নিজস্ব প্রতিবেদক :
বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
শুক্রবার (২৪ জুলাই) বিকেল সাড়ে ৫টায় সংসদ ভবনের শপথ কক্ষে এক ব্রিফিংয়ে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র গ্রহণের এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
স্পিকার বলেন, সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব না নেওয়া পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে আমি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েছি।
তিনি বলেন, মাননীয় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন আজ বিকেল ৫টা ১ মিনিটে আমার কাছে পদত্যাগপত্র হস্তান্তর করেছেন। জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে আমি সেই পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছি।
সাহাবুদ্দিন কেন পদত্যাগ করেছেন তার কারণ তুলে ধরতে গিয়ে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, তিনি লিখিতভাবে জানিয়েছেন যে, তিনি গুরুতর অসুস্থ; হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কিডনি জটিলতায় তিনি ভুগছেন। তার হৃদযন্ত্রের বাইপাস সার্জারি হয়েছে, ইদানীং স্বাস্থ্য পরীক্ষায় অটোনোমিক নিউরোপ্যাথি নামক রোগ শনাক্ত হয়েছে। এই রোগের কারণে তিনি মাঝে মাঝে অচেতন হয়ে পড়েন। এসব রোগের প্রাদুর্ভাবে এবং শারীরিক ও মানসিক অসমর্থতার কারণে রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদের দায়িত্ব পালন করা তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। তার দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন।
হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, তিনি স্বাস্থ্যগত কারণে পদত্যাগ করেছেন এবং বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে এই পদত্যাগপত্র আমি গ্রহণ করেছি। সংবিধানে ইতোমধ্যেই আপনারা জানেন, যেদিন আমি স্পিকার হিসেবে শপথ নিয়েছি, সেদিনই ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবেও শপথ নিয়েছি যদি প্রয়োজন হয়। একইভাবে আমাদের ডেপুটি স্পিকার সাহেব, তিনিও যখন ডেপুটি স্পিকার হিসেবে শপথ নেন, শপথেরই অংশে বর্ণিত থাকে, যখন বলা হবে- কোনো কারণে যখন স্পিকারের চেয়ার শূন্য থাকবে, তখন ডেপুটি স্পিকার- স্পিকারের পদ পদের দায়িত্ব পালন করবেন। সুতরাং আজকে বাংলাদেশের নানা ধরনের কথাবার্তা আমি দুপুরে এসেই শুনছি। দেখা গেল যে এটি প্রকৃত-তিনি শারীরিক অসমর্থতার কারণে পদত্যাগ করেছেন। আমি তার মঙ্গল এবং সুস্বাস্থ্য কামনা করি। এবং আমার মনে হয়, তিনি মাফিয়া সরকারের আমলে নির্বাচিত হলেও বর্তমানে জনগণের ভোটে যে নতুন সরকার নির্বাচিত হয়েছে, তার প্রতি তিনি সমর্থন এবং শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছেন সব সময়ই। আমি তার মঙ্গল কামনা করি।
এক সাংবাদিক বলেন, রাষ্ট্রপতি যে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন, তার সাথে কি কোনো মেডিক্যালের সার্টিফিকেট বা কোনো কিছু সংযুক্ত রয়েছে? কারণ সাধারণ জনমনে একটা প্রশ্ন আছে যে এটি কি আসলে কাগজে-কলমে অসুস্থতা নাকি জেনুইন অসুস্থতা? তার অসুস্থতা আসলে কাগজে-কলমে নাকি জেনুইন?
জবাবে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ একটি গুরুতর ঘটনা। এর সাথে দেশের ভালো-মন্দও জড়িত। রাষ্ট্রপতি একজন মানুষ, তিনি অসুস্থ হতেই পারেন এবং তিনি রোগেরও নাম প্রকাশ করেছেন। লিখিতভাবে জানিয়েছেন তিনি কী কী রোগে ভুগছেন এবং মাঝে মাঝে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। এর জন্য ডাক্তারের সার্টিফিকেটের কোনো প্রয়োজন নাই, যিনি যেখানে নিজেই এটি দাবি করেছেন। সুতরাং আমরা আশা করি এই পদত্যাগের ফলে সকল ধোঁয়াশা পরিষ্কার হলো। কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা কোনো ধরনের বিরূপ মনোভাব কিংবা কনফিউশন যাতে এসব ব্যাপারে না ঘটে।
ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, এর আগেও রাষ্ট্রপতিরা পদত্যাগ করেছেন বিভিন্ন কারণে। রাষ্ট্রপতি দেশের একজন সম্মানিত মাননীয় রাষ্ট্রপতি। তিনি পদত্যাগ করতেই পারেন এবং এই চেয়ারটা কখনো শূন্য থাকে না। এবং আমি জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে এই পদ পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছি, এটিই হলো বাস্তবতা। আশা করি সকল ধরনের কনফিউশন এখন থেকে দূর হয়ে যাবে।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে চলমান গুঞ্জনের প্রসঙ্গ টেনে স্পিকার বলেন, আজ দুপুর থেকেই এ বিষয়ে নানা ধরনের আলোচনা শুনছি। তবে প্রকৃত সত্য হলো, তিনি সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যগত কারণেই পদত্যাগ করেছেন। আমি তার দ্রুত সুস্থতা ও মঙ্গল কামনা করি।
সাবেক সরকারের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, আমার মনে হয়, তিনি আগের সরকারের আমলে নির্বাচিত হলেও জনগণের ভোটে নির্বাচিত বর্তমান সরকারের প্রতি সবসময়ই সমর্থন ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল এবং চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে বিকেল ৪টার দিকে মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগপত্র নিয়ে জাতীয় সংসদে যান বঙ্গভবনে কয়েকজন কর্মকর্তা। তারা স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগপত্র পৌঁছে দেন।
সংবাদ সম্মেলনে স্পিকার সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগপত্রের বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি জানান, রাষ্ট্রপতি কয়েকটি গুরুতর অসুস্থতায় ভুগছেন। তিনি মাঝে মাঝে অচেতন হয়ে পড়েন। এই অবস্থায় তার পক্ষে রাষ্ট্রপ্রধানের মতো মহান দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়।
এ সময় স্পিকার আশা প্রকাশ করেন, মো. সাহাবুদ্দিন ফ্যাসিবাদী আমলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেও তিনি বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের প্রতি আনুগত্যশীল থাকবেন। বিদায়ী রাষ্ট্রপতির সুস্থতাও কামনা করেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি।
২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু। মেয়াদের আরও প্রায় এক বছর নয় মাস বাকি থাকতেই তিনি পদত্যাগ করলেন। আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠভাজন হিসেবে পরিচিত সাবেক জেলা ও দায়রা জজ সাহাবুদ্দিন চুপ্পু ২০১১ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত সময়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটলে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে অপসারণের দাবি জানায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল। তাকে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তখন বঙ্গভবন ঘেরাও কর্মসূচিও পালিত হয়। তবে বিএনপি বরাবরই রাষ্ট্রপতিকে সরানোর পক্ষে ছিল না। ফলে শেষ পর্যন্ত টিকে যান মো. সাহাবুদ্দিন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















