নিজস্ব প্রতিবেদক :
ধীরে ধীরে গণতন্ত্র সংকুচিত হয়ে আসছে বলে মন্তব্য করে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলাম বলেন, কথা বলার জায়গাও সংকুচিত হচ্ছে। এই সংকোচন ঠেকাতে সাংবাদিকসহ সবাইকে ভূমিকা পালন করতে হবে।
সোমবার (১৭ আগস্ট) রাজধানীর গুলশানে একটি হোটেলে ডেমোক্রেটিক জার্নালিস্ট এলায়েন্সের (ডিজেএ) আয়োজনে ‘সাংবাদিকের চোখে জুলাই’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
নাহিদ বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সাংবাদিকরা প্রতিকূলতার মধ্যেও সাহসী ভূমিকা পালন করেছেন। আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে মাঠে থাকা সাংবাদিকদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। তারা বিভিন্ন সময় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, নিউজ ও ইনসাইট দিয়ে আমাদের সহায়তা করেছেন। অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তেও তাদের দেওয়া তথ্য আমাদের কাজে লেগেছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখসারির এই নেতা বলেন, একপর্যায়ে সব মিডিয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ইলেকট্রনিক মিডিয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। আন্তর্জাতিক ও মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিকদের কাজেও নানা ধরনের প্রতিকূলতা তৈরি হয়েছিল। তারপরও সাংবাদিকরা অনেক কাজ করে গেছেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সাংবাদিকদের ভূমিকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলাতেও অনেকে কাজ করেছেন। আমার কাছে মনে হয়েছে, সাংবাদিকরা সেই সময় পেশার ঊর্ধ্বে গিয়ে দেশপ্রেম, মানবিকতা ও বিবেকবোধ থেকে অনেক ভূমিকা পালন করেছেন। এমনও হয়েছে, কোনো সাংবাদিক আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য নিজ কাঁধে করে রিকশায় তুলে দিয়েছেন।
তবে, সাংবাদিকদের মধ্যে বিপক্ষ শক্তির ভূমিকাও ছিল উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, সাংবাদিকদের মধ্যেও বিপক্ষ শক্তি ছিল। আমরা সেই ধরনের ভূমিকাও দেখেছি। তবে, ডিজিটাল মিডিয়ায় সাংবাদিকদের সক্রিয়তা, বিভিন্ন ফুটেজ ও তথ্যচিত্র জুলাই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সাংবাদিকরা সক্রিয় না থাকলে অনেক কিছুই সম্ভব হতো না।
তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে প্রায় ছয়জন সাংবাদিক শহীদ হয়েছেন এবং কয়েকশ সাংবাদিক আহত হয়েছেন। অনেকে এখনো গুলিবিদ্ধ অবস্থায় আছেন। তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকাকালে আমি অনেক আহত সাংবাদিকের সঙ্গে দেখা করেছি এবং কথা বলেছি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গণমাধ্যম সংস্কারে আরো কিছু করা সম্ভব ছিল, মন্তব্য করে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, আমাদের অনেক কিছু করার সুযোগ ছিল। কিন্তু, অনেক কিছু করতে দেওয়া হয়নি। আপনাদের সব সমালোচনাকে আমি সাদরে গ্রহণ করি। তবে, আমি মাত্র সাত মাস দায়িত্বে ছিলাম। সেই সময়টা কোনো স্বাভাবিক সাত মাস ছিল না। পুরো দেশকে স্থিতিশীল করতে আমাদের সব শক্তি ও সামর্থ্য দিতে হয়েছে।
গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন সাংবাদিকদের সুরক্ষা আইনসহ অনেক ভালো নীতি ও সুপারিশ দিয়েছিল। আজকের অনুষ্ঠান থেকে আমরা দাবি জানাচ্ছি, এই সরকার যেন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী সেগুলো বাস্তবায়ন করে।
সাংবাদিকদের হয়রানি বন্ধের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এই সরকার আসার পর বিভিন্ন হাউস থেকে সাংবাদিকদের বের করে দেওয়া হয়েছে। এখন টিভির চারজন সাংবাদিকের বিষয়টি আমরা সংসদে বলেছি। সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে না পারলে তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন না।
গণমাধ্যমের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন স্বার্থের কথা তুলে ধরে নাহিদ ইসলাম বলেন, তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকার সময় গণমাধ্যমকে ভেতর থেকে বোঝার সুযোগ হয়েছে। এখানে মালিকপক্ষ, সম্পাদক, সাংবাদিক, করপোরেট স্বার্থ ও রাজনৈতিক দলের প্রভাব—অনেক ধরনের পরস্পরবিরোধী স্বার্থ কাজ করে।
তিনি বলেন, আমরা নতুন দল হিসেবে কিংবা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় মিডিয়ার কাছ থেকে সব সময় যে ধরনের ব্যবহার পাওয়ার কথা ছিল, তা পাইনি। কয়েকদিন আগেও হাসনাত আবদুল্লাহর একটি বক্তব্যের কারণে একটি মিডিয়া ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় তাকে নিয়ে ২০ থেকে ৩০টি প্রতিবেদন করেছে। বিভিন্ন সময় ছাত্রনেতৃত্বের চরিত্রহনন এবং তাদের দুর্নীতিবাজ প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়েছে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে ও মুক্তভাবে কাজ করবে, এটাই আমরা চাই। এখন একটা মুক্ত পরিবেশ আছে। কিন্তু, এটা কতদিন থাকবে, আমরা কেউ জানি না। ধীরে ধীরে আমরা দেখতে পাচ্ছি, গণতন্ত্র সংকুচিত হয়ে আসছে, কথা বলার জায়গা সংকুচিত হয়ে আসছে। এই সংকোচন ঠেকাতে হবে।
তিনি বলেন, গণতান্ত্রিকভাবে প্রতিবাদ করাকে যদি হটকারিতা বলা হয়, তাহলে আমাদের বুঝতে হবে, আমরা কোন দিকে যাচ্ছি। বিরোধী দল কথা বলবে, সংসদের বাইরেও কথা বলবে, এটাই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চরিত্র। গণতান্ত্রিকভাবে ও অহিংসভাবে যেকোনো কথা প্রকাশ করার সুযোগ থাকতে হবে।
সাংবাদিকদের নিরপেক্ষ ভূমিকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের গণমাধ্যমের কাছ থেকে আমরা নিরপেক্ষ ভূমিকা চাই। সাংবাদিকরা সাংবাদিকদের ভূমিকা পালন করে সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রচার করলেই যথেষ্ট। রাজনৈতিক দল হিসেবে আমরা আমাদের ভূমিকা পালন করব।
গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে হামলা ও অগ্নিসংযোগেরও প্রতিবাদ জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, সাংবাদিক হাউসগুলোর নীতিমালা ও আদর্শিক অবস্থান ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু, আমরা কখনোই সহিংস পদ্ধতিকে সমর্থন করি না। আমাদের বিরুদ্ধেও যেসব মিডিয়া রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক স্বার্থ থেকে কাজ করছে, আমরা সেগুলোর প্রতিবাদ গণতান্ত্রিকভাবে করে যাচ্ছি।
তিনি বলেন, আমরা দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা চাই, একই সঙ্গে দায়িত্বশীল রাজনীতিও চাই। যারা জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহত হয়েছেন, তাদের জন্য সরকারের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নেওয়া উদ্যোগগুলোও চলমান রাখা দরকার।
বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ বলেন, সাংবাদিকদের বেশি কিছু চাওয়ার নেই। তারা সঠিকভাবে তাদের পেশাগত কাজ করতে চান। সরকার বা কোনো রাজনৈতিক শক্তি যেন তাদের কাজে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। তারাও নিরপেক্ষভাবে কাজ করবেন, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
তিনি আরো বলেন, ব্যক্তির ইচ্ছায় কোনোদিন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বা গণতন্ত্র টিকে থাকে না। গণতন্ত্র টিকে থাকে প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হলে। গণমাধ্যমও একটি প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানকে যত বেশি নির্মোহ, নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী করতে পারব, দেশে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন তত বেশি টিকে থাকবে।
তিনি বলেন, আমরা যে জায়গায় আছি, সেখান থেকে আর পেছনের দিকে যেতে চাই না। আমরা সামনে এগোতে চাই। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করা, স্বাধীন ও সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতি এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুরক্ষিত করাই আমাদের লক্ষ্য।
নিজস্ব প্রতিবেদক 
























