বিদ্যুৎ-গ্যাস সমস্যা সমাধানে দুই বছর সময় লাগতে পারে : অর্থমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক :

বিদ্যুৎ, গ্যাস ও নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট এই তিন খাতকে অর্থনীতির অগ্রগতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সমস্যা সমাধানে অন্তত দুই বছর সময় লাগতে পারে। তবে সরকার দ্রুততম সময়ে পরিস্থিতির উন্নতির চেষ্টা করছে।

রোববার (১৬ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে অ্যামচ্যাম আয়োজিত মধ্যাহ্নভোজ ও ‘বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি: নীতি সংস্কার থেকে কার্যকর বাস্তবায়ন’ শীর্ষক সেমিনারে এসব তিনি কথা বলেন।

আমির খসরু বলেন, বর্তমান সরকার যে অর্থনীতি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে, সেখানে আর্থিক খাত, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ও গ্যাসসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমস্যা রয়েছে। এসব সমস্যা ছয় মাস বা এক বছরের মধ্যে সমাধান করা সম্ভব নয়। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ক্ষেত্রে ন্যূনতম দুই বছর সময় লাগতে পারে।

বিদ্যুৎ ও গ্যাসের পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন ও শক্তিশালী ইন্টারনেটকে অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্য অর্জন করতে হলে দেশের সব নাগরিকের কাছে প্রযুক্তির সুবিধা পৌঁছাতে হবে। এ জন্য শক্তিশালী ইন্টারনেট অবকাঠামো প্রয়োজন।

বিদ্যুৎ খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের সমন্বয়ে একটি জ্বালানি মিশ্রণ নিয়ে সরকার কাজ করছে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী। গ্যাসের ক্ষেত্রে এফএসআরইউ ও স্থলভিত্তিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা নিয়ে সিদ্ধান্ত শিগগিরই জানানো হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আমির খসরু বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ী সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরে যে সব সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছিল, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তার অনেকগুলোই দুই মাসের মধ্যে বাস্তবায়ন করেছে। কর ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে এসব পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

ব্যবসা পরিচালনায় প্রতিবন্ধকতা কমাতে সরকারের বাজেটে নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণ বা ডিরেগুলেশনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। তাঁর মতে, শুধু বাজেট বক্তৃতায় সংস্কারের কথা বললে হবে না, তা বাস্তবায়ন করতে হবে।

ডিরেগুলেশন কার্যক্রম তদারকিতে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, কোনো ব্যবসায়ী বা নাগরিক সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কোথাও আটকে গেলে একটি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অভিযোগ জানাতে পারবেন। সরকার প্রতিদিন এসব বিষয় পর্যবেক্ষণ করবে। প্রয়োজনে কিছু আইন পরিবর্তনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

ব্যবসায়ীদের অন্যতম অভিযোগ লালফিতার দৌরাত্ম্য, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, হয়রানি ও দুর্নীতি উল্লেখ করে আমির খসরু বলেন, এসব সমস্যা দীর্ঘদিনের এবং গভীরভাবে প্রোথিত। এগুলো দূর করে ব্যবস্থা সঠিক পথে আনাই সরকারের অন্যতম কাজ।

মন্ত্রী বলেন, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর পাশাপাশি করনীতি প্রণয়নে বড় ধরনের পরিবর্তন করা হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন কার্যক্রম আলাদা করা হচ্ছে। করনীতি প্রণয়নে ব্যবসা ও রাজস্ব ব্যবস্থার ওপর প্রভাব বোঝেন এমন বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করা হবে।

তিনি বলেন, করনীতি কীভাবে তৈরি হচ্ছে, সেটিই অনেক সময় মূল সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। নীতি প্রণয়নের আগে এর প্রভাব ব্যবসা, করদাতা, রাজস্ব আদায় ও ভোগের ওপর কী হবে, তা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

করব্যবস্থা পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় করার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, কর-সংক্রান্ত রিটার্ন জমা দেওয়া থেকে শুরু করে অন্যান্য সেবা অনলাইনে রিয়েল টাইমে দেওয়া গেলে হয়রানি ও অনিয়ম কমবে।

বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে শুধু নীতি সংস্কার করলেই হবে না, এর কার্যকর বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে বলে জানিয়ে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, দেশের আর্থিক খাতে ব্যাংক পুনর্গঠন বা ‘ব্যাংক রেজল্যুশন’ বড় চ্যালেঞ্জ। তবে সরকারের কাজ এখনো শেষ হয়নি। অর্থনীতিতে অনেক সমস্যা রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ।

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মুনাফা ও মূলধন দেশে ফেরত নেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের সমস্যা রয়েছে– এমন ধারণা নাকচ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে কাজ করছে। পরিস্থিতি আগের চেয়ে অনেকটাই সহজ হয়েছে।

বিদেশি একটি প্রতিষ্ঠানের মেয়াদ শেষ হওয়া বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কাস্টমস জটিলতার উদাহরণ তুলে ধরে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিষয়টি সরকারের নজরে আসার পর দ্রুত সমাধান করা হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এ ধরনের সমস্যায় পড়লে সরকার তা শুনবে এবং প্রয়োজন হলে পৃথকভাবে সমাধানের উদ্যোগ নেবে।

তিনি বলেন, বিনিময় হারও এখন অনেকটাই বাজারভিত্তিক হয়েছে। নীতির পূর্বানুমানযোগ্যতা ও ধারাবাহিকতা বাড়াতে এবারের বাজেটে পাঁচ বছরের জন্য নীতিগত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী।

ব্যাংক খাতের সংকট বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, অনেক ব্যাংক মূলধন ঘাটতি, খেলাপি ঋণ ও তারল্যসংকটে রয়েছে। কিছু ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি গুরুতর পর্যায়ে রয়েছে। এসব ব্যাংকের আমানতকারীরা টাকা তুলতে পারছেন না। আবার অনেক ব্যবসায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যাংক থেকে কার্যকরী মূলধন, ঋণপত্র (এলসি) ও অন্যান্য অর্থায়ন না পাওয়ায় সংকটে পড়েছেন।

ব্যাংকগুলোকে পুনঃমূলধনীকরণে সরকার এককভাবে পুরো অর্থের জোগান দিতে পারবে না বলেও জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকারি সহায়তার পাশাপাশি বিদেশি তহবিল ব্যবস্থাপকসহ অন্যান্য উৎস থেকে মূলধন আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এজন্য আর্থিক ব্যবস্থাপনায় নতুন কাঠামো গড়ে তোলার কাজ চলছে।

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের মতো দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির জন্য বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ বিভিন্ন উৎস থেকে বিকল্প অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংকনির্ভর অর্থায়ন থেকে বেরিয়ে বিভিন্ন আর্থিক পণ্যের সমন্বিত ব্যবহার বাড়াতে হবে।

রপ্তানি বাড়াতে বন্ডেড ওয়্যারহাউস ও করমুক্ত সুবিধা আরও উন্মুক্ত করা হয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, রপ্তানি পণ্য উৎপাদনে আগ্রহী ব্যবসায়ীদের জন্য এসব সুবিধা উন্মুক্ত করা হয়েছে। প্রয়োজনে বন্ডেড ওয়্যারহাউসের পরিবর্তে ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমেও সুবিধা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। স্বর্ণ ও রুপার গয়না এবং হীরা কাটার মতো ব্যবসাকেও এ ব্যবস্থার আওতায় আনার কথা জানান তিনি।

বন্দর ও কাস্টমসের কার্যক্রমের সমন্বয়েও সরকার কাজ করছে জানিয়ে আমির খসরু বলেন, ব্যবসার খরচ কমাতে বন্দরের দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। এজন্য সম্প্রতি বন্দর ও কাস্টমসকে নিয়ে যৌথ বৈঠক হয়েছে। এখন থেকে বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্ত নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করা হবে।

চুরি বা পণ্য পাচারের আশঙ্কায় সংস্কার থামিয়ে রাখা যাবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

পুঁজিবাজারে সংস্কারের ফলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ছে বলে দাবি করে অর্থমন্ত্রী বলেন, জেপি মরগ্যান ও গোল্ডম্যান স্যাকসের মতো বিদেশি কয়েকটি বড় তহবিল ব্যবস্থাপক ও বিনিয়োগ ব্যাংক বাংলাদেশে আগ্রহ দেখাচ্ছে। এজন্য বাজারে নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্ত করার কথা বলেন তিনি।

আমির খসরু বলেন, শিল্পের অর্থায়ন শুধু বাণিজ্যিক ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল থাকা ঠিক নয়। ব্যাংকের স্বল্পমেয়াদি আমানত দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেওয়া হলে আর্থিক খাতে চাপ তৈরি হয়। তাই পুঁজিবাজার, বন্ডসহ বিকল্প অর্থায়নের পথ বাড়াতে হবে।

জনপ্রিয় খবর

আবহাওয়া

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে ৭০ অনুচ্ছেদের প্রশ্নটা অবান্তর : গয়েশ্বর চন্দ্র রায়

বিদ্যুৎ-গ্যাস সমস্যা সমাধানে দুই বছর সময় লাগতে পারে : অর্থমন্ত্রী

প্রকাশের সময় : ০৪:৫২:০৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক :

বিদ্যুৎ, গ্যাস ও নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট এই তিন খাতকে অর্থনীতির অগ্রগতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সমস্যা সমাধানে অন্তত দুই বছর সময় লাগতে পারে। তবে সরকার দ্রুততম সময়ে পরিস্থিতির উন্নতির চেষ্টা করছে।

রোববার (১৬ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে অ্যামচ্যাম আয়োজিত মধ্যাহ্নভোজ ও ‘বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি: নীতি সংস্কার থেকে কার্যকর বাস্তবায়ন’ শীর্ষক সেমিনারে এসব তিনি কথা বলেন।

আমির খসরু বলেন, বর্তমান সরকার যে অর্থনীতি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে, সেখানে আর্থিক খাত, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ও গ্যাসসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমস্যা রয়েছে। এসব সমস্যা ছয় মাস বা এক বছরের মধ্যে সমাধান করা সম্ভব নয়। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ক্ষেত্রে ন্যূনতম দুই বছর সময় লাগতে পারে।

বিদ্যুৎ ও গ্যাসের পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন ও শক্তিশালী ইন্টারনেটকে অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্য অর্জন করতে হলে দেশের সব নাগরিকের কাছে প্রযুক্তির সুবিধা পৌঁছাতে হবে। এ জন্য শক্তিশালী ইন্টারনেট অবকাঠামো প্রয়োজন।

বিদ্যুৎ খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের সমন্বয়ে একটি জ্বালানি মিশ্রণ নিয়ে সরকার কাজ করছে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী। গ্যাসের ক্ষেত্রে এফএসআরইউ ও স্থলভিত্তিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা নিয়ে সিদ্ধান্ত শিগগিরই জানানো হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আমির খসরু বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ী সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরে যে সব সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছিল, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তার অনেকগুলোই দুই মাসের মধ্যে বাস্তবায়ন করেছে। কর ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে এসব পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

ব্যবসা পরিচালনায় প্রতিবন্ধকতা কমাতে সরকারের বাজেটে নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণ বা ডিরেগুলেশনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। তাঁর মতে, শুধু বাজেট বক্তৃতায় সংস্কারের কথা বললে হবে না, তা বাস্তবায়ন করতে হবে।

ডিরেগুলেশন কার্যক্রম তদারকিতে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, কোনো ব্যবসায়ী বা নাগরিক সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কোথাও আটকে গেলে একটি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অভিযোগ জানাতে পারবেন। সরকার প্রতিদিন এসব বিষয় পর্যবেক্ষণ করবে। প্রয়োজনে কিছু আইন পরিবর্তনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

ব্যবসায়ীদের অন্যতম অভিযোগ লালফিতার দৌরাত্ম্য, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, হয়রানি ও দুর্নীতি উল্লেখ করে আমির খসরু বলেন, এসব সমস্যা দীর্ঘদিনের এবং গভীরভাবে প্রোথিত। এগুলো দূর করে ব্যবস্থা সঠিক পথে আনাই সরকারের অন্যতম কাজ।

মন্ত্রী বলেন, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর পাশাপাশি করনীতি প্রণয়নে বড় ধরনের পরিবর্তন করা হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন কার্যক্রম আলাদা করা হচ্ছে। করনীতি প্রণয়নে ব্যবসা ও রাজস্ব ব্যবস্থার ওপর প্রভাব বোঝেন এমন বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করা হবে।

তিনি বলেন, করনীতি কীভাবে তৈরি হচ্ছে, সেটিই অনেক সময় মূল সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। নীতি প্রণয়নের আগে এর প্রভাব ব্যবসা, করদাতা, রাজস্ব আদায় ও ভোগের ওপর কী হবে, তা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

করব্যবস্থা পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় করার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, কর-সংক্রান্ত রিটার্ন জমা দেওয়া থেকে শুরু করে অন্যান্য সেবা অনলাইনে রিয়েল টাইমে দেওয়া গেলে হয়রানি ও অনিয়ম কমবে।

বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে শুধু নীতি সংস্কার করলেই হবে না, এর কার্যকর বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে বলে জানিয়ে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, দেশের আর্থিক খাতে ব্যাংক পুনর্গঠন বা ‘ব্যাংক রেজল্যুশন’ বড় চ্যালেঞ্জ। তবে সরকারের কাজ এখনো শেষ হয়নি। অর্থনীতিতে অনেক সমস্যা রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ।

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মুনাফা ও মূলধন দেশে ফেরত নেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের সমস্যা রয়েছে– এমন ধারণা নাকচ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে কাজ করছে। পরিস্থিতি আগের চেয়ে অনেকটাই সহজ হয়েছে।

বিদেশি একটি প্রতিষ্ঠানের মেয়াদ শেষ হওয়া বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কাস্টমস জটিলতার উদাহরণ তুলে ধরে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিষয়টি সরকারের নজরে আসার পর দ্রুত সমাধান করা হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এ ধরনের সমস্যায় পড়লে সরকার তা শুনবে এবং প্রয়োজন হলে পৃথকভাবে সমাধানের উদ্যোগ নেবে।

তিনি বলেন, বিনিময় হারও এখন অনেকটাই বাজারভিত্তিক হয়েছে। নীতির পূর্বানুমানযোগ্যতা ও ধারাবাহিকতা বাড়াতে এবারের বাজেটে পাঁচ বছরের জন্য নীতিগত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী।

ব্যাংক খাতের সংকট বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, অনেক ব্যাংক মূলধন ঘাটতি, খেলাপি ঋণ ও তারল্যসংকটে রয়েছে। কিছু ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি গুরুতর পর্যায়ে রয়েছে। এসব ব্যাংকের আমানতকারীরা টাকা তুলতে পারছেন না। আবার অনেক ব্যবসায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যাংক থেকে কার্যকরী মূলধন, ঋণপত্র (এলসি) ও অন্যান্য অর্থায়ন না পাওয়ায় সংকটে পড়েছেন।

ব্যাংকগুলোকে পুনঃমূলধনীকরণে সরকার এককভাবে পুরো অর্থের জোগান দিতে পারবে না বলেও জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকারি সহায়তার পাশাপাশি বিদেশি তহবিল ব্যবস্থাপকসহ অন্যান্য উৎস থেকে মূলধন আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এজন্য আর্থিক ব্যবস্থাপনায় নতুন কাঠামো গড়ে তোলার কাজ চলছে।

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের মতো দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির জন্য বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ বিভিন্ন উৎস থেকে বিকল্প অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংকনির্ভর অর্থায়ন থেকে বেরিয়ে বিভিন্ন আর্থিক পণ্যের সমন্বিত ব্যবহার বাড়াতে হবে।

রপ্তানি বাড়াতে বন্ডেড ওয়্যারহাউস ও করমুক্ত সুবিধা আরও উন্মুক্ত করা হয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, রপ্তানি পণ্য উৎপাদনে আগ্রহী ব্যবসায়ীদের জন্য এসব সুবিধা উন্মুক্ত করা হয়েছে। প্রয়োজনে বন্ডেড ওয়্যারহাউসের পরিবর্তে ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমেও সুবিধা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। স্বর্ণ ও রুপার গয়না এবং হীরা কাটার মতো ব্যবসাকেও এ ব্যবস্থার আওতায় আনার কথা জানান তিনি।

বন্দর ও কাস্টমসের কার্যক্রমের সমন্বয়েও সরকার কাজ করছে জানিয়ে আমির খসরু বলেন, ব্যবসার খরচ কমাতে বন্দরের দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। এজন্য সম্প্রতি বন্দর ও কাস্টমসকে নিয়ে যৌথ বৈঠক হয়েছে। এখন থেকে বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্ত নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করা হবে।

চুরি বা পণ্য পাচারের আশঙ্কায় সংস্কার থামিয়ে রাখা যাবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

পুঁজিবাজারে সংস্কারের ফলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ছে বলে দাবি করে অর্থমন্ত্রী বলেন, জেপি মরগ্যান ও গোল্ডম্যান স্যাকসের মতো বিদেশি কয়েকটি বড় তহবিল ব্যবস্থাপক ও বিনিয়োগ ব্যাংক বাংলাদেশে আগ্রহ দেখাচ্ছে। এজন্য বাজারে নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্ত করার কথা বলেন তিনি।

আমির খসরু বলেন, শিল্পের অর্থায়ন শুধু বাণিজ্যিক ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল থাকা ঠিক নয়। ব্যাংকের স্বল্পমেয়াদি আমানত দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেওয়া হলে আর্থিক খাতে চাপ তৈরি হয়। তাই পুঁজিবাজার, বন্ডসহ বিকল্প অর্থায়নের পথ বাড়াতে হবে।