নিজস্ব প্রতিবেদক :
জাতীয় দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে পুলিশের কাছে সব প্রার্থীই সমান বলে মন্তব্য করেছেন পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (অপারেশন) মো. আনোয়ার হোসেন।
শনিবার (৩০ ডিসেম্বর) দুপুরে পুলিশ সদরদফতরে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত এক সংবাদ সম্মেলনে এ মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, পুলিশের কাছে সকল প্রার্থী সমান। প্রচার প্রচারণার ক্ষেত্রে সকল প্রার্থী যেন সমান সুযোগ পান, সে নির্দেশনা দেওয়া আছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে একটি পক্ষ রেলে আগুনসহ নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড ঘটাচ্ছে। রেল পুলিশের মাধ্যমে রেলের নিরাপত্তায় বিভিন্ন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আইপি ক্যমেরা বসানো হয়েছে।
তিনি বলেন, বৈধ অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান চলমান রয়েছে। কোথাও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। মামলা হচ্ছে। কোথাও কোথাও গ্রেপ্তারও হচ্ছেন।
আনোয়ার হোসেন বলেন, নির্বাচনকালীন পরিস্থিতি রক্ষা করাই আমাদের দায়িত্ব। নির্বাচন কমিশনের আদেশ অনুযায়ী পুলিশ কর্মাকর্তাদের বদলি এবং কাউকে কাউকে প্রত্যাহারও করা হয়েছে।
তিনি বলেন, গত ২৮ অক্টোবরের পর থেকে এখন পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াতের কতজন নেতাকর্মীদেরকে গ্রেফতার করা হয়েছে সেটা একেবারে সংখ্যা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। তবে প্রতিদিন নিয়মিত মামলায় সারাদেশে গ্রেফতারি পরোয়ানাসহ নানা কারণে ১৮শ থেকে ১৯শ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এর বাহিরে যেটা বলা হয় শুধু রাজনৈতিক কারণে, আসলে রাজনৈতিক কারণে কোনো গ্রেফতার হয় না। যখন একটি জায়গায় মারামারি, বাসে অগ্নিসংযোগ, অবরোধ হয় তখন সেই সংক্রান্ত একটা মামলা হয়। মামলায় যারা আসামি হয় তাদেরকে গ্রেফতার করা হয়। যেই সংখ্যাটা বাহিরে বলা হয়, এটা একেবারেই অতিরঞ্জিত। আপনারা দেখেছেন গ্রেফতার বাণিজ্য শব্দ কিন্তু এবার গণমাধ্যমে নাই। আমরা গ্রেফতার করার আগে বারবার চিন্তা করি যে-ই জড়িত শুধু তার তাকেই গ্রেফতার করা হয়।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক কারণে কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। রাজনীতি করা অপরাধ নয়। কেউ যদি রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে যানবাহনে আগুন দেয়, ভাঙচুর করে, যানবাহন চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে তাহলে নির্দিষ্ট মামলায় তাদেরকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। তাদের কারও কারও হয়তো রাজনৈতিক পরিচয় থাকতে পারে। সেটা না দেখে নাশকতায় সম্পৃক্ত কিনা সেটা বিবেচনায় নিয়ে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।
আনোয়ার হোসেন বলেন, গত ২৮ অক্টোবর একটি সমাবেশকে কেন্দ্র করে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছিল। সেদিনের পরিস্থিতি আমরা মোকাবিলা করেছি। সেখানে একজন পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছিল। পুলিশের অনেকগুলো অস্ত্র ছিনতাই হয়েছিল। এই ঘটনার পর থেকে যেটা বলা হয় রাজনৈতিক কর্মী। আমরা যখন গ্রেফতার করি তখন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে কাউকে গ্রেফতার করা হয় না। আমরা দেখি কোন একটা ঘটনার সাথে যারা জড়িত থাকে তাদেরকে চিহ্নিত করে গ্রেফতার করা হয় যেন পরিস্থিতির আর অবনতি না ঘটে।
বিএনপি জামায়াতসহ বিরোধী পক্ষের ২৬ হাজার নেতাকর্মী গ্রেপ্তার করা হয়েছে এই তথ্য সঠিক কিনা জানতে চাইলে আনোয়ার হোসেন বলেন, পরোয়ানা তামিলসহ বিভিন্ন মামলা ও অভিযোগে সারা দেশে গড়ে ১ হাজার ৬০০ জনের মতো গ্রেপ্তার হয়। তাদের মধ্যে রাজনৈতিক দলের পদধারি সংখ্যা কতো সেটা আমাদের কাছে হিসাব নেই। সারা দেশ থেকে তথ্য নিয়ে সে হিসাব তৈরির বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ফৌজদারী অপরাধে সম্পৃক্তদেরই শুধু পুলিশ গ্রেপ্তার করছে।
লিফলেট বিতরণকারীদের কেন গ্রেফতার করা হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, নির্বাচনকে প্রতিরোধ করা, নির্বাচনী কার্যক্রমে বাধার সৃষ্টি করাটা কিন্তু অপরাধ। আমরা যদি নির্বাচনী আইন বিধি এই বিষয়গুলো দেখি তাহলে দেখবেন, একটা নির্বাচনী প্রক্রিয়া এগিয়ে যাচ্ছে সেখানে বাধার সৃষ্টি করা যাবে না। বাধা সৃষ্টি করতে গেলেই সেখানে সঙ্গত কারণেই একটা ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে আরও বড় ঘটনা সংঘটিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
তিনি বলেন, ফরিদপুর সহ সারা দেশের ৬৪ জেলার ৩০০ আসনে যেখানে যেই ধরনের ঘটনা ঘটছে- কোন জায়গায় আচরণ বিধি লঙ্ঘিত হচ্ছে। নানা ধরনের অভিযোগ আসছে। রিটার্নিং অফিসার, নির্বাচন কমিশন কিছু অভিযোগ আসছে। পাশাপাশি আমাদের দৃষ্টিতেও যেই বিষয়গুলো আসে এরমধ্যে কিছু থাকে সরাসরি ফৌজদারি অপরাধ সংক্রান্ত। সেগুলোর ব্যাপারে থানায় মামলা হয় এবং আসামি গ্রেফতার করার চেষ্টা করা হয়। এর বাহিরে আচরণবিধি সংক্রান্ত বিষয়গুলো রিটার্নিং কর্মকর্তা ও ম্যাজিস্ট্রেট দেখে যেখানে যেই ধরনের ব্যবস্থা প্রয়োজন সেই ধরনের ব্যবস্থা নিয়ে থাকে।
ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র সম্পর্কে তিনি বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে বাড়তি ফোর্স মোতায়েন রয়েছে। কোনো কোনো দুর্গম এলাকার কেন্দ্রও ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে। সেগুলোর বিষয়েও পুলিশ বাড়তি ফোর্স দিয়ে কাজ করছে। পুলিশ অবাধ শান্তিপূর্ণ একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সর্বাত্মক গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।
বিভিন্ন এলাকায় বৈধ অস্ত্র প্রদর্শণ করে হুমিক দেওয়া হচ্ছে জানতে চাইলে ডিআইজি বলেন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার নিয়ে আমাদের বিশেষ অভিযান চলমান রয়েছে। বৈধ অস্ত্র প্রদর্শন ও বহন নিষিদ্ধ করে একটি পরিপত্র জারি হয়েছে। নির্বাচনকালে কেউ বৈধ অস্ত্র প্রদর্শন বা বহন করতে পারবে না। আমাদের কাছে নির্দিষ্ট এলাকায় বৈধ অস্ত্র প্রদর্শনের ২টি অভিযোগ এসেছে। আমরা তদন্ত করে দেখেছি সেগুলো ছিল খেলনা অস্ত্র।
নির্বাচন কেন্দ্রিক মারামারি ও দাঙ্গা-হাঙ্গামা বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যেকোনো ঘটনার পরই মামলা হচ্ছে। পুলিশ ওই সব ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনছে। আইন শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ কোনো ধরনের ছাড় দিচ্ছে না। পুলিশ পেশাদারত্ব ও নিরপেক্ষভাব দায়িত্ব পালন করছে। পুলিশের কোনো কর্মকর্তা নিরপেক্ষতা হারানোর অভিযোগ আসলে তাৎক্ষণিকভাবে তাকে বদলী বা প্রত্যাহার করছে। এরপরও ওই কর্মকর্তার বিষয়ে তদন্ত হচ্ছে। তদন্তে তার বিরুদ্ধে নিরপেক্ষতা হারানোর প্রমাণ পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভোটকেন্দ্রের আইন শৃঙ্খলা বিষয়ে তিনি বলেন, নির্বাচনী এরাকায় রিটার্নিং কর্মকর্তা কোনো অভিযোগ পেলে সেগুলোর প্রতিকারের ব্যবস্থা নিচ্ছেন। পুলিশ তাদেরকে সহযোগিতা করছে। কেন্দ্রে প্রিজাইডিং অফিসারগণ যেভাবে নিরাপত্তা নির্দেশনা দিবেন পুলিশ সেভাবে কাজ করবে।
ডিআইজি অপারেশন বলেন, নির্বাচনের সময়ে সারা দেশে ১ লাখ ৮৯ হাজার পুলিশ সদস্য কর্মরত থাকছেন। নির্বাচনের দায়িত্বে, মোবাইল টিম, স্ট্রাইকিং টিম, ম্যাজিস্ট্রের সাথেও ডিউটিতে থাকেন। এমনকি ওইদিন যিনি থানার সিসি লেখেন, উনিও নির্বাচনী দায়িত্বে।
দাগী আসামি ও তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের জামিনে বেড়িয়ে নির্বাচনী এলাকায় প্রচারণায় অংশ নেওয়ার বিষয়ে ডিআইজি আনোয়ার হোসেন বলেন, কোনো আসামি জামিনে বেড়িয়ে নতুন করে অপরাধে না জড়ালে তাকে গ্রেপ্তার করার সুযোগ নেই। জামিন পাওয়া আসামিদের বিষয়ে পুলিশের বিশেষ নজরদারী অব্যাহত আছে। তারা কোনো অপরাধ করলে সঙ্গে সঙ্গে তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হবে।
থার্টিফাস্ট নাইটের নিরাপত্তারে বিষয়ে জানতে চাইলে আনোয়ার হোসেন বলেন, থার্টিফাস্ট নাইটের নিরাপত্তার বিষয়ে ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ে সভা হয়েছে। আইজিপিও বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন। থার্টিফাস্ট নাইটে আতশবাজি ফুটানো ও ফানুস ওড়ানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। উন্মুক্তস্থানে কোনো অনুষ্ঠান করা যাবে না। এছাড়া গুলশান, বনানী ও ৩০০ ফিটসহ বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ নজরদারীর আওতায় আনা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন এআইজি এনামুল হক সাগর ও পুলিশ সদর দপ্তরের উপপ্রধান তথ্য কর্মকর্তা একেএম কামরুল আহছান।
নিজস্ব প্রতিবেদক 















