নিজস্ব প্রতিবেদক :
পাবলিক পরীক্ষা আইনে ডিজিটাল নকলের সাজা যুক্ত করা হয়েছে, যেখানে পরীক্ষার ফলাফল, মেধাতালিকায় হ্যাকিং বা অবৈধভাবে পরিবর্তনের জন্য সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদন্ড এবং জরিমানার বিধান রয়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
শুক্রবার (১৯ জুন) রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে রোটারি বাংলাদেশ আয়োজিত ‘লিডার্স ট্রেনিং সেমিনার’ ও ‘ইনকামিং লিডার্স সেমিনার’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, শিক্ষার্থীদের এমন ভাবে গড়ে তুলতে হবে যাতে তারা বিশ্ব নেতৃত্ব দিতে পারে। আর বর্তমান সরকার, সেভাবেই শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলছে। এছাড়া সকলকে উচ্চ শিক্ষা দিয়ে, বেকারত্বের কারখানা তৈরি করা যাবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, সরকার কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় গুরুত্ব দিচ্ছে। পাশাপাশি, ৬ষ্ঠ শ্রেণি থেকেই পাঠ্যবইয়ে কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধ ও পাবলিক পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল মাধ্যমে নকল, ফলাফল বা মেধাতালিকায় হ্যাকিং এবং অবৈধ পরিবর্তনের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে বলে জানিয়ে ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, এ ধরনের অপরাধে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রেখে ‘পাবলিক পরীক্ষা আইন’ মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পেয়েছে।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, শিক্ষার্থীদের এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যাতে তারা বিশ্বমঞ্চে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হয়। সে লক্ষ্যেই সরকার শিক্ষাব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করছে। শুধু উচ্চশিক্ষার প্রসার ঘটিয়ে দেশে ‘বেকারত্বের কারখানা’ তৈরি করা যাবে না। বরং তরুণদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করাই সরকারের মূল লক্ষ্য।
তিনি জানান, বর্তমান সরকার কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের ভিত্তিতে আগামীতে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই পাঠ্যবইয়ে কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীরা অল্প বয়স থেকেই কর্মমুখী দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবে।
অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী আরও জানান, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৩ অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের ৫০০ টাকা করে প্রণোদনা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তবে এ অর্থ পাওয়ার জন্য প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে অন্তত তিনজন নিরক্ষর মানুষকে সাক্ষরজ্ঞান দিতে হবে।
তিনি বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ‘অক্ষরদান’ কর্মসূচির ধারণা থেকেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একজন শিক্ষার্থী তিনজনকে অক্ষরজ্ঞান দিলে অল্প সময়ের মধ্যেই নিরক্ষরতা দূরীকরণে বড় ধরনের অগ্রগতি সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, সরকারের লক্ষ্য শুধু সনদধারী শিক্ষার্থী তৈরি করা নয়; বরং এমন দক্ষ, মানবিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক গড়ে তোলা, যারা দেশের উন্নয়ন ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, পলিটিক্স করতে হবে অন্যের জন্য, নিজের জন্য নয়। এই শিক্ষার পরেও, ওই জুলাই ৩৬-এর শিক্ষার পরেও যদি বাংলাদেশের জনগণের পলিটিশিয়ানরা শিক্ষা না নেয়, তাহলে আমি জানি না ভবিষ্যতে কী হবে। প্রধানমন্ত্রী দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে পুরোনো কাঠামো থেকে বের করে নতুনভাবে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি (প্রধানমন্ত্রী) আমাকে বলছিলেন, আমি যখন ইংল্যান্ডে ছিলাম, সকালে উঠে দেখতাম বাচ্চারা কত সুন্দর পোশাক পরে, জুতা-মোজা পরে স্কুলে যাচ্ছে। তখন ভাবতাম, আমার দেশে কবে এটা হবে। এখন ভাবার সময় শেষ, করার সময়। তিনি দেশে এসেছেন, প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, তাই নির্দেশ দিয়েছেন—এটা আমাদের করতে হবে।
তিনি বলেন, দেশমাতা বেগম খালেদা জিয়া শিশুদের জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষা কর্মসূচি চালু করেছিলেন। পরে চালু করেন টাকার বিনিময়ে শিক্ষা কর্মসূচি। তিনি মেয়েদের জন্য দশম শ্রেণি পর্যন্ত উপবৃত্তি চালু করেন, পরে তা উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে সম্প্রসারণ করেন। একই সঙ্গে ছেলেদের জন্যও উপবৃত্তি চালুর উদ্যোগ নেন। তিনি বলেছিলেন, আবার দায়িত্ব পেলে ডিগ্রি পর্যন্ত মেয়েদের উপবৃত্তির ব্যবস্থা করবেন। উনার ভাগ্যে সেটা হয়নি। কিন্তু উনার জ্যেষ্ঠ সন্তান জনাব তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি মেয়েদের ডিগ্রি পর্যন্ত উপবৃত্তির ব্যবস্থা করলেন। অর্থাৎ ধারাবাহিকতা রয়েছে—মা যেভাবে দেখেছেন, ছেলে ঠিক সেভাবেই দেখছেন।
মিলন আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের জন্য মিডডে মিল চালু করা হচ্ছে, যাতে তারা ভালোভাবে বেড়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে তাদের খেলাধুলা ও পড়াশোনাকে আনন্দময় করতে ‘লার্নিং হ্যাপি ক্লাস’, খেলাধুলা, সংস্কৃতি, পারিবারিক মূল্যবোধ, ধর্মীয় মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও চারিত্রিক মূল্যবোধ শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এমনকি সাতার, দাবাসহ বিভিন্ন খেলাও প্রাথমিক স্তর থেকেই অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘তিনি মাত্র ১৬ দিনের জন্য শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছিলেন। আমার অফিসে একটি বোর্ড রয়েছে, সেখানে লেখা আছে—জিয়াউর রহমান, এডুকেশন মিনিস্টার, ১৬ দিন মাত্র। আমি এখনো বসে ভাবি, ১৬ দিনে তিনি যে পরিবর্তন এনেছিলেন, বোধ হয় ওই পরিমাণ কাজ আমরা করতে পারিনি।’
তিনি বলেন, ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে নকলের জন্য কোনো শাস্তির বিধান ছিল না। সরকার সেটি এখন অন্তর্ভুক্ত করেছে। উনার ভিশনারি আইকিউ ছিল। যে বিষয় নিয়ে তিনি কাজ করেছেন, তা সত্যিই অবিশ্বাস্য।
রোটারি ইন্টারন্যাশনালের কার্যক্রমের প্রশংসা করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, রোটারিয়ানরা সেবার জন্য কাজ করেন, কিছু পাওয়ার জন্য নয়। রোটারির চারটি সত্যকে শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব এসেছে এবং কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সামনে উদাহরণমূলক বিষয়গুলো তুলে ধরার ব্যাপারে সরকার ইতিবাচক।
তিনি বলেন, ছোটবেলায় যে কবিতাগুলো মুখস্থ করেছি, এখনো সেগুলো মনে আছে। কিন্তু বড় হয়ে প্রতিদিন কত কিছু পড়ছি, সেগুলো অনেক সময় মনে থাকে না। তাই শিশুদের ছোটবেলা থেকেই সঠিক মূল্যবোধ শেখানো আমাদের দায়িত্ব।
বাংলাদেশ পুরো বিশ্বকে নেতৃত্ব দিতে পারে। কারণ আমরা অত্যন্ত জনবহুল দেশ। অনেকে জনসংখ্যাকে বোঝা মনে করে, কিন্তু আমি মনে করি এটাই আমাদের আশীর্বাদ।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















