নিজস্ব প্রতিবেদক :
সদ্য পদত্যাগ করা রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ সংবিধানসম্মতভাবে হয়েছে এবং তাকে গ্রেফতারের মতো কোনো বিষয় সরকার দেখছে না বলে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি সাংবিধানিক সুরক্ষা (ইমিউনিটি) ভোগ করেছেন। পদত্যাগের পর সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে আইন অনুযায়ী যে নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার কথা, সেগুলোও তিনি পাবেন।
রোববার (২৬ জুলাই) সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে পুলিশের সাহসিকতা ও প্রশংসনীয় কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ পুরস্কার ও সম্মাননা প্রদান শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, স্বৈরাচারের শেষদিকে ও অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময় এবং বর্তমান সরকারের প্রায় ৬ মাস সময়ে সাংবিধানিকভাবে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। বিধি-বিধান অনুযায়ী তিনি এই দায়িত্ব পালন করেছেন। আমরা রাষ্ট্রপতির সহযোগিতা পেয়েছি। সেই সময়টায় সংবিধান অনুসারে তিনি প্রিভিলেজড ছিলেন, তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধ কিংবা এ বিষয়ে আদালতে কোনো মামলা করা যায় না। এর বহির্ভূত কোনো সময়ে যদি কেউ কোনো বক্তব্য দিয়ে থাকে, সেটিতে তাদের স্বাধীনতা আছে। তবে আমরা আমলে নেয়ার মতো কোনো বিষয় এখানে দেখিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি শারীরিক কারণ দেখিয়ে সংবিধান অনুযায়ী পদত্যাগ করেছেন। তার পদত্যাগপত্রে বিষয়টি বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে এবং সাংবিধানিক বিধান অনুসারে তা জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে জমা দেওয়া হয়। স্পিকার তা গ্রহণ করেছেন এবং বর্তমানে তিনি অস্থায়ীভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালনকালে সংবিধান অনুযায়ী বিশেষ সুবিধা (প্রিভিলেজ) ও দায়মুক্তি (ইমিউনিটি) ভোগ করেন। দায়িত্ব পালনকালীন সময়ের বিষয়ে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা যায় না। তবে দায়িত্বের বাইরের কোনো বিষয়ে কেউ অভিযোগ বা বক্তব্য দিলে তা আইন অনুযায়ী বিবেচিত হবে।
সাবেক রাষ্ট্রপতির একটি কথিত অডিও রেকর্ড প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিষয়টি তারা শুধু পত্রিকায় দেখেছেন। এ বিষয়ে সরকারের কাছে কোনো তথ্যপ্রমাণ নেই। তিনি বলেন, কোনো পত্রিকা যদি এ ধরনের সংবাদ প্রকাশ করে, তাহলে তাদের কাছে কী তথ্যপ্রমাণ আছে, সেটি তাদেরই জিজ্ঞেস করতে হবে। আমাদের কাছে এ ধরনের কোনো তথ্য নেই। কোনো পত্রিকা যদি এ ধরনের খবর প্রকাশ করে, তাহলে তথ্যপ্রমাণ তাদেরই দিতে হবে। আর কথা বলার জন্য লন্ডন যেতে হয় নাকি? আজকালকার ইন্টারনেটের দুনিয়ায় লন্ডন গিয়ে কারও সঙ্গে কথা বলতে হয় না, এটা আমার কাছে অলিক মনে হয়। কথা বলতে চাইলে তো এখান থেকেও বলা যায়।
সাবেক রাষ্ট্রপতির অতীত দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ ছিল কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে যদি কোনো বিষয় থেকে থাকে, তা সে সময়কার আইন ও বিধি অনুযায়ী বিবেচিত হবে। এছাড়া সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি আইন অনুযায়ী যেসব সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার অধিকারী, সেগুলো তিনি পাবেন।
তিনি বলেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে আইন অনুযায়ী সব সুবিধা পাবেন মো. সাহাবুদ্দিন এবং তার প্রটেকশনের জন্য এসএসএফ ও পিজিআরসহ ৬ মাসের একটি বিধান আছে। এ ছাড়াও পুলিশ ও অন্যান্য সংস্থা থেকে তার নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আইন অনুযায়ী যেসব সুবিধা রয়েছে, তার সব সুবিধা তিনি পাবেন।
সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তিন বছর তিন মাস রাষ্ট্রপতি ছিলেন। এর আগে দুদক ও ব্যাংকের প্রশাসনিক দায়িত্বে ছিলেন। তখনকার ঘটনায় কোনো বিচার হবে কি না জানতে চাইলে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সেই সময় দায়িত্ব পালনকালীন তার কি কোনো অভিযোগ কেউ দিয়েছিল? দিয়ে থাকলে সেটা তখনকার সময়ে যদি কোনো কিছুর রেকর্ড করে থাকে সেটা তখনকার বিষয়, বিধি-বিধান অনুসারে চলবে, আইনানুসারে চলবে।
বিরোধীদল কেন সাবেক রাষ্ট্রপতির গ্রেফতার চায়- এমন প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ উল্টো প্রশ্ন করেন- বিরোধী পক্ষকে জিজ্ঞাসা করেন, কেন চায়।
সরকার এক সপ্তাহের বেশি টিকবে না, এক বিরোধী নেতার এমন বক্তব্যের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এক সপ্তাহ পরে কী হয়, সেটার জন্য অপেক্ষা করি। সব বিষয়ে মন্তব্য করার মতো যোগ্য আমি নই।
রাজধানীর মতিঝিলে বোমা উদ্ধারের ঘটনায় তদন্তের বিষয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে।
সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত অগ্রগতি সম্পর্কে প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংশ্লিষ্ট বিদেশি কর্তৃপক্ষের চাওয়া তথ্য সরকার দ্রুত পাঠাচ্ছে। প্রথম দফায় ৩০ দিনের মধ্যে যেসব নথি চাওয়া হয়েছিল, সেগুলো তিন দিনের মধ্যেই পাঠানো হয়। পরে সংশ্লিষ্ট আদালত আরও কিছু তথ্য চেয়েছে। সেগুলোর জবাবও এক-দুদিনের মধ্যে পাঠানো হবে বলে তিনি জানান।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরো বলেন, ভালো কাজের স্বীকৃতি এবং অনিয়মের জবাবদিহি—দুই ধারাই সরকার অব্যাহত রাখবে। যারা সাহসিকতা, সততা ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন, তাদের পুরস্কৃত করা হবে। আর যারা আইন ও বিধি লঙ্ঘন করে জনগণের সেবা প্রাপ্তিতে বাধা সৃষ্টি করবেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, এটি আমাদের তৃতীয় পুরস্কার ও তিরস্কার অনুষ্ঠান। এই ধারা অব্যাহত থাকবে। আমরা জনবান্ধব পুলিশ বাহিনী গড়ে তুলতে চাই, যাতে গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হয়। ইতোমধ্যে পুলিশ বাহিনীর মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
তিনি অভিযোগ করেন, অতীতে রাজনৈতিক সরকারগুলো নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অপব্যবহার করেছে। বর্তমান সরকার সেই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে জনসেবামুখী পুলিশিংকে উৎসাহিত করছে।
পুলিশ সপ্তাহে পদক না দেওয়ার কারণ সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পদকপ্রাপ্তদের তালিকা পর্যালোচনার সময় কিছু ত্রুটি এবং কয়েকটি ক্ষেত্রে সম্ভাব্য অনিয়ম ধরা পড়েছে। সেগুলো যাচাই-বাছাই করে তালিকা সংশোধনের কাজ চলছে। খুব দ্রুতই পুলিশ পদক দেওয়া হবে।
অনুষ্ঠানে পুরস্কারপ্রাপ্তদের মধ্যে দুই ট্রাফিক সার্জেন্ট জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছিনতাইকারী আটক ও মালামাল উদ্ধারের জন্য এবং এক প্রবাসীর হারিয়ে যাওয়া ব্যাগ দ্রুত উদ্ধার করে বিমানবন্দরে পৌঁছে দেওয়ার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের প্রশংসা করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, এসব ঘটনা প্রমাণ করে পুলিশ বাহিনীর মধ্যে জনসেবার মানসিকতা আরও শক্তিশালী হচ্ছে।
সীমান্তে চোরাচালান ও রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমার কাছে এ ধরনের কোনো অভিযোগ নেই। অভিযোগ পেলে অবশ্যই তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
রথযাত্রার দিন মেট্রোরেলের একটি পিলারের নিচে সন্দেহজনক ইলেকট্রনিক ডিভাইস উদ্ধারের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি কাকতালীয় একটি ঘটনা। ওই ডিভাইসটির সঙ্গে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের কোনো সম্পর্ক রয়েছে বলে সরকার মনে করে না। একজন আনসার সদস্যের সতর্কতায় বিষয়টি শনাক্ত হয় এবং পরে বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট সেটি নিষ্ক্রিয় করে।
হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে যুক্তরাষ্ট্রের একটি গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক কর্মকর্তার অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার জানার কথা নয়। যদি কোনো তথ্য থাকে, আপনারা প্রকাশ করুন, তখন আমরা দেখবো।’
সংযুক্ত আরব আমিরাতে পলাতক সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে প্রত্যর্পণ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। প্রথম দফায় তারা যে নথিপত্র চেয়েছিল, নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই পাঠানো হয়েছে। পরে আদালতের মাধ্যমে আরও কিছু তথ্য চাওয়া হয়েছে। সেগুলোর জবাবও দুই-এক দিনের মধ্যে পাঠানো হবে।’
জুলাই-আগস্টের ঘটনায় স্নাইপার রাইফেল ও ৭ দশমিক ৬২ ক্যালিবারের গুলি ব্যবহারের অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে পরে কথা বলবেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















