স্পোর্টস ডেস্ক :
পুরো টুর্নামেন্টে যে দাপটের সঙ্গে খেলে সেমিফাইনালে উঠে এসেছিল ফ্রান্স, ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে তাদেরকে তেমনটা দেখা গেলো না। পুরো টুর্নামেন্টের তুলনায় পুরোপুরি নিষ্প্রভ। কিলিয়ান এমবাপেকে ঠিক তার মত দেখা গেলো না।
উল্টো সেমিফাইনালে দাপট দেখালো স্পেন। শুরু থেকেই ছন্দে ছিল তারা। আর সেই ছন্দ শেষ পর্যন্ত ভাঙতে পারেনি ফ্রান্স। কিলিয়ান এমবাপেদের আক্রমণভাগ ছিল নিষ্প্রভ, অন্যদিকে লামিনে ইয়ামাল, দানি ওলমো ও পেদ্রো পোরোদের গতিময় ফুটবলে ডালাস স্টেডিয়ামে স্পেন ২-০ গোলে ফ্রান্সকে হারিয়ে ১৬ বছর পর ফাইনালে উঠল। ২০১০ সালের পর প্রথমবার শিরোপা নির্ধারণী মঞ্চে তারা।
ইউরোপিয়ান দুই দলের হাই-ভোল্টেজ ম্যাচ শুরু থেকেই জমে ওঠেছে। দুই দলই চেষ্টা করছে একে অপরের ওপর চাপ প্রয়োগ করে সুযোগ তৈরির। নবম মিনিটে ওলমো ফ্রান্সের বক্সের সামনে ফ্রি কিক আদায় করেন। বায়েনা কিক নেন। কিন্তু রক্ষণদেয়ালে আঘাত করে বল। ফ্রান্স দারুণ সুযোগ পেয়েছিল ১৪ মিনিটে। কাউন্টার অ্যাটাক থেকে এমবাপে দ্রুত বল নিয়ে বক্সে ঢুকেছিলেন। তার সামনে কেবল পোরো ও গোলকিপার ছিলেন। কুবারসি ও লাপোর্তে তাদের পজিশনে থেকে এমবাপেকে রুখে দেন।
হাইড্রেশন ব্রেকের আগে এগিয়ে যায় স্পেন। লামিন ইয়ামালকে ফাউল করলেন দিনিয়ে। ডিবক্সের মধ্যে স্পেন তারকাকে ফেলে দিয়ে পেনাল্টি পায় লা রোজারা। তারপর মিকেল ওয়ারসাবালের কিকে এগিয়ে গেল তারা। ফ্রান্স ২৩তম মিনিটে পিছিয়ে পড়ে।
২০ মিনিটে স্পেন পেনাল্টি পায়। কুকুরেয়ার বক্সের মধ্যে বাড়ানো ক্রস দিনিয়ে বুক দিয়ে নিয়ন্ত্রণে নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এই লেফটব্যাক ব্যর্থ হন। তার সামনে ছিল ইয়ামাল। তাকে ফাউল করে বসেন। রেফারি দ্রুত পেনাল্টির বাঁশি বাজান। বিশ্বকাপ ইতিহাসে তৃতীয় সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে পেনাল্টি আদায় করলেন ১৯ বছর ও ১ দিনের ইয়ামাল।
ওয়ারসাবাল নেন পেনাল্টি কিক। রিয়াল সোসিয়েদাদ তারকার শট ডানকোণা দিয়ে নেন। ফরাসি কিপার মাগনিয়ঁ ঠিক দিকেই ডাইভ দিয়েছিলেন। কিন্তু বল তার নাগালে ছিল না। জালে জড়ায় বল।
৩৬ মিনিটে ফ্রান্সকে আরেকবার কাঁপিয়ে দেয় স্পেন। দূরপাল্লার একটি ক্রস নিয়ন্ত্রণে নেন বায়েনা। মাইগনান তাকে রুখে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু স্প্যানিশ ফরোয়ার্ড শট নিতেই অফসাইডের বাঁশি বাজে। পরের মিনিটে স্পেনের বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া বারকোলার ডানপায়ের বাঁকানো শট গোলবারের অনেক উপর দিয়ে যায়।
তিন মিনিট পর স্পেন আরেকটি সুযোগ তৈরি করে। ওলমোর সঙ্গে ওয়ান-টু পাস করেন ইয়ামাল। তারপর ওলমোর ব্যাকহিল থেকে ইয়ামালের পাসে বল পান রুইজ। কিন্তু তার শট গোলবার ঘেঁষে যায়।
৪৩ মিনিটে ফ্রান্স চমৎকার সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু এমবাপেকে বল পায়েই নিতে দেননি সিমন। স্প্যানিশ কিপার দ্রুত বক্সের বাইরে এসে বল ক্লিয়ার করেন। গোল হজম করে সমতায় ফিরতে মরিয়া হয়েই লড়েন এমবাপেরা। বেশ কয়েকবার সুযোগ তৈরি করলেও সেসব ঠিকঠাক কাজে লাগাতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত এক গোলে পিছিয়ে থেকেই বিরতিতে যায় দিদিয়ের দেশমের দল।
বিরতি থেকে ফিরেও স্পেনের আক্রমণের ধার কমেনি। ফরাসিদের ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ না দিয়ে ৫৮ মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন পেদ্রো পোরো। দারুণ এক ফিনিশিংয়ে স্কোরলাইন ২-০ করেন এই স্প্যানিশ তারকা। ঠিক তিন মিনিট পর (৬১ মিনিটে) লামিন ইয়ামালের একটি গোল অফসাইডের ফাঁদে পড়ে বাতিল না হলে ব্যবধান আরও বাড়তে পারতো।
দুই গোলে পিছিয়ে পড়ে মরিয়া হয়ে ওঠে ফ্রান্স। ৬৮ মিনিটে বক্সের প্রান্ত থেকে নেওয়া এমবাপ্পের জোরালো শট দারুণ দক্ষতায় ব্লক করেন মার্ক কুকুরেয়া। অন্যদিকে, ৮০ মিনিটে ব্যবধান ৩-০ করার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল স্পেন। ওইয়ারসাবালের বদলি হিসেবে নামার কয়েক মিনিট পরই ফেরান তোরেসের একটি হেড অল্পের জন্য গোলবারের পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়।
ম্যাচের শেষ ১০ মিনিটে স্প্যানিশ রক্ষণে রীতিমতো ঝড় তোলে ফ্রান্স। তবে গোলরক্ষক উনাই সিমন ও ডিফেন্ডার কুকুরেয়ার বীরত্বে ফরাসিদের সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়। ৮২ মিনিটে বক্সের বাইরে এসে বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে কিছুটা ভুল করে বসেছিলেন সিমন, তবে দ্রুতই পজিশনে ফিরে এসে দেজিরে দুয়ের শট বক্সের ভেতর থেকে ব্লক করে দলকে বাঁচান তিনি। পরের মিনিটেই থিও হার্নান্দেজের আরেকটি দারুণ শট রুখে দেন এই গোলরক্ষক।
৮৯ মিনিটে এমবাপ্পের একটি শট গোলবারের ওপর দিয়ে চলে গেলে ফ্রান্সের ম্যাচে ফেরার আশা কার্যত শেষ হয়ে যায়। পরের মিনিটে ফরাসি অধিনায়কের আরেকটি প্রচেষ্টা নিজেদের পেনাল্টি বক্স থেকে ক্লিয়ার করে স্পেনের জয় নিশ্চিত করেন কুকুরেয়া।
রেফারির শেষ বাঁশির সঙ্গে সঙ্গেই উল্লাসে ফেটে পড়ে স্প্যানিশ শিবির। এমবাপ্পের বিষাদের রাতে ফরাসিদের দম্ভ চূর্ণ করে ২০১০ সালের পর নিজেদের ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার আনন্দে মাতোয়ারা এখন পুরো স্পেন।
আগামী ১৯ জুলাই নিউইয়র্কের নিউজার্সিতে হবে ফাইনাল। ইংল্যান্ড অথবা আর্জেন্টিনাকে প্রতিপক্ষ হিসেবে পাবে স্পেন। অবশ্য ফ্রান্সের বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যায়নি। তারা ১৮ জুলাই তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ খেলবে দ্বিতীয় সেমিফাইনালে পরাজিত দলের সঙ্গে।