নিজস্ব প্রতিবেদক :
আগামীর বাংলাদেশ হবে একটি গণতান্ত্রিক ও কল্যাণ রাষ্ট্র বলে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতিসহ সব ক্ষেত্র ধ্বংস করে গিয়েছে ফ্যাসিবাদী সরকার। এবার তা পুনর্গঠনের পালা। সেই লক্ষ্যেই কাজ অব্যাহত আছে। আমরা মনে করি, দেশ পুনর্গঠনের এই যাত্রা পথে অবশ্যই এসডিজির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অনস্বীকার্য।
সোমবার (১০ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘এসডিজি অর্জনে পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামো: নীতি, অংশীদারত্ব ও অগ্রাধিকার’ শীর্ষক জাতীয় সম্মেলন-২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, কোনো এক মন্ত্রণালয় বা বিভাগের পক্ষে এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়, এর জন্য সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কাউকে পেছনে ফেলে নয়’ এই মূলনীতির সঙ্গে বর্তমান সরকারের জননীতিরও মিল রয়েছে। সব শ্রেণি-পেশা তথা জনগণের স্বার্থ নিশ্চিতকরার লক্ষ্যে বর্তমান সরকারের নীতি হলো, ‘সবার জন্য বাংলাদেশ’।
বিএনপির সব পরিকল্পনা ও কর্মসূচি সবসময়ই জনবান্ধব বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, দেশ ও জনগণের উন্নয়নে স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা খালেদা জিয়ার ‘ভিশন ২০৩০’ এবং বর্তমানে রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফার প্রতিটি রূপকল্প ও লক্ষ্যের সঙ্গে এমডিজি কিংবা বর্তমানের এসডিজির খুব বেশি অমিল নেই।
তারেক রহমান বলেন, এসডিজির মূলনীতি ‘কাউকে পেছনে ফেলে নয়’- এর সঙ্গে বর্তমান সরকারের জননীতিরও মিল রয়েছে। সব শ্রেণি-পেশার তথা জনগণের স্বার্থ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বর্তমান সরকারের নীতি হচ্ছে ‘সবার জন্য বাংলাদেশ’।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ যেভাবে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) বাস্তবায়নে সাফল্যের পরিচয় দিয়েছে, একইভাবে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ ও তা বাস্তবায়ন করে চলছে।
এমডিজির লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও কর্মপরিকল্পনা নিয়ে সম্মেলনে তথ্যবহুল আলোচনা হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদী শোষণ-শাসন বাংলাদেশকে একটি ঋণনির্ভর ও আমদানিনির্ভর ভঙ্গুর রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশসহ সব ক্ষেত্রে ভঙ্গুর এই রাষ্ট্রটি এবার পুনর্গঠনের পালা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বর্তমান সরকার পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত অর্থনৈতিক কাঠামো বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নিয়েছে। এই কাঠামো দেশের জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনাকে জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সমন্বিত করেছে।
বর্তমান সরকারের গৃহীত ‘সংস্কার ও উন্নয়নের পাঁচ স্তম্ভের’ মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন, সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, জেন্ডার সমতা ও জলবায়ু সহনশীলতা এবং সুশাসন- এসডিজির এসব মূল অগ্রাধিকারই প্রতিফলিত হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ এবং এসডিজি বাস্তবায়নে অর্জিত অগ্রগতি সুসংহত করতে বর্তমান সরকার ‘পুনরুদ্ধার-পুনর্বাসন-পুনর্গঠন’- এই তিন স্তরের কৌশল গ্রহণ করেছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, এর মাধ্যমে সাময়িক স্থিতিশীলতা থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত রূপান্তর- সবকিছুই একটি সুসংহত পথনকশায় বাস্তবায়ন করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের রায়ে বর্তমান সরকার গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠনের পরদিন থেকেই নারীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষকের স্বার্থ রক্ষায় কৃষক কার্ড এবং জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবা সহজ করতে ই-হেলথ কার্ডের মতো একাধিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এর মাধ্যমে প্রান্তিক কৃষক, স্বল্প আয়ের পরিবার ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে সরাসরি ভর্তুকি, কৃষি উপকরণ, আর্থিক সহায়তা ও স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। এর পাশাপাশি ক্রীড়া কার্ড এবং সারাদেশে ইমাম-মুয়াজ্জিন ও বিভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় গুরুদেরও সম্মানি ভাতার আওতায় আনা হয়েছে ।
তিনি বলেন, কোনো না কোনো উপায়ে দেশের প্রতিটি শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে সরকারের সহায়তা নেটওয়ার্ক বিস্তৃত হচ্ছে। এভাবে চলতি মেয়াদের মধ্যেই পর্যায়ক্রমে সম্ভাব্য প্রতিটি নাগরিককে সামাজিক সুরক্ষা বলয় ও আর্থিক সহায়তা কাঠামোর আওতায় আনার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সুচিন্তিত পথনকশা সরকারের রয়েছে।
‘এসডিজি ভিলেজ’ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার মিতিঙ্গাছড়ি, খুলনার দাকোপ উপজেলার পানখালী এবং দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার নাফানগর- এই তিন গ্রামকে এসডিজি স্থানীয়করণের একটি পরীক্ষামূলক মডেল হিসেবে প্রাথমিকভাবে বেছে নেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, এসব গ্রামে ফ্যামিলি কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড, কৃষক কার্ড, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের ঋণ, স্কুলের পোশাক, মাদরাসাভিত্তিক শিক্ষা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, গ্রাম পর্যটন, নীল অর্থনীতিভিত্তিক কর্মসংস্থান, এক গ্রাম-এক পণ্য, বৃক্ষরোপণ, খাল খনন ও পরিবেশবান্ধব পর্যটনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি একযোগে পরীক্ষামূলকভাবে বাস্তবায়ন করা হবে এবং এর প্রভাব পর্যবেক্ষণ করা হবে।
এই উদ্যোগের সাফল্যের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে দেশের অন্যান্য গ্রামেও এই মডেল সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
এসডিজি ভিলেজ বর্তমান সরকারের নির্বাচনি অঙ্গীকারকে একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত উন্নয়ন মডেল হিসেবে বিশ্বের সামনে তুলে ধরার একটি দৃষ্টান্তমূলক প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠবে বলে আশা প্রকাশ করেন তারেক রহমান।
সরকারপ্রধান বলেন, কোনো একক মন্ত্রণালয় বা বিভাগের মাধ্যমে এসডিজি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এর সফল বাস্তবায়নের জন্য সরকার, বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সহযোগী, এনজিও, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম এবং প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিত সহযোগিতা প্রয়োজন।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, তিনদিনের এই সম্মেলনে প্রতিটি সমন্বয়কারী মন্ত্রণালয় ও বিভাগ তাদের অভীষ্টভিত্তিক অগ্রগতি, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে আলোচনা করে বাস্তবসম্মত ও সময়োপযোগী কর্মপরিকল্পনা ও পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
আগামীদিনের কর্মপরিকল্পনায় কয়েকটি মৌলিক বিষয়ে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যেখানে থাকবে অবাধ নির্বাচন, আইনের শাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি। একটি মানবিক রাষ্ট্র যেখানে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নাগরিক অধিকার হবে সর্বজনীন এবং একটি কল্যাণ রাষ্ট্র, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের অর্থনৈতিক সুযোগ ও আন্তঃপ্রজন্ম ন্যায্যতা নিশ্চিত থাকবে।
আগামী দিনের কর্মপরিকল্পনায় সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, আমাদের লক্ষ্য একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যেখানে অবাধ নির্বাচন ও আইনের শাসন থাকবে; একটি মানবিক রাষ্ট্র, যেখানে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নাগরিক অধিকার হবে সর্বজনীন; এবং একটি কল্যাণ রাষ্ট্র, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের অর্থনৈতিক সুযোগ ও আন্তঃপ্রজন্ম ন্যায্যতা নিশ্চিত থাকবে।এসডিজি বাস্তবায়ন কোনো একক মন্ত্রণালয়ের পক্ষে সম্ভব নয় উল্লেখ করে এর সফল বাস্তবায়নের জন্য সরকার, বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সহযোগী, এনজিও, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম এবং প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিত সহযোগিতা কামনা করেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি-বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক ও গভর্নেন্স ইনোভেশন ইউনিট এবং বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগকে এমন একটি জনগুরুত্বপূর্ণ সম্মেলন আয়োজনের জন্য ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী।
২০৩০ সাল নাগাদ টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনের লক্ষ্যে সবাইকে দৃঢ় সংকল্প নিয়ে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি জাতীয় সম্মেলনের সাফল্য কামনা করেন। এরপর ‘এসডিজি ভিলেজ’ কার্যক্রমের উদ্বোধন ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস. এম. শাকিল আখতার এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা (মন্ত্রী পদমর্যাদা) অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।