ফরিদপুর জেলা প্রতিনিধি :
ফরিদপুরে হত্যার পর লাশ গুম করা হয়। নিখোঁজ হওয়ার পাঁচ দিন পর আখক্ষেত থেকে হাসান শেখ (৩৫) নামে এক যুবকের বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ হত্যাকাণ্ডের আট বছর পর চার আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত। একই সঙ্গে প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে আরও এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া মরদেহ গুম করার ঘটনায় ওই চারজনকে সাত বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড ও ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। অনাদায়ে তাদের আরও ছয় মাস বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
তবে আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আসামিরা দুটি দণ্ড একসঙ্গে ভোগ করতে পারবেন। পাশাপাশি পূর্বের হাজতবাসের সময়কাল কারাদণ্ডের মেয়াদ থেকে বাদ যাবে।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ফরিদপুরের বিশেষ জজ (জেলা ও দায়রা জজ) আদালতের বিচারক মো. শরীফ উদ্দীন এ আদেশ দেন।
দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন, ফরিদপুর সদর উপজেলার কানাইপুর ইউনিয়নের ঝাউখোলা গ্রামের শাহজাহান মাতুব্বর, ফারুক বিশ্বাস, চান্দু শেখ ও ফরিদা বেগম। তাঁদের মধ্যে শাহজাহান, ফারুক ও চান্দু রায় ঘোষণার সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন। ফরিদা বেগম পলাতক রয়েছেন। রায় ঘোষণার পর উপস্থিত তিন আসামিকে পুলিশ পাহারায় কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
মামলার এজাহার ও নথি সূত্রে জানা যায়, সদর উপজেলার কানাইপুর ইউনিয়নের ঝাউখোলা গ্রামের ইমাম উদ্দিন শেখের ছেলে হাসান শেখ ২০১৮ সালের ৮ মে রাত সাড়ে ১০টার দিকে বাড়ি থেকে বের হন। এরপর পরিবারের সদস্যরা তার আত্মীয়স্বজনসহ বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তাকে না পেয়ে ১১ মে কোতোয়ালি থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
ওই ঘটনার পাঁচদিন পর ১৩ মে বিকেলে কানাইপুর ইউনিয়নের ঝাউখোলা গ্রামের দক্ষিণ মাঠে জমিতে কাজ করতে গিয়ে স্থানীয়রা একটি আখক্ষেতের ভেতর থেকে দুর্গন্ধ পান। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, বস্তার মধ্যে পড়ে আছে একটি মরদেহ। খবর পেয়ে হাসানের স্বজনরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরনের পোশাকসহ বিভিন্ন আলামতের মাধ্যমে মরদেহটি হাসানের বলে শনাক্ত করেন। বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় এলাকায় ওই সময় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
এজাহারে বলা হয়, ঘটনার প্রায় চার মাস আগে হাসানের সঙ্গে কয়েকজনের বিরোধ ও মারামারির ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় হাসানের মাথায় আঘাত লাগে বলে অভিযোগ করা হয়। পরে স্থানীয়ভাবে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা হলেও বিরোধ পুরোপুরি মেটেনি বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়।
এজাহারে আরও অভিযোগ করা হয়, বিরোধের জেরে হাসানকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। পরে ৮ মে রাতে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর তিনি নিখোঁজ হন। পাঁচদিন পর আখক্ষেত থেকে তার বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় পূর্ববিরোধের বিষয়টি মামলার তদন্তে গুরুত্ব পায়।
হাসান হত্যার ঘটনায় তার বাবা ইমাম উদ্দিন শেখ বাদী হয়ে ছয়জনকে আসামি করে কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন। পরে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মিজানুর রহমান তদন্ত শেষে চারজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
দীর্ঘ আট বছর ধরে সাক্ষ্যগ্রহণ ও নথিপত্র পর্যালোচনা শেষে আদালত চার আসামির বিরুদ্ধে হত্যা ও লাশ গোপনের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সাজা ঘোষণা করেন।
বিষয়টি নিশ্চিত করে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শাহ মো. আজিজুর রহমান বিকু বলেন, মামলায় অভিযুক্ত ছয়জনের মধ্যে চারজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় আদালত তাদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন। রাষ্ট্রপক্ষ এ রায়ে খুশি।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বিশেষ জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) এস এম আজিজুর রহমান বিকু বলেন, স্ত্রীর বিভিন্নজনের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক ও স্ত্রীর আয়ের টাকা নিজ হেফাজতে নেওয়ার ক্ষোভকে পুঁজি করে এলাকার মাদক ব্যবসায়ীরা পরিকল্পিতভাবে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন—আদালতে এ সত্য সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
ফরিদপুর জেলা প্রতিনিধি 























