নিজস্ব প্রতিবেদক :
অন্তর্বর্তী সরকার জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার সুযোগ দেয়নি বলে অভিযোগ করে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, গত বছর ডিসিদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার সুযোগ পাইনি। গত বছর যে সরকার ছিল, তারা রাষ্ট্রপতিকে বঞ্চিত করেছে। বর্তমান নির্বাচিত সরকার সেই প্রথা আবার চালু করায় ধন্যবাদ জানাই।
রোববার (৩ মে) সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে জেলা প্রশাসক সম্মেলন উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, দীর্ঘ অপশাসনের অবসানের পর সংগতভাবে নতুন সরকারের কাছে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। একটি দায়িত্বশীল, স্বচ্ছ ও সেবামুখী প্রশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনমানুষের প্রত্যাশা পূরণ করা জরুরি। বর্তমান সরকার ইতোমধ্যে জনগণের কল্যাণে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এ জন্য আপনাদেরও সরকারের নেওয়া বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি, কর্মসূচি, নীতি ও প্রকল্প বাস্তবায়নে সচেষ্ট হতে হবে, জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
যুবসমাজের দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির ব্যাপারে জেলা প্রশাসকদের আরও সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দিয়ে মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার প্রতিরোধে সর্বোচ্চ কঠোরতা অবলম্বন করবেন। দুর্নীতি−সুশাসন ও উন্নয়নের প্রধান অন্তরায়। দুর্নীতির ব্যাপারে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নে আপনারা আরো সচেষ্ট হবেন। মাঠ প্রশাসনের সর্বস্তরে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও পেশাদারিত্ব প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দেবেন।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান এবং দীর্ঘ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শহীদ ও আহতদের, যাদের চরম আত্মত্যাগ ও অসীম সাহসিকতার মধ্য দিয়ে দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা পেয়েছে। সৃষ্টি হয়েছে জবাবদিহিমূলক, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক নতুন বাংলাদেশ গড়ার বিশাল সুযোগ।
তিনি আরো বলেন, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে আয়োজনে মাঠ প্রশাসনে আপনারা দক্ষতা, সততা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। সেজন্য আমি আপনাদের সাধুবাদ জানাই। জেলা প্রশাসক সম্মেলন সরকারের নীতি-নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের মধ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন। মাঠ প্রশাসনের অভিজ্ঞতা, সমস্যা, সম্ভাবনা ও করণীয় বিষয়ে কার্যকর মতবিনিময়ের এক সুবর্ণ সুযোগ।
রাষ্ট্রপতি বলেন, দীর্ঘ অপশাসনের অবসানের পর সংগতভাবেই এই নতুন সরকারের কাছে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। একটি দায়িত্বশীল, স্বচ্ছ ও সেবামুখী প্রশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনমানুষের প্রত্যাশা পূরণ করা জরুরি। বর্তমান সরকার এরইমধ্যে জনগণের কল্যাণে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এজন্য আপনাদেরকেও সরকারের নেওয়া বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি, কর্মসূচি, নীতি ও প্রকল্প বাস্তবায়নে সচেষ্ট হতে হবে−জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আর এসব উদ্যোগের সুফল যাতে প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে যথাসময়ে পৌঁছে, তা নিশ্চিত করাও আপনাদের দায়িত্ব। আপনারা মাঠ পর্যায়ে সরকারের প্রত্যক্ষ প্রতিনিধি। মনে রাখতে হবে সবকিছুর উপরে আপনারা জনগণের সেবক। সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা, সমস্যা ও অভিযোগ শুনতে নিয়মিত সময় দেবেন ও সুরাহায় সক্রিয় থাকবেন।
‘জনগণের দোরগোড়ায় দ্রুত, সহজ ও মানসম্মত সেবা পৌঁছে দেওয়াকে অগ্রাধিকার দেবেন। এজন্য তথ্য প্রযুক্তির সহযোগিতা নেবেন। সব সরকারি-বেসরকারি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সেবাও যেন কোনো বাধা-বিঘ্ন ছাড়া সঠিকভাবে মানুষের ঘরে-ঘরে পৌঁছে দেওয়া যায়, সে লক্ষ্যে তৎপর থাকবেন।’
দেশের প্রত্যেকটি অঞ্চলের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য, ঐতিহ্য, সমস্যা ও সম্ভাবনা রয়েছে জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, আমি অনুরোধ করবো, দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আপনারা ‘প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা ও স্মৃতি’কে কাজে লাগাবেন। আধুনিক ধ্যান-ধারণা, লাগসই সমাধান ও উদ্ভাবনী চর্চাকে নিয়ে এগিয়ে যাবেন। জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নে জনগণের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করবেন এবং তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেবেন।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা ও যুদ্ধের ফলে সারা বিশ্বে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিরসনে সরকারের গৃহীত সিদ্ধান্ত মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নে সদা সজাগ থাকবেন। অবৈধ মজুতদারি রোধ এবং দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখার জন্য নিয়মিত বাজার মনিটরিংসহ অন্যান্য কার্যক্রম আরো জোরদার করবেন। সরকারি অর্থের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার নিশ্চিতে সম্পদের সঠিক ব্যবহার, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হ্রাস এবং উন্নয়ন প্রকল্প যথাসময়ে বাস্তবায়নের বিষয়টিও নিয়মিত তদারকি করবেন। তথ্য প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা সহজ করার পাশাপাশি আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। কিন্তু দুর্বৃত্তরা এর ভয়াবহ অপব্যবহার করছে। ফলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অনলাইনে বিভিন্ন অপরাধ সংঘটনের প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। স্থানীয় পর্যায়ে অপতথ্য, ভুয়া তথ্য ও গুজব ছড়িয়ে সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, জাতীয় ঐক্য ও সংহতি বিনষ্টের অপতৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। সুধী সমাজ ও আইন-শৃঙ্খলা সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে এসব অপরাধ কঠোর হাতে দমনে সচেষ্ট থাকবেন।
মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, গ্রামীণ বিরোধ ও মামলা মোকদ্দমার বেশির ভাগ এখনো জমিজমা সংক্রান্ত। তাই ভূমি ব্যবস্থাপনাকে আরো দক্ষ, আধুনিক, জনকল্যাণমুখী ও জবাবদিহিমূলক করে গড়ে তুলতে সচেষ্ট হবেন। যেকোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোরভাবে ব্যবস্থা নেবেন। আবাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষিনির্ভর শিল্প, বিদ্যুৎ, গ্যাস, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন— এসব মৌলিক সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের কাজ তদারকি করবেন। নারী ও শিশুসহ সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উপর যে-কোনো ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবেন। লিঙ্গভিত্তিক অপরাধ, নারীর নিরাপত্তা ও প্রান্তিক পর্যায়ের নারীদের ক্ষমতায়ন নিশ্চিতে আরো সক্রিয়ভাবে কাজ করবেন।
তিনি বলেন, এরইমধ্যে আপনারা প্রধানমন্ত্রীর মূল্যবান দিকনির্দেশনা ও পরামর্শ পেয়েছেন। আগামী কয়েকদিন আপনারা বিভিন্ন সভায় অংশ নেবেন। আমার বিশ্বাস, এই সম্মেলন থেকে যে নির্দেশনা ও দায়িত্ব পাবেন, সেগুলোর বাস্তবায়নে আপনারা আরো সক্রিয়, সচেষ্ট ও আন্তরিক হবেন। আপনাদের মেধা, সততা ও নিষ্ঠা দেশের উন্নয়ন ও জনকল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা। আমি বিশ্বাস করি, আপনারা অর্পিত দায়িত্ব সফলভাবে পালনের মাধ্যমে একটি উন্নত, আধুনিক, ন্যায়ভিত্তিক মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে অগ্রণী ভূমিকা রাখবেন। জনকল্যাণমুখী গণতান্ত্রিক সরকারের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল ও সমুন্নত করবেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 

















