নিজস্ব প্রতিবেদক :
মূলধারার অর্থনীতির বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের আওতায় আনতে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, শুধু রাজনৈতিক গণতন্ত্র নয়, অর্থনীতিতেও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা জরুরি।
রোববার (১০ মে) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অনানুষ্ঠানিক খাতের উন্নয়নে পিকেএসএফ ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ প্রকল্প ‘রেইজ’-এর ২য় পর্যায়ের কার্যক্রম উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, যারা মূলধারার অর্থনীতির বাইরে আছে, তাদেরকে অর্থনীতির মূলধারায় নিয়ে আসতে চাই। নাগরিক হিসেবে এটি সবার অধিকার। শুধু রাজনীতিতে গণতন্ত্র থাকলেই হবে না, অর্থনীতিতেও গণতন্ত্র থাকতে হবে। সে জন্য সরকার অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
তিনি বলেন, যেকোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মানদণ্ড রয়েছে। সেই মানদণ্ড পূরণ না করলে সরকার কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে না। পিকেএসএফ অনেক ভালো কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণে কী কী প্রয়োজন, তা সরকার বিবেচনা করছে।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, পিকেএসএফ বর্তমানে যে দক্ষতা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করছে তা অত্যন্ত ইতিবাচক এবং তাদের এই ভূমিকা সরকারের বর্তমান অর্থনৈতিক দর্শনের সঙ্গে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ। বর্তমান সরকার এখন মেগা প্রকল্পের বদলে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কতগুলো কঠোর মানদণ্ড বা বেঞ্চমার্ক নির্ধারণ করেছে। বিগত দিনের দুর্নীতি ও অপচয়ের পরিপ্রেক্ষিতে এখন থেকে যে কোনো প্রকল্প হাতে নেওয়ার আগে তার ভ্যালু, রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট, কর্মসংস্থান সৃষ্টির সক্ষমতা এবং পরিবেশগত প্রভাবকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
মন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, সরকারি টাকা মানেই জনগণের ট্যাক্সের টাকা, তাই প্রতিটি প্রকল্পের পেছনে সুনির্দিষ্ট চিন্তাভাবনা, আউটপুট এবং জনগণের কাছে দায়বদ্ধতা থাকতে হবে। বর্তমানে পরিকল্পনা কমিশনে থাকা প্রায় ১৩০০ প্রকল্পের অনেকগুলোতেই কোনো রিটার্ন বা কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই এবং পরিবেশগত দিক বিবেচনা করা হয়নি বলে সেগুলো সরকার বাতিল করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, সরকারের মূল স্লোগান হলো অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ বা ডেমোক্রেটাইজেশন অব ইকোনমি। শুধু রাজনীতিতে গণতন্ত্র থাকলে চলবে না, অর্থনীতিতেও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ও অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
ডেমোক্রেটাইজেশন অব ইকোনমির তিনটি প্রধান স্তম্ভের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রথমত, বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিকের অর্থনীতিতে অংশগ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, অর্থনীতির সুফল বা বেনিফিট সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং তৃতীয়ত যারা সবসময় অর্থনৈতিক পরিকল্পনার বাইরে ছিল তাদের মূলধারায় সম্পৃক্ত করা। যদিও বাংলাদেশে এই কাজ করা অত্যন্ত কঠিন, তবুও সরকার সাহসের সঙ্গে এই পথেই এগোচ্ছে। সরকার এখন মেগা প্রকল্পের বদলে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। যাতে বিশেষ গোষ্ঠীর বদলে সাধারণ মানুষ উপকৃত হয় বলে জানান তিনি।
সামাজিক ক্ষমতায়নের উদাহরণ দিতে গিয়ে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ফ্যামিলি কার্ডের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, পরিবারের নারীরা সারাদিন কাজ করলেও তাদের যথাযথ স্বীকৃতি থাকে না। সরকার এখন ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে সরাসরি মহিলাদের হাতে টাকা পৌঁছে দিচ্ছে, যাতে পরিবার ও সমাজে তাদের ক্ষমতায়ন ঘটে। মহিলারা সাশ্রয়ী এবং তারা জানেন কীভাবে সংসার চালাতে হয়। এই নগদ অর্থ লোকাল ইকোনমিতে ডিমান্ড তৈরি করবে এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করবে। একইভাবে কৃষকদের জন্য সরাসরি কার্ডের মাধ্যমে সহায়তার ব্যবস্থা করা হচ্ছে যাতে তারা বীজের মতো মৌলিক চাহিদাগুলো অনায়াসেই মেটাতে পারেন।
জনস্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবায় ব্যক্তিগত ব্যয় (আউট অফ পকেট এক্সপেন্ডিচার) আফগানিস্তানের চেয়েও বেশি, যা অত্যন্ত লজ্জাজনক। এই পরিস্থিতি বদলে সরকার ইউনিভার্সাল হেলথকেয়ার এবং প্রাইমারি হেলথকেয়ারের ওপর জোর দিচ্ছে, যার প্রতিফলন আগামী বাজেটে দেখা যাবে।
দেশের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগাতে ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ বা সৃজনশীল অর্থনীতির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, কামার, কুমার, তাঁতি বা হস্তশিল্পের সঙ্গে যারা যুক্ত, তারা বছরের পর বছর কাজ করলেও তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হচ্ছে না। সরকার এখন এই সৃজনশীল খাতের উদ্যোক্তাদের স্কিল ডেভেলপমেন্ট, ডিজাইনিং সাপোর্ট এবং ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে আমাজন বা আলিবাবার মতো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে যেতে চায়।
তিনি বরিশালের শীতল পাটির উদাহরণ দিয়ে বলেন, একটি নির্দিষ্ট ডিজাইনের কারণে একটি পণ্যের দাম কয়েকগুণ বেড়ে যেতে পারে। থাইল্যান্ডের ‘ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রোডাক্ট’ ধারণার মতো বাংলাদেশেও গ্রামভিত্তিক পণ্য উৎপাদন এবং কালেকশন সেন্টারের মাধ্যমে তা সরাসরি বিশ্ববাজারে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পিকেএসএফ এই উদ্যোগগুলোতে সরকারের বড় সহযোগী হতে পারে।
মন্ত্রী সংস্কৃতি ও ক্রীড়া খাতকেও জিডিপিতে কন্ট্রিবিউট করার মতো শক্তিশালী শিল্প হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলেন। তিনি বলেন, থিয়েটার বা স্টেডিয়ামে মানুষ যখন টিকিট কেটে খেলা দেখতে যায়, তখন সেটিও জিডিপির অংশ। ইউকে-র থিয়েটার ডিস্ট্রিক্টের মতো আমাদের দেশেও লাইটম্যান, মেকাপ ম্যান এবং ডিজাইনারদের সমন্বয়ে একটি বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে তোলা সম্ভব।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া অর্থনৈতিক বোঝা বয়ে নিয়েও বর্তমান সরকার দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে উল্লেখ করে আমির খসরু বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়নের স্বপ্ন বাস্তবায়ন কোনো একটি দলের নয় বরং সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার বিষয়। পিকেএসএফের কার্যক্রম সরকারের দর্শনের সাথে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ হওয়ায় এই প্রতিষ্ঠানকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়ার আশ্বাস দেন মন্ত্রী।
কৃষকদের জন্য ‘ফার্মার্স কার্ড’ কর্মসূচির কথাও তিনি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সব কৃষকের ব্যাংকঋণে প্রবেশাধিকার নেই। তাই সরাসরি কৃষকের হাতে সহায়তা পৌঁছে দিতে আমরা ফার্মার্স কার্ড চালুর উদ্যোগ নিয়েছি। এর মাধ্যমে তারা অন্তত সার ও বীজ কেনার মতো মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে পারবেন।
স্বাস্থ্য খাত নিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশে মানুষের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ব্যয় অত্যন্ত বেশি। অনেক ক্ষেত্রেই মানুষকে নিজের পকেট থেকেই চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে হয়। তাই আমরা প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবাকে সর্বজনীন করার উদ্যোগ নিয়েছি। আগামী বাজেটে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক খাতে বরাদ্দ আরো বাড়ানো হবে। কারণ এই খাতগুলোতে বিনিয়োগ ছাড়া দেশের জনশক্তিকে কার্যকর সম্পদে পরিণত করা সম্ভব নয়।
সৃজনশীল অর্থনীতি নিয়ে সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে আমির খসরু বলেন, দেশের কামার, কুমার, তাঁতি ও কুটির শিল্পের সঙ্গে জড়িত মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম কাজ করলেও তাদের জীবনমানের তেমন পরিবর্তন হয়নি। অথচ বিশ্ববাজারে এসব পণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। সরকার এসব খাতের মানুষের জন্য অর্থায়ন, দক্ষতা উন্নয়ন, ডিজাইন সাপোর্ট, ব্র্যান্ডিং ও বাজারজাতকরণে সহায়তা দিতে চায়। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের পণ্যের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
‘ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রোডাক্ট’ ধারণার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, একটি গ্রাম একটি নির্দিষ্ট পণ্য উৎপাদনে বিশেষায়িত হবে। সরকার তাদের ঋণ, প্রশিক্ষণ, ডিজাইন ও বিপণন সহায়তা দেবে। এতে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে।
বরিশালের শীতলপাটির উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, যথাযথ ডিজাইন ও ব্র্যান্ডিং সাপোর্ট পেলে স্থানীয় পণ্যের মূল্য কয়েকগুণ বাড়ানো সম্ভব। জিডিপি শুধু শিল্পকারখানার মাধ্যমে হয় না। খেলাধুলা, সংস্কৃতি, থিয়েটার ও সৃজনশীল শিল্পও অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখতে পারে। বিশ্বের অনেক দেশে থিয়েটার, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বিশাল অর্থনৈতিক খাত হিসেবে গড়ে উঠেছে।
পিকেএসএফ’র ভূমিকাকে গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে আমির খসরু বলেন, সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে প্রকল্প বাস্তবায়ন। এজন্য এনজিও ও বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের উন্নয়ন কোনো একক রাজনৈতিক দলের বিষয় নয়। এটি পুরো জাতির বিষয়। তাই দেশের অর্থনীতিকে অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
পিকেএসএফ চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ খানের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক। সম্মাননীয় অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্বব্যাংকের অ্যাক্টিং ডিভিশনাল ডিরেক্টর (বাংলাদেশ ও ভুটান) ড. গেইল এইচ. মার্টিন। স্বাগত বক্তব্য দেন পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদের।
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















