরে যায়।

অবশেষে ৫৫তম মিনিটে ম্যাচের ডেডলক ভাঙতে পারে ইংল্যান্ড। প্রতি-আক্রমণে উড়ে আসা বল প্রথমে আটকানোর সুযোগ পেয়েও পারেননি নিকোলাস তালিয়াফিকো। তার ব্যর্থতায় সতীর্থ ঘুরে বল পেয়ে ডান দিক থেকে গোলমুখে দারুণ ক্রস বাড়ান রজার্স, আর নিখুঁত টোকায় বল জালে পাঠান গর্ডন। তার সঙ্গেই লেগে ছিলেন নাউয়েল মলিনা, কিন্তু বলের গতি-প্রকৃতি বুঝতেই পারেননি এই রাইট-ব্যাক।

বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনালে ইংল্যান্ডের চতুর্থ গোলদাতা হলেন গর্ডন।

তিন মিনিটের মধ্যে দারুণ এক আক্রমণ শাণায় আর্জেন্টিনা। বল পায়ে ডি-বক্সে ঢুকে পড়েছিলেন দলে ফেরা সিমেওনে, তবে তার শট নেওয়ার আগমুহূর্তে দারুণ ক্ষিপ্রতায় অসাধারণ এক ট্যাকলে দলকে বিপদুমক্ত করেন ডিফেন্ডার জেড স্পেন্স।

দ্বিতীয় হাইড্রেশন ব্রেকের আগে গোল প্রায় পেয়েই যাচ্ছিল বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। কিন্তু মেসির ক্রসে নিকোলা হন্সালেসের হেড দারুণ নৈপুণ্যে আটকে দেন জর্ডান পিকফোর্ড।

এই বিরতি থেকে ফেরার পর, আর্জেন্টাইনদের মরিয়া ভাব ফুটে উঠতে থাকে। দুর্ভাগ্য বাধা হয়ে না দাঁড়ালে, ৭৬তম মিনিটে গোল পেতে পারতো তারা। বদলি নেমে দারুণ এক ক্রস বাড়ান রদ্রিগো দেল পল, ডাইভিং হেড করেন আলেক্সিস মাক আলিস্তের, কিন্তু বল লাগে পোস্টে।

অনেক প্রচেষ্টা নষ্ট হওয়ার পর, ৮৫তম মিনিটে একক প্রচেষ্টায় অসাধারণ গোলে সমতা টানেন ফের্নান্দেস। ডান দিক থেকে মেসির পাস ডি-বক্সের অনেকটা বাইরে পেয়ে জোরাল শট নেন চেলসি মিডফিল্ডার, বল হাওয়ায় ভেসে খুঁজে নেয় ঠিকানা।

গোলটি যেন ইংল্যান্ড শিবিরে জোর ধাক্কা হয়ে আসে। আবার ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার তেমন মরিয়া চেষ্টাই দেখা যায়নি তাদের মধ্যে। আর যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে পিছিয়ে পড়ার পর পুরোপুরিই খেই হারিয়ে ফেলে তারা।

মাক আলিস্তেরের আরেকটি শট পোস্টে প্রতিহত হলে হয়তো হাফ ছেড়েছিল ইংল্যান্ড; তবে সেটা কেবলই মুহূর্তের জন্য। ডান দিকে বল পেয়ে ডি-বক্সে দারুণ ক্রস বাড়ান মেসি এবং অরক্ষিত মার্তিনেস নিখুঁত হেডে গড়ে দেন ব্যবধান।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এই নিয়ে তৃতীয় জয় পেল আর্জেন্টিনা, এবং কাকতালীয় ব্যাপার- তিনটিই তাদের নীল জার্সি (অ্যাওয়ে) পরে এবং তিনটিই বিশ্বকাপে!

একই সঙ্গে বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনালে শতভাগ সাফল্যের ধারাও ধরে রাখল লাতিন আমেরিকার দলটি; তিনবারের বিশ্বকাপ জয়ীরা ছয় ম্যাচ খেলে জিতল ছয়টিতেই।

পুরো নকআউট পর্বজুড়েই কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছে লিওনেল স্কালোনির দল। কেপ ভার্দে, মিশর ও সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে লড়াই করে এগিয়ে আসার পর সেমিফাইনালেও পিছিয়ে পড়েছিল তারা। তবে প্রতিবারের মতো এবারও শেষ মুহূর্তে ঘুরে দাঁড়িয়ে নিজেদের মানসিক দৃঢ়তার প্রমাণ দিয়েছে আলবিসেলেস্তেরা।

এবার ফাইনালে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ স্পেন। আগামী রোববারের লড়াইয়ে শিরোপা ধরে রাখতে পারলে ইতিহাসের মাত্র তৃতীয় দল হিসেবে টানা দুটি বিশ্বকাপ জয়ের কীর্তি গড়বে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।