নিজস্ব প্রতিবেদক :
জামায়াতে ইসলামীকে ঘিরে কড়া সমালোচনা করেছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি অভিযোগ করেছেন, অনেক ‘গুপ্ত চাঁদাবাজ’ জামায়াতে ইসলামীতে আশ্রয় নিয়েছে।
রোববার (৩১ মে) সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস) আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে ‘সাংস্কৃতিক অঙ্গনে জিয়াউর রহমানের অবদান’ শীর্ষক এ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।
রুহুল কবির রিজভী বলেন, জামায়াতে ইসলামী বড় বড় কথা বললেও নিজেদের দিকেও তাকানো উচিত। তিনি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন জায়গায় চাঁদাবাজি ও অনিয়মের ঘটনায় জামায়াতের নেতাকর্মীদের নাম এসেছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি মিরসরাইয়ে ফেনী নদী থেকে বালু উত্তোলনের ঘটনায় জামায়াতের দুই নেতার নাম আলোচনায় আসার কথা উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, ফেনীতে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার কথা বলে এক নেতা টাকা নিয়েছেন বলেও গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। রিজভীর দাবি, এসব ঘটনা প্রমাণ করে জামায়াত নিজেদের ভেতরের অনিয়ম আড়াল করার চেষ্টা করে।
রিজভী বলেন, ধর্মের নামে রাজনীতি করেন, সবাই নাকি পবিত্র মানুষ। কিন্তু যেমন তারা আগে গুপ্ত রাজনীতি করেছে, ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের ভেতরে ঢুকে থেকেছে; তেমনি অনেক গুপ্ত চাঁদাবাজও এখন জামায়াতের মধ্যে আশ্রয় নিয়েছে।
জামায়াতের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ তুলে বিএনপির এই নেতা বলেন, চাঁদাবাজির ক্ষেত্রে তারা সরাসরি চাঁদাবাজি শব্দ ব্যবহার না করে আরবি শব্দ দিয়ে সেটিকে ঢাকার চেষ্টা করে। তার ভাষায়, চাঁদাবাজি না বলে আপনারা সেটাকে হাদিয়াবাজি, ইয়ানতবাজি বলেন। আরবি শব্দ দিয়ে বিষয়টাকে ঢাকার চেষ্টা করেন। কিন্তু এই হাদিয়াবাজি-ইয়ানতবাজি আপনারা কম করেন না।
রিজভী বলেন, রাজনৈতিক দলে নানা ধরনের মানুষ ঢুকে পড়তে পারে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দলটি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে কি না। তিনি দাবি করেন, ৫ আগস্টের পর বিএনপির ভেতরে যেসব নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, বিএনপির চেয়ারম্যান এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শক্ত হাতে শত শত নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করেছেন, অব্যাহতি দিয়েছেন এবং শোকজ করেছেন। শক্তিশালী নেতা থেকে তৃণমূল পর্যায় কেউ ছাড় পায়নি।
জামায়াতকে উদ্দেশ করে রিজভী বলেন, আপনাদের অনেক রোকন ও সাংগঠনিক কাঠামোর বিভিন্ন স্তরের লোকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। পত্রিকায় প্রকাশের পর কখনো কখনো বহিষ্কার করেছেন। কিন্তু যাদের ঘটনা ধরা পড়েনি, তারা তো এখনো দলের ভেতরেই আছে।
তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, আপনারা ফেরেশতা হয়ে গেলেন কীভাবে? এত পরিশুদ্ধ হলেন কীভাবে?” রিজভীর দাবি, জামায়াত বড় বড় কথা বলছে এই ভেবে যে তারা হয়তো ক্ষমতায় চলে আসবে। তবে বাংলাদেশের মানুষের মানসিকতা তারা বুঝতে পারেনি।
রুহুল কবির রিজভী বলেন, এ দেশের মানুষ ধর্মভীরু, কিন্তু জামায়াতকে পছন্দ করে না। আবার দেশের মানুষ ধর্মবিরোধী কর্মকাণ্ডও পছন্দ করে না। তার মতে, বাংলাদেশের মানুষ ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী হলেও রাজনৈতিকভাবে চরমপন্থা বা দ্বিচারিতা মেনে নেয় না।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব বলেন, দেশে এখন গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে এসেছে। রাজনৈতিক দলগুলো স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করতে পারছে, সরকারের সমালোচনা করতে পারছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে অপপ্রচার ও মিথ্যাচারের রাজনীতি এখনও থামেনি।
রিজভী বলেন, গণতন্ত্রের আবহে সবাই কথা বলবে, সরকারের সমালোচনাও করবে। তবে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা কিংবা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে অপপ্রচার চালানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন সত্যিকারের দেশপ্রেমিক ও জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রনায়ক। তার সততা, দেশপ্রেম, নেতৃত্বগুণ ও রাষ্ট্র পরিচালনার দক্ষতা নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষও কখনো প্রশ্ন তোলেনি। তিনি এমন এক নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন, যা আজও দেশের রাজনীতিতে অনুসরণীয়।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব বলেন, জিয়াউর রহমান দেশের কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছিলেন। তার খাল খনন কর্মসূচি নিয়ে বিরোধীরা নানা কটাক্ষ করলেও বাস্তবে সেই খাল দেশের কৃষি উৎপাদন বাড়িয়েছে, মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি করেছে এবং খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথ সুগম করেছে।
রিজভী বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও তার পিতার উন্নয়ন দর্শন অনুসরণ করে খাল, নদী ও জলাশয় পুনঃখননের উদ্যোগ নিয়েছেন। দায়িত্ব গ্রহণের আগেই তিনি এসব বিষয়ে পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন এবং এখন তা বাস্তবায়ন শুরু করেছেন।
সাংস্কৃতিক অঙ্গনের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, কোনো পরাশক্তি যখন একটি দেশের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে চায়, তখন প্রথমেই সে দেশের সাংস্কৃতিক ভিত্তিকে দুর্বল করার চেষ্টা করে। তাই জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ সাংস্কৃতিক কর্মীদের দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষায় আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
কয়েকটি দলের নেতাদের সাম্প্রতিক মন্তব্যের সমালোচনা করে বিএনপির সিনিয়র এ নেতা বলেন, জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপির অবস্থান সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। অথচ সরকারপ্রধান নিজেই বলেছেন, জুলাই সনদের বিষয়গুলো বাস্তবায়নে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণ নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রসঙ্গে রিজভী বলেন, ঈদের দিন থেকেই সিটি কর্পোরেশনের কর্মীরা মাঠে কাজ করেছেন। পরদিন প্রধানমন্ত্রী নিজে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেছেন এবং যেখানে গাফিলতি পেয়েছেন, সেখানে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, বিএনপি কোনো ধরনের অনিয়ম বা চাঁদাবাজিকে প্রশ্রয় দেয় না। দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ইতোমধ্যে শত শত নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ হলেও ধর্মের নামে ব্যবসা কিংবা রাজনৈতিক সুবিধাবাদকে সমর্থন করে না বলেও মন্তব্য করেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব। বলেন, দেশের মানুষ যেমন ধর্মবিরোধী উগ্রতা পছন্দ করে না, তেমনি ধর্মকে ব্যবহার করে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টাও গ্রহণ করে না।
রিজভী বলেন, জান্নাতের টিকিট বিক্রির রাজনীতি যেমন মানুষ গ্রহণ করে না, তেমনি ধর্ম নিয়ে কটূক্তি বা অবমাননাকেও মেনে নেয় না। বাংলাদেশের মানুষের অবস্থান সবসময় মধ্যপন্থায়, সহনশীলতায় ও জাতীয় স্বার্থের পক্ষে।
রিজভী বলেন, ‘একদিকে যেমন ধর্ম ব্যবসা জামায়াত করেছে তাদেরকেও পছন্দ করে না। এদেশের মানুষ আবার একবারে ধর্মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহকারী আওয়ামী লীগের যে সমস্ত সহযোগীরা আছে তাদের যে কর্মকাণ্ড সেটাও পছন্দ করে না। আওয়ামী লীগের এক নেতা যেমন বলেছিলেন মনে নাই আপনাদের..লতিফ সিদ্দিকী যে হজ মক্কা শরীফে এগুলো নিয়ে কি মন্তব্য করেছিলেনৃহজ আরবরা অর্থনৈতিক কারণে করেছেৃমানুষ এগুলো পছন্দ করেনি। আবার ধর্মের নাম বিক্রি করে ধর্ম ব্যবসা করে জান্নাতের টিকিট বিক্রি করে মানুষকে ধোঁকা দেওয়া এটাও এদেশের মানুষ কোনদিনই এটা পছন্দ করেনি।’
জাসাসের উদ্দেশ্যে বিএনপির এই সিনিয়র নেতা বলেন, ‘আমি মনে করি যে, জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন তারা একটা এদেশের মৃত্তিকা থেকে উৎসারিত আমাদের যে সংস্কৃতির যে স্ফুরণ সেটার অনুশীলন এবং চর্চা করা এর সঙ্গে সংস্কৃতি মানেই শুধু নিজস্ব সেটা না। পৃথিবীর ভালো ভালো যে সাংস্কৃতিক অর্জনগুলো সেগুলোকে গ্রহণ করতেও তো কোনো অসুবিধা নেই।’
জাসাসের যুগ্ম আহ্বায়ক আনিসুল ইসলাম সানির সভাপতিত্বে ও সদস্য সচিব জাকির হোসেন রোকনের সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় বিএনপির সাংস্কৃতিক সম্পাদক আশরাফ উদ্দিন উজ্জ্বল, স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক মীর সরাফত আলী সপু, তাঁতী দলের আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ, জাসাসের লিয়াকত আলী লাকি, ফেরদৌস ফকির, জাবেদ আহমেদ কিসলু, খালেদুজ্জামান জুয়েল, ফরহাদ হোসেন নিয়ন, রাফিজা আলম লাকি প্রমুখ বক্তব্য দেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 
























