নিজস্ব প্রতিবেদক :
ডিএমপিতে কোনো মব হবে না বলে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের নবনিযুক্ত কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ।
বুধবার (২০ মে) রাজধানীতে আয়োজিত ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই ছিল তার প্রথম সংবাদ সম্মেলন।
মব কালচারের বিরুদ্ধে ডিএমপির কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে কমিশনার বলেন, যেখানেই মব হবে সেখানেই অ্যাকশনে যাবে পুলিশ।
চাঁদাবাজি নিয়ে তিনি বলেন, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সে পুলিশ। সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করা হবে না। এখন পর্যন্ত ২০৬ জন তালিকাভুক্ত চাঁদাবাজকে গ্রেফতার করা হয়েছে বিশেষ অভিযানে।
ডিএমপি কমিশনার বলেন, চাঁদাবাজ, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী, মাদককারবারি, অনলাইন জুয়া এবং প্রতারণার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান অব্যাহত। ছিনতাই এবং যে কোনো ধরনের চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে আমাদের জিরো টলারেন্স। অপরাধী যেই হোক, তার কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় বিবেচনা করা হবে না।
তিনি বলেন, ঢাকা মহানগরীতে প্রায় ৩ কোটি মানুষের বসবাস। এই নগরীতে ছিনতাই, মাদক, মাদকের বিস্তার, চাঁদাবাজ, কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত, অনলাইন জুয়া, সাইবার প্রতারণা, হ্যাকিংয়ের মতো অপরাধের বিরুদ্ধে গত ১ মে থেকে ডিএমপি বিশেষ অভিযান শুরু করেছে।
কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধ অভিযান অব্যাহত আছে জানিয়ে কমিশনার বলেন, তালিকা ধরে ধরে গ্যাং লিডারদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।
শীর্ষ সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, জামিনে বের হয়ে অনেকেই অপরাধে জড়াচ্ছে। তাদেরকেও আইনের আওতায় আনা হবে।
থানায় কর্মরত পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, থানা হবে জনবান্ধব, সেবা বান্ধব। থানায় কোনো দালালের অস্তিত্ব থাকবে না। থানায় কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নেয়া হবে। থানা এবং ফাঁড়ির মান উন্নয়ন করা হবে। যানবাহনের সংকট দূর করা হবে বলে জানান ডিএমপি কমিশনার।
গণমাধ্যম সমাজের দর্পণ উল্লেখ করে ডিএমপি কমিশনার বলেন, একটি নিরাপদ, অপরাধমুক্ত এবং শান্তিময় রাজধানী গড়ে তোলার লক্ষ্যে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অহর্নিশ কাজ করে যাচ্ছে। আর আমাদের এই যাত্রায় আপনারা, অর্থাৎ সাংবাদিক সমাজ সবসময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সহযোগী ভূমিকা পালন করছেন।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের অন্যতম মূল অঙ্গীকার হচ্ছে আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ঢাকা মহানগরীতে এই লক্ষ্য অর্জনে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সম্প্রতি সমাপ্ত আমাদের পুলিশ সপ্তাহ ২০২৬-এর স্লোগান ‘আমার পুলিশ আমার দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ আমাদের এই দর্শনকে প্রতিফলিত করে। আমরা জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করতে চাই।
ডিএমপি কমিশনার বলেন, সাইবার হ্যাকিং, সাইবার বুলিং, অনলাইন জুয়া, প্রতারণাসহ অনলাইনভিত্তিক অপরাধ প্রতিরোধে ডিএমপি নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। নাগরিকদের ডিজিটাল নিরাপত্তা দিতে ডিএমপির সাইবার ইউনিটকে ক্রমশ শক্তিশালী করা হচ্ছে। সম্প্রতি ডিএমপির সিটিটিসির অধীনে স্থাপিত ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব আইসিটি মন্ত্রণালয়ের স্বীকৃতি লাভ করেছে, যা সাইবার সুরক্ষা আইন এবং এর অধীনে যে মামলা, সেগুলোর তদন্তের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে।
ঢাকার অন্যতম প্রধান সমস্যা ট্রাফিক জ্যাম উল্লেখ করে নবনিযুক্ত ডিএমপি কমিশনার বলেন, আমরা ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক ও সচল করতে নিত্যনতুন কর্মপরিকল্পনা হাতে নিচ্ছি এবং চালক ও পথচারীদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করছি। আমরা এর মধ্যে ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমকে প্রযুক্তিনির্ভর করেছি। গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে এআই ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। সড়ক পরিবহন আইন লঙ্ঘনের ভিডিও ফুটেজের ভিত্তিতে ই-প্রসিকিউশন চালু হয়েছে। এর ফলে সড়কে আইন মানার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বলেন, আসন্ন ঈদুল আজহায় কোরবানির পশুর হাট, ঈদ জামাত, শপিং মল এবং আবাসিক এলাকার নিরাপত্তা আমাদের কাছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। ঘরমুখো মানুষের নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন যাতায়াত নিশ্চিত করতে বাস টার্মিনাল, লঞ্চঘাট ও রেলস্টেশনে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এবং অতিরিক্ত যাত্রী বহনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঈদের ছুটিতে নগরে নিরাপত্তায় অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন করা হবে।
ডিএমপি কমিশনার বলেন, কোরবানির ঈদ সামনে রেখে নগদ টাকার লেনদেন কমিয়ে ব্যাংক লেনদেন করার জন্য সবাইকে পরামর্শ প্রদান করছি এবং বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেন করলে পুলিশের সহযোগিতা নেওয়ার জন্য সবাইকে আহ্বান জানাচ্ছি।
তিনি বলেন, ঈদ ঘিরে অজ্ঞান পার্টি, মলম পার্টি, ছিনতাইকারী, জাল নোট প্রতিরোধে ডিবি ও থানা পুলিশকে সর্বোচ্চ সক্রিয় করা হয়েছে। ডিএমপির প্রতিটি থানায় মতবিনিময় সভা করা হচ্ছে। আমরা ঢাকার সম্মানিত নাগরিকদের মতামত নিয়ে সর্বোত্তম পুলিশি সেবা দিতে চাই। অনেক ক্ষেত্রে জনসাধারণের সহযোগিতা ছাড়া আমাদের কাজ করা দুরূহ হয়। চাঁদাবাজি ও মাদকের বিরুদ্ধে সমাজের সবাই মিলে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
মোসলেহ উদ্দিন আরও বলেন, আপনার এলাকায় ছিনতাই, চাঁদাবাজ, কিশোর গ্যাং, যে কোনো অপরাধের তথ্য থাকলে অবিলম্বে পুলিশকে জানান। প্রয়োজনে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল করুন এবং সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ব্যবস্থা নেবে।
তিনি বলেন, আপনাদের একটি সঠিক তথ্য বড় কোনো অপরাধ বা দুর্ঘটনা রুখে দিতে পারে। আসন্ন ঈদুল আজাহায় পশুর হাটে কেনাবেচা থেকে শুরু করে ফাঁকা ঢাকার নিরাপত্তা রক্ষায় আপনারা সচেতন থাকবেন এবং ট্রাফিক আইন মেনে আমাদের আধুনিকায়নের এই যাত্রাকে সফল করতে সহযোগিতা করবেন।
‘পুলিশ, জনগণ, গণমাধ্যম আমরা সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করলে ঢাকাকে একটি নিরাপদ শহর হিসেবে গড়ে তুলতে পারবো।’ যোগ করেন ডিএমপির নতুন কমিশনার।
আসন্ন ঈদুল আজহা সামনে রেখে রাজধানীর নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান ডিএমপি কমিশনার। তিনি বলেন, পশুর হাট, ঈদের জামাত, শপিং মল ও আবাসিক এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হবে। বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন ও লঞ্চঘাটে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও অতিরিক্ত যাত্রী বহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনে পুলিশের সহায়তা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ঈদকে কেন্দ্র করে অজ্ঞান পার্টি, মলম পার্টি, ছিনতাইকারী ও জাল নোট চক্র ঠেকাতে ডিবি ও থানা পুলিশকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে।
গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, পুলিশের গঠনমূলক সমালোচনার পাশাপাশি ভালো কাজও তুলে ধরতে হবে, যাতে নগরবাসী সচেতন হয়।
ঈদে ফাঁকা ঢাকার নিরাপত্তা নিয়ে তিনি বলেন, ঈদে ফাঁকা ঢাকার নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ঢাকায় উগ্রবাদ বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই পুলিশের কাছে। নিরাপদ নগরী গড়ে তোলাই সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ অন্যতম চ্যালেঞ্জ। নিরাপদ নগরী গড়ে তুলতে নগরবাসীর সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন তিনি।
ঈদযাত্রা নিয়ে ডিএমপি কমিশনার বলেন, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এআইয়ের মতো প্রযুক্তি সুফল বয়ে আনছে। ঈদে ঘরমুখো মানুষের যাতায়াত সহজ করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। বাড়তি ভাড়া আদায়কারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 























