নিবন্ধনে থাকবে সৌরবিদ্যুতের শর্ত

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে সরকারের নতুন পরিকল্পনা

নিজস্ব প্রতিবেদক :

জ্বালানি সংকট, বিদ্যুতের ঘাটতি এবং জাতীয় গ্রিডের ওপর বাড়তি চাপ কমাতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর পাশাপাশি নিবন্ধন ও নবায়নের শর্ত হিসেবে সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে অটোরিকশা চার্জ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা চালুর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

তবে দেশে ৬০ লাখের বেশি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার জন্য প্রয়োজনীয় সৌর চার্জিং অবকাঠামো গড়ে তোলাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

বছরে বিদ্যুৎ খরচ ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি

একসময় রাজধানীর অলিগলিতে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা প্রধান সড়কেও চলাচল করছে। দ্রুতগতির এসব তিন চাকার যানবাহনের কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়েছে। একটি গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩০ শতাংশ যাত্রী কোনো না কোনোভাবে ব্যাটারিচালিত রিকশাজনিত দুর্ঘটনার শিকার হন।

দেশে বর্তমানে প্রায় ৬০ লাখ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল করছে। এসব যানবাহনের ব্যাটারি চার্জে বছরে ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি বিদ্যুৎ ব্যয় হচ্ছে। প্রতিদিন এই খাতে প্রায় ৫৫ কোটি টাকার বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়, যার বড় অংশই আসে অবৈধ সংযোগ থেকে।

প্রতিদিন ৮৫০ মেগাওয়াট গ্রিডের ওপর চাপ

গবেষণা অনুযায়ী, একটি অটোরিকশা প্রতিদিন গড়ে ৮ থেকে ৯ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। সব মিলিয়ে এটি জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৮০০ থেকে ৮৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের সমপরিমাণ চাপ সৃষ্টি করছে, যা দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত ৫ শতাংশ।

রাজধানীতে হাজারো অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট

সরেজমিনে রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাত ও গ্যারেজে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে অটোরিকশা চার্জ দেওয়ার চিত্র দেখা গেছে।

তথ্য অনুযায়ী, শুধু ঢাকাতেই রয়েছে ৪৮ হাজার ১৩৬টি অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট এবং ৯৯২টি গ্যারেজ। এসব স্থানে অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহারের কারণে সরকার বছরে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। কোথাও শত শত ব্যাটারি একসঙ্গে চার্জ দেওয়া হচ্ছে, আবার কোথাও প্রিপেইড মিটারের অপব্যবহার করে চার্জিং কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

একজন অটোরিকশা চালক বলেন, গাড়ির চার্জ দিলেই চাঁদা চায়। চাঁদা না দিলে মারধর করে, আবার আমাদের নামে মামলা দেয়। আমরা অবৈধ কিছু করছি না।

নিবন্ধনে সৌরবিদ্যুতের শর্ত

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার মাধ্যমে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে নিবন্ধনের আওতায় আনা হবে। নিবন্ধন ও নবায়নের ক্ষেত্রে সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে চার্জ দেওয়ার শর্ত যুক্ত করা হতে পারে, যাতে জাতীয় গ্রিডের ওপর নির্ভরতা কমে।

বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সারা দেশে বিপুলসংখ্যক সোলার চার্জিং স্টেশন, বিদ্যুৎ সংরক্ষণ (স্টোরেজ) ব্যবস্থা, নিরাপদ চার্জার, মিটারভিত্তিক বিলিং এবং কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, শুধু সৌরবিদ্যুতের ওপর নির্ভর করে চার্জিং স্টেশন পরিচালনা করা কঠিন হবে। স্টোরেজ ব্যবস্থা পুরোপুরি চালু না হওয়া পর্যন্ত হাইব্রিড পদ্ধতিতে যেতে হবে। তবে এই সংকট সমাধান করা সরকারের সক্ষমতার মধ্যেই রয়েছে।

সরকারের এই উদ্যোগে একদিকে যেমন সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর লক্ষ্য রয়েছে, অন্যদিকে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমিয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করার পরিকল্পনাও সামনে এসেছে।

জনপ্রিয় খবর

আবহাওয়া

শহীদ জিয়া ও খালেদা জিয়ার কবরে নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতির শ্রদ্ধা

নিবন্ধনে থাকবে সৌরবিদ্যুতের শর্ত

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে সরকারের নতুন পরিকল্পনা

প্রকাশের সময় : ১২:৫৯:৫৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক :

জ্বালানি সংকট, বিদ্যুতের ঘাটতি এবং জাতীয় গ্রিডের ওপর বাড়তি চাপ কমাতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর পাশাপাশি নিবন্ধন ও নবায়নের শর্ত হিসেবে সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে অটোরিকশা চার্জ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা চালুর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

তবে দেশে ৬০ লাখের বেশি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার জন্য প্রয়োজনীয় সৌর চার্জিং অবকাঠামো গড়ে তোলাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

বছরে বিদ্যুৎ খরচ ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি

একসময় রাজধানীর অলিগলিতে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা প্রধান সড়কেও চলাচল করছে। দ্রুতগতির এসব তিন চাকার যানবাহনের কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়েছে। একটি গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩০ শতাংশ যাত্রী কোনো না কোনোভাবে ব্যাটারিচালিত রিকশাজনিত দুর্ঘটনার শিকার হন।

দেশে বর্তমানে প্রায় ৬০ লাখ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল করছে। এসব যানবাহনের ব্যাটারি চার্জে বছরে ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি বিদ্যুৎ ব্যয় হচ্ছে। প্রতিদিন এই খাতে প্রায় ৫৫ কোটি টাকার বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়, যার বড় অংশই আসে অবৈধ সংযোগ থেকে।

প্রতিদিন ৮৫০ মেগাওয়াট গ্রিডের ওপর চাপ

গবেষণা অনুযায়ী, একটি অটোরিকশা প্রতিদিন গড়ে ৮ থেকে ৯ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। সব মিলিয়ে এটি জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৮০০ থেকে ৮৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের সমপরিমাণ চাপ সৃষ্টি করছে, যা দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত ৫ শতাংশ।

রাজধানীতে হাজারো অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট

সরেজমিনে রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাত ও গ্যারেজে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে অটোরিকশা চার্জ দেওয়ার চিত্র দেখা গেছে।

তথ্য অনুযায়ী, শুধু ঢাকাতেই রয়েছে ৪৮ হাজার ১৩৬টি অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট এবং ৯৯২টি গ্যারেজ। এসব স্থানে অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহারের কারণে সরকার বছরে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। কোথাও শত শত ব্যাটারি একসঙ্গে চার্জ দেওয়া হচ্ছে, আবার কোথাও প্রিপেইড মিটারের অপব্যবহার করে চার্জিং কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

একজন অটোরিকশা চালক বলেন, গাড়ির চার্জ দিলেই চাঁদা চায়। চাঁদা না দিলে মারধর করে, আবার আমাদের নামে মামলা দেয়। আমরা অবৈধ কিছু করছি না।

নিবন্ধনে সৌরবিদ্যুতের শর্ত

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার মাধ্যমে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে নিবন্ধনের আওতায় আনা হবে। নিবন্ধন ও নবায়নের ক্ষেত্রে সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে চার্জ দেওয়ার শর্ত যুক্ত করা হতে পারে, যাতে জাতীয় গ্রিডের ওপর নির্ভরতা কমে।

বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সারা দেশে বিপুলসংখ্যক সোলার চার্জিং স্টেশন, বিদ্যুৎ সংরক্ষণ (স্টোরেজ) ব্যবস্থা, নিরাপদ চার্জার, মিটারভিত্তিক বিলিং এবং কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, শুধু সৌরবিদ্যুতের ওপর নির্ভর করে চার্জিং স্টেশন পরিচালনা করা কঠিন হবে। স্টোরেজ ব্যবস্থা পুরোপুরি চালু না হওয়া পর্যন্ত হাইব্রিড পদ্ধতিতে যেতে হবে। তবে এই সংকট সমাধান করা সরকারের সক্ষমতার মধ্যেই রয়েছে।

সরকারের এই উদ্যোগে একদিকে যেমন সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর লক্ষ্য রয়েছে, অন্যদিকে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমিয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করার পরিকল্পনাও সামনে এসেছে।