নিজস্ব প্রতিবেদক :
দেশের ডেঙ্গুর প্রকোপ আবারও বেড়েছে। চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে বা অক্টোবরের শুরুতে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে পারে, এমন আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) ‘নীরবতা থেকে পদক্ষেপ: তরুণদের আত্মহত্যা নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের আহ্বান’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ শঙ্কার কথা বলেন। আঁচল ফাউন্ডেশন ও হিউম্যান রাইটস ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের আয়োজনে এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, মঙ্গলবার থেকে দেশব্যাপী ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে। আমরা আশঙ্কা করছি, সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ এবং অক্টোবরের শুরুর দিকে দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
তিনি বলেন, ডেঙ্গু নিয়ে ৩ মাসের ক্যাম্পেইন চালু করতে যাচ্ছে সরকার। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুহার কমাতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ডেঙ্গুর চিকিৎসায় ৩০০ চিকিৎসককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। রোগী বৃদ্ধির শঙ্কায় বেড, স্যালাইন ও টেস্ট কিট মজুদ রাখা হয়েছে।
ডেঙ্গু মোকাবিলায় তিন মাসব্যাপী জনসচেতনতামূলক অভিযান শুরু করা হবে জানিয়ে ড. এম এ মুহিত বলেন, এ কার্যক্রমে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করা হবে। ঘরবাড়ি ও কর্মস্থল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার পাশাপাশি এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
তিনি বলেন, সিটি করপোরেশন, স্থানীয় সরকার ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সমন্বিতভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং এডিস মশার লার্ভা ধ্বংসে কার্যক্রম চালাবে।
ডা. এম এ মুহিত বলেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় সরকারের মূল লক্ষ্য দুটি—আক্রান্তের সংখ্যা কমানো এবং মৃত্যুর হার কমানো। এ জন্য ইতোমধ্যে প্রায় তিন হাজার চিকিৎসককে ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনার বিষয়ে রিফ্রেশার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও এ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার সময় হাসপাতালগুলোতে শয্যা, স্যালাইন ও পরীক্ষার কিটের সংকট এড়াতে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, বর্তমান রোগীর হারের ভিত্তিতে পর্যাপ্ত ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট ও স্যালাইন মজুত রয়েছে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য নির্ধারিত শয্যাও চালু করা হয়েছে। রোগীর সংখ্যা আরও বাড়লে প্রয়োজনে অন্যান্য শয্যা পুনর্বিন্যাস করে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হবে।
ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার সময়ে বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়ে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রয়োজন হলে বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় ভূমিকা রাখতে হবে। একই সঙ্গে এ সময়ে অযৌক্তিকভাবে চিকিৎসা ব্যয় বাড়ানো যাবে না। হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য নির্ধারিত শয্যা রাখারও আহ্বান জানান তিনি।
আত্মহত্যা প্রতিরোধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার পরিবর্তে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার পরিধি বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে ড. এম. এ. মুহিত বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমান আইনে আত্মহত্যার ঘটনাকে অপরাধ হিসেবে দেখার কারণে নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। এর ফলে আত্মহত্যার সঙ্গে জড়িত সামাজিক কলঙ্কও আরও শক্তিশালী হচ্ছে।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে কথা বলা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জীবনের নানা উত্থান-পতন ও চ্যালেঞ্জ মানুষ যখন একা মোকাবিলা করতে থাকে, তখন তার ওপর মানসিক চাপের ভার বাড়তে থাকে। তাই মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আরও বেশি কাজ করা প্রয়োজন।
ড. এম এ মুহিত বলেন, প্রান্তিক পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। উপজেলা পর্যায়ের একজন মানুষ উদ্বেগ, বিষণ্নতা বা আত্মহত্যার চিন্তার মতো সমস্যায় পড়লে কোথায় এবং কার কাছে যাবেন, সে বিষয়ে অনেক সময় কোনো ধারণাই থাকে না। এই ঘাটতি পূরণে সরকার কমিউনিটি মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, পাবনার মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের জন্য একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। নতুন ভবন নির্মাণ ও জনবল বাড়ানোর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা বাড়ানো হবে। ঢাকার জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটকেও আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ড. এম. এ. মুহিত বলেন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার, টেলি কাউন্সেলিং এবং কমিউনিটিভিত্তিক সচেতনতামূলক কর্মসূচি নেওয়া যেতে পারে। প্রান্তিক পর্যায় থেকে তৃতীয় স্তরের চিকিৎসাকেন্দ্র পর্যন্ত একটি রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে, যাতে মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তি কোথায় এবং কার কাছে যাবেন, তা সহজেই জানতে পারেন।
আত্মহত্যা নিয়ে বিদ্যমান আইনি কাঠামো প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমান আইনে আত্মহত্যার ঘটনাকে অপরাধ হিসেবে দেখানো হয়েছে। অথচ এটি কোনো অপরাধমূলক কাজ নয়। এ কারণে আত্মহত্যা প্রতিরোধের কার্যক্রমে সমস্যা হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট সামাজিক কলঙ্ক আরও বাড়ছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আরও আলোচনা করে আইনগত সমস্যাগুলো বোঝার চেষ্টা করবেন। একজন সংসদ সদস্য হিসেবে বিষয়টি যৌক্তিকভাবে কীভাবে তুলে ধরা যায়, সে বিষয়ে কাজ করার আগ্রহ রয়েছে তার।
মানসিক স্বাস্থ্যকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, শুধু চিকিৎসার মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যকে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। মানুষের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। প্রতিটি নাগরিক যাতে নিজের এবং অন্যের মানসিক সুস্থতার বিষয়ে সচেতন ভূমিকা রাখতে পারেন, সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
সেমিনারে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সাইফুন নাহার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক কামাল উদ্দিন আহমেদ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রফেশনাল অফিসার হাসিনা মমতাজসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বক্তব্য দেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















