রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে মিয়ানমারকেই দায়িত্ব নিতে হবে : আইনমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

রোহিঙ্গা সংকটকে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার রক্ষায় মিয়ানমার সরকারকেই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

রোববার (২৩ আগস্ট) জাতীয় প্রেস ক্লাবে নীতি গবেষণা কেন্দ্র আয়োজিত ‘রোহিঙ্গা সংকট: বর্তমান বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

আইনমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সংকট মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংকট। তবে বাংলাদেশ সরকার বিষয়টিকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছে। মানবিক বিবেচনায় সরকার রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় দিয়েছে।

মো. আসাদুজ্জামান বলেন, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক আইন ও সংবিধান মেনে কাজ করছে সরকার। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জাতীয় ঐক্যের বিকল্প নেই।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়, বাংলাদেশে মানবিক মূল্যবোধের জায়গা থেকে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ বারবার চেষ্টা করেছে আন্তর্জাতিকভাবে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে তাদের-ই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের ভূখণ্ডের অখণ্ডতা রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা ইস্যুতে যাতে কোনো ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন না হয়, সে বিষয়েও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

মো. আসাদুজ্জামান বলেন, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশি নয়, তারা এই ভূখণ্ডের জনগোষ্ঠীও নয়। আমরা বলতে চাই, তারা মানুষ।

রোহিঙ্গা সংকটে সরকারের নেয়া পদক্ষেপের বিষয়ে জনগণের সমর্থন রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে সরকার যে পদক্ষেপ নিতে চায়, সেখানে জনগণের সমর্থন আছে।

আমাদের কাছে বাংলাদেশের ভূখণ্ডের অখণ্ডতা রক্ষা করাই সবচেয়ে বড় ইস্যু বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের ভূখন্ড রক্ষা করতে যেয়ে নিরাপত্তার দিকটাকে হয়তো আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। কিন্তু আমরা ডিপ্লোমেটিক পাসপোর্ট এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটকে কখনোই এড়িয়ে করছি না। একইসঙ্গে আমরা মানবাধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। যেন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ কোনভাবেই না আসে। রোহিঙ্গাদের মানবাধিকারের বিষয়টা নিশ্চিত হোক। তারা তাদের মাতৃভূমিতে ফিরে যাক।

মো. আসাদুজ্জামান বলেন, রোহিঙ্গাকে আন্তর্জাতিকভাবে যেভাবে দেখা হচ্ছে আমরাও সেভাবেই দেখছি, যেটা মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সমস্যা। রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক, মিয়ানমারের জনগোষ্ঠী। মিয়ানমারের মানুষের মানবাধিকার রক্ষার জন্য মিয়ানমার সরকারকে আল্টিমেটলি পদক্ষেপ নিতে হবে। বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন সময় মিয়ানমারকে বিভিন্নভাবে বলার এবং বোঝানোর চেষ্টা করেছে যে রোহিঙ্গারা তোমাদের ভূখণ্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

তিনি বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়ার সরকার মিয়ানমারকে যেভাবে রোহিঙ্গা ইস্যুতে অ্যাড্রেস করেছেন পরবর্তী সরকারগুলো সেভাবে পারেনি বলেই বাংলাদেশ এমন একটি জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের আমেরিকাকে এটা বোঝাতে হবে। আমাদের চীনকে এটা বোঝাতে হবে। ভারতকে এটা বোঝাতে হবে। আমরা মনে করি, অবশ্যই তাদের সঙ্গে আলোচনার বিষয় আছে। তবে, সবার আগে আমার বাংলাদেশের জনগণকে এক কাতারে দাঁড়াতে হবে। বাংলাদেশের মানুষকে সবার দল-মত নির্বিশেষে মতভেদ ভুলে যেয়ে আমাদের বুঝতে হবে। এই ভূখণ্ড আমাদের। এই বাংলাদেশটা সবার আগে।

বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের এই দেশের প্রতি একটা কর্তব্যবোধ আছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, সেটা আমাদের সাংবিধানিকভাবেই উল্লেখ করা আছে। আমরা মনে করি রোহিঙ্গা সংকট মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংকট। বাংলাদেশ সরকার এটাকে দেখছে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ আশ্রয় দিয়েছে, তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে সম্পূর্ণ মানবিক মূল্যবোধের জায়গা থেকে।

আইনমন্ত্রী বলেন, একজন মানুষ যখন ভূমিষ্ঠ হয় তখন সেই মানুষের কিছু অধিকার মানবাধিকারে রূপান্তরিত হয়। একটা সার্বজনীন। মানুষ হিসেবে জন্ম নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার কিছু অধিকার থাকে। জীবনধারণের অধিকার। তার খাদ্যের অধিকার। তার ন্যূনতম কিছু অধিকার থাকে। এই রোহিঙ্গারা তার নিজ দেশে জেনোসাইডের শিকার হচ্ছে। তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়েই বাংলাদেশের বর্ডার ক্রস করে যখন আসে, তখন তাদের বাংলাদেশের জনগণ আশ্রয় দেওয়ার জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত দেয়। তখন মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা তাদের পাশে দাঁড়িয়েছি। ফলে, এটা কখনোই আন্তর্জাতিক কোনো ইস্যু না, এই ইস্যুটা হলো মানবাধিকারের ইস্যু।

রোহিঙ্গাকে তাদের দেশে পাঠানোটা মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়, হস্তক্ষেপের বিষয় না। এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, বিষয়টা হলো রোহিঙ্গারা বাংলাদেশী না। এই ভূখণ্ডের জনগোষ্ঠী না। তবে, আমরা বলতে চাই রোহিঙ্গারা মানুষ, তাদেরও মানবাধিকার আছে। রোহিঙ্গারা সংস্কৃতিগতভাবে নৃতাত্ত্বিকভাবে তারা ওই ভূখণ্ডের অধিবাসী এবং সেখানে আন্তর্জাতিক আইনে তারা কিছু প্রোটেকশন পাওয়ার অধিকার রাখে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়ার সরকার যেভাবে রোহিঙ্গা সমস্যা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমাধান করেছিলেন সেই পথটা সুগম হবে। সেই পথ ধরেই আমরা এগিয়ে যাবো। রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার বিষয়টা নিশ্চিত হোক। তারা তাদের মাতৃভূমিতে ফিরে যাক।

তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের মানুষকে দল-মত নির্বিশেষে, সব মতভেদ ভুলে এক কাতারে দাঁড়াতে হবে। আমাদের বুঝতে হবে—এই ভূখণ্ড, এই বাংলাদেশ সবার আগে। যখন ভূখণ্ডের কোনো বিষয় নিয়ে আমরা আন্তর্জাতিকভাবে মোকাবিলা করতে চাই, তখন ধরে নিতে হবে, সেই আন্তর্জাতিক মোকাবিলা হচ্ছে আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য। দেশের মানুষের ভালো ও কল্যাণের জন্য।

আসাদুজ্জামান বলেন, ১৯৭১ সালে যে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল, সেই বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষেরই দেশের প্রতি একটি কর্তব্যবোধ রয়েছে। আমাদের সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদেও বিষয়টি উল্লেখ করা রয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে আমরা কীভাবে এসব বিষয় মোকাবিলা করব, সেটিও আমাদের সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে।

সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদ অনুসরণ করলে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সরকার কীভাবে বিষয়গুলো মোকাবিলা করবে এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রামরত থাকলে তাদের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করা হবে—সেটিও আমাদের সংবিধানে বিধৃত রয়েছে।

তিনি বলেন, আমরা মনে করি, রোহিঙ্গা সংকট মূলত মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংকট। অন্যদিকে, বাংলাদেশ সরকার বিষয়টিকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছে। অনেকে বলতে পারেন, রোহিঙ্গারা যখন বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, তখন বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চলে গেছে। আসলে তা নয়। বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে, তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে সম্পূর্ণ মানবিক মূল্যবোধের জায়গা থেকে।

আইনমন্ত্রী বলেন, এটি নিয়ে আমাদের সঙ্গে মিয়ানমারের কোনো আন্তর্জাতিক বিরোধের বিষয় নয়। এটি মানবাধিকারের বিষয়। হিউম্যান রাইটস বা মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকেই আমরা বিষয়টিকে দেখি। মানবিক মূল্যবোধের জায়গা থেকে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদ অনুসারেও এটি আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। সেখান থেকেই আমরা বলছি, রোহিঙ্গা ইস্যুটিকে জাতীয় ঐকমত্যের জায়গায় নিয়ে আসতে পারলে সেটি একটি কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে। সেই চিন্তা থেকেই আমাদের প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই বিষয়টি নিয়ে একটি জাতীয় কমিটি গঠন করেছেন— কীভাবে বিষয়টিকে অ্যাড্রেস করা যায়, তা নিয়ে কাজ করার জন্য।

তিনি বলেন, আমাদের কাছে বাংলাদেশের ভূখণ্ডের অখণ্ডতা রক্ষা করাই সবচেয়ে বড় ইস্যু। সেই অখণ্ডতা রক্ষা করতে গিয়ে নিরাপত্তার বিষয়টিকে হয়তো আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। কিন্তু একই সঙ্গে আমরা ডিপ্লোমেটিক, সোশ্যাল কনটেক্সটকেও কখনো বাইপাস করছি না। একই সঙ্গে আমরা মানবাধিকারের বিষয়টিকেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি, যাতে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ কোনোভাবেই না আসে।

একই সময়ে সেখানে ক্রমবর্ধমান খুন-জখমের প্রবণতা ও অপরাধের প্রবণতাকেও আমাদের অ্যাড্রেস করতে হচ্ছে। সবদিক বিবেচনা করেই আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের প্রধানমন্ত্রী যে উদ্যোগ নিয়েছেন, সেই উদ্যোগের পেছনে আপনারা আপনাদের জায়গা থেকে সোশ্যাল প্রেসার গ্রুপ কিংবা ওয়াচডগ হিসেবে ভূমিকা রাখবেন। যাতে জাতীয় ঐকমত্য তৈরি হয়।

আয়োজকদের উদ্দেশ্য করে মন্ত্রী বলেন, আপনারা আপনাদের জায়গা থেকে যে বিষয়গুলো ভাবছেন, সেই ভাবনাটিই যে একমাত্র সঠিক—এমনটি না ভেবে আপনাদের ভাবনাগুলো আমাদের দিন। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে যে কমিটি রয়েছে, সেখানে সেগুলো উপস্থাপন করুন। আমি বিশ্বাস করি, আপনাদের ভাবনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও কমিটি বিবেচনা করবেন।

‘আমি নিজেও বলব, আপনাদের সোশ্যাল প্রেসার গ্রুপ হিসেবে যে সুপারিশগুলো আসছে, সেগুলো বিবেচনায় নিয়ে কীভাবে রোহিঙ্গা ইস্যুটিকে স্থায়ী সমাধানের পথে নেওয়া যায়, সে বিষয়ে কাজ করতে হবে’—যোগ করেন আইনমন্ত্রী।

তিনি আরও বলেন, আমরা মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার পক্ষে নই। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের বিষয় নয়। বিষয়টি হলো— আমরা বলতে চাই, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশি নয়। আমরা বলতে চাই, রোহিঙ্গারা এই ভূখণ্ডের জনগোষ্ঠী নয়। আমরা বলতে চাই, রোহিঙ্গারা মানুষ। আমরা বলতে চাই, রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার রয়েছে।

মো. আসাদুজ্জামান বলেন, আমরা বলতে চাই, সংস্কৃতিগত ও নৃতাত্ত্বিকভাবে তারা ওই ভূখণ্ডের অধিবাসী এবং আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে তারা কিছু সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রাখে। সেই দৃষ্টিভঙ্গি ও জায়গা থেকেই আমরা বিষয়গুলোকে অ্যাড্রেস করার পক্ষে।

আলোচনা সভায় নীতি গবেষণা কেন্দ্রের ট্রাস্টি সদস্য প্রফেসর এস কে তৌফিক এম হক, নীতি গবেষণা কেন্দ্রের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ড. শাকিল আহম্মেদ, রোহিঙ্গা নারী অধিকার কর্মী রাজিয়া সুলতানাসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন।

জনপ্রিয় খবর

আবহাওয়া

ঠিকাদার উধাও অষ্টগ্রামে বন্ধ ১৭৮ কোটি টাকার সেতু নির্মাণ

রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে মিয়ানমারকেই দায়িত্ব নিতে হবে : আইনমন্ত্রী

প্রকাশের সময় : ০২:৩৯:৪৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

রোহিঙ্গা সংকটকে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার রক্ষায় মিয়ানমার সরকারকেই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

রোববার (২৩ আগস্ট) জাতীয় প্রেস ক্লাবে নীতি গবেষণা কেন্দ্র আয়োজিত ‘রোহিঙ্গা সংকট: বর্তমান বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

আইনমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সংকট মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংকট। তবে বাংলাদেশ সরকার বিষয়টিকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছে। মানবিক বিবেচনায় সরকার রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় দিয়েছে।

মো. আসাদুজ্জামান বলেন, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক আইন ও সংবিধান মেনে কাজ করছে সরকার। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জাতীয় ঐক্যের বিকল্প নেই।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়, বাংলাদেশে মানবিক মূল্যবোধের জায়গা থেকে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ বারবার চেষ্টা করেছে আন্তর্জাতিকভাবে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে তাদের-ই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের ভূখণ্ডের অখণ্ডতা রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা ইস্যুতে যাতে কোনো ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন না হয়, সে বিষয়েও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

মো. আসাদুজ্জামান বলেন, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশি নয়, তারা এই ভূখণ্ডের জনগোষ্ঠীও নয়। আমরা বলতে চাই, তারা মানুষ।

রোহিঙ্গা সংকটে সরকারের নেয়া পদক্ষেপের বিষয়ে জনগণের সমর্থন রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে সরকার যে পদক্ষেপ নিতে চায়, সেখানে জনগণের সমর্থন আছে।

আমাদের কাছে বাংলাদেশের ভূখণ্ডের অখণ্ডতা রক্ষা করাই সবচেয়ে বড় ইস্যু বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের ভূখন্ড রক্ষা করতে যেয়ে নিরাপত্তার দিকটাকে হয়তো আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। কিন্তু আমরা ডিপ্লোমেটিক পাসপোর্ট এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটকে কখনোই এড়িয়ে করছি না। একইসঙ্গে আমরা মানবাধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। যেন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ কোনভাবেই না আসে। রোহিঙ্গাদের মানবাধিকারের বিষয়টা নিশ্চিত হোক। তারা তাদের মাতৃভূমিতে ফিরে যাক।

মো. আসাদুজ্জামান বলেন, রোহিঙ্গাকে আন্তর্জাতিকভাবে যেভাবে দেখা হচ্ছে আমরাও সেভাবেই দেখছি, যেটা মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সমস্যা। রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক, মিয়ানমারের জনগোষ্ঠী। মিয়ানমারের মানুষের মানবাধিকার রক্ষার জন্য মিয়ানমার সরকারকে আল্টিমেটলি পদক্ষেপ নিতে হবে। বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন সময় মিয়ানমারকে বিভিন্নভাবে বলার এবং বোঝানোর চেষ্টা করেছে যে রোহিঙ্গারা তোমাদের ভূখণ্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

তিনি বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়ার সরকার মিয়ানমারকে যেভাবে রোহিঙ্গা ইস্যুতে অ্যাড্রেস করেছেন পরবর্তী সরকারগুলো সেভাবে পারেনি বলেই বাংলাদেশ এমন একটি জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের আমেরিকাকে এটা বোঝাতে হবে। আমাদের চীনকে এটা বোঝাতে হবে। ভারতকে এটা বোঝাতে হবে। আমরা মনে করি, অবশ্যই তাদের সঙ্গে আলোচনার বিষয় আছে। তবে, সবার আগে আমার বাংলাদেশের জনগণকে এক কাতারে দাঁড়াতে হবে। বাংলাদেশের মানুষকে সবার দল-মত নির্বিশেষে মতভেদ ভুলে যেয়ে আমাদের বুঝতে হবে। এই ভূখণ্ড আমাদের। এই বাংলাদেশটা সবার আগে।

বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের এই দেশের প্রতি একটা কর্তব্যবোধ আছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, সেটা আমাদের সাংবিধানিকভাবেই উল্লেখ করা আছে। আমরা মনে করি রোহিঙ্গা সংকট মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংকট। বাংলাদেশ সরকার এটাকে দেখছে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ আশ্রয় দিয়েছে, তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে সম্পূর্ণ মানবিক মূল্যবোধের জায়গা থেকে।

আইনমন্ত্রী বলেন, একজন মানুষ যখন ভূমিষ্ঠ হয় তখন সেই মানুষের কিছু অধিকার মানবাধিকারে রূপান্তরিত হয়। একটা সার্বজনীন। মানুষ হিসেবে জন্ম নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার কিছু অধিকার থাকে। জীবনধারণের অধিকার। তার খাদ্যের অধিকার। তার ন্যূনতম কিছু অধিকার থাকে। এই রোহিঙ্গারা তার নিজ দেশে জেনোসাইডের শিকার হচ্ছে। তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়েই বাংলাদেশের বর্ডার ক্রস করে যখন আসে, তখন তাদের বাংলাদেশের জনগণ আশ্রয় দেওয়ার জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত দেয়। তখন মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা তাদের পাশে দাঁড়িয়েছি। ফলে, এটা কখনোই আন্তর্জাতিক কোনো ইস্যু না, এই ইস্যুটা হলো মানবাধিকারের ইস্যু।

রোহিঙ্গাকে তাদের দেশে পাঠানোটা মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়, হস্তক্ষেপের বিষয় না। এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, বিষয়টা হলো রোহিঙ্গারা বাংলাদেশী না। এই ভূখণ্ডের জনগোষ্ঠী না। তবে, আমরা বলতে চাই রোহিঙ্গারা মানুষ, তাদেরও মানবাধিকার আছে। রোহিঙ্গারা সংস্কৃতিগতভাবে নৃতাত্ত্বিকভাবে তারা ওই ভূখণ্ডের অধিবাসী এবং সেখানে আন্তর্জাতিক আইনে তারা কিছু প্রোটেকশন পাওয়ার অধিকার রাখে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়ার সরকার যেভাবে রোহিঙ্গা সমস্যা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমাধান করেছিলেন সেই পথটা সুগম হবে। সেই পথ ধরেই আমরা এগিয়ে যাবো। রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার বিষয়টা নিশ্চিত হোক। তারা তাদের মাতৃভূমিতে ফিরে যাক।

তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের মানুষকে দল-মত নির্বিশেষে, সব মতভেদ ভুলে এক কাতারে দাঁড়াতে হবে। আমাদের বুঝতে হবে—এই ভূখণ্ড, এই বাংলাদেশ সবার আগে। যখন ভূখণ্ডের কোনো বিষয় নিয়ে আমরা আন্তর্জাতিকভাবে মোকাবিলা করতে চাই, তখন ধরে নিতে হবে, সেই আন্তর্জাতিক মোকাবিলা হচ্ছে আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য। দেশের মানুষের ভালো ও কল্যাণের জন্য।

আসাদুজ্জামান বলেন, ১৯৭১ সালে যে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল, সেই বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষেরই দেশের প্রতি একটি কর্তব্যবোধ রয়েছে। আমাদের সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদেও বিষয়টি উল্লেখ করা রয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে আমরা কীভাবে এসব বিষয় মোকাবিলা করব, সেটিও আমাদের সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে।

সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদ অনুসরণ করলে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সরকার কীভাবে বিষয়গুলো মোকাবিলা করবে এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রামরত থাকলে তাদের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করা হবে—সেটিও আমাদের সংবিধানে বিধৃত রয়েছে।

তিনি বলেন, আমরা মনে করি, রোহিঙ্গা সংকট মূলত মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংকট। অন্যদিকে, বাংলাদেশ সরকার বিষয়টিকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছে। অনেকে বলতে পারেন, রোহিঙ্গারা যখন বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, তখন বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চলে গেছে। আসলে তা নয়। বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে, তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে সম্পূর্ণ মানবিক মূল্যবোধের জায়গা থেকে।

আইনমন্ত্রী বলেন, এটি নিয়ে আমাদের সঙ্গে মিয়ানমারের কোনো আন্তর্জাতিক বিরোধের বিষয় নয়। এটি মানবাধিকারের বিষয়। হিউম্যান রাইটস বা মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকেই আমরা বিষয়টিকে দেখি। মানবিক মূল্যবোধের জায়গা থেকে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদ অনুসারেও এটি আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। সেখান থেকেই আমরা বলছি, রোহিঙ্গা ইস্যুটিকে জাতীয় ঐকমত্যের জায়গায় নিয়ে আসতে পারলে সেটি একটি কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে। সেই চিন্তা থেকেই আমাদের প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই বিষয়টি নিয়ে একটি জাতীয় কমিটি গঠন করেছেন— কীভাবে বিষয়টিকে অ্যাড্রেস করা যায়, তা নিয়ে কাজ করার জন্য।

তিনি বলেন, আমাদের কাছে বাংলাদেশের ভূখণ্ডের অখণ্ডতা রক্ষা করাই সবচেয়ে বড় ইস্যু। সেই অখণ্ডতা রক্ষা করতে গিয়ে নিরাপত্তার বিষয়টিকে হয়তো আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। কিন্তু একই সঙ্গে আমরা ডিপ্লোমেটিক, সোশ্যাল কনটেক্সটকেও কখনো বাইপাস করছি না। একই সঙ্গে আমরা মানবাধিকারের বিষয়টিকেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি, যাতে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ কোনোভাবেই না আসে।

একই সময়ে সেখানে ক্রমবর্ধমান খুন-জখমের প্রবণতা ও অপরাধের প্রবণতাকেও আমাদের অ্যাড্রেস করতে হচ্ছে। সবদিক বিবেচনা করেই আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের প্রধানমন্ত্রী যে উদ্যোগ নিয়েছেন, সেই উদ্যোগের পেছনে আপনারা আপনাদের জায়গা থেকে সোশ্যাল প্রেসার গ্রুপ কিংবা ওয়াচডগ হিসেবে ভূমিকা রাখবেন। যাতে জাতীয় ঐকমত্য তৈরি হয়।

আয়োজকদের উদ্দেশ্য করে মন্ত্রী বলেন, আপনারা আপনাদের জায়গা থেকে যে বিষয়গুলো ভাবছেন, সেই ভাবনাটিই যে একমাত্র সঠিক—এমনটি না ভেবে আপনাদের ভাবনাগুলো আমাদের দিন। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে যে কমিটি রয়েছে, সেখানে সেগুলো উপস্থাপন করুন। আমি বিশ্বাস করি, আপনাদের ভাবনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও কমিটি বিবেচনা করবেন।

‘আমি নিজেও বলব, আপনাদের সোশ্যাল প্রেসার গ্রুপ হিসেবে যে সুপারিশগুলো আসছে, সেগুলো বিবেচনায় নিয়ে কীভাবে রোহিঙ্গা ইস্যুটিকে স্থায়ী সমাধানের পথে নেওয়া যায়, সে বিষয়ে কাজ করতে হবে’—যোগ করেন আইনমন্ত্রী।

তিনি আরও বলেন, আমরা মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার পক্ষে নই। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের বিষয় নয়। বিষয়টি হলো— আমরা বলতে চাই, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশি নয়। আমরা বলতে চাই, রোহিঙ্গারা এই ভূখণ্ডের জনগোষ্ঠী নয়। আমরা বলতে চাই, রোহিঙ্গারা মানুষ। আমরা বলতে চাই, রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার রয়েছে।

মো. আসাদুজ্জামান বলেন, আমরা বলতে চাই, সংস্কৃতিগত ও নৃতাত্ত্বিকভাবে তারা ওই ভূখণ্ডের অধিবাসী এবং আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে তারা কিছু সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রাখে। সেই দৃষ্টিভঙ্গি ও জায়গা থেকেই আমরা বিষয়গুলোকে অ্যাড্রেস করার পক্ষে।

আলোচনা সভায় নীতি গবেষণা কেন্দ্রের ট্রাস্টি সদস্য প্রফেসর এস কে তৌফিক এম হক, নীতি গবেষণা কেন্দ্রের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ড. শাকিল আহম্মেদ, রোহিঙ্গা নারী অধিকার কর্মী রাজিয়া সুলতানাসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন।