নিজস্ব প্রতিবেদক :
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে যাত্রাবাড়ীতে ৭৫ জনকে হত্যার তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। এর মধ্যে শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার দিন ৫ আগস্টই ৫০-৫৫ জন শহীদ হয়েছেন বলে জানান তিনি।
রোববার (২ আগস্ট) যাত্রাবাড়ীর নবী টাওয়ারের কনফারেন্স রুমে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও আহতদের নিয়ে আয়োজিত গণশুনানিতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে যাত্রাবাড়ীতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত প্রায় ৮৫ জনের নাম-পরিচয়সহ একটি তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। তদন্ত শেষ হলে এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
যাত্রাবাড়ীর হত্যাকাণ্ডের তদন্তকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে আমিনুল ইসলাম বলেন, পৃথক হত্যা মামলা তদন্ত করলে বিচার দীর্ঘায়িত হবে। তাই ১৬, ১৯ ও ২০ জুলাইসহ বিভিন্ন দিনের হত্যাকাণ্ডগুলো দিনভিত্তিক একত্র করে একটি সমন্বিত তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে একই বিচারে একাধিক ঘটনা ও একাধিক আসামিকে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হবে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনাগুলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত তদন্ত শেষ করে বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে বলে জানিয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, যাত্রাবাড়ীর ঘটনাগুলোকে জুলাই আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এসব মামলার তদন্ত দ্রুত শেষ করে যত দ্রুত সম্ভব বিচার সম্পন্ন করতে ট্রাইব্যুনাল কাজ করছে।
সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, থানায় থাকা তদন্ত প্রতিবেদনগুলো দ্রুত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে সব তদন্ত একই সংস্থার মাধ্যমে সম্পন্ন করা যায়।
শহীদ ও আহতদের পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশে মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। প্রত্যেক শহীদ ও আহত পরিবারের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে ট্রাইব্যুনাল সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে।
তিনি ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর প্রতি তদন্তে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে বলেন, যাদের কাছে ভিডিও ফুটেজ, ছবি, তথ্য বা অন্য কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ রয়েছে, সেগুলো তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে জমা দিলে বিচার প্রক্রিয়া আরও দ্রুত এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও ভিডিও ফুটেজ ইতোমধ্যে একাধিক মামলার তদন্ত ও বিচার কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে আবু সাঈদ হত্যা মামলায় একটি টেলিভিশন চ্যানেলের ভিডিও ফুটেজ বিচার কার্যক্রম ত্বরান্বিত করতে সহায়ক হয়েছে।
গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্দেশে আমিনুল ইসলাম বলেন, জুলাই হত্যাকাণ্ড-সংক্রান্ত যেকোনো ভিডিও ফুটেজ বা তথ্য ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কাছে দিলে তা বিচারিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
এ সময় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের প্রতিও তদন্তে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, যার কাছে যে তথ্য, সাক্ষ্য বা প্রমাণ রয়েছে, তা ট্রাইব্যুনালের কাছে পৌঁছে দিয়ে বিচার প্রক্রিয়াকে সহায়তা করা উচিত।
গণশুনানিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের পরিবারের সদস্য ও আহত ব্যক্তিরা তাদের অভিজ্ঞতা, ক্ষয়ক্ষতি, বিচার প্রত্যাশা এবং রাষ্ট্রের কাছে বিভিন্ন দাবি-দাওয়া তুলে ধরেন।
উপস্থিত কর্মকর্তারা তাদের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন।
চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত এ গণশুনানিতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, ভুক্তভোগী পরিবার এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন।
আয়োজকদের মতে, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর বক্তব্য সরাসরি শুনে বিচারিক প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহে এ গণশুনানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
গণশুনানিতে বক্তব্য দিতে গিয়ে শহীদ পরিবারের সদস্যরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। তারা দ্রুত বিচার, দোষীদের শাস্তি এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
শহীদ পারভেজের মা কানিজ ফাতেমা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ৫ আগস্ট আমার ছেলে পারভেজ শহীদ হয়। সন্তান হারানোর কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আমি শুধু চাই, আমার ছেলের হত্যার বিচার যেন হয়।
শহীদ শাহাদাত হোসেন শাওনের বাবা মো. বাসির আলম বলেন, বাবার কাঁধে সন্তানের লাশ বহন করার মতো কষ্ট পৃথিবীতে আর কিছু নেই। আমরা এই শোক নিয়ে বেঁচে আছি। যারা আমাদের সন্তানদের হত্যা করেছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।
শহীদ সোহেল রানার মা রাশেদা বেগম বলেন, আমার বুক খালি হয়ে গেছে। আমি আমার সন্তানের হত্যার বিচার চাই। আর কোনো মাকে যেন এভাবে সন্তান হারাতে না হয়।
বরিশালের বাসিন্দা হলেও দোলাইপাড়ে বসবাসকারী শহীদ মো. শাকিবের মা হেলেনা জানান, ১৮ জুলাই তার ছেলে শাকিব গুলিতে নিহত হয়। তিনি বলেন, আমার সন্তানের মতো সব শহীদের হত্যার বিচার চাই।
শহীদ আব্দুর রহমান জিসানের বাবা মো. বাবুল সরকার আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, আমার ছেলে আব্দুর রহমান জিসান ২০ জুলাই সন্ধ্যা ৬টার দিকে যাত্রাবাড়ীর রায়েরবাগ এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হয়। গোলাগুলি থেমেছে মনে করে সে উঁকি দিলে একটি গুলি তার শরীর ভেদ করে চলে যায়। আমি চাই, আমার সন্তানসহ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত প্রায় ১,৪০০ শহীদ ও ৩০ হাজার আহতের ঘটনায় পূর্ণ বিচার হোক।
তিনি আরও জানান, তিনি সুদানে কর্মরত ছিলেন। তার ছেলে আন্দোলনে অংশ নিয়ে ২০ জুলাই নিহত হন। ২২ জুলাই সন্ধ্যায় তার দাফন সম্পন্ন হয়।
তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমানেও পরিবারটি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে নানা ভয়-ভীতির মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে।
গণশুনানিতে অংশ নেওয়া অধিকাংশ স্বজনই বলেন, তারা প্রতিশোধ নয়, আইনের মাধ্যমে ন্যায়বিচার চান। একই সঙ্গে তারা দ্রুত তদন্ত শেষ করে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন ডেপুটি প্রসিকিউটর শহীদুল ইসলাম বাবু, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-আহ্বায়ক নবী উল্লাহ নবী, যাত্রাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রাজু, বিএনপি নেতা ফেরদৌস হোসেন রনি।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















