নিজস্ব প্রতিবেদক :
জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনে সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রকল্প বাস্তবায়নের দুর্বলতা দূর করা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি। তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য শুধু ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি গঠন নয়, সেই অর্থনীতিতে বৈষম্য কমিয়ে একটি মানবিক, গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা।
সোমবার (৪ মে) জেলা প্রশাসক সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে ডিসিদের পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী কী দিকনির্দেশনা দেওয়া হলো তার তথ্য তুলে ধরতে গিয়ে তিনি এসব বলেন।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, জনগণের বিপুল আস্থা ও সমর্থন নিয়ে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেছে। সরকারের পরিষ্কার লক্ষ্য ও পরিকল্পনা রয়েছে। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে মাঠ প্রশাসন, বিশেষ করে জেলা প্রশাসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। সম্মেলনে আলোচনা হচ্ছে কীভাবে সরকারের পরিকল্পনা মাঠপর্যায়ে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, প্রশাসনকে আরো দক্ষ ও কার্যকর করা যায় এবং বাস্তবায়নের পথে কী কী প্রতিবন্ধকতা রয়েছে।
তিনি আরো বলেন, সরকার ইতোমধ্যে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। তবে সেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল যাতে কেবল একটি অংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং বৈষম্য কমিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে ওঠে, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ জন্য উপযোগী প্রশাসনিক কাঠামো ও সক্ষমতা তৈরির কাজ চলছে।
জোনায়েদ সাকি বলেন, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় নতুন একটি স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করছে। আগে যেখানে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ছিল, সেখানে এখন দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যকে সামনে রেখে নতুন কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। এই ফ্রেমওয়ার্কের প্রথম দুই বছরের মূল লক্ষ্য হবে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করা।
তিনি আরো বলেন, বর্তমান সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে একটি বিপর্যস্ত অর্থনীতি পেয়েছে। শুধু অর্থনৈতিক কাঠামো নয়, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাই প্রথম কাজ হচ্ছে অর্থনীতি ও প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন করা, এরপর সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়া।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নে কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়নে গুণগত মান নিশ্চিত হয় না, দুর্নীতি ও অপচয় ঘটে। এসব সমস্যা কমিয়ে উন্নয়ন বাজেটের সর্বোচ্চ মান নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। এ জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হচ্ছে।
ডিসিদের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতার কথা তুলে ধরা হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে জমি অধিগ্রহণ একটি বড় সমস্যা। এ ছাড়া আর্থিক বর্ষের সময়সীমা, মূল্যায়ন ও পরিবীক্ষণ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং দুর্নীতিও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠে এসেছে। জেলা প্রশাসকেরা এসব বিষয়ে লিখিত প্রস্তাবও দিয়েছেন।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার তার যে নির্বাচনি ম্যান্ডেট, জনগণ যে বিরাট আস্থা এবং ভরসা নিয়ে এই সরকারকে নির্বাচিত করেছে এই সরকারের পরিষ্কার লক্ষ্য আছে, পরিকল্পনা আছে এবং সেটা বাস্তবায়ন করার জন্য তো সমগ্র প্রশাসন এবং বিশেষভাবে জেলা প্রশাসন মাঠ পর্যায়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই বিষয়গুলো নিয়েই মূলত আলোচনা হচ্ছে যে, কীভাবে মাঠ পর্যায়ে সরকারের লক্ষ্য এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যাবে এবং সেটা করার ক্ষেত্রে নানা অসুবিধাগুলো কী কী, কীভাবে আরও দক্ষ এবং কার্যকর প্রশাসন গড়ে তোলা যাবে যার মধ্য দিয়ে সরকারের লক্ষ্য-পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবে এবং একটা মানবিক, গণতান্ত্রিক, একটা কল্যাণকামী রাষ্ট্র এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা যাবে।
তিনি বলেন, এই সরকারের একটা লক্ষ্য এরই মধ্যে ঘোষিত হয়েছে- ট্রিলিয়ন ডলার ইকোনমি। কিন্তু সেই ট্রিলিয়ন ডলার ইকোনমির মধ্যে বৈষম্য যাতে বৃদ্ধি না পায়, বরং অন্তর্ভুক্তিমূলক একটা বৈষম্য কমিয়ে এনে যথাসম্ভব একটা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যাতে গড়ে তোলা যায়। তো সেজন্য সরকারের যে পরিকল্পনা সেগুলো বাস্তবায়নের উপযোগী একটা যাকে বলে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা—সেটা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে এবং প্রত্যেক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেই তাদের এরই মধ্যে যে প্রস্তুতিগুলো সেগুলো তুলে ধরা হচ্ছে।
এ ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসনের দিক থেকে যে বাধাগুলো আসে, যে সমস্ত সমস্যার তারা মুখোমুখি হন সেসব বিষয়গুলো নিয়ে তারা প্রশ্ন করছেন, তারা তাদের মতামত দিচ্ছেন এবং একটা ইন্টারঅ্যাকশনের মধ্য দিয়ে আমরা কতগুলো ধারণার মধ্যে পৌঁছাচ্ছি, বোঝাপড়ার মধ্যে পৌঁছাচ্ছি যেখান থেকে আসলে পরবর্তীকালে এই কার্যক্রমগুলো বাস্তবায়নে সুবিধা হবে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় একটা স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এটা আসলে একটা ফ্রেমওয়ার্ক। আগে তো পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ছিল। সরকার এসে এখন পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার জন্য যে সময়টা একটা লাগে, সে ক্ষেত্রে আমরা একটা স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করছি। এবং এর মধ্যে প্রথম দুই বছর আসলে মূলত একটা অর্থনীতিকে কতটা পুনরুদ্ধার করা যায়—আপনারা জানেন যে এই সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে যে ধরনের একটা অর্থনীতি পেয়েছে, সেটা ভীষণভাবে বিপর্যস্ত। প্রতিষ্ঠানগুলো নানাভাবে বিপর্যস্ত। অর্থনৈতিক কাঠামো এবং প্রাতিষ্ঠানিক জায়গা—সবগুলোই বিপর্যস্ত হওয়ার ফলে এই স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্কের মূল লক্ষ্য হচ্ছে কীভাবে আমরা পুনরুদ্ধার করব এবং তারপর আমরা সমৃদ্ধির দিকে যাবো।
সে ক্ষেত্রে একটা বড় বাধা হচ্ছে কাঠামোগত দিক থেকে যে উন্নয়ন বাজেট যেটা—যেটা পাবলিক এক্সপেন্ডিচার—সেটার আসলে যথার্থভাবে বাস্তবায়নটা হয় না। সে ক্ষেত্রে কোয়ালিটিরও নানা জায়গা থাকে, অনেক দুর্নীতি কিংবা লিকেজ থাকে। সেসব ক্ষেত্রে কীভাবে উন্নতিটা আনা যায়—অর্থাৎ যা উন্নয়ন বাজেট হবে, সেই উন্নয়ন বাজেটকে সর্বোচ্চ কোয়ালিটি নিয়ে অর্থাৎ কী বলে কোয়ালিটি… গুণগত মান বজায় রেখে দুর্নীতি কমিয়ে এইসব প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন—এটা একটা কীভাবে তার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা তৈরি করা যায় সেগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ডিসিরা তুলেছেন যে এই প্রকল্প বাস্তবায়নে সমস্যাগুলো কী। মূল্যায়ন-পরিবীক্ষণ যে বিভাগ আছে সেটা আসলে জেলা পর্যায়ে এর কাঠামো দরকার—সেইসব বিষয় নিয়ে এখানে কথা হয়েছে।
তিনি বলেন, আসলে সরকারের দিক থেকে সরকার দুটো কাজ করছে। একদিকে হচ্ছে যে এই যে বর্তমান যে এডিপি কিংবা চলমান যে সমস্ত প্রকল্প এগুলোকে সরকারের যে মেনিফেস্টো আছে ইশতেহার ৩১ দফা এবং তারপর নির্বাচনি ইশতেহার একই সঙ্গে এসডিজি, তারপর আমাদের তো একটা এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের প্রশ্ন আছে। আমরা টাইম এক্সটেনশন চেয়েছি কিন্তু সেটার জন্য তো প্রস্তুতি আমাদের নিতে হবে। এই সবগুলোর সঙ্গে যাতে এটাকে সমন্বয় করা যায়, অ্যালাইন করা যায় এবং এই প্রকল্পগুলো সেজন্য প্রয়োজনীয় যদি কোথাও সংশোধন-সংযোজন-বিয়োজনের প্রয়োজন হয় সেভাবে অ্যালাইন করা। এবং সবচেয়ে বড় ব্যাপারটা হচ্ছে নতুন যে প্রকল্পগুলো গ্রহণ করা হবে সেই প্রকল্পগুলো এই নির্বাচনি ইশতেহারের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলা এবং সে ক্ষেত্রে কেবল পিসমিল আকারে প্রকল্প না নেওয়া, বিচ্ছিন্ন বিচ্ছিন্ন প্রকল্প না নেওয়া।
ইশতেহারকে একটা প্রোগ্রামে পরিণত করে সেই প্রোগ্রামের অধীনে প্রকল্পগুলোকে দেখা—অর্থাৎ একটার সাথে আরেকটার যে পরস্পর নির্ভরশীলতা এবং সব মিলিয়ে একটা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জন করা—সেই জায়গাতে প্রকল্পগুলোকে সেভাবে গ্রহণ করা হচ্ছে এই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা।
পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগকে (এসআইডি) একেবারে নতুন করে সাজানো হচ্ছে জানিয়ে জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, রিয়েল টাইম ডাটা যাতে সংগৃহীত হয়, কোনো ডাটা ম্যানিপুলেশন যাতে না হয়, কোনো উপাত্ত যাতে একেবারে সত্যিকারের বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে, সেই দিকে সরকার মনোযোগ দিচ্ছে। অন্যদিকে আইএমইডির মতো প্রতিষ্ঠান, যেটা পরিবীক্ষণ মূল্যায়ন করবে, সেটাকে কীভাবে শক্তিশালী করা যায়, প্রতিটি প্রকল্পের গুণগত মান এবং তার অর্থব্যয় সাশ্রয়ী জায়গাটা নিশ্চিত করা।
ভ্যালু অব মানি মানে সাশ্রয়ী প্রকল্প করা এবং অর্থের গুরুত্বটাকে জনগণের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে সর্বাধিক গুরুত্বের জায়গাটা দেওয়া বিবেচনাটা রাখা—এটা সরকারের লক্ষ্য। প্রকল্পগুলো বিনিয়োগ যেটা হচ্ছে সেখান থেকে কী আয় আসবে ফেরত আসবে, রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট কী হবে সেই জায়গাটা গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া।
সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনায় কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যেখানে ১ কোটি চাকরি তৈরির লক্ষ্য সামনে রেখে প্রতিটি প্রকল্প মূল্যায়ন করা হচ্ছে। পাশাপাশি পরিবেশগত ভারসাম্য, বৈষম্য হ্রাস এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তুলে দেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।
তিনি আরও জানান, এই লক্ষ্য অর্জনে এডিপি বাস্তবায়নের দক্ষতা ও কার্যকারিতা বাড়াতে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা জোরদার করছে, যা কেন্দ্র থেকে মাঠপর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জেলা প্রশাসক সম্মেলনেও এ বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
অন্যদিকে জমি অধিগ্রহণ, অর্থবছরের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, পর্যাপ্ত পরিবীক্ষণ ঘাটতি এবং দুর্নীতিকে প্রকল্প বাস্তবায়নের বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দীর্ঘসূত্রতা, ব্যয় বৃদ্ধি ও সময় বাড়ানোর প্রবণতা কাটিয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সাশ্রয়ীভাবে প্রকল্প শেষ করতে সরকার নীতিমালা ও সুনির্দিষ্ট অ্যাকশন প্ল্যান প্রণয়নে কাজ করছে বলেও জানিয়েছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী।
নিজস্ব প্রতিবেদক 




















