নিজস্ব প্রতিবেদক :
রাজধানীতে কোনো হকার বা রিকশা নিবন্ধনের (রেজিস্ট্রেশন) বাইরে থাকতে পারবে না বলে জানিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক মো. আবদুস সালাম বলেন, সদরঘাটে বা এলিফ্যান্ট রোডে ঠিক কতজন হকার বসতে পারবেন, তার সুনির্দিষ্ট পরিধি নির্ধারণ করা হবে।
শনিবার (২৩ মে) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘নগর উন্নয়ন সাংবাদিক ফোরাম, বাংলাদেশ’ আয়োজিত ‘ঢাকায় বৃষ্টি ভোগায় কেন?’ শীর্ষক নগর সংলাপে তিনি এ কথা বলেন।
৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর ঢাকা শহরে ব্যাটারিচালিত রিকশা এবং হকারদের সংখ্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে উল্লেখ করে ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, নদীভাঙা বা কর্মহীন মানুষ ঢাকা শহরে এসেই কোনো লাইসেন্স বা ফি ছাড়াই রিকশা নিয়ে নেমে পড়ছে। এভাবে একটি আন্তর্জাতিক মানের শহর চলতে পারে না।
এ সময় তিনি হুঁশিয়ারি করে বলেন, এই শৃঙ্খলা ফেরাতে গিয়ে যদি কেউ আন্দোলনের নামে বিশৃঙ্খলা করতে চায়, তা বরদাশত করা হবে না এবং এ বিষয়ে তিনি জনগণের সমর্থন প্রত্যাশা করেন।
রাজধানীর জলাবদ্ধতা ও মশা নির্মূলে সব রাজনৈতিক দল এবং নগরবাসীকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে মো. আব্দুস সালাম বলেন, রাজধানীর বর্তমান পরিস্থিতি পরিবর্তন করে একটি মানসম্মত ও বাসযোগ্য নগরী গড়ে তুলতে রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে জাতীয় ঐক্যের চিন্তা করতে হবে। একইসঙ্গে নাগরিকদেরও সমষ্টিগত উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।
প্রশাসক আব্দুস সালাম বলেন, বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই ঢাকাকে পৃথিবীর সবচেয়ে দূষিত, আবর্জনা ও দুর্গন্ধময় শহর এবং মশার নগরী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। তবে এই অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব। জনগণ যদি ৫০ শতাংশ এবং সরকার বা সিটি করপোরেশন যদি বাকি ৫০ শতাংশ দায়িত্ব পালন করে, তাহলে শতভাগ সফলতা অর্জন অসম্ভব নয়।
এ সময় প্রশাসক অতীতের উদাহরণ টেনে বলেন, ‘১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যে দেশ এক মহাসংকট ও দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হয়েছিল। কিন্তু শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে দেশ দ্রুত সেই অবস্থা কাটিয়ে ওঠে। বর্তমানের জাতীয় সমস্যাগুলোর সঠিক নেতৃত্ব ও সমষ্টিগত ঐক্যের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব।’
প্রশাসক জানান, যথাযথ পদক্ষেপ নিলে মশা ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তাঁর দাবি, প্রায় ৯৯ শতাংশ মশার জন্ম হয় জলাবদ্ধতা থেকে। তাই জলাবদ্ধতা দূর করতে পারলে ডেঙ্গুর প্রকোপও কমানো সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে প্রথমবারের মতো প্রাক্-বর্ষা মশার লার্ভা নিধনে বিশেষ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর আওতায় ৩৬ জন মাঠকর্মী প্রতিদিন প্রতিটি ওয়ার্ডে বাড়ি বাড়ি গিয়ে জরিপ চালাচ্ছেন। মোট ২ হাজার ২৫০টি বাড়ি থেকে লার্ভার নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো আগেভাগে চিহ্নিত করা হবে।
নাগরিক অসচেতনতার উদাহরণ তুলে ধরে আব্দুস সালাম বলেন, ‘জরিপ শুরুর প্রথম দিন আমি নিজেই নগর ভবনের পাশের পশু হাসপাতালে যাই। সেখানে দুই দিন আগের বৃষ্টির পানি জমে থাকা একটি ভাঙা কৌটা ও পরিত্যক্ত পাতিলে অসংখ্য লার্ভা দেখতে পাই। লার্ভা ধ্বংস না করলে তা মশায় পরিণত হয়ে মানুষকেই আক্রান্ত করবে। অথচ ঘরের কোণে, ছাদবাগানে কিংবা ফ্রিজের জমে থাকা পানিতে মশা উৎপাদন হলেও দায় চাপানো হয় সিটি করপোরেশনের ওপর।’
রাজধানীর জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ হিসেবে অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং প্রাকৃতিক খাল-পুকুর ভরাটকে দায়ী করেন ডিএসসিসি প্রশাসক। ধোলাইখালের মতো ঐতিহ্যবাহী খালকে বক্স কালভার্টে রূপান্তরের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর বড় বড় শহরে উন্মুক্ত নদী বা প্রবাহিত খাল থাকে, যা বৃষ্টির পানি দ্রুত সরিয়ে নিতে সহায়তা করে। কিন্তু ঢাকায় কার্যকর ড্রেনেজব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। যেখানে অন্তত সাত থেকে আটটি প্রধান ড্রেনেজ চ্যানেল থাকা দরকার, সেখানে রয়েছে মাত্র দুটি বা তিনটি।’
ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, নিউমার্কেট, ধানমন্ডি কিংবা এলিফ্যান্ট রোড এলাকার পানি পাম্প করে অন্য এলাকায় সরিয়ে দেওয়া কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। এসব পানি শেষ পর্যন্ত বুড়িগঙ্গা বা শীতলক্ষ্যায় নিয়ে যেতে হবে। এ বিষয়ে সরকারপ্রধানকে অবহিত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
আব্দুস সালাম বলেন, অন্তত দুই থেকে তিন বছর সময় দিয়ে দেখতে হবে সরকার জনগণের মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধান করতে পারে কি না। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ভুলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ ও ঢাকার শৃঙ্খলা ফেরাতে সব রাজনৈতিক দলকে ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
নগর সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার এবং প্রকৌশলী-পরিকল্পনাবিদ মো. নূরুল্লাহ।
সংগঠনের সভাপতি মতিন আব্দুল্লাহর সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক হাসান ইমনের সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য দেন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সভাপতি ড. আলী আফজাল, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সহসভাপতি শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান, ঢাকা ওয়াসার সাবেক এমডি একেএম শহিদ উদ্দিন, বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) চেয়ারম্যান আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার এবং স্থপতি খালিদ মাহমুদ শাহীন প্রমুখ।
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















