রাজস্ব খাতের দুর্বলতা আমাদের অর্থনীতির গভীর সমস্যাগুলোর একটি : অর্থমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

রাজস্ব খাতের দুর্বলতা আমাদের অর্থনীতির গভীর সমস্যাগুলোর একটি বলে উল্লেখ করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেল তিনটায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতা উপস্থাপনকালে তিনি এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের এটি প্রথম বাজেট। একই সঙ্গে অর্থমন্ত্রী হিসেবে আমির খসরুরও প্রথম বাজেট।

বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, রাজস্ব খাতের দুর্বলতা আমাদের অর্থনীতির গভীর সমস্যাগুলোর একটি। বহু বছর ধরেই কর-জিডিপি অনুপাত নিম্নপর্যায়ে রয়ে গেছে; এখনও তা ৮ শতাংশের নিচে অবস্থান করছে, যা সমপর্যায়ের অনেক দেশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এর অর্থ হলো, সরকারের আয় বাড়ানোর সক্ষমতা যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। উন্নয়ন ও জনকল্যাণে ব্যয়ের চাহিদা যত বেড়েছে, রাজস্ব আহরণ ততটা বাড়েনি; ফলে ঘাটতি অর্থায়নের ওপর চাপ বেড়েছে।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে মোট রাজস্ব আহরণ হয়েছে ৩ লাখ ৮২ হাজার ৮৯৬ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ বেশি। উক্ত সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে আদায় হয়েছে ৩ লাখ ২৯ হাজার ৭৭২ কোটি টাকা। এই অগ্রগতি লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক কম, যা সরকারের আর্থিক ভারসাম্যকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।

তিনি বলেন, শুধু সম্পদ আহরণেই নয়, বাজেট বাস্তবায়নেও সক্ষমতার ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট বাজেটের আকার ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা থাকলেও আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা নির্ধারণ করা হয় ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। তারপরও বাস্তবায়ন সীমাবদ্ধতার কারণে বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে গিয়ে বাজেটকে সংশোধন ও সমন্বয় করতে হয়েছে, যা প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানকে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নিতে সহায়ক নয়।

চলতি অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে মোট ব্যয় হয়েছে সংশোধিত বাজেট বরাদ্দের প্রায় ৬০ শতাংশ; এক্ষেত্রে উন্নয়ন ব্যয়ের বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৪০ দশমিক ৭ শতাংশ। এ অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, কেবল উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করাই যথেষ্ট নয়; রাজস্ব আহরণ, ব্যয় পরিকল্পনা এবং বাজেট বাস্তবায়নের মধ্যে বাস্তবসম্মত ভারসাম্য নিশ্চিত করাও জরুরি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নতুন করে গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছে বলে মন্তব্য করে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিএনপি বরাবরই জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ জাতীয় নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করেছে।

তিনি বলেন, ২০১৬ সালের ভিশন-২০৩০, ২০২২ সালের রাষ্ট্র মেরামতের ২৭ দফা এবং ২০২৩ সালের যুগপৎ আন্দোলনের ৩১ দফার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনই ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের ভিত্তি তৈরি করে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে জুলাই জাতীয় সনদের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের ঘোষণা ইতোমধ্যে দেওয়া হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে দুর্নীতি, লুটপাট ও অর্থপাচারের মাধ্যমে অর্থনীতির ভিত্তি দুর্বল করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর করে দেওয়া হয়েছে এবং তথাকথিত উন্নয়নের আড়ালে অর্থনৈতিক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে দেশকে পুনরুদ্ধার করে সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব বর্তমান সরকার গ্রহণ করেছে।

আমির খসরু বলেন, জাতীয় বাজেটকে কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব হিসেবে নয়, বরং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা ও দেশের সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার একটি রোডম্যাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য হলো সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য নিরাপদ, সমৃদ্ধ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা।

অর্থমন্ত্রী বলেন, নতুন সরকার এমন সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে যখন বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক মেরুকরণ নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এসব বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে এবারের বাজেটে স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং ন্যায্যতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

আশাবাদ ব্যক্ত করে আমির খসরু বলেন, সরকারের পরিকল্পনা ও কৌশল বাস্তবায়িত হলে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হবে। একই সঙ্গে জনমিতিক লভ্যাংশ, দীর্ঘায়ু লভ্যাংশ এবং গণতান্ত্রিক লভ্যাংশ অর্জনের সুযোগও তৈরি হবে।

আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফিরিয়ে আনার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন।

বাজেটে সরকার ১০টি প্রধান অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছে। এগুলো হলো— সবার জন্য উন্নয়ন, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানভিত্তিক অর্থনীতি, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিকাশ, পরিবেশ ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

এছাড়া সৃজনশীল অর্থনীতি, ক্রীড়া অর্থনীতি, সবুজ অর্থনীতি এবং সুনীল অর্থনীতিকে জাতীয় অর্থনীতির মূলধারায় আনার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী।

আমির খসরু বলেন, বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে ‘ভ্যালু ফর মানি’, বিনিয়োগের বিপরীতে সুফল, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পরিবেশগত ভারসাম্য—এই চারটি নীতিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী জানান, সরকার ইতোমধ্যে সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর একচ্ছত্র আধিপত্য ভেঙে একটি প্রতিযোগিতামূলক, উৎপাদনশীল, ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। প্রস্তাবিত বাজেট সেই উদ্যোগেরই প্রতিফলন।

আশা প্রকাশ করে আমির খসরু বলেন, এই বাজেট উন্নয়নকে বৈষম্যহীন, কর্মসংস্থানকে নিরাপদ, রাষ্ট্রকে আরও জবাবদিহিমূলক এবং নাগরিক অংশগ্রহণকে আরও শক্তিশালী করতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

এর আগে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সংসদ ভবনে মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রস্তাবিত বাজেট অনুমোদন দেওয়া হয়। জাতীয় সংসদ ভবনের মন্ত্রিসভা কক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বিশেষ বৈঠকে বাজেট অনুমোদন দেওয়া হয়।

জানা গেছে, আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের আকার হতে পারে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। বাজেটে ঘাটতি থাকতে পারে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হতে পারে সাড়ে ৬ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হতে পারে সাড়ে ৭ শতাংশ।

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে ব্যাপক কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে সরকার। আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, ২০ হাজার কিলোমিটার নদী-খাল ও জলাধার খনন ও পুনঃখনন, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যাসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব মোকাবিলায় সরকার দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।

তিনি জানান, আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ করা হবে। এর মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় সাড়ে তিন লাখ সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ২৫ হাজার ৯শ ৬০ হেক্টর ব্লক বাগানে চার কোটি ২৮ লাখ ৯৭ হাজার চারা, তিন হাজার সাতশ ২৭ কিলোমিটার স্ট্রিপ বাগানে ৩৭ লাখ ২৭ হাজার চারা এবং চার হাজার হেক্টর ম্যানগ্রোভ বাগানে এক কোটি ৭৭ লাখ ৭৬ হাজার চারা রোপণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বসতবাড়ি বনায়নের আওতায় ৫৬ লাখ চারা রোপণ করা হবে।

এ ছাড়া ‘ওয়ান চাইল্ড, ওয়ান ট্রি’ কর্মসূচির আওতায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে নিজ বাড়ি বা আঙিনায় এক কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বনের ৫০ শতাংশকে কার্বন ট্রেডিং কার্যক্রমের আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ‘সার্কুলার ফিউচার মডেল’ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

পরিবেশ দূষণ রোধে আগামী অর্থবছরে ১৫টি সিএএমএস এবং ১৬টি সি-সিএএমএসের মাধ্যমে নিয়মিত বায়ুর মান পর্যবেক্ষণ করা হবে। যানবাহনের দূষণ নিয়ন্ত্রণে বিআরটিএর মাধ্যমে ১০টি আধুনিক ভেহিকেল ইন্সপেকশন সেন্টার স্থাপন করা হবে। পাশাপাশি ইলেকট্রিক বাস সার্ভিস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য নতুন গাইডলাইন ও হালনাগাদ বিধিমালা প্রণয়ন করা হবে। এছাড়া, ‘রিডিউস, রিইউজ, রিসাইকেল (৩আর)’ নীতির আওতায় আগামী পাঁচ বছরে প্লাস্টিক বর্জ্য ৩০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরে একশ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।

পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনার বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, সেচ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীভাঙন রোধ, ভূমি পুনরুদ্ধার, জলাবদ্ধতা নিরসন, নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও লবণাক্ততা প্রতিরোধে সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।

তিনি জানান, আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী-খাল ও জলাধার খনন এবং পুনঃখনন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। এর মধ্যে ইতোমধ্যে ছয় হাজার ৫শ ৯৮ কিলোমিটার খাল খননের কাজ চলমান রয়েছে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরে তিনশ ৯ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ, পুনর্র্নিমাণ ও মেরামত এবং ফ্লাড ওয়াল নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি চারশ ৮৪ কিলোমিটার নদ-নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি এবং ডুবোচর অপসারণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

নদী পুনরুদ্ধার কর্মসূচির আওতায় প্রতিটি বিভাগে অন্তত একটি নদী বা জলাশয় দখলমুক্ত ও পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনার কথাও জানান অর্থমন্ত্রী। ধলেশ্বরী, লৌহজং, আলাইকুড়ি, মগড়া, সালতা, সুতাং, বাঁকখালী ও বারনই নদী পুনরুদ্ধার এবং পানি প্রবাহ নিশ্চিত করার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

এ ছাড়া হাওর-বাঁওড় অঞ্চলের সমন্বিত উন্নয়ন এবং উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা নিরসনে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান।

বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প’ ইতোমধ্যে একনেক কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ ও পানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে আগামী সাত বছরে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে। চারটি বিভাগের ১৯টি জেলার একশ ২০টি উপজেলা এ সুবিধা পাবে।

একই সঙ্গে দেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান তিনি।

পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জন্য আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১০ হাজার পাঁচশ ৩৩ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।

বিএনপি সরকার যতবার দেশে সরকার পরিচালনা করেছে, কখনোই ব্যাংক, আর্থিক খাতসহ পুঁজিবাজারে কোনো সংকট সৃষ্টি হয়নি বলে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, লুটপাট, অব্যবস্থাপনা, স্ক্যাম ও ভুল নীতি গ্রহণের মাধ্যমে পুঁজিবাজারকে সম্পূর্ণ ধ্বংস এবং এর ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুরোপুরি নষ্ট করা হয়েছে। বিএনপি সরকার যতবার এ দেশে সরকার পরিচালনা করেছে, কখনোই ব্যাংক, আর্থিক খাতসহ পুঁজিবাজারে কোনো সংকট সৃষ্টি হয়নি।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালের জানুয়ারি শেষে মোট বাজার মূলধন ছিল ৭ লাখ ৫১ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা; ২০২৬ সালের এপ্রিল শেষে তা কমে ৬ লাখ ৮৫ হাজার ১১৯ কোটিতে নেমে এসেছে। একই সময়ে ডিএসইর প্রধান সূচক ৬১৫৩ থেকে কমে ৫২৮৭-এ দাঁড়িয়েছে। এই প্রবণতা থেকে বোঝা যায়, পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, গভীরতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের উপযোগী কাঠামো এখনো যথেষ্ট শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারেনি।

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সরকার দেশের অর্থনীতির পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে একটি আধুনিক, শক্তিশালী ও টেকসই আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে ব্যাংক ও পুঁজিবাজার খাতে কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন করবে। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ অর্থায়নের জন্য বন্ড মার্কেট এবং বিকল্প অর্থায়ন ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হবে, যাতে ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নের ওপর চাপ কমে। পুঁজিবাজারকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের কার্যকর প্ল্যাটফর্মে রূপান্তরের জন্য নিয়ন্ত্রক কাঠামো শক্তিশালী করা হবে এবং বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা জোরদার করা হবে। এই উদ্দেশ্যে শেয়ারবাজারের পাশাপাশি করপোরেট বন্ড মার্কেট, মিউচুয়াল ফান্ড, গ্রিন বন্ড, সুকুক এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ উপকরণের উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

মন্ত্রী বলেন, যোগ্য কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে উৎসাহিত করতে তালিকাভুক্তির ধাপসমূহ পর্যালোচনা ও সরলীকরণ করা হবে। প্রতিবেদন ও তথ্য প্রকাশের শর্তাবলি সংশোধনপূর্বক আরও সহজ, সুস্পষ্ট এবং বাস্তবসম্মত করা হবে, যাতে ভালো কোম্পানি পুঁজিবাজারে আসতে উৎসাহিত হয়। দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বিকল্প উৎস গড়ে তুলতে করপোরেট বন্ড মার্কেট সম্প্রসারণ, স্থানীয় সরকার ও নগর অবকাঠামো উন্নয়নে পৌর বন্ড ইস্যুর কাঠামো প্রণয়ন করা হবে।

অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতার ২৭ পৃষ্ঠায় বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী পুঁজি গঠনের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পুঁজিবাজার প্রধান ভূমিকা পালন করে এলেও আমাদের দেশে এই ধারা অনুপস্থিত। এ ক্ষেত্রে উদ্যোক্তারা ব্যাংকের ওপরই ভরসা করে এসেছে। যে পুঁজিবাজার শিল্পায়নের মূলধন গঠনে ভূমিকা রেখে দেশকে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা, আস্থাহীনতার কারণে সেখানে হয়েছে উল্টোটা। আমরা ঋণনির্ভর বিনিয়োগকে ইক্যুইটিতে রূপান্তর করতে চাই।’

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য বর্তমান ঋণভিত্তিক অর্থনীতি থেকে দূরে সরে এসে বিনিয়োগভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলা। এই লক্ষ্যে পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করতে এবং এর প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে আমরা কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করব।’

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বর্তমান সরকারের আগামী ৫ বছরের বেশির ভাগ উন্নয়ন পরিকল্পনা দেশের গ্রামকে কেন্দ্র করে। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ গ্রামে বাস করেন, গ্রামের মানুষকে স্বাবলম্বী করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। তিনি জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবছর ও মধ্য মেয়াদে দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন, নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি জোরদার এবং ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক, নারী ও যুবকদের দক্ষতা উন্নয়নে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

পরিকল্পনার অনুযায়ী, পল্লী উন্নয়ন একাডেমির মাধ্যমে প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও পরামর্শ সেবা সম্প্রসারণ, ২০০টি উপজেলায় নারীদের দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং সমবায়ের মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর টেকসই আর্থিক অন্তর্ভুক্তকরণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, একই সাথে সহজ ঋণপ্রাপ্তি, ক্ষুদ্র ঋণ ও নারী উদ্যোক্তা ঋণ ব্যবস্থার সংস্কার এবং জামানতবিহীন ঋণ প্রদানের মাধ্যমে প্রান্তিক কৃষক ও নারীদের আত্ম-কর্মসংস্থান, আয় বৃদ্ধি এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।

আমির খসরু বলেন, ‘গ্রামীণ সড়ক, সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম গ্রামীণ অর্থনীতি ও বাজার ব্যবস্থাকে গতিশীল করছে। সে কারণে আমরা আগামী অর্থবছরে সড়ক, সেতু, গ্রোথ সেন্টার উন্নয়ন ও সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণের মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও দুর্যোগ সহনশীলতা শক্তিশালী করার কার্যক্রম গ্রহণ করেছি।’

পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় খাতে সুশাসন, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু সহনশীল উন্নয়ন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, বৃক্ষরোপণ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং নারী-যুবকদের দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে সুষম ও টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনে আমরা পদক্ষেপ নিচ্ছি। একই সাথে গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও আত্মকর্মসংস্থান তৈরিতে সমবায়ভিত্তিক কার্যক্রম আরও জোরদার করা হচ্ছে।’

মন্ত্রী বলেন, গ্রামীণ সড়ক ও বাজার অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে বর্তমানে প্রায় ৯৩ শতাংশ গ্রামীণ জনগোষ্ঠী সারা বছর চলাচলের উপযোগী সড়ক সুবিধার আওতায় এসেছে, যা পর্যায়ক্রমে ১০০ শতাংশ এ উন্নীত করা হচ্ছে। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও স্থানীয় প্রশাসনের সেবা ডিজিটালাইজেশন কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন জোরদার করার মাধ্যমে সামাজিক সুরক্ষা ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে এবং এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান সমস্যাসমূহ সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের মাধ্যমে সুপেয় পানি সরবরাহ, শতভাগ স্যানিটেশন নিশ্চিতকরণ, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং পরিবেশবান্ধব পানি ব্যবস্থাপনায় কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। এ বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাসমূহে বর্ষার আগেই জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল পুনঃখনন, ড্রেন সংস্কার এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। নগর এলাকায় সড়ক ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, খাল পুনরুদ্ধার এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে যা নগর জীবনের মানোন্নয়নে সহায়ক হবে।

জনপ্রিয় খবর

আবহাওয়া

রাজস্ব খাতের দুর্বলতা আমাদের অর্থনীতির গভীর সমস্যাগুলোর একটি : অর্থমন্ত্রী

রাজস্ব খাতের দুর্বলতা আমাদের অর্থনীতির গভীর সমস্যাগুলোর একটি : অর্থমন্ত্রী

প্রকাশের সময় : ০৬:১৯:২০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

রাজস্ব খাতের দুর্বলতা আমাদের অর্থনীতির গভীর সমস্যাগুলোর একটি বলে উল্লেখ করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেল তিনটায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতা উপস্থাপনকালে তিনি এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের এটি প্রথম বাজেট। একই সঙ্গে অর্থমন্ত্রী হিসেবে আমির খসরুরও প্রথম বাজেট।

বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, রাজস্ব খাতের দুর্বলতা আমাদের অর্থনীতির গভীর সমস্যাগুলোর একটি। বহু বছর ধরেই কর-জিডিপি অনুপাত নিম্নপর্যায়ে রয়ে গেছে; এখনও তা ৮ শতাংশের নিচে অবস্থান করছে, যা সমপর্যায়ের অনেক দেশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এর অর্থ হলো, সরকারের আয় বাড়ানোর সক্ষমতা যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। উন্নয়ন ও জনকল্যাণে ব্যয়ের চাহিদা যত বেড়েছে, রাজস্ব আহরণ ততটা বাড়েনি; ফলে ঘাটতি অর্থায়নের ওপর চাপ বেড়েছে।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে মোট রাজস্ব আহরণ হয়েছে ৩ লাখ ৮২ হাজার ৮৯৬ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ বেশি। উক্ত সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে আদায় হয়েছে ৩ লাখ ২৯ হাজার ৭৭২ কোটি টাকা। এই অগ্রগতি লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক কম, যা সরকারের আর্থিক ভারসাম্যকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।

তিনি বলেন, শুধু সম্পদ আহরণেই নয়, বাজেট বাস্তবায়নেও সক্ষমতার ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট বাজেটের আকার ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা থাকলেও আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা নির্ধারণ করা হয় ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। তারপরও বাস্তবায়ন সীমাবদ্ধতার কারণে বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে গিয়ে বাজেটকে সংশোধন ও সমন্বয় করতে হয়েছে, যা প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানকে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নিতে সহায়ক নয়।

চলতি অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে মোট ব্যয় হয়েছে সংশোধিত বাজেট বরাদ্দের প্রায় ৬০ শতাংশ; এক্ষেত্রে উন্নয়ন ব্যয়ের বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৪০ দশমিক ৭ শতাংশ। এ অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, কেবল উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করাই যথেষ্ট নয়; রাজস্ব আহরণ, ব্যয় পরিকল্পনা এবং বাজেট বাস্তবায়নের মধ্যে বাস্তবসম্মত ভারসাম্য নিশ্চিত করাও জরুরি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নতুন করে গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছে বলে মন্তব্য করে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিএনপি বরাবরই জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ জাতীয় নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করেছে।

তিনি বলেন, ২০১৬ সালের ভিশন-২০৩০, ২০২২ সালের রাষ্ট্র মেরামতের ২৭ দফা এবং ২০২৩ সালের যুগপৎ আন্দোলনের ৩১ দফার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনই ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের ভিত্তি তৈরি করে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে জুলাই জাতীয় সনদের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের ঘোষণা ইতোমধ্যে দেওয়া হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে দুর্নীতি, লুটপাট ও অর্থপাচারের মাধ্যমে অর্থনীতির ভিত্তি দুর্বল করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর করে দেওয়া হয়েছে এবং তথাকথিত উন্নয়নের আড়ালে অর্থনৈতিক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে দেশকে পুনরুদ্ধার করে সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব বর্তমান সরকার গ্রহণ করেছে।

আমির খসরু বলেন, জাতীয় বাজেটকে কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব হিসেবে নয়, বরং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা ও দেশের সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার একটি রোডম্যাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য হলো সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য নিরাপদ, সমৃদ্ধ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা।

অর্থমন্ত্রী বলেন, নতুন সরকার এমন সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে যখন বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক মেরুকরণ নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এসব বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে এবারের বাজেটে স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং ন্যায্যতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

আশাবাদ ব্যক্ত করে আমির খসরু বলেন, সরকারের পরিকল্পনা ও কৌশল বাস্তবায়িত হলে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হবে। একই সঙ্গে জনমিতিক লভ্যাংশ, দীর্ঘায়ু লভ্যাংশ এবং গণতান্ত্রিক লভ্যাংশ অর্জনের সুযোগও তৈরি হবে।

আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফিরিয়ে আনার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন।

বাজেটে সরকার ১০টি প্রধান অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছে। এগুলো হলো— সবার জন্য উন্নয়ন, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানভিত্তিক অর্থনীতি, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিকাশ, পরিবেশ ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

এছাড়া সৃজনশীল অর্থনীতি, ক্রীড়া অর্থনীতি, সবুজ অর্থনীতি এবং সুনীল অর্থনীতিকে জাতীয় অর্থনীতির মূলধারায় আনার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী।

আমির খসরু বলেন, বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে ‘ভ্যালু ফর মানি’, বিনিয়োগের বিপরীতে সুফল, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পরিবেশগত ভারসাম্য—এই চারটি নীতিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী জানান, সরকার ইতোমধ্যে সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর একচ্ছত্র আধিপত্য ভেঙে একটি প্রতিযোগিতামূলক, উৎপাদনশীল, ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। প্রস্তাবিত বাজেট সেই উদ্যোগেরই প্রতিফলন।

আশা প্রকাশ করে আমির খসরু বলেন, এই বাজেট উন্নয়নকে বৈষম্যহীন, কর্মসংস্থানকে নিরাপদ, রাষ্ট্রকে আরও জবাবদিহিমূলক এবং নাগরিক অংশগ্রহণকে আরও শক্তিশালী করতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

এর আগে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সংসদ ভবনে মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রস্তাবিত বাজেট অনুমোদন দেওয়া হয়। জাতীয় সংসদ ভবনের মন্ত্রিসভা কক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বিশেষ বৈঠকে বাজেট অনুমোদন দেওয়া হয়।

জানা গেছে, আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের আকার হতে পারে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। বাজেটে ঘাটতি থাকতে পারে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হতে পারে সাড়ে ৬ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হতে পারে সাড়ে ৭ শতাংশ।

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে ব্যাপক কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে সরকার। আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, ২০ হাজার কিলোমিটার নদী-খাল ও জলাধার খনন ও পুনঃখনন, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যাসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব মোকাবিলায় সরকার দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।

তিনি জানান, আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ করা হবে। এর মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় সাড়ে তিন লাখ সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ২৫ হাজার ৯শ ৬০ হেক্টর ব্লক বাগানে চার কোটি ২৮ লাখ ৯৭ হাজার চারা, তিন হাজার সাতশ ২৭ কিলোমিটার স্ট্রিপ বাগানে ৩৭ লাখ ২৭ হাজার চারা এবং চার হাজার হেক্টর ম্যানগ্রোভ বাগানে এক কোটি ৭৭ লাখ ৭৬ হাজার চারা রোপণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বসতবাড়ি বনায়নের আওতায় ৫৬ লাখ চারা রোপণ করা হবে।

এ ছাড়া ‘ওয়ান চাইল্ড, ওয়ান ট্রি’ কর্মসূচির আওতায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে নিজ বাড়ি বা আঙিনায় এক কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বনের ৫০ শতাংশকে কার্বন ট্রেডিং কার্যক্রমের আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ‘সার্কুলার ফিউচার মডেল’ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

পরিবেশ দূষণ রোধে আগামী অর্থবছরে ১৫টি সিএএমএস এবং ১৬টি সি-সিএএমএসের মাধ্যমে নিয়মিত বায়ুর মান পর্যবেক্ষণ করা হবে। যানবাহনের দূষণ নিয়ন্ত্রণে বিআরটিএর মাধ্যমে ১০টি আধুনিক ভেহিকেল ইন্সপেকশন সেন্টার স্থাপন করা হবে। পাশাপাশি ইলেকট্রিক বাস সার্ভিস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য নতুন গাইডলাইন ও হালনাগাদ বিধিমালা প্রণয়ন করা হবে। এছাড়া, ‘রিডিউস, রিইউজ, রিসাইকেল (৩আর)’ নীতির আওতায় আগামী পাঁচ বছরে প্লাস্টিক বর্জ্য ৩০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরে একশ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।

পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনার বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, সেচ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীভাঙন রোধ, ভূমি পুনরুদ্ধার, জলাবদ্ধতা নিরসন, নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও লবণাক্ততা প্রতিরোধে সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।

তিনি জানান, আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী-খাল ও জলাধার খনন এবং পুনঃখনন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। এর মধ্যে ইতোমধ্যে ছয় হাজার ৫শ ৯৮ কিলোমিটার খাল খননের কাজ চলমান রয়েছে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরে তিনশ ৯ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ, পুনর্র্নিমাণ ও মেরামত এবং ফ্লাড ওয়াল নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি চারশ ৮৪ কিলোমিটার নদ-নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি এবং ডুবোচর অপসারণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

নদী পুনরুদ্ধার কর্মসূচির আওতায় প্রতিটি বিভাগে অন্তত একটি নদী বা জলাশয় দখলমুক্ত ও পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনার কথাও জানান অর্থমন্ত্রী। ধলেশ্বরী, লৌহজং, আলাইকুড়ি, মগড়া, সালতা, সুতাং, বাঁকখালী ও বারনই নদী পুনরুদ্ধার এবং পানি প্রবাহ নিশ্চিত করার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

এ ছাড়া হাওর-বাঁওড় অঞ্চলের সমন্বিত উন্নয়ন এবং উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা নিরসনে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান।

বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প’ ইতোমধ্যে একনেক কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ ও পানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে আগামী সাত বছরে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে। চারটি বিভাগের ১৯টি জেলার একশ ২০টি উপজেলা এ সুবিধা পাবে।

একই সঙ্গে দেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান তিনি।

পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জন্য আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১০ হাজার পাঁচশ ৩৩ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।

বিএনপি সরকার যতবার দেশে সরকার পরিচালনা করেছে, কখনোই ব্যাংক, আর্থিক খাতসহ পুঁজিবাজারে কোনো সংকট সৃষ্টি হয়নি বলে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, লুটপাট, অব্যবস্থাপনা, স্ক্যাম ও ভুল নীতি গ্রহণের মাধ্যমে পুঁজিবাজারকে সম্পূর্ণ ধ্বংস এবং এর ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুরোপুরি নষ্ট করা হয়েছে। বিএনপি সরকার যতবার এ দেশে সরকার পরিচালনা করেছে, কখনোই ব্যাংক, আর্থিক খাতসহ পুঁজিবাজারে কোনো সংকট সৃষ্টি হয়নি।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালের জানুয়ারি শেষে মোট বাজার মূলধন ছিল ৭ লাখ ৫১ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা; ২০২৬ সালের এপ্রিল শেষে তা কমে ৬ লাখ ৮৫ হাজার ১১৯ কোটিতে নেমে এসেছে। একই সময়ে ডিএসইর প্রধান সূচক ৬১৫৩ থেকে কমে ৫২৮৭-এ দাঁড়িয়েছে। এই প্রবণতা থেকে বোঝা যায়, পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, গভীরতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের উপযোগী কাঠামো এখনো যথেষ্ট শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারেনি।

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সরকার দেশের অর্থনীতির পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে একটি আধুনিক, শক্তিশালী ও টেকসই আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে ব্যাংক ও পুঁজিবাজার খাতে কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন করবে। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ অর্থায়নের জন্য বন্ড মার্কেট এবং বিকল্প অর্থায়ন ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হবে, যাতে ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নের ওপর চাপ কমে। পুঁজিবাজারকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের কার্যকর প্ল্যাটফর্মে রূপান্তরের জন্য নিয়ন্ত্রক কাঠামো শক্তিশালী করা হবে এবং বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা জোরদার করা হবে। এই উদ্দেশ্যে শেয়ারবাজারের পাশাপাশি করপোরেট বন্ড মার্কেট, মিউচুয়াল ফান্ড, গ্রিন বন্ড, সুকুক এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ উপকরণের উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

মন্ত্রী বলেন, যোগ্য কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে উৎসাহিত করতে তালিকাভুক্তির ধাপসমূহ পর্যালোচনা ও সরলীকরণ করা হবে। প্রতিবেদন ও তথ্য প্রকাশের শর্তাবলি সংশোধনপূর্বক আরও সহজ, সুস্পষ্ট এবং বাস্তবসম্মত করা হবে, যাতে ভালো কোম্পানি পুঁজিবাজারে আসতে উৎসাহিত হয়। দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বিকল্প উৎস গড়ে তুলতে করপোরেট বন্ড মার্কেট সম্প্রসারণ, স্থানীয় সরকার ও নগর অবকাঠামো উন্নয়নে পৌর বন্ড ইস্যুর কাঠামো প্রণয়ন করা হবে।

অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতার ২৭ পৃষ্ঠায় বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী পুঁজি গঠনের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পুঁজিবাজার প্রধান ভূমিকা পালন করে এলেও আমাদের দেশে এই ধারা অনুপস্থিত। এ ক্ষেত্রে উদ্যোক্তারা ব্যাংকের ওপরই ভরসা করে এসেছে। যে পুঁজিবাজার শিল্পায়নের মূলধন গঠনে ভূমিকা রেখে দেশকে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা, আস্থাহীনতার কারণে সেখানে হয়েছে উল্টোটা। আমরা ঋণনির্ভর বিনিয়োগকে ইক্যুইটিতে রূপান্তর করতে চাই।’

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য বর্তমান ঋণভিত্তিক অর্থনীতি থেকে দূরে সরে এসে বিনিয়োগভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলা। এই লক্ষ্যে পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করতে এবং এর প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে আমরা কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করব।’

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বর্তমান সরকারের আগামী ৫ বছরের বেশির ভাগ উন্নয়ন পরিকল্পনা দেশের গ্রামকে কেন্দ্র করে। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ গ্রামে বাস করেন, গ্রামের মানুষকে স্বাবলম্বী করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। তিনি জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবছর ও মধ্য মেয়াদে দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন, নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি জোরদার এবং ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক, নারী ও যুবকদের দক্ষতা উন্নয়নে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

পরিকল্পনার অনুযায়ী, পল্লী উন্নয়ন একাডেমির মাধ্যমে প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও পরামর্শ সেবা সম্প্রসারণ, ২০০টি উপজেলায় নারীদের দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং সমবায়ের মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর টেকসই আর্থিক অন্তর্ভুক্তকরণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, একই সাথে সহজ ঋণপ্রাপ্তি, ক্ষুদ্র ঋণ ও নারী উদ্যোক্তা ঋণ ব্যবস্থার সংস্কার এবং জামানতবিহীন ঋণ প্রদানের মাধ্যমে প্রান্তিক কৃষক ও নারীদের আত্ম-কর্মসংস্থান, আয় বৃদ্ধি এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।

আমির খসরু বলেন, ‘গ্রামীণ সড়ক, সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম গ্রামীণ অর্থনীতি ও বাজার ব্যবস্থাকে গতিশীল করছে। সে কারণে আমরা আগামী অর্থবছরে সড়ক, সেতু, গ্রোথ সেন্টার উন্নয়ন ও সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণের মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও দুর্যোগ সহনশীলতা শক্তিশালী করার কার্যক্রম গ্রহণ করেছি।’

পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় খাতে সুশাসন, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু সহনশীল উন্নয়ন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, বৃক্ষরোপণ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং নারী-যুবকদের দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে সুষম ও টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনে আমরা পদক্ষেপ নিচ্ছি। একই সাথে গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও আত্মকর্মসংস্থান তৈরিতে সমবায়ভিত্তিক কার্যক্রম আরও জোরদার করা হচ্ছে।’

মন্ত্রী বলেন, গ্রামীণ সড়ক ও বাজার অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে বর্তমানে প্রায় ৯৩ শতাংশ গ্রামীণ জনগোষ্ঠী সারা বছর চলাচলের উপযোগী সড়ক সুবিধার আওতায় এসেছে, যা পর্যায়ক্রমে ১০০ শতাংশ এ উন্নীত করা হচ্ছে। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও স্থানীয় প্রশাসনের সেবা ডিজিটালাইজেশন কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন জোরদার করার মাধ্যমে সামাজিক সুরক্ষা ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে এবং এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান সমস্যাসমূহ সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের মাধ্যমে সুপেয় পানি সরবরাহ, শতভাগ স্যানিটেশন নিশ্চিতকরণ, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং পরিবেশবান্ধব পানি ব্যবস্থাপনায় কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। এ বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাসমূহে বর্ষার আগেই জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল পুনঃখনন, ড্রেন সংস্কার এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। নগর এলাকায় সড়ক ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, খাল পুনরুদ্ধার এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে যা নগর জীবনের মানোন্নয়নে সহায়ক হবে।