নিজস্ব প্রতিবেদক :
নতুন অর্থবছরের বাজেটে ঘোষিত পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা তখনই সফল হবে, যখন সাধারণ মানুষের খাদ্য ব্যয় কমবে, প্রকৃত আয় বাড়বে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে মন্তব্য করেছেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ও নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
সোমবার (১৫ জুন) রাজধানীর মহাখালীতে অবস্থিত ব্র্যাক সেন্টারে নাগরিক প্লাটফর্ম আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: অসুবিধাগ্রস্ত মানুষের জন্য কী আছে?’ শীর্ষক মিডিয়া বিফ্রিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন তিনি। মিডিয়া বিফ্রিংয়ে সভাপতিত্ব করেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, শুধু জিডিপি প্রবৃদ্ধি দিয়ে উন্নয়ন বিচার করা যায় না। কৃষি, এসএমই, তৈরি পোশাক ও সেবা খাতে কর্মসংস্থান বাড়াতে না পারলে প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে না।
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে মূল্যস্ফীতি মজুরি বৃদ্ধির চেয়ে বেশি হওয়ায় মানুষের প্রকৃত আয় কমছে। একই সঙ্গে কিছু আয়সীমার করদাতার ওপর করের চাপও বাড়তে পারে।’ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি ও ভর্তুকি কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করারও আহ্বান জানান তিনি।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য , চিন্তাশীল হলেও দুর্বল, অপেশাদার এবং অমনোযোগী আর্থিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে নতুন বাজেট। সেখানে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে, তবে সেটি কতটুকু বাস্তব? এখন ১০ শতাংশের কাছাকাছি। এখানে ভ্রান্ত ধারণা দিয়ে আপনি প্রক্কালন করলে তো হবে না। মূল্যস্ফীতি কমানো না গেলে, মজুরি বাড়ানো না হলে এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো জোরালো না হলে কিন্তু মধ্যবিত্তের ওপর চাপ কমবে না। এক্ষত্রে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের শর্ত সরকারকে মানতে হবে। সামনে আইএমএফের শর্ত আসছে।
তিনি বলেন, আমরা মনে করি বাণিজ্য, রফতানি বাড়লে দারিদ্র্য কমবে। কিন্তু এটা ঠিক নয়। সরকার এখানে রিকভারির জন্য এক বছরের জন্য সময়ের কথা বলছে। কিন্তু তা কি হবে? অন্তত দুই বছর সময় নেয়া দরকার ছিল। কারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমছে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। মাসিক আয় ৩১ হাজার ২৫০ টাকা থেকে ৩৭ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে হলে মার্জিনাল ট্যাক্স রেট ৫ শতাংশ বাড়বে। ফলে এ আয়সীমার কিছু মানুষের ওপর করের চাপ বাড়তে পারে।
বাজেট ও এর বাস্তবায়ন নিয়ে চারটি দাবি তুলে ধরেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য— প্রথমত চলতি তথ্যের ভিত্তিতে প্রাক্কালন হালানাগাদ করা। দ্বিতীয়ত প্রতি তিন মাস পর সংসদে অর্থমন্ত্রীকে বর্তমান পরিস্থিতি ও বাজেট বাস্তবায়ন উপস্থাপন করতে হবে। তৃতীয়ত এমন একটি পার্লামেন্টারি ককাস তৈরি যেখানে সংসদ সদস্যরা থাকবেন। সর্বশেষ হলো রিফর্ম ট্র্যাকার। যেখানে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও সরকার কী চায় সে বিষয় তুলে ধরতে হবে।
বাজেটের তথ্য ও উপাত্ত নিয়ে ছলচাতুরী না করতে সর্তক করে এ অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘সরকারের বাজেট নিয়ে আমাদের সবচেয়ে বড় অনুযোগ হলো তথ্য উপাত্ত নিয়ে। অনেকক্ষেত্রে অপটুতা, অমনোযোগিতা ও ছলচাতুরী করেছেন— তা নিয়ে আমরা মর্মাহত। তথ্য চলচাতুরী করলে তারা আবারো বিগত সরকারের পথে হাঁটবে। আগের সরকার তথ্য নিয়ে ছলচাতুরী করেছিল। কীভাবে তাদের প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে বলা যায়, মূল্যস্ফীতিকে কম বলা, বড় বড় প্রকল্প দিয়ে দৃষ্টি সরানো এবং এর মাধ্যমে জনমানুষের উপকার হলো কিনা তা মূল্যায়ন না করা।’
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘এ সরকার পুরানো পথে হাটঁতে পারে এমন আশঙ্কা আমাদের রয়েছে এবং সেটার সূত্রপাত হয় ওই তথ্য উপাত্তের চলচাতুরী দিয়ে, এ ব্যাপারে সর্তক করার পক্ষপাতি আমরা।’
সিপিডি’র প্রবন্ধে বলা হয়, অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে সরকারের তিন বছর মেয়াদি তিন ‘আর’ রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন পরিকল্পনার তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। প্রথম বছরেই রিকভারি বা পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়ানোর যে লক্ষ্য অর্থমন্ত্রী দিয়েছেন, তা অতি-মাত্রায় চাপ সৃষ্টিকারী এবং অবাস্তব। যেখানে আগে অর্থমন্ত্রী নিজেই বলেছিলেন, দুই বছরের আগে কিছু দেওয়া সম্ভব নয়, সেখানে হঠাৎ এক বছরেই এই সংস্কার শেষ করা অসম্ভব। যথাযথ সংস্কার ছাড়া এভাবে তাড়াহুড়ো করলে এবং নির্বাচনের প্রাক্কালে যদি মূল্যস্ফীতি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়, তবে সরকারের ‘লাভের গুড় পিঁপড়ায় খেয়ে যাবে’ বলে মন্তব্য করা হয়।
অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি বা বাণিজ্যের সূচক বাড়লেই যে সাধারণ মানুষের ভাগ্যবদল হয় না, তা উল্লেখ করে দেবপ্রিয় বলেন, দেশের নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত সমাজ এখন তীব্র ত্রিমুখী চাপে রয়েছে, মূল্যস্ফীতির চাপ, মজুরির চাপ ও সঞ্চয় হারানোর চাপ। নিত্যদিনের খরচ মেটাতে মানুষ তার জমানো সঞ্চয় ভাঙতে বাধ্য হচ্ছে। এর ওপর টাকার অবমূল্যায়ন বা বিনিময় হারের পতন ঘটলে খাদ্যদ্রব্যের দাম আরও বাড়বে, যা জনগোষ্ঠীকে চরম সংকটে ফেলবে।
তিনি বলেন, বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বর্ধিত অংশের প্রায় ৬০ শতাংশ এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির প্রায় ২৭ থেকে ৮৭ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়াকে ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হলেও বড় অঙ্কের ‘থোক বরাদ্দ’ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এই থোক বরাদ্দ মূলত আর্থিক শৃঙ্খলা নষ্ট করে। এছাড়া অতিরিক্ত পরিচালন ব্যয়ের কারণে রাজস্ব উদ্বৃত্ত থেকে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে অর্থায়নের সুযোগ এখনো অত্যন্ত সামান্য।
দেবপ্রিয়, তার বাজেট উপস্থাপনায় বলেন, বাজেট ঘাটতি পূরণে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও এডিবি থেকে সাড়ে নয় বিলিয়ন ডলার ঋণ নেওয়ার যে পরিকল্পনা চলছে, সেখানে শর্তের বদলে কেপিআই বা কর্মসম্পাদনের সূচক জুড়ে দেওয়া হচ্ছে। ঋণ পাওয়ার শর্ত বা কেপিআই যাই হোক না কেন, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ যেন দেশের পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক মানুষের স্বার্থ রক্ষা করে। ঋণ নিতে হলে তা যেন কোনোভাবেই জনবিরোধী না হয়ে ‘জনমানুষের পক্ষের শর্ত’ হয়, তা সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে।
দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, মানুষ এখন মূল্যস্ফীতি, মজুরি সংকট এবং সঞ্চয় হারানোর ত্রিমুখী চাপে রয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে অনেকেই সঞ্চয় ভাঙতে বাধ্য হচ্ছেন।
বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও বড় অঙ্কের থোক বরাদ্দ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার মতে, এ ধরনের বরাদ্দ আর্থিক শৃঙ্খলার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
এছাড়া বাজেট ঘাটতি পূরণে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে প্রায় সাড়ে ৯ বিলিয়ন ডলার ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, এসব ঋণের শর্ত বা কর্মসম্পাদন সূচক যেন দেশের প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া মানুষের স্বার্থের পরিপন্থি না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, ঋণ নিতে হলে সেটি অবশ্যই জনমানুষের পক্ষে হতে হবে, জনবিরোধী নয়।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















