না ফেরার দেশে মৃত্তিকার কবি আল মুজাহিদী

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

সাহিত্যাঙ্গনে শোকের ছায়া ফেলে না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন মৃত্তিকার কবিখ্যাত একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি আল মুজাহিদী।

শুক্রবার (১৯ জুন) দুপুরে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, কবি আল মুজাহিদী দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন জটিলতা এবং হৃদ্রোগে ভুগছিলেন। সম্প্রতি তাঁর শারীরিক অবস্থার গুরুতর অবনতি হলে এবং কিডনি জটিলতাসহ ফুসফুসে পানি জমায় তাঁকে ইউনাইটেড হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) ভর্তি করা হয়। সেখানে নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকাকালে আজ দুপুরে তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন।

তার ছেলে শাবিব আল মুজাহিদী জানান বলেন, বাবাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল গত বুধবার। এর মধ্যে দুইবার তার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়। তার ব্লাড ইনফেকশন ছিল এবং কিডনি ফেইলিউর, হার্ট ফেইলিউর সবই, অ্যাট এ টাইম সব। আজকে বেলা ১টার দিকে আবার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়। তারপর তাকে শক থেরাপি দেওয়া হয়, কিন্তু ফাইনালি আর বাঁচানো যায়নি। দেড়টার দিকে বাবা মারা যান।

আল মুজাহিদী ছিলেন একধারে কবি, গবেষক ও সম্পাদক। গত শতকের ষাটের দশকের বাংলা কবিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর হিসেবে তিনি বিবেচিত।

১৯৪৩ সালের ১ জানুয়ারি টাঙ্গাইলের গোপালপুরের নারুচি গ্রামে আল মুজাহিদীর জন্ম। তার বাবা আবদুল হালিম জামালী ছিলেন একজন নাট্যকার ও সংগঠক। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে তিনি কয়েকবার কারাবরণ করেন। আর মা সাখিনা খান ছিলেন গীত-রচয়িতা এবং সমাজকর্মী।

১৯৬০ সালে টাঙ্গাইলের করটিয়া সা’দত কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে ঢাকার জগন্নাথ কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি নেন আল মুজাহিদী। পরে সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজ বিজ্ঞান এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে তিনি দুইবার স্নাতকোত্তর করেন।

বাবার নাট্যচর্চা এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের পক্ষে তার রাজনৈতিক দর্শন আল মুজাহিদীকে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছিল। ষাটের দশকে আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে যোগ দিয়ে তাকেও বেশ কয়েকবার কারাগারে যেতে হয়। একাত্তরে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।

নিজের কাব্যশৈলীতে তিনি ষাটের দশকের আধুনিক কাব্যধারার সঙ্গে লোকায়ত গ্রামীণ ঐতিহ্যের মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। মৃত্তিকার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, প্রকৃতি, প্রেম, জাতীয় চেতনা এবং আত্মদর্শন তার কাব্যজগতের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ।

সমাজবিজ্ঞানে ভালো দখল থাকায় নৃতাত্ত্বিক, পৌরাণিক, প্রত্নতাত্ত্বিক এবং ঐতিহ্যিক উপাদানকে তিনি অবলীলায় নিজের কাব্যছন্দে আত্মীকরণ করে নেন।

আল মুজাহিদীর কবিতা সম্পর্কে সাহিত্যিক সৈয়দ আলী আহসান বলেছিলেন, তিনি প্রাচীন গ্রিক কাব্যের মৃত্তিকা বোধের প্রতি প্রবল আকর্ষণ অনুভব করেছেন। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘হেমলকের পেয়ালা’। নামটিতে বোঝা যায় গ্রিক জীবনদর্শন তাকে কত প্রবলভাবে আলোড়িত করেছিল। এ কাব্যগ্রন্থে তিনি চাঁদকে ছুঁয়ে দেখেছেন, নক্ষত্রকে স্পর্শ করেছেন এবং নীহারিকাপুঞ্জকে গ্রহণ করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কখনো মৃত্তিকাকে ভুলতে পারেননি।

দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে কবিতার পাশাপাশি গল্প, উপন্যাস, নাটক ও প্রবন্ধ রচনা করেছেন আল মুজাহিদী। তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা অর্ধশতাধিক।

হেমলকের পেয়ালা, ধ্রুপদ ও টেরাকোটা, দূত পারাবত, মৃত্তিকা অতিমৃত্তিকা, সমুদ্র মেখলা, কালের বন্দিশে, কাঁদো হিরোশিমা কাঁদো নাগাসাকি, যুদ্ধ নাস্তি, ঈভের হ্যামলেট, সহস্র দিবস সহস্র রজনী, ‎প্রাচ্য পৃথিবী, পৃথিবীর ধুলো, সৌর জোনাকি, ‎ভিতা নুওভা, অ্যাকাডেমাসের বাগান, সন্ধ্যার বৃষ্টি তার অন্যতম কাব্যগ্রন্থ।

তার লেখা উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে মানব বসতি, সনেট, আর্কিওপটেরিক্স, স্যোনাটা ও সিলুএট এবং কালমিতি।

‎প্রপঞ্চের পাখি, ‎বাতাবরণ ও ভরা কটাল মরা কটালের চাঁদ তার গল্পগ্রন্থ। রাজ করোটি ও মেরুমৈত্রী তার প্রবন্ধ সংকলন। কাইফি আজমির কবিতা, ‎পৃথিবীর কবিতা, ‎আহমদ ফরাজের কবিতা, ‎ঊর্দু কবিতা, হিন্দি কবিতা ও ‎হাইনরীশ হাইনের কবিতা তার ‎অনুবাদগ্রন্থ।

আল মুজাহিদী শিশু-কিশোরদের জন্য লিখে গেছেন উপন্যাস লালবাড়ির হরিণ, টুপুনের ডায়েরি; কবিতাগ্রন্থ ইস্টিশানে হুইসেল, সোনার মাটি রূপোর মাটি, পালকি চলে দুলকি তালে; ছড়ার বই হালুম হুলুম ও তালপাতার সেপাই।

পেশাজীবনে তিন দশকের বেশি সময় দৈনিক ইত্তেফাকের সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন আল মুজাহিদী। ২০১২ সালে সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন যায়যায় দিন পত্রিকায়। সবশেষ তার সম্পাদনায় প্রকাশিত হত ষান্মাষিক সাহিত্যপত্র ‘নতুন এক মাত্রা’।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার ২০০৩ সালে কবিকে একুশে পদকে ভূষিত করে। এছাড়া ‘জীবনানন্দ দাশ একাডেমি পুরস্কার’, ‘‎কবি জসীমউদ্দীন একাডেমি পুরস্কার’, ‎‘মাইকেল মধুসূদন একাডেমি পুরস্কার’, ‘‎শেরে বাংলা সংসদ পুরস্কার’ ও ‘‎জয়বাংলা সাহিত্য পুরস্কার’‎ পেয়েছেন তিনি।

জনপ্রিয় খবর

আবহাওয়া

না ফেরার দেশে মৃত্তিকার কবি আল মুজাহিদী

প্রকাশের সময় : ০৬:১৯:১৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

সাহিত্যাঙ্গনে শোকের ছায়া ফেলে না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন মৃত্তিকার কবিখ্যাত একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি আল মুজাহিদী।

শুক্রবার (১৯ জুন) দুপুরে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, কবি আল মুজাহিদী দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন জটিলতা এবং হৃদ্রোগে ভুগছিলেন। সম্প্রতি তাঁর শারীরিক অবস্থার গুরুতর অবনতি হলে এবং কিডনি জটিলতাসহ ফুসফুসে পানি জমায় তাঁকে ইউনাইটেড হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) ভর্তি করা হয়। সেখানে নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকাকালে আজ দুপুরে তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন।

তার ছেলে শাবিব আল মুজাহিদী জানান বলেন, বাবাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল গত বুধবার। এর মধ্যে দুইবার তার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়। তার ব্লাড ইনফেকশন ছিল এবং কিডনি ফেইলিউর, হার্ট ফেইলিউর সবই, অ্যাট এ টাইম সব। আজকে বেলা ১টার দিকে আবার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়। তারপর তাকে শক থেরাপি দেওয়া হয়, কিন্তু ফাইনালি আর বাঁচানো যায়নি। দেড়টার দিকে বাবা মারা যান।

আল মুজাহিদী ছিলেন একধারে কবি, গবেষক ও সম্পাদক। গত শতকের ষাটের দশকের বাংলা কবিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর হিসেবে তিনি বিবেচিত।

১৯৪৩ সালের ১ জানুয়ারি টাঙ্গাইলের গোপালপুরের নারুচি গ্রামে আল মুজাহিদীর জন্ম। তার বাবা আবদুল হালিম জামালী ছিলেন একজন নাট্যকার ও সংগঠক। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে তিনি কয়েকবার কারাবরণ করেন। আর মা সাখিনা খান ছিলেন গীত-রচয়িতা এবং সমাজকর্মী।

১৯৬০ সালে টাঙ্গাইলের করটিয়া সা’দত কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে ঢাকার জগন্নাথ কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি নেন আল মুজাহিদী। পরে সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজ বিজ্ঞান এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে তিনি দুইবার স্নাতকোত্তর করেন।

বাবার নাট্যচর্চা এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের পক্ষে তার রাজনৈতিক দর্শন আল মুজাহিদীকে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছিল। ষাটের দশকে আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে যোগ দিয়ে তাকেও বেশ কয়েকবার কারাগারে যেতে হয়। একাত্তরে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।

নিজের কাব্যশৈলীতে তিনি ষাটের দশকের আধুনিক কাব্যধারার সঙ্গে লোকায়ত গ্রামীণ ঐতিহ্যের মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। মৃত্তিকার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, প্রকৃতি, প্রেম, জাতীয় চেতনা এবং আত্মদর্শন তার কাব্যজগতের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ।

সমাজবিজ্ঞানে ভালো দখল থাকায় নৃতাত্ত্বিক, পৌরাণিক, প্রত্নতাত্ত্বিক এবং ঐতিহ্যিক উপাদানকে তিনি অবলীলায় নিজের কাব্যছন্দে আত্মীকরণ করে নেন।

আল মুজাহিদীর কবিতা সম্পর্কে সাহিত্যিক সৈয়দ আলী আহসান বলেছিলেন, তিনি প্রাচীন গ্রিক কাব্যের মৃত্তিকা বোধের প্রতি প্রবল আকর্ষণ অনুভব করেছেন। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘হেমলকের পেয়ালা’। নামটিতে বোঝা যায় গ্রিক জীবনদর্শন তাকে কত প্রবলভাবে আলোড়িত করেছিল। এ কাব্যগ্রন্থে তিনি চাঁদকে ছুঁয়ে দেখেছেন, নক্ষত্রকে স্পর্শ করেছেন এবং নীহারিকাপুঞ্জকে গ্রহণ করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কখনো মৃত্তিকাকে ভুলতে পারেননি।

দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে কবিতার পাশাপাশি গল্প, উপন্যাস, নাটক ও প্রবন্ধ রচনা করেছেন আল মুজাহিদী। তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা অর্ধশতাধিক।

হেমলকের পেয়ালা, ধ্রুপদ ও টেরাকোটা, দূত পারাবত, মৃত্তিকা অতিমৃত্তিকা, সমুদ্র মেখলা, কালের বন্দিশে, কাঁদো হিরোশিমা কাঁদো নাগাসাকি, যুদ্ধ নাস্তি, ঈভের হ্যামলেট, সহস্র দিবস সহস্র রজনী, ‎প্রাচ্য পৃথিবী, পৃথিবীর ধুলো, সৌর জোনাকি, ‎ভিতা নুওভা, অ্যাকাডেমাসের বাগান, সন্ধ্যার বৃষ্টি তার অন্যতম কাব্যগ্রন্থ।

তার লেখা উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে মানব বসতি, সনেট, আর্কিওপটেরিক্স, স্যোনাটা ও সিলুএট এবং কালমিতি।

‎প্রপঞ্চের পাখি, ‎বাতাবরণ ও ভরা কটাল মরা কটালের চাঁদ তার গল্পগ্রন্থ। রাজ করোটি ও মেরুমৈত্রী তার প্রবন্ধ সংকলন। কাইফি আজমির কবিতা, ‎পৃথিবীর কবিতা, ‎আহমদ ফরাজের কবিতা, ‎ঊর্দু কবিতা, হিন্দি কবিতা ও ‎হাইনরীশ হাইনের কবিতা তার ‎অনুবাদগ্রন্থ।

আল মুজাহিদী শিশু-কিশোরদের জন্য লিখে গেছেন উপন্যাস লালবাড়ির হরিণ, টুপুনের ডায়েরি; কবিতাগ্রন্থ ইস্টিশানে হুইসেল, সোনার মাটি রূপোর মাটি, পালকি চলে দুলকি তালে; ছড়ার বই হালুম হুলুম ও তালপাতার সেপাই।

পেশাজীবনে তিন দশকের বেশি সময় দৈনিক ইত্তেফাকের সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন আল মুজাহিদী। ২০১২ সালে সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন যায়যায় দিন পত্রিকায়। সবশেষ তার সম্পাদনায় প্রকাশিত হত ষান্মাষিক সাহিত্যপত্র ‘নতুন এক মাত্রা’।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার ২০০৩ সালে কবিকে একুশে পদকে ভূষিত করে। এছাড়া ‘জীবনানন্দ দাশ একাডেমি পুরস্কার’, ‘‎কবি জসীমউদ্দীন একাডেমি পুরস্কার’, ‎‘মাইকেল মধুসূদন একাডেমি পুরস্কার’, ‘‎শেরে বাংলা সংসদ পুরস্কার’ ও ‘‎জয়বাংলা সাহিত্য পুরস্কার’‎ পেয়েছেন তিনি।