অক্টোবরের মধ্যে কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর চালু করা হবে : বিমানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

চলতি বছরের অক্টোবরের মধ্যে কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে চালু করা হবে বলে জানিয়ে এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর আমরা অক্টোবরের মধ্যে ইনশাআল্লাহ চালু করবো। আশা করছি, এবার মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে নতুন একটি ন্যাশনাল এয়ারপোর্ট উদ্বোধন করতে পারবো।

রোববার (২৩ আগস্ট) সচিবালয়ে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম কার্যদিবসে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় ও মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে চালুর লক্ষ্যে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) কাজ করছে। বিভিন্ন এয়ারলাইনসের সঙ্গে যোগাযোগ, চুক্তি এবং ফ্লাইটের ফ্রিকোয়েন্সি নিয়ে আলোচনা চলছে। এ সংক্রান্ত বেশ কিছু আনুষ্ঠানিকতা শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

যাত্রীদের কম খরচে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ভ্রমণের সুযোগ দিতে বাজেট এয়ারলাইনস আনার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের জন্য বিমান ভ্রমণ আরও সহজলভ্য করতে এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

ঈশ্বরদী বিমানবন্দর নিয়েও সরকারের পরিকল্পনার কথা জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, ঈশ্বরদীতে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। সেখানে ইউরেনিয়াম পরিবহনের প্রয়োজন হয়। সড়কপথে ইউরেনিয়াম পরিবহনের ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ঘটলে বিকিরণজনিত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ কারণে ঈশ্বরদী বিমানবন্দরকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে সরকার।

মন্ত্রী বলেন, ঈশ্বরদী বিমানবন্দর বর্তমানে সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বিমানবন্দরটি সম্প্রসারণ করে সেখানে অভ্যন্তরীণ কয়েকটি ফ্লাইট চালুর চেষ্টা করা হবে। এতে সেখানে কর্মরত বিদেশিরাও সহজে যাতায়াত করতে পারবেন। পাশাপাশি ইউরেনিয়াম পরিবহনের ক্ষেত্রেও বিমানবন্দরটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

তিনি জানান, ঈশ্বরদী বিমানবন্দরে বর্তমানে প্রায় ৬ হাজার ফুট রানওয়ে রয়েছে। সেটি আরও প্রায় ২ হাজার ৫০০ ফুট বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি রানওয়ের সংস্কার এবং একটি ছোট টার্মিনাল ভবন নির্মাণের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের বিমান পরিবহন ও পর্যটন খাতকে আরও কার্যকর, আধুনিক ও যাত্রীবান্ধব করে গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য।

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে একটি বিমানবন্দরের গুরুত্ব তুলে ধরে বিমানমন্ত্রী বলেন, ইউরেনিয়াম পরিবহনের ক্ষেত্রে সড়কপথ ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট এলাকায় বিমানবন্দর সম্প্রসারণ করে অভ্যন্তরীণ কয়েকটি ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এতে সেখানে থাকা বিদেশি নাগরিকদের যাতায়াতের পাশাপাশি ইউরেনিয়াম পরিবহনেও প্লেন ব্যবহার করা সম্ভব হবে।

দেশের অভ্যন্তরীণ বিমান যোগাযোগ নিয়ে তিনি বলেন, সব রুটে নতুন করে ফ্লাইট বাড়ানোর পরিকল্পনা আপাতত নেই। তবে যশোরে দুটি ফ্লাইট চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। বেসরকারি এয়ারলাইন্স ইউএস-বাংলা সকালে ও বিকেলে দুটি ফ্লাইট পরিচালনা করবে।

বগুড়ায় বিমানবন্দর চালুর বিষয়ে তিনি আরো বলেন, সেখানে বর্তমানে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা চলছে। সমীক্ষা শেষ হওয়ার পর বিমানবন্দর নির্মাণের কাজ শুরু করা হবে। দ্রুততার সঙ্গে কাজ এগিয়ে নিয়ে প্রথমে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট চালুর চেষ্টা করা হবে।

বাগেরহাটে নতুন বিমানবন্দর নির্মাণের বিষয়ে এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, সেখানে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের প্রায় ৬০০ একর জমি রয়েছে। তবে, দেশের সড়ক ও রেল যোগাযোগব্যবস্থার দ্রুত উন্নয়ন এবং ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে দ্রুতগতির ট্রেন চালুর পরিকল্পনার কারণে সব জায়গায় নতুন বিমানবন্দরের প্রয়োজনীয়তা কমে আসছে।

ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন প্লেন কেনার পাশাপাশি প্লেন লিজ নেওয়ার চুক্তি করতে চায় সরকার। আগামী বছর থেকে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে নতুন প্লেন যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়ে বিমানমন্ত্রী বলেন, নতুন বিমান কেনার বিষয়ে এরই মধ্যে আরএফপি (রিকোয়েস্ট ফর প্রপোজাল) দেওয়া হয়েছে এবং টেন্ডার প্রক্রিয়াও চলছে। বিষয়টি নিয়ে আগামী সপ্তাহেই বসবো। ডিসেম্বরের মধ্যে প্লেন কেনা এবং লিজ নেওয়ার চুক্তি সই করতে চাই। এর ফলে আগামী বছর থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে নতুন প্লেন যুক্ত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

বিমান বাংলাদেশকে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে বিমানমন্ত্রী বলেন, দেশের যাত্রীদের বড় একটি অংশ এখন বিদেশি এয়ারলাইনসের মাধ্যমে যাতায়াত করেন। বাংলাদেশ বিমানের সক্ষমতা বাড়িয়ে নিজস্ব জাতীয় ক্যারিয়ারের মাধ্যমে আরও বেশি যাত্রী পরিবহনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশ বিমানের প্রতিদিন পাঁচ থেকে সাতটি ফ্লাইট পরিচালিত হচ্ছে। এ সংখ্যা বাড়িয়ে প্রতিদিন ১০ থেকে ১৪টি ফ্লাইট করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের যাতায়াত আরও সহজ হবে।

বিমানের খাবারের মানসহ যাত্রীসেবার বিভিন্ন বিষয়েও পরিবর্তন আনার কথা জানান মন্ত্রী।

এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, বিমান সম্পর্কে মানুষের মধ্যে যে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে, তা দূর করতে চাই। মন্ত্রণালয় ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কর্মকর্তারা সম্মিলিতভাবে কাজ করলে সেবার মানে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইকাও) অডিটে বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় গ্রেড অর্জন করতে পারলে নিউইয়র্কে সরাসরি ফ্লাইট চালু করা সম্ভব হবে। আগামী বছরের জানুয়ারি থেকেই এ ফ্লাইট চালুর সম্ভাবনা।

তিনি আরো বলেন, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে উড়োজাহাজের সংকট রয়েছে। এ কারণে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গন্তব্যে বিদ্যমান ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ানো যাচ্ছে না। সংকট কাটাতে পর্যায়ক্রমে অন্তত ১০টি উড়োজাহাজ লিজ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই এ বিষয়ে চুক্তি সই করে পরের বছর থেকে নতুন উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে।

এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, আমরা অনেকগুলো নতুন ফ্লাইট শুরু করেছি। ভবিষ্যতে নিউইয়র্ক ও সিডনির ফ্লাইট চালু করতে চাই। পাশাপাশি যেসব গন্তব্যে আমাদের ফ্রিকোয়েন্সি বরাদ্দ আছে কিন্তু উড়োজাহাজের অভাবে ব্যবহার করতে পারছি না, সেসব রুটেও ফ্লাইট বাড়ানো হবে।

তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় পাঁচটি গন্তব্যে প্রতিদিন কয়েকটি করে ফ্লাইট পরিচালিত হচ্ছে। পর্যাপ্ত উড়োজাহাজ পাওয়া গেলে এসব গন্তব্যে ফ্লাইটের সংখ্যা দ্বিগুণ বা তিন গুণ করার সুযোগ রয়েছে।

নিউইয়র্ক ফ্লাইট চালুর বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, এটি আইকাওর নির্ধারিত মান অর্জনের ওপর নির্ভর করছে। প্রয়োজনীয় গ্রেড অর্জন করা গেলে আগামী বছরের জানুয়ারি থেকেই নিউইয়র্ক ফ্লাইট চালুর সম্ভাবনা রয়েছে।

বিমানবহর সম্প্রসারণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বোয়িংয়ের সঙ্গে করা চুক্তির আওতায় নতুন উড়োজাহাজ ২০৩১ সাল থেকে দেশে আসবে। তবে তার আগ পর্যন্ত যাত্রীসেবা সচল রাখা ও ফ্লাইট সম্প্রসারণের জন্য লিজে উড়োজাহাজ আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরইমধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ বিষয়ে দরপত্র প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। আগামী সপ্তাহে তিনি এ বিষয়ে বসবেন বলেও জানান।

তিনি বলেন, হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনালের সফট ওপেনিং আগামী ১৬ ডিসেম্বর করার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। তবে কাজ ভালোভাবে সম্পন্ন করতে প্রয়োজন হলে সময় আরও দুই-এক মাস বাড়ানো হতে পারে। সফট ওপেনিংয়ের পর সর্বোচ্চ তিন মাসের মধ্যে টার্মিনালটি পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হবে।

বিমানমন্ত্রী বলেন, থার্ড টার্মিনাল যেটা আছে, আমরা প্রাথমিকভাবে বলেছিলাম যে ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে সফট ওপেনিং হলেও করব। সেটার কাজ চলছে। এ মাসের মধ্যেই ২৫ তারিখে তারা (জাপানিজরা) বিড জমা দেবে এবং এটা একটা পুঙ্খানুপুঙ্খ রূপের মূল্যায়ন করে আশা করছি সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি আমরা চুক্তি সই করতে পারব।

তিনি বলেন, তারপরে আমাদের হাতে থাকবে সাড়ে তিন মাস। এ সময়ের মধ্যে আমরা চেষ্টা করব যে একটা যদি সফট ওপেনিংও করতে পারি, করলাম। আর যদি মনে করি যে একটু সময় লেগে ভালো হবে, তাহলে দুই-এক মাস সময় বাড়াতেও পারি। সেটা আপনারা সবাই জানবেন আর কি অবস্থা পরিস্থিতি। কিন্তু এখনও আমরা ১৬ ডিসেম্বরে সফট ওপেনিং হলেও করব, এটাতেই আমরা এখনও অটল রয়েছি।

পুরোপুরি চালু করতে কত সময় লাগবে- জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, আমরা একটা শুরু করার পরে বোঝা যাবে। কিন্তু এটা সর্বোচ্চ তিন মাসের বেশি সময় নেবে না সর্বোচ্চ।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের যাত্রী হয়রানি বন্ধে নেওয়া পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং কিছুটা সফলতাও এসেছে। তবে পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব হয়নি। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করে সমস্যা সমাধানে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, টিমওয়ার্কের মাধ্যমে বিমানকে আপনারা যে পর্যায়ে দেখতে চান, সেই পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।

বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের কাজে সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়ে মন্ত্রী বলেন, তিনি নিয়মিত অফিস করবেন এবং পর্যটন, বেসামরিক বিমান চলাচল ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। যারা দায়িত্ব পালনে সক্ষম হবেন, তাদের পুরস্কৃত করা হবে। আর যারা কাজ করতে পারবেন না, তাদের সম্মানের সঙ্গে মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে দিয়ে নতুন লোক আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বিমানবন্দরের পরিচ্ছন্নতার ওপরও গুরুত্ব দেন মন্ত্রী। তিনি জানান, বিমানবন্দর থেকে শুরু করে বিমান পর্যন্ত সর্বত্র পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। যাত্রীদের জন্য বিমান ও বিমানবন্দরে উন্নত পরিবেশ তৈরির পাশাপাশি রুচিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করার কথাও বলেন তিনি।

দায়িত্ব নেওয়ার পর মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, সবাইকে নতুন উদ্যমে কাজ করতে হবে। বিমান ও পর্যটন খাতকে আরও কার্যকর ও জনবান্ধব করতে সম্মিলিতভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

জনপ্রিয় খবর

আবহাওয়া

ঠিকাদার উধাও অষ্টগ্রামে বন্ধ ১৭৮ কোটি টাকার সেতু নির্মাণ

অক্টোবরের মধ্যে কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর চালু করা হবে : বিমানমন্ত্রী

প্রকাশের সময় : ০২:৪২:৫২ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

চলতি বছরের অক্টোবরের মধ্যে কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে চালু করা হবে বলে জানিয়ে এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর আমরা অক্টোবরের মধ্যে ইনশাআল্লাহ চালু করবো। আশা করছি, এবার মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে নতুন একটি ন্যাশনাল এয়ারপোর্ট উদ্বোধন করতে পারবো।

রোববার (২৩ আগস্ট) সচিবালয়ে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম কার্যদিবসে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় ও মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে চালুর লক্ষ্যে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) কাজ করছে। বিভিন্ন এয়ারলাইনসের সঙ্গে যোগাযোগ, চুক্তি এবং ফ্লাইটের ফ্রিকোয়েন্সি নিয়ে আলোচনা চলছে। এ সংক্রান্ত বেশ কিছু আনুষ্ঠানিকতা শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

যাত্রীদের কম খরচে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ভ্রমণের সুযোগ দিতে বাজেট এয়ারলাইনস আনার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের জন্য বিমান ভ্রমণ আরও সহজলভ্য করতে এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

ঈশ্বরদী বিমানবন্দর নিয়েও সরকারের পরিকল্পনার কথা জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, ঈশ্বরদীতে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। সেখানে ইউরেনিয়াম পরিবহনের প্রয়োজন হয়। সড়কপথে ইউরেনিয়াম পরিবহনের ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ঘটলে বিকিরণজনিত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ কারণে ঈশ্বরদী বিমানবন্দরকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে সরকার।

মন্ত্রী বলেন, ঈশ্বরদী বিমানবন্দর বর্তমানে সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বিমানবন্দরটি সম্প্রসারণ করে সেখানে অভ্যন্তরীণ কয়েকটি ফ্লাইট চালুর চেষ্টা করা হবে। এতে সেখানে কর্মরত বিদেশিরাও সহজে যাতায়াত করতে পারবেন। পাশাপাশি ইউরেনিয়াম পরিবহনের ক্ষেত্রেও বিমানবন্দরটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

তিনি জানান, ঈশ্বরদী বিমানবন্দরে বর্তমানে প্রায় ৬ হাজার ফুট রানওয়ে রয়েছে। সেটি আরও প্রায় ২ হাজার ৫০০ ফুট বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি রানওয়ের সংস্কার এবং একটি ছোট টার্মিনাল ভবন নির্মাণের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের বিমান পরিবহন ও পর্যটন খাতকে আরও কার্যকর, আধুনিক ও যাত্রীবান্ধব করে গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য।

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে একটি বিমানবন্দরের গুরুত্ব তুলে ধরে বিমানমন্ত্রী বলেন, ইউরেনিয়াম পরিবহনের ক্ষেত্রে সড়কপথ ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট এলাকায় বিমানবন্দর সম্প্রসারণ করে অভ্যন্তরীণ কয়েকটি ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এতে সেখানে থাকা বিদেশি নাগরিকদের যাতায়াতের পাশাপাশি ইউরেনিয়াম পরিবহনেও প্লেন ব্যবহার করা সম্ভব হবে।

দেশের অভ্যন্তরীণ বিমান যোগাযোগ নিয়ে তিনি বলেন, সব রুটে নতুন করে ফ্লাইট বাড়ানোর পরিকল্পনা আপাতত নেই। তবে যশোরে দুটি ফ্লাইট চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। বেসরকারি এয়ারলাইন্স ইউএস-বাংলা সকালে ও বিকেলে দুটি ফ্লাইট পরিচালনা করবে।

বগুড়ায় বিমানবন্দর চালুর বিষয়ে তিনি আরো বলেন, সেখানে বর্তমানে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা চলছে। সমীক্ষা শেষ হওয়ার পর বিমানবন্দর নির্মাণের কাজ শুরু করা হবে। দ্রুততার সঙ্গে কাজ এগিয়ে নিয়ে প্রথমে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট চালুর চেষ্টা করা হবে।

বাগেরহাটে নতুন বিমানবন্দর নির্মাণের বিষয়ে এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, সেখানে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের প্রায় ৬০০ একর জমি রয়েছে। তবে, দেশের সড়ক ও রেল যোগাযোগব্যবস্থার দ্রুত উন্নয়ন এবং ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে দ্রুতগতির ট্রেন চালুর পরিকল্পনার কারণে সব জায়গায় নতুন বিমানবন্দরের প্রয়োজনীয়তা কমে আসছে।

ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন প্লেন কেনার পাশাপাশি প্লেন লিজ নেওয়ার চুক্তি করতে চায় সরকার। আগামী বছর থেকে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে নতুন প্লেন যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়ে বিমানমন্ত্রী বলেন, নতুন বিমান কেনার বিষয়ে এরই মধ্যে আরএফপি (রিকোয়েস্ট ফর প্রপোজাল) দেওয়া হয়েছে এবং টেন্ডার প্রক্রিয়াও চলছে। বিষয়টি নিয়ে আগামী সপ্তাহেই বসবো। ডিসেম্বরের মধ্যে প্লেন কেনা এবং লিজ নেওয়ার চুক্তি সই করতে চাই। এর ফলে আগামী বছর থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে নতুন প্লেন যুক্ত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

বিমান বাংলাদেশকে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে বিমানমন্ত্রী বলেন, দেশের যাত্রীদের বড় একটি অংশ এখন বিদেশি এয়ারলাইনসের মাধ্যমে যাতায়াত করেন। বাংলাদেশ বিমানের সক্ষমতা বাড়িয়ে নিজস্ব জাতীয় ক্যারিয়ারের মাধ্যমে আরও বেশি যাত্রী পরিবহনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশ বিমানের প্রতিদিন পাঁচ থেকে সাতটি ফ্লাইট পরিচালিত হচ্ছে। এ সংখ্যা বাড়িয়ে প্রতিদিন ১০ থেকে ১৪টি ফ্লাইট করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের যাতায়াত আরও সহজ হবে।

বিমানের খাবারের মানসহ যাত্রীসেবার বিভিন্ন বিষয়েও পরিবর্তন আনার কথা জানান মন্ত্রী।

এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, বিমান সম্পর্কে মানুষের মধ্যে যে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে, তা দূর করতে চাই। মন্ত্রণালয় ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কর্মকর্তারা সম্মিলিতভাবে কাজ করলে সেবার মানে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইকাও) অডিটে বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় গ্রেড অর্জন করতে পারলে নিউইয়র্কে সরাসরি ফ্লাইট চালু করা সম্ভব হবে। আগামী বছরের জানুয়ারি থেকেই এ ফ্লাইট চালুর সম্ভাবনা।

তিনি আরো বলেন, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে উড়োজাহাজের সংকট রয়েছে। এ কারণে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গন্তব্যে বিদ্যমান ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ানো যাচ্ছে না। সংকট কাটাতে পর্যায়ক্রমে অন্তত ১০টি উড়োজাহাজ লিজ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই এ বিষয়ে চুক্তি সই করে পরের বছর থেকে নতুন উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে।

এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, আমরা অনেকগুলো নতুন ফ্লাইট শুরু করেছি। ভবিষ্যতে নিউইয়র্ক ও সিডনির ফ্লাইট চালু করতে চাই। পাশাপাশি যেসব গন্তব্যে আমাদের ফ্রিকোয়েন্সি বরাদ্দ আছে কিন্তু উড়োজাহাজের অভাবে ব্যবহার করতে পারছি না, সেসব রুটেও ফ্লাইট বাড়ানো হবে।

তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় পাঁচটি গন্তব্যে প্রতিদিন কয়েকটি করে ফ্লাইট পরিচালিত হচ্ছে। পর্যাপ্ত উড়োজাহাজ পাওয়া গেলে এসব গন্তব্যে ফ্লাইটের সংখ্যা দ্বিগুণ বা তিন গুণ করার সুযোগ রয়েছে।

নিউইয়র্ক ফ্লাইট চালুর বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, এটি আইকাওর নির্ধারিত মান অর্জনের ওপর নির্ভর করছে। প্রয়োজনীয় গ্রেড অর্জন করা গেলে আগামী বছরের জানুয়ারি থেকেই নিউইয়র্ক ফ্লাইট চালুর সম্ভাবনা রয়েছে।

বিমানবহর সম্প্রসারণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বোয়িংয়ের সঙ্গে করা চুক্তির আওতায় নতুন উড়োজাহাজ ২০৩১ সাল থেকে দেশে আসবে। তবে তার আগ পর্যন্ত যাত্রীসেবা সচল রাখা ও ফ্লাইট সম্প্রসারণের জন্য লিজে উড়োজাহাজ আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরইমধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ বিষয়ে দরপত্র প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। আগামী সপ্তাহে তিনি এ বিষয়ে বসবেন বলেও জানান।

তিনি বলেন, হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনালের সফট ওপেনিং আগামী ১৬ ডিসেম্বর করার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। তবে কাজ ভালোভাবে সম্পন্ন করতে প্রয়োজন হলে সময় আরও দুই-এক মাস বাড়ানো হতে পারে। সফট ওপেনিংয়ের পর সর্বোচ্চ তিন মাসের মধ্যে টার্মিনালটি পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হবে।

বিমানমন্ত্রী বলেন, থার্ড টার্মিনাল যেটা আছে, আমরা প্রাথমিকভাবে বলেছিলাম যে ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে সফট ওপেনিং হলেও করব। সেটার কাজ চলছে। এ মাসের মধ্যেই ২৫ তারিখে তারা (জাপানিজরা) বিড জমা দেবে এবং এটা একটা পুঙ্খানুপুঙ্খ রূপের মূল্যায়ন করে আশা করছি সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি আমরা চুক্তি সই করতে পারব।

তিনি বলেন, তারপরে আমাদের হাতে থাকবে সাড়ে তিন মাস। এ সময়ের মধ্যে আমরা চেষ্টা করব যে একটা যদি সফট ওপেনিংও করতে পারি, করলাম। আর যদি মনে করি যে একটু সময় লেগে ভালো হবে, তাহলে দুই-এক মাস সময় বাড়াতেও পারি। সেটা আপনারা সবাই জানবেন আর কি অবস্থা পরিস্থিতি। কিন্তু এখনও আমরা ১৬ ডিসেম্বরে সফট ওপেনিং হলেও করব, এটাতেই আমরা এখনও অটল রয়েছি।

পুরোপুরি চালু করতে কত সময় লাগবে- জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, আমরা একটা শুরু করার পরে বোঝা যাবে। কিন্তু এটা সর্বোচ্চ তিন মাসের বেশি সময় নেবে না সর্বোচ্চ।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের যাত্রী হয়রানি বন্ধে নেওয়া পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং কিছুটা সফলতাও এসেছে। তবে পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব হয়নি। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করে সমস্যা সমাধানে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, টিমওয়ার্কের মাধ্যমে বিমানকে আপনারা যে পর্যায়ে দেখতে চান, সেই পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।

বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের কাজে সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়ে মন্ত্রী বলেন, তিনি নিয়মিত অফিস করবেন এবং পর্যটন, বেসামরিক বিমান চলাচল ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। যারা দায়িত্ব পালনে সক্ষম হবেন, তাদের পুরস্কৃত করা হবে। আর যারা কাজ করতে পারবেন না, তাদের সম্মানের সঙ্গে মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে দিয়ে নতুন লোক আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বিমানবন্দরের পরিচ্ছন্নতার ওপরও গুরুত্ব দেন মন্ত্রী। তিনি জানান, বিমানবন্দর থেকে শুরু করে বিমান পর্যন্ত সর্বত্র পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। যাত্রীদের জন্য বিমান ও বিমানবন্দরে উন্নত পরিবেশ তৈরির পাশাপাশি রুচিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করার কথাও বলেন তিনি।

দায়িত্ব নেওয়ার পর মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, সবাইকে নতুন উদ্যমে কাজ করতে হবে। বিমান ও পর্যটন খাতকে আরও কার্যকর ও জনবান্ধব করতে সম্মিলিতভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।