নিজস্ব প্রতিবেদক :
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউ ভেন্টিলেটরের অভাবে শিশুদের মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ১১ দিনে ৩৩ জন শিশু মারা গেছে রাজশাহী মেডিকেলে। অথচ সেখানকার পরিচালক আমাদের জানাননি যে তার কাছে ভেন্টিলেটর নেই। তাকে ফাঁসির কাষ্ঠে চড়ানো উচিত।
শনিবার (২৮ মার্চ) দুপুরে রাজধানীর আবু সাঈদ কনভেনশন সেন্টারে ‘সোসাইটি অব সার্জনস অব বাংলাদেশ’ আয়োজিত ‘সিএমই অন মেডিকেল এথিকস’ অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলার কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, আমি ফোন করার পর তিনি (পরিচালক) দাবি করেন, মিডিয়া একটু বাড়াবাড়ি করছে। কিন্তু গতকাল প্রতিবেদন পাওয়ার পর দেখা গেল, মিডিয়া যা বলেছে তা–ই সত্য। তিনি আর বিষয়টি অস্বীকার করতে পারেননি।
সরকারি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে ব্যক্তি উদ্যোগে ভেন্টিলেটর সংগ্রহের কথা জানিয়ে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘সরকার থেকে দ্রুত কিনে দেওয়া কঠিন ব্যাপার। আমি ব্যক্তিগত যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে দু-একজন ওষুধ প্রস্তুতকারকের সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের সহায়তায় আজ জরুরি ভিত্তিতে তিনটি ভেন্টিলেটর কিনে দেওয়া হচ্ছে। এটা সরকারি টাকায় নয়, বেসরকারি উদ্যোগে হচ্ছে। আজ আরও দুটি ভেন্টিলেটর ম্যানেজ করার চেষ্টা করব।’
চিকিৎসকদের পেশাগত আচরণ ও নৈতিকতা (মেডিকেল এথিকস) নিয়ে কথা বলতে গিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, রোগীরা চিকিৎসকদের ওপর ঈশ্বরের মতো ভরসা করে। তাই তাদেরকে আচরণ, কথা ও সেবায় আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।
তিনি বলেন, ‘অনেক সময় পত্রিকায় দেখি, অস্ত্রোপচারের পর রোগীর পেটের ভেতর সুতা রেখে দেওয়া হয়েছে। পরে ব্যথায় রোগী কষ্ট পান। এগুলো কেন হয়? চিকিৎসকেরা যখন অতিরিক্ত ক্লান্ত থাকেন বা খুব বেশি ব্যস্ত থাকেন, তখন কাজে মনোযোগ দিতে পারেন না। এই বিষয়গুলো চিকিৎসকদের খেয়াল রাখতে হবে।’
একই সঙ্গে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ওঠা যৌন হয়রানির অভিযোগ নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। নাম প্রকাশ না করে তিনি বলেন, ‘ঢাকা নর্থের এক জায়গায় প্র্যাকটিস করতেন এমন একজন গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট আছেন—দেখতে খুবই সুদর্শন, ব্যাকগ্রাউন্ড সেনাবাহিনীর। নারীরা গেলে তিনি রোগের কথা না শুনে নিজের ইচ্ছামতো গল্প করতেন, গান গাইতেন। এসব করা মেডিকেল এথিকসের পুরোপুরি বাইরে।’
অনুষ্ঠানে মন্ত্রী নিজের চিকিৎসা নিয়ে অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে পুলিশের হামলায় তার পায়ের লিগামেন্ট ছিঁড়ে গেলে দেশীয় অনেক চিকিৎসক তাকে অস্ত্রোপচার করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি ভারতে গিয়ে একজন বিশেষজ্ঞের পরামর্শে কেবল বিশেষ জুতা (অর্থোপেডিক শু) ব্যবহার করে ও ব্যায়ামের মাধ্যমে সুস্থ হয়ে ওঠেন।
নতুন নতুন চিকিৎসাপদ্ধতি সম্পর্কে জানতে চিকিৎসকদের নিয়মিত পড়াশোনা ও প্রশিক্ষণের ওপর তাগিদ দিয়ে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আপনাদের প্রতিনিয়ত জ্ঞান অর্জন করতে হবে। প্রবীণ চিকিৎসকদের কাছ থেকে শিখতে হবে এবং বিশ্বের নতুন চিকিৎসাপদ্ধতি সম্পর্কে জানতে মেডিকেল জার্নালগুলো পড়তে হবে।’
দেশের চিকিৎসা খাতকে এগিয়ে নিতে চিকিৎসকদের সহযোগিতা চেয়ে তিনি বলেন, সবাই সমন্বিতভাবে এগিয়ে এলে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে। অন্যথায় এত বিশাল স্বাস্থ্যখাতের তত্ত্বাবধান করা অত্যন্ত কঠিন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, আমি একটাই অনুরোধ করবো, আপনারা অত্যন্ত সম্মানিত শ্রেণি। আপনারা যদি সহযোগিতা না করেন, এই মন্ত্রণালয়ে থেকে মানুষের সেবা করা কঠিন। আপনাদের সহকর্মী তৃণমূল পর্যায়ে যারা চাকরি করছেন তাদের নিকট আজকের বার্তা পৌঁছে দেবেন। এ ব্যাপারে সবাই সমন্বিতভাবে এগিয়ে না এলে এত বিশাল খাতের চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধান করা কঠিন।
সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আমি আজকের এই প্রোগ্রামে এসেছি, শুধু একটি কথা বলতে যে, আমি জাতির সেবার জন্য আপনাদের সহযোগিতা চাই, আমার জন্য না। আমি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়টাকে সম্পূর্ণ দুষ্কৃতমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত, সন্ত্রাসমুক্ত করতে চাই। সন্ত্রাস মানে মারামারি না, কলমের সন্ত্রাস, সিদ্ধান্তের সন্ত্রাস। আমাদের ডাক্তারদের যেন আপনাদের সহযোগিতায় একটি সম্মানিত জায়গায় নিয়ে যেতে পারি। আর এটা করা মানে বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের উপকার।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী তার বক্তব্যে সম্প্রতি জলাতঙ্ক রোগের ভ্যাকসিন নিয়ে ব্যবস্থাপনা, সম্প্রতি বেড়ে যাওয়া হাম রোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতি, রাজশাহী মেডিকেলে জরুরি ভিত্তিতে এনআইসিইউ ও ভেন্টিলেশন স্থাপনসহ বিভিন্ন বিষয়ে সরকার গৃহীত ব্যবস্থা ও পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে আলোচকরা চিকিৎসা ক্ষেত্রে নৈতিকতার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
সোসাইটি অব সার্জনস অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডা. মো. মনির হোসেন খানসহ সিনিয়র ও জুনিয়র চিকিৎসকরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে সংগঠনের সদ্য প্রয়াত সভাপতি অধ্যাপক এএমএসএম শরফুজ্জামান রুবেলকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















