নিজস্ব প্রতিবেদক :
দেশের যুব সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মাদকের ভয়াল গ্রাস থেকে রক্ষা করতে দেশব্যাপী খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং উদ্ভাবনী প্রতিযোগিতার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র সাংবাদিকদের সঙ্গে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি এই জোর দেন।
তিনি বলেন, আমাদের তরুণ প্রজন্মের সামনে এখন একটি বড় সমস্যা হচ্ছে মাদক। বিশ্বব্যাপী কম-বেশি থাকলেও আমাদের এখানে এর প্রকোপ আশঙ্কাজনক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কতজনকে ধরব, কতজনকে চিকিৎসা দেব বা কাউন্সেলিং করব? আমাদের তো সক্ষমতা ও সম্পদের একটা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই এই সমস্যার সমাধানে আমাদের বিকল্প পথ খুঁজতে হবে।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সঠিকভাবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের শারীরিক ও মানসিক যে বিপুল শক্তি থাকে, তা ইতিবাচক খাতে ব্যবহারের সুযোগ করে দিতে হবে। আর এর অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো খেলাধুলা ও সংস্কৃতি। অথচ ঢাকা শহরসহ সারা দেশেই এখন খেলার মাঠের তীব্র সংকট।
তরুণদের এই শক্তিকে কাজে লাগাতে সরকারের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে ‘নতুন কুঁড়ি’ স্পোর্টস ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা চালু করেছি। সম্প্রতি শেষ হওয়া একটি শিক্ষা বিভাগীয় ইভেন্টে সারা দেশের প্রায় ২২ লাখ ছেলে-মেয়ে অংশ নিয়েছে। দল-মত নির্বিশেষে সকল পরিবারের সন্তানরা এখানে যুক্ত হয়েছে। অথচ দুঃখের বিষয়, এত বড় একটি আয়োজন আমাদের দেশের সংবাদমাধ্যমগুলোতে সেভাবে গুরুত্ব পায়নি।’
কেবল খেলাধুলা নয়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে তরুণদের মেধা বিকাশের জন্য জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে উদ্ভাবনী মেলা বা সায়েন্স ফেয়ার আয়োজনের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তিনি বলেন, বছরের নির্দিষ্ট কিছু দিন (যেমন ১৬ ডিসেম্বর বা ২১ ফেব্রুয়ারি) ছাড়া কেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সারা বছর সাংস্কৃতিক বা বিতর্ক প্রতিযোগিতা হয় না! যুব সমাজকে সুস্থ ধারায় ফেরাতে এই চর্চাগুলো সারা বছর চালু রাখতে হবে।
তরুণদের নৈতিক অবক্ষয় রোধ এবং সামাজিক মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনার ওপর তাগিদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকাল দেখা যায় একটা জীবন্ত প্রাণীকে পিটিয়ে মারা হচ্ছে এবং ১০ জন মিলে তা মোবাইলে রেকর্ড করছে। এগুলো অস্বাভাবিক মানসিকতা। স্কুল পর্যায় থেকেই আমাদের সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের চর্চা বাড়াতে হবে। তথ্য মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
সভায় প্রধানমন্ত্রী দেশের অর্থনৈতিক সংস্কার, গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালীকরণ এবং সরকারের প্রস্তাবিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘ফার্মার্স কার্ড’ এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়েও সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।
তারেক রহমান বলেন, ‘আজকের দিনটা সংবাদপত্র জগতের জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ দিন। এই দিনে বাংলাদেশের সব সংবাদপত্র একসময় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, হাতে গোনা মাত্র চারটি সংবাদপত্র ছিল। সেখান থেকে আজ আমরা এতগুলো সাংবাদিক ভাইদের সঙ্গে কথা বলছি। তার মানে একটা জিনিস প্রমাণিত হয়েছে যে, এখন সংবাদপত্রের যে টুটি চেপে ধরা হয়েছিল সেটি অন্তত এখন নেই। যেভাবে সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। মাত্র চারটা সংবাদপত্র রেখে সব বন্ধ করে দিয়েছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘একই সময় আমরা দেখেছি, বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলকে বন্ধ মানে বিলুপ্ত করে বাকশাল নামে একটা দল গঠন করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে আমরা দেখেছি, শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেলেন উনি যেরকম বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু করলেন, একই সঙ্গে সংবাদপত্রের ওপর থেকে যে রেস্ট্রিকশন ছিল সেটাও তুলে নিলেন। পরবর্তী সময় কী হয়েছে, কতটুকু হয়েছে- এটা আপনাদের কথা থেকেও বেরিয়ে এসেছে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি যখন বলেছিলাম যে, আসুন আমাদের নিজের চিন্তা কিছুটা আমরা পরিবর্তন করার চেষ্টা করি। হ্যাঁ আমার সাথে হয়েছে, আপনি এখন প্রতিশোধ নিলে আপনার সেটা আপনি ফেরত পাবেন বা একদম আগের মত হয়ে যাবে? হবে না। আমরা আমাদের সেই মাইন্ডসেট থেকে বেরিয়ে এসে দেশের জন্য, সমাজের জন্য, মানুষের জন্য কি করতে পারি? পারি বা না পারি সেটা পরের ব্যাপার …..চেষ্টা তো করতে পারি। সাকসেসফুল হওয়া পরের ব্যাপার।’
তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা একটি ব্যাপারে সবাই কনসার্ন। আপনাদের পত্রিকায় প্রায় এরকম নিউজগুলো আসে দেখি… যেমন ধরেন, আমাদের ইয়াং জেনারেশনের ড্রাগের একটা প্রবলেম দেখা দিয়েছে। হয়তো বিশ্বব্যাপী কম বেশি আছে…. এখন আপনি কতজনকে ধরবেন, কতজনকে চিকিৎসা দিবেন, কতজনকে আপনি কাউন্সিলিং করবেন? সবকিছু একটা রিসোর্সের লিমিট আছে, ক্যাপাবিলিটি আছে, ক্যাপাসিটি আছে।’
তিনি বলেন, ‘তাহলে বিষয়টিকে আর অন্য কীভাবে এড্রেস করা যায়? এটা এড্রেস করার আরও কিছু উপায় আছে। দেখুন ব্যাপারটাকে আমাদের অবশ্যই এড্রেস করতে হবে যে, এই সমস্যা থেকে কীভাবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বের করে নিয়ে আসব। এই চিন্তার পাশাপাশি বা এই সমস্যা থেকে বের হওয়ার পাশাপাশি আরেকটা বিষয় আছে যে, আমার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তো আমার সঠিকভাবে গড়ে তুলতে হবে…. তরুণদের এনার্জিটা বার্ন করার একটা এভিনিউ দিতে হবে, একটা স্কোপ দিতে হবে- সে সুযোগ তাকে ক্রিয়েট করে দিতে হবে।’
তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘আমরা ঢাকাসহ সারাদেশে যেখানেই তাকাই না কেন কয়টি খেলার মাঠ আছে? আমাদের যারা এখন এসবের (ড্রাগ) মধ্যে ইনভলভ হয়ে যাচ্ছে, অথবা সারাদিন সোশ্যাল মিডিয়ার মধ্যে আছে, বুঝে হোক না বুঝে হোক, ভালো-মন্দ পার্টিসিপেট করে ফেলছে। খেলার মাঠ সব বন্ধ। ছেলে হোক মেয়ে হোক উভয়ের জন্য খেলার মাঠ বলতে কিছু নেই।’
তরুণ প্রজন্মের সামাজিক মূল্যবোধ ও ধর্মীয় মূল্যবোধের ঘাটতি আছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী স্কুল পর্যায় থেকে এ বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়ার কথাও তুলে ধরেন।
লন্ডনে সবুজ গাছ-গাছালির কথা স্মৃতিচারণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এটা তো এখন আমি খুব মিস করি। ওই গাছগুলো বিশাল বিশাল সব গাছ। খুব ভালো লাগতো। সামারে আমাদের দেশে কোকিল পাখি ছিল। তো একটা ডাক দিলে আরেকটা ডাক দিত। মাঝে মাঝে আমি ওদের ওই গান শোনার জন্যই হাঁটতাম। যেদিন কাজ থাকতো না গান শোনার জন্য আমি হাঁটতাম। একটা ডাকে, আরেকটা ডাকে, আরেকটা ডাকে… মানে ইকোর মতো ছিল পাখিগুলার ডাক। খুব সুন্দর লাগতো। খুব মিস করি আমি।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা আমাকে অনেক সাহায্য করতে পারেন। শুধু সরকার একা পারবে না। আপনার সহযোগিতা আমার লাগবে। আপনার সহযোগিতা না পেলে তো আমি বুঝতে পারব না যে, কাজটা ভালো হচ্ছে না, খারাপ হচ্ছে। সহযোগিতা পেলেই অন্তত বুঝতে পারব যে, কাজটা ভালো হচ্ছে না খারাপ হচ্ছে। অথবা ভালো কাজের পথটা আপনাকেও দেখাতে হবে। অর্থাৎ আমাদের প্রত্যেককে এগিয়ে আসতে হবে। এই সহযোগিতাটা আমি আপনাদের কাছে চাইছি। আমাকে যদি আপনারা হেল্প করেন… আমার জন্য কাজটা করতে অনেকটা ইজি হবে।’
তারেক রহমান বলেন, ‘আমাদের পরিবেশটা বাঁচাতে হবে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাতে হবে, সন্তানদের যেভাবে হোক রাইট ট্র্যাকে রাখতে হবে। সেটা শিক্ষার মাধ্যমে হোক, কালচারের মাধ্যমে হোক, স্পোর্টসের মাধ্যমে হোক। মানবিক ও সামাজিক ধর্মীয় মূল্যবোধগুলো তাদের মাঝে দেওয়া হোক।’
প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেসসচিব জাহিদুল ইসলাম রনির সঞ্চালনায় মতবিনিময় সভায় তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহাদী আমিন, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, স্পিচ রাইটার এসএএম মাহফুজুর রহমান, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, উপপ্রেস সচিব হাসান শিপলু, সুজাউদ্দৌলা সুজন, শাহাদাত হোসেন স্বাধীন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















