নিজস্ব প্রতিবেদক :
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে দেশে জ্বালানি তেলের সংকট হতে পারে বলে যে শঙ্কা দেখা দিয়েছে তা নাকচ করে দিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই। মানুষের মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে এটাও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কেটে যাবে। তাছাড়া জ্বালানি তেলের দাম আপাতত বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনাও সরকারের নেই।
মঙ্গলবার (১০ মার্চ) দুপুরে সচিবালয়ে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দেশের জ্বালানি নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ নিয়ে অতীতেও কোনো সংকট ছিল না, এখনো নেই। রমজান ও ঈদকে নির্বিঘ্ন করতে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। সাম্প্রতিক সময়ে পেট্রোল পাম্পগুলোতে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট যানবাহনের দীর্ঘ লাইন মূলত মানুষের উদ্বেগ ও আতঙ্কের কারণেই তৈরি হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, পেট্রোল পাম্পে যে লম্বা লাইন দেখা যাচ্ছে, তা মূলত মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির। এই ধরনের যানবাহনের প্রধান জ্বালানি হচ্ছে অকটেন ও পেট্রোল। অথচ এই দুই ধরনের জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই।
তিনি বলেন, পেট্রোল প্রায় পুরোটাই বাংলাদেশে পরিশোধিত হয়। অকটেনের সিংহভাগও আমরা দেশে পরিশোধন করে পাই, কিছু অংশ আমদানি করতে হয়। মূলত ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলের ক্ষেত্রে আমাদের আমদানির ওপর নির্ভরতা বেশি। জ্বালানি পাওয়া যাবে না— এমন আশঙ্কা এবং দাম বাড়তে পারে— এমন উদ্বেগ থেকেই অনেক মানুষ আগেভাগে জ্বালানি নেওয়ার চেষ্টা করছেন। ফলে পাম্পগুলোতে ভিড় তৈরি হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, এতদিনেও কোনো পেট্রোল পাম্পে জ্বালানি সংকট হয়নি। হয়তো কিছু জায়গায় অপেক্ষা করতে হয়েছে, কিন্তু সরবরাহ বন্ধ হয়নি। এখনো জ্বালানির দামও বাড়েনি। তাই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের এই উদ্বেগ কমে যাবে।
জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রতিমন্ত্রী বলেন, গতকাল প্রায় ৩০ হাজার টন জ্বালানি নিয়ে দুটি জাহাজ আসার কথা ছিল। এর মধ্যে একটি পৌঁছেছে এবং আরেকটি আউটার অ্যাঙ্করেজে রয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরের মধ্যে সেটি থেকে জ্বালানি খালাস শুরু করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া ১২ তারিখে আরও একটি জাহাজ আসার কথা রয়েছে।
দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ নিয়ে অতীতেও কোনো সংকট ছিল না, এখনো নেই। রমজান ও ঈদকে নির্বিঘ্ন করতে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।
ভারত থেকে জ্বালানি আমদানির বিষয়েও এত প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ভারতের সঙ্গে একটি পাইপলাইন চুক্তির আওতায় প্রতি মাসে গড়ে ১৫ হাজার টন জ্বালানি আসার কথা রয়েছে। এর একটি বড় অংশ এরইমধ্যে এসেছে এবং বাকি অংশ ধারাবাহিকভাবে সরবরাহ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, এই সরবরাহ চুক্তি প্রতি বছর নবায়ন হয় এবং বর্তমানে এর মেয়াদও রয়েছে। ফলে এ নিয়ে কোনো সংকট নেই।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার একটি নির্বাচিত সরকার, জনগণের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা রয়েছে। এই দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিন থেকে আমরা কাজ করার চেষ্টা করছি, যাতে করে জনদুর্ভোগ কমানো যায়, না হলে অন্তত সহনীয় মাত্রায় রাখা যায়। আমরা বারংবার একটি কথা বলেছি যে বর্তমানে বাংলাদেশে জ্বালানি কিংবা বিদ্যুতের কোনো সংকট নেই। যদিও সাম্প্রতিককালে আমরা দেখেছি পেট্রোল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন। এই প্রশ্ন আসতেই পারে তাহলে কেন দীর্ঘ লাইন? এই গণমাধ্যমের বন্ধুরা অর্থাৎ আপনারাই কিন্তু এটি স্পষ্ট করেছেন। আমাদের স্বাভাবিক যে চাহিদা, সেই চাহিদার চাইতে গত সপ্তাহের পাঁচ দিন কার্যত দু থেকে তিন গুণ জ্বালানি সরবরাহ করেও কিন্তু আমরা মানুষের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা অনেক ক্ষেত্রে কমাতে পারিনি কিংবা কমেনি।
এই অস্বাভাবিক চাহিদা কোনো যৌক্তিক কারণে ছিল না মন্তব্য করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এটি উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা থেকে, প্যানিক বায়িং থেকে কিংবা হয়তোবা আমাদের যেভাবেই বলেন, দেশপ্রেমের ঘাটতির জায়গা থেকে এটা ঘটতে পারে। আমরা এটাকে অস্বাভাবিকভাবে দেখিনি, আমরা এটি স্বাভাবিকভাবে দেখেছি এবং স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় এটি সমাধান করার চেষ্টা করেছি।
তিনি বলেন, এখানে আমরা স্বাভাবিক যে চাহিদা মানুষের সেই চাহিদাটাকে বিবেচনায় নিয়ে—কারণ আগের সপ্তাহে যখন পাঁচ দিন দু থেকে তিন গুণ জ্বালানি সরবরাহ করা হয়েছে, স্বাভাবিকভাবেই এই জ্বালানি কারো না কারো কাছে রয়ে গেছে—সেটিকে বিবেচনায় নিয়ে গত বছরের এই সময়ে স্বাভাবিক যে চাহিদা ছিল তা থেকে আমরা কিছু রেশনিক করবার চেষ্টা করেছি। এরপরেও আমরা দেখলাম যে কিছু জায়গায় সংকট বেড়েছে।
অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘আজকে আমরা নোটিশ করেছি যারা রাইড শেয়ার করেন, তাদের লম্বা লাইনে দাঁড়াতে হয় এবং সে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে তারা—আগে আমরা রেশনিং করে ২ লিটার তাদের জন্য বরাদ্দ করেছিলাম—এটি নিয়ে তাদের জন্য খুব বেশি রাইড করা সম্ভব হয় না। এই সময়ে তাদের জন্য এটি একটি সংকট। যে কারণে আমরা আজকে রাইড শেয়ার যারা করে উবার, পাঠাও—একরকম চালকদেরকে আমরা ৫ লিটার পর্যন্ত জ্বালানিতে সরবরাহের ব্যবস্থা করেছি। এটি অর্থাৎ দ্বিগুণের চাইতেও বেশি করেছি। আমি মনে করি এটা একটি স্বস্তির কারণ হবে।’
তিনি বলেন, ‘সবচাইতে বড় ব্যাপার দেখেন, পেট্রোল পাম্পের লাইনটা একটা হচ্ছে মোটরসাইকেলের, আর একটি হচ্ছে প্রাইভেট ভেহিকেলের লাইন। এই সমস্ত ট্রান্সপোর্টের মূল চাহিদা কী? অকটেন এবং পেট্রোল। অকটেন এবং পেট্রোলে তো কার্যরত কোনো সংকট নেই। আপনারা জানেন পেট্রোল কার্যত পুরোটাই আমরা বাংলাদেশেই আমরা নিজেরা উৎপাদন করি, আমরা পরিশোধন করি। অকটেনেরও সিংহভাগ আমরা কিন্তু আমাদের দেশ থেকেই পাই, কিন্তু আমরা এটি পরিশোধিত আকারে পাই। কিছু আমদানি করতে হয়।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, আমরা মূলত জ্বালানি আমদানিনির্ভর ডিজেলের জন্য, ফার্নেস অয়েলের জন্য। কিন্তু আপনি পেট্রোল পাম্পগুলোতে দেখবেন যে লম্বা লাইনটা মূলত মোটরবাইক এবং প্রাইভেট ভেহিকেলের। অর্থাৎ কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই উৎকণ্ঠা থেকে, উদ্বেগ থেকে এই সংকটটা তৈরি হয়েছে। আমরা মনে করছি উদ্বেগ এবং উৎকণ্ঠার জায়গাটা কী? জ্বালানি পাওয়া যাবে না। আর একটি আশঙ্কা কী? জ্বালানির দাম বাড়তে পারে। কিন্তু যখন একটানা এতদিন পরেও কোনো পেট্রোল পাম্পে জ্বালানি সংকট হয়নি—হয়তোবা জ্বালানি পেতে আপনাকে একটু লম্বা সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে—এবং এখনো পর্যন্ত যখন জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পায়নি, তখন আমার ধারণা এই উদ্বেগ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় কমে যাবে।
তিনি বলেন, গতকাল দুটি জাহাজ আসার কথা ছিল গড়ে ৩০ হাজার মেট্রিক টনের জ্বালানি নিয়ে। একটি এসেছে। আর একটি যেটি গতকাল এসে পৌঁছানোর কথা ছিল সেটি বর্হিনোঙ্গরে পৌঁছেছে। আজকে দুপুর নাগাদ আমরা মনে করছি আমরা এটার জ্বালানি খালাস করতে পারবো। ১২ তারিখে কিন্তু আরেকটি জাহাজ আসছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, সেহেতু আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি, আমরা অতীতেও বলেছিলাম—আপনাদের মাধ্যমে দেশবাসীকে বলছি—জালানি এবং বিদ্যুৎ নিয়ে সাম্প্রতিক অতীতেও কোনো সংকট ছিল না, এই মুহূর্তে কোনো সংকট নেই আল্লাহর রহমতে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















