নিজস্ব প্রতিবেদক :
সারাদেশে জরাজীর্ণ রেললাইন এবং নিম্নমানের রক্ষণাবেক্ষণের কারণে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা। দীর্ঘদিন ধরে দেশের রেলপথের এমন নাজুক দশা চলায় রেল পরিচালনায় বেশ ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ এবং রেল ভ্রমণ নিরাপদ করতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিশেষ করে পূর্বাঞ্চলের রেললাইন সংস্কারে ‘বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসন’ শীর্ষক একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন রেলপথ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
রোববার (২৬ এপ্রিল) স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে বগুড়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. মোশারফ হোসেনের করা লিখিত প্রশ্নে জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
রেলপথমন্ত্রী বলেন, প্রকল্পের কাজ দ্রুত শুরু করতে ইতোমত্যে দুটি প্যাকেজের আওতায় দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। গত ৮ এপ্রিল দরপত্র উন্মুক্ত করা হয়েছে এবং বর্তমানে কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এই প্রক্রিয়া শেষ হওয়া মাত্রই ঠিকাদার নিয়োগ করে সংস্কার কাজ শুরু করবে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
তিনি বলেন, পশ্চিমাঞ্চলের রেলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিতেও সমান্তরাল পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। পশ্চিমাঞ্চলের রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসনের লক্ষ্যে একটি ডিপিপি প্রস্তুত করা হয়েছে যা বর্তমানে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এই দুটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে রেলপথে দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকাংশে কমে আসবে। একইসঙ্গে যাত্রীসেবার মানোন্নয়নসহ ট্রেন ভ্রমণ আগের চেয়ে অনেক বেশি আরামদায়ক ও নিরাপদ হবে।
পাবনা-৫ আসনের সরকারি দলের সদস্য মো. শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের টেবিলে উত্থাপিত লিখিত প্রশ্নের জবাবে বলেন, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অধীনে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) এর আওতায় বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পসমূহ ফাস্টট্র্যাক প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত। তবে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরে চলমান কোনো প্রকল্পই ফাস্টট্র্যাক প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত নেই।
তিনি বলেন, ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) এর আওতায় বর্তমানে ফাস্টট্র্যাক প্রকল্পগুলো হলো- এমআরটি লাইন-৬, এমআরটি লাইন-১, এমআরটি লাইন-৫: নর্দার্ন রুট, এবং এমআরটি লাইন-৫: সাউদার্ন রুট।
সড়ক মন্ত্রী বলেন, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের আওতায় সারা দেশে মোট মহাসড়কের দৈর্ঘ্য ২২,৭৩৬.৫৮০ কিলোমিটার। এর মধ্যে ৪-লেন মহাসড়ক ৮৮৩.৬১ কিলোমিটার, ৬-লেন মহাসড়ক ১০,৪৮৮ কিলোমিটার এবং ৮-লেন মহাসড়কের ১৭.৩৪৭ কিলোমিটার।
কুমিল্লা-৯ আসনের সরকারি দলের সংসদ সদস্য মো. আবুল কালামের প্রশ্নের জবাবে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী বলেন, ঈদের ছুটিকে কেন্দ্র করে সড়কে যানবাহনের চাপ বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে মহাসড়কে যানবাহন ও যাত্রীদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে সরকার সমন্বিত নজরদারি ও আইন প্রয়োগ কার্যক্রম আরো জোরদার করেছে।
তিনি বলেন, ঈদের সময় যানবাহনের চাপ অনেক বেড়ে যায়, আর দুর্ভাগ্যজনকভাবে কিছু ফিটনেসবিহীন যানও মহাসড়কে চলাচল করে, যা অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার কারণ হয়। আমরা বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সমন্বিত ও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির মাধ্যমে মোকাবিলা করছি।
শেখ রবিউল আলম জানান, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) সদর দপ্তরে একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে বিআরটিএ, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (আরএইচডি), বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি), ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ), ঢাকা বাস র্যাপিড ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড এবং ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড একসঙ্গে কাজ করছে।
তিনি বলেন, ‘এই নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে সিসিটিভি ও টেলিভিশন ফিডের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো হচ্ছে এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ মোড়, সংযোগস্থল ও যানজটপ্রবণ এলাকাগুলো পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।’
তিনি আরো বলেন, যানজট নিরসন ও সড়ক দুর্ঘটনায় দ্রুত সাড়া দিতে জেলা প্রশাসন ও পুলিশের সঙ্গে তাৎক্ষণিক সমন্বয় করা হচ্ছে। দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত যান সরিয়ে নেওয়া এবং আহতদের জন্য জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
মন্ত্রী জানান, ঈদের সময়ে ২৪ ঘণ্টা নজরদারি কার্যক্রম চালু রয়েছে এবং জেলা পর্যায়ে সড়ক নিরাপত্তা কমিটির সভা নিয়মিত অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
বিআরটিএ, পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছে।
দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর জাতীয়, আঞ্চলিক ও জেলা সড়কগুলোকে নিরাপদ করতে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
তিনি বলেন, মহাসড়কগুলো চার লেনে উন্নীত করা হচ্ছে এবং ধীরগতির যানবাহন পৃথক রাখতে সার্ভিস লেন নির্মাণ করা হচ্ছে। ব্যস্ত মোড় ও রেলক্রসিংয়ে ওভারপাস, আন্ডারপাস ও রেলওয়ে ওভারপাস নির্মাণ করা হচ্ছে।’
মন্ত্রী আরো জানান, বিদ্যমান সড়ক ও চলমান প্রকল্পে নিরাপত্তা মান নিশ্চিত করতে নিয়মিত রোড সেফটি অডিট করা হচ্ছে। জ্যামিতিক নকশার কারিগরি যাচাই জোরদার করা হয়েছে এবং নকশা নির্দেশিকা হালনাগাদ করা হচ্ছে।
স্মার্ট প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়ে তিনি বলেন, কোরিয়ার সহায়তায় কোইকা’র মাধ্যমে জাতীয় মহাসড়কে ইন্টেলিজেন্ট ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম (আইটিএস) পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে যানবাহনের চলাচল রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ করা যায়, ফলে অতিরিক্ত গতি, অবৈধ পার্কিং, যানজট ও দুর্ঘটনা দ্রুত শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়।
তিনি জানান, বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ৩৬০ মিলিয়ন ডলারের ‘বাংলাদেশ রোড সেফটি প্রোগ্রাম (বিআরএসপি)’ বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এ কর্মসূচির আওতায় রোড সেফটি সেল, আধুনিক দুর্ঘটনা ডেটা সেন্টার, ডিজিটাল আইন প্রয়োগ ব্যবস্থা, যানবাহন পরিদর্শন কেন্দ্র, চালক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট এবং দুর্ঘটনা-পরবর্তী সেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে।
তিনি বলেন, টেকসই সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জনসচেতনতা, গবেষণা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ব্যবহারকারীদের সুরক্ষায়, বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিল্পাঞ্চলের কাছে, ফুটওভারব্রিজ, উঁচু পথচারী পারাপার এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে বলেও জানান তিনি।
মন্ত্রী বলেন, মহাসড়ক পুলিশের তথ্য ও গবেষণার ভিত্তিতে চিহ্নিত দুর্ঘটনাপ্রবণ ‘ব্ল্যাক স্পট’গুলো পর্যায়ক্রমে উন্নয়ন করা হচ্ছে।
তিনি আরো জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-রংপুর ও ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের চারটি স্থানে— কুমিল্লা, হবিগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ ও মাগুরায় পণ্যবাহী যানবাহনের চালকদের জন্য আধুনিক বিশ্রামাগার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, এই বিশ্রামাগারগুলো চালকদের ক্লান্তি কমাতে সহায়তা করবে, ফলে দুর্ঘটনা হ্রাস পাবে।
এছাড়া অতিরিক্ত পণ্যবহন রোধে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এক্সেল লোড নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যা সড়কের ক্ষতি কমাবে এবং নিরাপত্তা বাড়াবে।
মন্ত্রী বলেন, সমন্বিত এসব উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের সকল নাগরিকের জন্য নিরাপদ, শৃঙ্খলাপূর্ণ ও কার্যকর সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা আমাদের লক্ষ্য।
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















