নিজস্ব প্রতিবেদক :
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক হয়রানির উদ্দেশ্যে দায়ের করা মামলাগুলো প্রত্যাহারের বিষয়ে সরকার অত্যন্ত সচেতন এবং এ লক্ষ্যে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে সংসদ সদস্য মো. মনোয়ার হোসেনের এক প্রশ্নের এক লিখিত জবাবে তিনি এ কথা বলেন। ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন।
আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দায়েরকৃত হয়রানিমূলক মামলাগুলো প্রত্যাহারের বিষয়ে বর্তমান সরকার সম্পূর্ণ সচেতন এবং এ লক্ষ্যে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। উল্লেখ্য যে, এর পূর্বে অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের জন্য একটি কমিটি গঠন করেছিল।
ওই কমিটির নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কোনো হত্যা মামলা প্রত্যাহার করা হয়নি।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার বিগত ৫ মার্চ ২০২৬ তারিখে হয়রানিমূলক রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ করার লক্ষ্যে জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসকের সমন্বয়ে ৪ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করেছে।
ওই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার জন্য বর্তমান সরকার ৮ মার্চ ২০২৬ তারিখে আইনমন্ত্রীকে আহ্বায়ক করে ৬ সদস্যবিশিষ্ট ‘কেন্দ্রীয় কমিটি’ গঠন করেছে। কেন্দ্রীয় কমিটি জেলা কমিটির নিকট হতে প্রাপ্ত সুপারিশগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মামলা প্রত্যাহারের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।
আইনমন্ত্রী বলেন, সংসদ সদস্যসহ যে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে দায়েরকৃত যে কোনো ধরনের রাজনৈতিক (হত্যা মামলাসহ) মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের জন্য যথাযথ প্রক্রিয়ায় আবেদন করা হলে গঠিত জেলা ও কেন্দ্রীয় কমিটি মামলাগুলো পর্যালোচনা করবে। পর্যালোচনায় কোনো মামলা রাজনৈতিকভাবে হয়রানিমূলক বলে প্রতীয়মান হলে সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। সরকার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দায়েরকৃত হয়রানিমূলক মামলা থেকে ভুক্তভোগীদের প্রতিকার প্রদানে আন্তরিকভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর লিখিত প্রশ্নে বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ হতে সম্পূর্ণ স্বাধীন করবার ক্ষেত্রে কী কী আইনি বা প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা ছিল এবং সেই সময়ে নিম্ন আদালতের বিচারকদের বদলি ও নিয়োগের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপের যে অভিযোগ ছিল, সেই ব্যাপারে বর্তমান সরকারের মূল্যায়ন কী?
জবাবে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে স্বাধীন করার ক্ষেত্রে কোনো আইনি বা প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা ছিল না। তবে, ফ্যাসিস্ট সরকার বিচারকদের বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে দলীয় আনুগত্যকে মুখ্য মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করে সুপ্রিম কোর্টের মাধ্যমে দলের প্রতি অনুগত বিচারকদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করতো এবং যারা স্বাধীনভাবে বিচারকার্য পরিচালনার চেষ্টা করতেন, সুপ্রিম কোর্টের সহায়তায় তাদের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বদলির মাধ্যমে কার্যত শাস্তি দেওয়া হতো।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকার সেই পথ ধরে না হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সততা, দক্ষতা এবং বিচারকদের বিচারিক আচরণই হবে মানদণ্ড। সে লক্ষ্যেই আইন মন্ত্রণালয় সুপ্রিম কোর্টে সুপারিশ করবে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের। সরকারের এ ক্ষেত্রে একক ক্ষমতা নেই।
সংসদ সদস্য মো. কামরুল হাসানের এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে আসাদুজ্জামান বলেন, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত অধস্তন আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৪০,৪১,৯২৪টি। এই বিশাল সংখ্যক মামলা দ্রুত ও কার্যকরভাবে নিষ্পত্তির লক্ষ্যে সরকার বহুমাত্রিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে৷ The Code of Civil Procedure, 1908-এ যুগোপযোগী সংশোধন আনার জন্য ইতোমধ্যেই অত্র সংসদের অধিবেশনে The Code of Civil Procedure (Amendment) Bill, 2026 উত্থাপনপূর্বক পাস হয়েছে। ওই বিলে এসএমএস ও ভয়েস কলের মাধ্যমে সমন জারী করার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। অ্যাফিডেভিটের মাধ্যমে আরজি ও লিখিত জবাব দাখিল করা এবং সরাসরি জেরা করার বিধান প্রবর্তন করা হয়েছে।
আইনমন্ত্রী বলেন, এছাড়াও, ডিক্রি জারির জন্য পৃথক মামলা না করে মূল মামলায় সরাসরি দরখাস্ত দাখিলের বিধান সংযুক্ত করা হয়েছে। ফৌজদারি মামলার দ্রুত ও কার্যকর নিষ্পত্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ইতোমধ্যেই অত্র সংসদের অধিবেশনে The Code of Criminal Procedure (Amendment) Bill, 2026 উত্থাপনপূর্বক পাস হয়েছে। উক্ত বিলে মামলার কার্যক্রমে অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব ‘কমানোর জন্য পলাতক আসামীর ক্ষেত্রে Proclamation and Attachment প্রক্রিয়া পরিহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। সমন জারিতে ডিজিটাল পদ্ধতি প্রবর্তনের মাধ্যমে প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার আইন, ২০২০-এর আলোকে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা, চিকিৎসক এবং আসামির দোষ স্বীকারোক্তি রেকর্ডধারী ম্যাজিস্ট্রেটের সাক্ষ্য অনলাইনে গ্রহণ করা হচ্ছে। এতে সাক্ষীদের সশরীরে আদালতে উপস্থিত না হয়েও সাক্ষ্য দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে এবং বিচার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হচ্ছে। ম্যাজিস্ট্রেটগণ বিচারকার্যের পাশাপাশি পুলিশের তদন্ত তদারকি, জামিন শুনানি, রিমান্ড শুনানি ও এভিডেভিট সম্পাদনসহ নানাবিধ কাজ করতে গিয়ে বিচারকার্যে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারতেন না। এই সমস্যা সমাধানে বিদ্যমান ম্যাজিস্ট্রেট আদালতসমূহের মধ্যে শুধুমাত্র বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট আদালত নির্ধারণ করা হয়েছে, যার ফলে ম্যাজিস্ট্রেটগণ মামলা নিষ্পত্তিতে অধিকতর সময় দিতে পারছেন।
তিনি বলেন, মামলার জট নিরসনে ইতোমধ্যে ৮৭১টি আদালত সৃজন এবং ২৩২টি বিচারকের পদ সৃজন করা হয়েছে। আরও ৩০৪টি বিচারকের পদ সৃজনের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন এবং ১৫০ জন সিভিল জজ নিয়োগের কাজ চলমান রয়েছে। বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে ৭০৮ জন বিচার বিভাগীয় কর্মচারী নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে এবং আরও ৫৫৩ জন কর্মচারী নিয়োগের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
আইনমন্ত্রী বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলাসহ আলোচিত মামলার তদন্ত ও বিচার কার্যক্রম তরান্বিত করতে সলিসিটরের সভাপতিত্বে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। আইনগত সহায়তা কার্যক্রম সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ইতোমধ্যেই অত্র সংসদের অধিবেশনে আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) বিল, ২০২৬ উত্থাপনপূর্বক পাস হয়েছে। উক্ত বিলের তফসিলভুক্ত ৯টি আইনের মধ্যে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ এবং The Negotiable Instruments Act, 1881 ব্যতীত অবশিষ্ট ৭টি আইনের আওতায় উদ্ধৃত বিরোধের ক্ষেত্রে আদালতে মামলা দায়েরের পূর্বে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে মধ্যস্থতার উদ্যোগ গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। মধ্যস্থতায় সমঝোতা হলে চিফ লিগ্যাল এইড অফিসার কর্তৃক প্রত্যয়িত চুক্তি আদালতের ডিক্রির সমতুল্য হবে। বর্তমানে ২০টি জেলায় এই কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোতে মামলা দায়েরের হার দৃশ্যমানভাবে হ্রাস পেয়েছে ও বিরোধ নিষ্পত্তির হার বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়াও, আইনগত সহায়তা সেবা শক্তিশালীকরণে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে বিচারক সংখ্যা বৃদ্ধি, অভিজ্ঞ মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ এবং বিনামূল্যে আইনি সহায়তার জন্য ১৬৬৯ হটলাইন চালু করা হয়েছে।
আইনমন্ত্রী বলেন, বিদ্যমান এজলাস সংকট নিরসনের লক্ষ্যে ২৩টি জেলায় চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবন নির্মাণসহ ৪টি জেলায় চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের উর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণের লক্ষ্যে প্রেরিত প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে প্রেরণ করা হলে উ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশন পিইসি সভা করেছে। এছাড়াও, সারা দেশের ৩৯টি চৌকি আদালতসমূহের ভবন এবং সংশ্লিষ্ট বিচারকগণের জন্য আবাসন নির্মাণ সংক্রান্ত প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে প্রেরণ করা হলে ডিপিপি-এর উপর কিছু পর্যবেক্ষণ প্রদান করা হয়। উক্ত পর্যবেক্ষণের আলোকে বর্তমানে ডিপিপি পুনর্গঠন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে ১টি জেলায় ই-বেইলবন্ড ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার চালু রয়েছে। অনলাইনে বেইলবন্ড দাখিল করার মাধ্যমে আইনজীবী, কারা প্রশাসন ও বিচারপ্রার্থী সকলের সময় ও ব্যয় সাশ্রয় হচ্ছে। উক্ত সফটওয়্যার পর্যায়ক্রমে সকল জেলায় সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে ২টি জেলায় ই-ফ্যামিলি কোর্ট চালু রয়েছে। এই ব্যবস্থায় পারিবারিক মামলা দায়ের, শুনানিসহ মামলার যাবতীয় কার্যক্রম অনলাইনে সম্পন্ন করা হচ্ছে, যার ফলে মামলা পরিচালনা আরও দ্রুত, স্বচ্ছ ও কম খরচে সম্পন্ন হচ্ছে। বিশেষ করে নারী, শিশু ও দূরবর্তী এলাকার মানুষ এই সুবিধার মাধ্যমে সহজে বিচারপ্রাপ্তির সুযোগ পাচ্ছেন। উক্ত ই-ফ্যামিলি কোর্ট পর্যায়ক্রমে সকল জেলায় সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। অধস্তন এবং উচ্চ আদালতের কজলিস্ট শতভাগ অনলাইন করা হয়েছে, ফলে মানুষ ঘরে বসেই মামলার তারিখ জানতে পারছেন। এতে বিচার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং হয়রানি কমেছে।
আসাদুজ্জামান বলেন, দেশের সকল চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রাঙ্গণে তথ্য ও সেবা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। এতে মামলার পক্ষগণ সহজে মামলার অগ্রগতি, পরবর্তী ধার্য তারিখ এবং প্রক্রিয়াগত প্রয়োজনীয় তথ্য জানতে পারছেন। সিভিল রেজিস্ট্রেশন এন্ড ভাইটাল স্ট্যাটিসটিক্স: বিবাহ ও তালাক নিবন্ধনের আইসিটি অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ১০টি জেলার ১০২টি ইউনিয়নে মুসলিম বিবাহ আইন অনুযায়ী অনলাইনে বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন কার্যক্রম শীঘ্রই চালু করা হবে। এটি বাস্তবায়িত হলে বিবাহ ও তালাক সংক্রান্ত জালিয়াতি রোধ এবং এ সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা হ্রাস পাবে। বিচার ব্যবস্থাকে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল রূপান্তরের লক্ষ্যে ‘ই-জুডিসিয়ারি’ শীর্ষক প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে প্রেরণ করা হয়েছে। কমিশনের পর্যবেক্ষণের আলোকে বর্তমানে ডিপিপি পুনর্গঠনের কাজ চলমান রয়েছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে মামলা দায়ের, কেস ট্র্যাকিং, কজলিস্ট ব্যবস্থাপনা ও নথি সংরক্ষণসহ বিচার সংক্রান্ত সমগ্র কার্যক্রম ডিজিটাল পদ্ধতিতে পরিচালিত হবে, যা বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষের ভোগান্তি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করবে।
সরকার বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ লাঘব করতে এবং দ্রুত, স্বচ্ছ ও সাশ্রয়ী বিচার নিশ্চিতে অঙ্গীকারবদ্ধ। গৃহীত পদক্ষেপসমূহ পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়িত হলে সারাদেশের আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে এবং জনগণ দ্রুত ন্যায়বিচার পাবেন বলে সরকার আশাবাদী। এর বাইরে, মামলার জট কমানো এবং ন্যায় বিচারের ধারনা উন্নতকরণের জন্য জনগণের যে কোন সুপারিশ আইন মন্ত্রণালয় গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















