রংপুর জেলা প্রতিনিধি :
রংপুর মহানগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় তালাবদ্ধ একটি বাড়ি থেকে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ওরফে জুয়েলসহ একই পরিবারের চারজনের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে ডাকাতির সন্দেহ করছে পুলিশ। তবে নিহতদের পরিবারের দাবি, এটি ডাকাতির ঘটনা নয়, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। বাড়ি নির্মাণকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজির বিরোধও ছিল বলে দাবি করেছেন নিহত গণপতি চক্রবর্তীর স্বজনেরা।
শনিবার (২৩ আগস্ট) রাত সাড়ে ১১টার দিকে নগরীর দাসপাড়া (মাছুয়াপাড়া) এলাকা থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
নিহতরা হলেন- রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৩) ও ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তী (১২)।
গণপতি চক্রবর্তী গত ডিসেম্বরে রংপুর জেলা স্কুল থেকে অবসর নেন। অবসরের পর তিনি হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাসেবা দিতেন। স্বজনেরা জানান, দুই দিন ধরে পরিবারের চার সদস্যের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে তাঁরা বাড়িতে এসে মূল ফটকে তালা ঝুলতে এবং পুরো বাড়ি অন্ধকার দেখতে পান। পরে বাড়িতে ঢুকে পরিবারের চার সদস্যের মরদেহ দেখতে পান তাঁরা।
তবে নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী দাবি করেন, বাড়ি নির্মাণের সময় চাঁদার টাকা নিয়ে একটি ঝামেলা হয়েছিল। তাঁর ধারণা, সেই বিরোধের জেরেই পরিকল্পিতভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়ে থাকতে পারে।
গোপীনাথ চক্রবর্তী বলেন, বাড়ি করার সময় চাঁদার টাকা নিয়ে একটা ঝামেলা ছিল। এরপর তাঁরা বাড়িতে বসবাস করছিলেন। বিদ্যুতের লাইন বিচ্ছিন্ন করে ঘটনাটিকে অন্যভাবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। আমরা এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার চাই।’ তিনি জানান, গণপতির শ্যালকের মাধ্যমে তাঁরা জানতে পারেন, পরিবারের চার সদস্যের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। তাঁদের ব্যবহৃত চারটি মোবাইল ফোনই বন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। এ ছাড়া বাড়ির মূল ফটকে তালা ঝুলছিল এবং ভেতরে ছিল অন্ধকার। পরে স্থানীয় এক যুবককে বাড়িতে খোঁজ নিতে পাঠানো হয়। তবে তিনি সেখানে পৌঁছানোর আগেই স্বজনেরা বাড়িতে গিয়ে মরদেহ দেখতে পান।
সরেজমিনে মাছুয়াপাড়া এলাকায় দেখা যায়, দুইতলা বাড়িটি ঘিরে রেখেছে পুলিশ। নিচতলায় নির্মাণকাজ চলছিল। ওপরের তলার নির্মাণকাজ শেষ করে সেখানেই পরিবারটি বসবাস করত। চারজনের মৃত্যুর ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বাড়ির সামনে স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয়দের ভিড় দেখা যায়।
পাশের বাড়ির গৃহবধূ সোনালী দাস বলেন, খুব ভালো পরিবার ছিল। সবার সঙ্গে মিশত, কথা বলত। কারা যে তাদের এমন নৃশংসভাবে হত্যা করল, জানি না। পরিবারে শত্রুতা ছিল, নাকি বাইরের কারও সঙ্গে শত্রুতা ছিল, তা তদন্তেই জানা যাবে।
রংপুর সিআইডির ইনচার্জ সুমির চৌধুরী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সাংবাদিকদের জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, তিন থেকে চার দিন আগে তাদের মৃত্যু হয়েছে। পচন ধরায় মরদেহগুলো অনেকটা গলে গেছে।
তিনি জানান, বাড়ির বিভিন্ন স্থানে টাকা-পয়সা ও গহনা রাখার জায়গাগুলোর তালা ভাঙা পাওয়া গেছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বাড়িতে ডাকাতির ঘটনা ঘটতে পারে। তবে ডাকাতির সঙ্গে চারজনের মৃত্যুর ঘটনা কীভাবে সম্পৃক্ত, তা তদন্তের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে।
সিআইডির এই কর্মকর্তা আরও জানান, বাড়িটির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। এ কারণে ঘটনাস্থলে তদন্ত ও আলামত সংগ্রহে কিছুটা সময় লাগছে। কীভাবে তাদের মৃত্যু হয়েছে এবং এর পেছনে কারা রয়েছে, তদন্তের মাধ্যমে তা বেরিয়ে আসবে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, নিহত গণপতি চক্রবর্তীর গ্রামের বাড়ি রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার ১৬ নম্বর মির্জাপুর ইউনিয়নে।
একই পরিবারের চারজনের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। তাদের মৃত্যুর কারণ এবং ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করছে। মরদেহগুলো ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্তের পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং ঘটনার বিস্তারিত জানা যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এদিকে এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ ও জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে মানববন্ধনের ডাক দিয়েছে জেলা স্কুলসহ নগরীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
রংপুর জেলা প্রতিনিধি 




















