নিজস্ব প্রতিবেদক :
সড়ক পরিবহন, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, দেশে প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা ও দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনতে চায় সরকার। এ লক্ষ্য অর্জনে চালকদের প্রশিক্ষণ, যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিত করা, অতিরিক্ত গতিনিয়ন্ত্রণ, পথচারীদের সচেতনতা বাড়ানো এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সোমবার (২৪ আগস্ট) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সড়ক ভবনে বাংলাদেশ সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্পের আওতায় ৬০টি বেসিক লাইফ সাপোর্ট অ্যাম্বুলেন্স, ৪০টি মোটরসাইকেল অ্যাম্বুলেন্স এবং হাইওয়ে পুলিশের জন্য ৮০টি টহল মোটরসাইকেল উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
সড়ক নিরাপত্তায় নতুন আইনের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে শেখ রবিউল আলম বলেন, ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে একটি সমন্বিত নিরাপদ সড়ক আইন করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি মহাসড়কের পাশে থাকা বাজার সরিয়ে নেওয়া, আঞ্চলিক সড়কের সংযোগস্থলে প্রয়োজনীয় ডাইভারশন এবং সড়কে মার্কিংয়ের মতো বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সড়কমন্ত্রী বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে অনেক আলোচনা হলেও শুধু সভা-সেমিনার করে এর সমাধান হবে না। দুর্ঘটনার শিকার মানুষ ও সাধারণ জনগণের কাছে নিরাপদ সড়কের বার্তা পৌঁছে দিতে হবে। একই সঙ্গে আইন প্রয়োগ ও জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।
সড়ক দুর্ঘটনার কারণ তুলে ধরে শেখ রবিউল আলম বলেন, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অদক্ষ ও অযোগ্য চালক, অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত গতি, হেলমেট ব্যবহার না করা এবং পথচারীদের অসচেতনতা দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। এসব বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া গেলে দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব।
চালকদের প্রশিক্ষণের বিষয়ে তিনি বলেন, দেশে অনেক চালক পরিবহন খাতে হেলপার হিসেবে কাজ করতে করতে ধীরে ধীরে গাড়ি চালানো শিখেছেন। কিন্তু একজন চালককে শুধু গাড়ি চালাতে জানলেই হবে না, মহাসড়কে কীভাবে নিয়ম মেনে গাড়ি চালাতে হয়, সে বিষয়েও তাকে দক্ষ হতে হবে। এ প্রকল্পের আওতায় চালকদের প্রশিক্ষণ ও শারীরিক সক্ষমতা যাচাইয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
পথচারীদের সচেতনতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে সড়কমন্ত্রী বলেন, মহাসড়কের পাশে বাজার, স্কুল ও কলেজসহ বিভিন্ন স্থানে মানুষ অনেক সময় নিজের মতো করে রাস্তা পার হন। কাছাকাছি ওভারপাস থাকলেও অনেকে সেটি ব্যবহার করেন না। এ মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে।
তিনি বলেন, সরকার বাসের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল ২০ বছর এবং ট্রাকের ২৫ বছর নির্ধারণ করেছে। পুরোনো যানবাহন স্ক্র্যাপ ও রিসাইক্লিংয়ের জন্য নীতিমালা চূড়ান্ত করা হয়েছে। ডাম্পিং স্টেশনও করা হচ্ছে। ফিটনেসবিহীন যানবাহন সেখানে নিয়ে স্ক্র্যাপ ও রিসাইক্লিং করা হবে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে অ্যাম্বুলেন্স হস্তান্তর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দুর্ঘটনাকবলিতদের দ্রুত প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে মোটরসাইকেল অ্যাম্বুলেন্স ও সাধারণ অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস চালু করা হচ্ছে। মহাসড়কের প্রতি ১০ কিলোমিটারের মধ্যে যেন একটি করে অ্যাম্বুলেন্সের সুবিধা নিশ্চিত করা যায় এবং হাইওয়ে সংলগ্ন হাসপাতালগুলোতে বিশেষ জরুরি চিকিৎসা ইউনিট প্রস্তুত রাখা যায়, সেই লক্ষ্যে কাজ চলছে।
তিনি বলেন, দেশে থাকা ট্রমা সেন্টারগুলো সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। দুর্ঘটনার পর আহত ব্যক্তিকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পাশাপাশি সেখানে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।
হাইওয়ে পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে মন্ত্রী বলেন, মহাসড়কে দায়িত্ব পালনের জন্য পুলিশের জনবল প্রয়োজনের তুলনায় কম। তাদের যানবাহন ও মোটরসাইকেলেরও ঘাটতি রয়েছে। এ কারণে ৮০টি পেট্রল (টহল) মোটরসাইকেল যুক্ত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনগণকে সচেতন করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। সরকার, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও জনগণ সবাইকে নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা অর্ধেকে নামিয়ে আনতে না পারলে আমাদের সব প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হবে।
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্পের কথা উল্লেখ করে শেখ রবিউল আলম বলেন, বিগত দিনে এ ধরনের প্রকল্পে যেভাবে অর্থ ব্যয় করা হয়েছে, তা সড়ক নিরাপত্তায় কতটুকু সহায়ক ছিল সেটি আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রকল্পটির বাজেট প্রায় ৪০০ কোটি টাকায় পুনর্বিন্যাস করে সাশ্রয়ী করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠায় সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (হাইওয়ে পুলিশ) এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। আমাদের সড়কগুলো সুনির্দিষ্ট আইন ও বিধিমালার মধ্যে চালাতে হবে। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই আমরা একটি সার্বিক ‘নিরাপদ সড়ক আইন’ বাস্তবায়ন করতে চাই।
চালক ও পথচারীদের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, হাইওয়ে বা মহাসড়কে ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও অপ্রশিক্ষিত চালক দুর্ঘটনা বাড়াচ্ছে। অনেক চালক হেলপার থেকে গাড়ি চালানো শেখেন কিন্তু ট্রাফিক আইন বা বিধির বিষয়ে তাদের স্পষ্ট ধারণা থাকে না। এই প্রকল্পের মাধ্যমে চালকদের প্রয়োজনীয় শারীরিক পরীক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। একইসঙ্গে মহাসড়কের পাশে হঠাৎ গড়ে ওঠা হাট-বাজার এবং যত্রতত্র রাস্তা পারাপারের মনোভাব থেকেও জনগণকে সচেতন হতে হবে।
অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের প্রধান সমন্বয়ক শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাসসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 




















