নিজস্ব প্রতিবেদক :
স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো ‘আয়নাঘর’ থাকবে না বলে ঘোষণা দিয়ে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, প্রতিটি গুমের ঘটনার সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের-তা সে যত বড় ক্ষমতাবানই হোক না কেন-বিচারের মুখোমুখি করা হবে এবং তাদের আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি পেতেই হবে।
রোববার (৩০ আগস্ট) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস-২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, আমি আজ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, এই স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো আয়নাঘর থাকবে না। আর কোনো মাকে সন্তানের জন্য, কোনো স্ত্রীকে স্বামীর জন্য চোখের পানি ফেলতে হবে না।
তিনি বলেন, প্রতিটি গুমের ঘটনার সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের-তারা যত বড় ক্ষমতাবানই হোক না কেন-বিচারের মুখোমুখি করা হবে। আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি তাদের পেতেই হবে।
মির্জা ফখরুল বলেন, আজ এমন এক দিন, যা আমাদের বুকফাটা হাহাকার আর তীব্র বেদনার অতল গহ্বরে নিয়ে যায়। বক্তব্যের শুরুতে আমি তীব্র কষ্ট-বেদনা নিয়ে এবং গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছ, বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে জোরপূর্বক গুমের শিকার সকল মানুষকে। স্মরণ করছি, সেইসব মা-বাবা, ভাই-বোনদের যারা দিনের পর দিন, বছরের পর বছর অপেক্ষা করছেন-এই বুঝি তাঁদের সন্তান, স্বজন ফিরে এলো। স্মরণ করছি সেই স্ত্রীকে, যিনি প্রিয় স্বামীকে হারিয়ে একা জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে চলেছেন। স্মরণ করছি সেই সন্তানকে, যার শৈশব পেরিয়ে গেছে বাবার ফিরে আসার অপেক্ষায়। কিন্তু বাবা তাকে কোলে তুলে নিতে আর ফিরে আসেননি।
গুমের শিকার সকল ব্যক্তি, পরিবার, স্বজন ও সহযোদ্ধার প্রতি জানাই আমার গভীর সমবেদনা ও আন্তরিক সহমর্মিতা। গুম-খুনের শিকার সকল মানুষের পবিত্র স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা। আমি তাদের রূহের চিরশান্তি ও মাগফিরাত কামনা করি।
গুমকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, গুম কোনো সাধারণ অপরাধ নয়। এটি মানবতাবিরোধী অপরাধ। গুম শুধু একটা মানুষকে কেড়ে নেয় না। কেড়ে নেয় প্রিয়জনদের হাসি, শান্তি, স্বপ্ন, অর্থনৈতিক-সামাজিক স্বস্তি। এ এক জঘন্য মানবাধিকার লঙ্ঘন। আমাদের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিকের জীবন, ব্যক্তিস্বাধীনতা, আইনের সুরক্ষা ও মানবিক মর্যাদার নিশ্চয়তা দিয়েছে। গুম-খুনের মাধ্যমে কার্যত সেই অধিকারগুলোর সবকটিকেই একসঙ্গে ভুলুণ্ঠিত করা হয়।
বিগত দেড় দশকে গুম ও গোপন বন্দিশালা ‘আয়নাঘর’-এর প্রসঙ্গ তুলে রাষ্ট্রপতি বলেন, ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে গুম, গোপন বন্দিশালা ‘আয়নাঘর’ এর দুঃসহ থাবা বাংলাদেশের বুকে চেপে বসেছিল। যারাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন, ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন, গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের জন্য যখনই আন্দোলন করেছেন, তখনই তাদের স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, গুম করা হয়েছে, গোপনে খুন করা হয়েছে। অথচ ফ্যাসিস্টের আজ্ঞাবহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এই গুরুতর অপরাধকে সর্বদা অস্বীকার করে গেছে। আমরা ভুলে যাইনি বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতা ইলিয়াস আলী, ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলম, একটি ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম সুমনসহ অগণিত মানুষকে। যাদের পরিবারের প্রতিটি রাত কাটছে বুকভরা বেদনা, অনিশ্চয়তা ও প্রতীক্ষা নিয়ে।
তিনি বলেন, আইনজীবী ব্যারিস্টার আরমান, অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আজমীসহ অসংখ্য ভিন্ন মতাবলম্বী, কর্মকর্তা, লেখক, সাংবাদিক, সমাজকর্মী, এমনকি গৃহবধূ ও সাধারণ নাগরিককে বছরের পর বছর অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে, আলো-বাতাসহীন আয়নাঘরে আটকে রাখা হয়েছিল। সেখানে প্রতিটি মুহূর্ত ছিল মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ। বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকেও গুম করে ভিনদেশে ফেলে আসা হয়েছিল। তাদের মধ্যে কেউ কেউ সৌভাগ্যক্রমে আমাদের মাঝে ফিরে এসেছেন। এ দেশে আজও এমন বহু মানুষ আছেন, যারা আজ পর্যন্ত আর ফিরে আসেননি।
মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, যে গণতন্ত্র, সাম্য, বাকস্বাধীনতা, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য ১৯৭১ সালে আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধারা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে দেশটাকে স্বাধীন করেছিলেন, সেই স্বাধীন দেশে গুম-খুনের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে চূড়ান্ত অন্যায় আর ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছিল। এর মাধ্যমে একটা ভয়ানক ও ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল। আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এ এক অত্যন্ত বেদনাদায়ক, অপমানজনক অধ্যায়।
প্রয়াত বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে এই সময়ে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি, যিনি ফ্যাসিবাদী সরকারের গুম-খুনের বিরুদ্ধে সবসময় সোচ্চার ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, একদিন এই গুম, খুন, অত্যাচার, নির্যাতনের বিচার বাংলাদেশের মাটিতেই হবে। শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ ফ্যাসিবাদবিরোধী সকল রাজনৈতিক দল, সামাজিক শক্তি, গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ ও সর্বস্তরের জনগণকে, যাদের অনেকে গুম-খুনের শিকার হয়েছেন। এখন প্রতিশোধ নয়, প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতে হবে, প্রকৃত অপরাধীদের আইনানুগ শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, আজ এখানে গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সদস্যরা উপস্থিত আছেন। কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে যে সত্য বেরিয়ে এসেছে, তা শুধু বেদনাদায়কই নয়, অত্যন্ত লজ্জাজনক ও ভয়াবহ। কমিশন ১,৫৬৯টি ঘটনাকে সুনির্দিষ্টভাবে গুম হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যার মধ্যে ২৮৭ জন নিখোঁজ ও মৃত। এই প্রতিবেদনে নির্বাচনের আগে গুমের ঘটনা বেড়ে যাওয়া, বেছে বেছে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের জোরপূর্বক গুম ও গোপনে খুন করার যে চিত্র ফুটে উঠেছে তা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে রাষ্ট্রক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে রাখতেই দলীয় ও ব্যক্তি স্বার্থে এই বর্বর, পৈশাচিক ও ঘৃণ্য কাজগুলো বেশি করা হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, কমিশনের প্রতিবেদন আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে, কিন্তু পথ এখনও অনেক দীর্ঘ। এবারের আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসের প্রতিপাদ্য: ‘Victims first, Action now’ । গুমের শিকার ব্যক্তি ও পরিবারকে রক্ষা এবং গুমকে চিরতরে নিষিদ্ধ করতে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হয়েছে। বাংলাদেশ আর্ন্তজাতিক গুম প্রতিরোধ সনদে স্বাক্ষর করেছে। আর্ন্তজাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের মাধ্যমে গুম এবং গণহত্যার বিচারের কাজ স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে এগিয়ে চলছে।
গুমের শিকার পরিবারগুলোর দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, শুধু অপরাধীদের শাস্তি দিলেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হবে না। যেসব পরিবার বছরের পর বছর প্রিয়জনের অপেক্ষায় সীমাহীন অনিশ্চয়তা, আর্থিক সংকট ও মানসিক যন্ত্রণা বহন করেছে, তাদের মর্যাদা, সামাজিক নিরাপত্তা, চিকিৎসা, শিক্ষা, জীবিকা ও পুনর্বাসনের দায়িত্বও রাষ্ট্রকে নিতে হবে।
তিনি বলেন, আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে-কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থাকবে না। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে-কিন্তু ভয়ের সংস্কৃতি থাকবে না। আইনশৃঙ্খলা থাকবে—কিন্তু আইনের নামে মানবাধিকার ও সুবিচার লঙ্ঘনের সুযোগ থাকবে না। রাষ্ট্রের ক্ষমতা থাকবে-কিন্তু সেই ক্ষমতার ওপর থাকবে সংবিধান ও আইনের নিয়ন্ত্রণ। মনে রাখতে হবে, একটি দেশের উন্নয়ন ও সাফল্য শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। বরং একটি রাষ্ট্র কতটা গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমুখী, কতটা ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক এবং তার নাগরিক কতটা নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করে-সেটি একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন ও সাফল্যের চিত্র তুলে ধরে। আর এমন একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতেই আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
রাষ্ট্রপতি বলেন, আমি আজ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, এই স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো ‘আয়নাঘর’ থাকবে না। আর কোনো মাকে সন্তানের জন্য, কোনো স্ত্রীকে স্বামীর জন্য চোখের পানি ফেলতে হবে না। প্রতিটি গুমের ঘটনার সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের-তা সে যতো বড় ক্ষমতাবানই হোক না কেন- বিচারের মুখোমুখি করা হবে। আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি তাদের পেতেই হবে। এই দেশে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার সকল পথ চিরতরে বন্ধ করা হবে।
4444
রাষ্ট্রপতি বলেন, আমি তীব্র বেদনা নিয়ে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে জোরপূর্বক গুমের শিকার সকল মানুষকে, স্মরণ করছি সেইসব মা-বাবা-ভাই-বোনদের যারা দিনের পর দিন, বছর পর বছর অপেক্ষা করছেন এই বুঝি তাদের সন্তান তাদের স্বজন ফিরে এল। স্মরণ করছি সেই স্ত্রীকে যিনি প্রিয় স্বামীকে হারিয়ে একা জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে চলেছেন। স্মরণ করছি সেই সন্তানকে যার শৈশব পেরিয়ে গেছে বাবার ফিরে আসার অপেক্ষায় কিন্তু বাবা তাকে কোলে তুলে নিতে ফিরে আসেননি।
গুমের নির্মম শিকার সকল ব্যক্তি, পরিবার স্বজন ও সহযোগীদের প্রতি গভীর সমবেদনা ও আন্তরিক সহমর্মিতা জানিয়ে তিনি বলেন, গুম-খুনের শিকার সকল মানুষের পবিত্র স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা। আমি তাদের রুহের চির শান্তি ও মাগফেরাত কামনা করছি।
রাষ্ট্রপ্রধান বলেন, গুম কোনো সাধারণ অপরাধ নয়। এটি মানবতাবিরোধী অপরাধ। গুম শুধু একটা মানুষকে কেড়ে নেয় না, কেড়ে নেয় প্রিয়জনদের হাসি, শান্তি, স্বপ্ন, অর্থনৈতিক সামাজিক স্বস্তি। এটা জঘন্য মানবাধিকার লঙ্ঘন। আমাদের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিকের জীবন ব্যক্তির স্বাধীনতা, আইনের সুরক্ষা ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চয়তা দিয়েছে। গুম-খুনের মাধ্যমে কার্যত সেই অধিকারগুলোর সব কটিকে একসঙ্গে ভূলুণ্ঠিত করা হয়।
রাষ্ট্রপতি বলেন, “দেড় দশকে ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে এই গুম, গোপন বন্দিশালা আয়নাঘরের দুঃসহ থাবা বাংলাদেশের বুকে চেপে বসেছিল। যারাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন, ভিন্নমত পোষণ করেছেন, গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের জন্য যখন আন্দোলন করেছেন তখনই তাদের জন্য তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, গুম করা হয়েছে, গোপনে খুন করা হয়েছে হয়েছে। অথচ ফ্যাসিস্টের আজ্ঞাবাহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এই গুরুতর অপরাধকে সর্বদা অস্বীকার করে গেছে।
এ সময় তিনি বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতা ইলিয়াস আলী, ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলম, একটি ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলামসহ অগণিত মানুষের কথা স্মরণ করেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, আইনজীবী ব্যারিস্টার অবসরপ্রাপ্ত লেফটেনেন্ট জেনারেল আযমীসহ বিভিন্ন মতালম্বী কর্মকর্তা, লেখক, সাংবাদিক, সমাজকর্মী, এমনকি গৃহবধু ও সাধারণ নাগরিককে বছরের পর বছর অন্ধকার, স্যাঁতস্যাঁতে আলো-বাতাসহীন আয়নাঘরে আটকে রাখা হয়েছিল। সেখানে প্রতিমুহূর্ত ছিল তাদের মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ।
অনুষ্ঠানমঞ্চে থাকা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের গুমের ঘট্না তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেন, গুমের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে কেউ সৌভাগ্যক্রমে ফিরে এসেছেন। এদেশে আজও এমন বহু মানুষ আছেন যারা আজ পর্যন্ত আর ফিরে আসেননি।
তিনি বলেন, আমি অবশ্যই উল্লেখ করতে চাই যে আমাদের একটি মেয়ে সাহসিকতার সঙ্গে, নির্বিকতার সঙ্গে সেদিন এই গুম হওয়া পরিবারগুলোকে সঙ্গে নিয়ে সামনে এগিয়ে এসেছিল। সে হচ্ছে আমাদের এখন সংসদ সদস্য সানজীদা ইসলাম তুলি… সে নিজে একা লড়ে গেছে। এমনকি সে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কমিশনে পর্যন্ত গিয়েছে। সেজন্য আমি তাকে ধন্যবাদ জানাই অভিবাদন জানাই।
রাষ্ট্রপতি বলেন, গণতন্ত্র সাম্যবাদ স্বাধীনতা মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়ভিত্তিক যে রাষ্ট্র গঠনের জন্য ১৯৭১ সালে আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধারা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছিলেন, সেই স্বাধীন দেশে গুম-খুনের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে চূড়ান্ত অন্যায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছিল। এর মাধ্যমে একটা ভয়ানক ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল, যা আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক অত্যন্ত বেদনাদায়ক অপমানজনক অধ্যায়।”
এ সময় প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে স্মরণ করে মির্জা ফখরুল বলেন, “ফ্যাসিবাদী সরকারের গুম খুনের বিরুদ্ধে তিনি সবসময় সোচ্চার ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, একদিন এই গুম-খুন, অত্যাচার-নির্যাতনের বিচার বাংলাদেশের মাটিতেই হবে।”
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ ‘ফ্যাসিবাদী’ বিরোধী সকল রাজনৈতিক দল, সামাজিক শক্তি, গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ ও সর্বস্তর জনগণ, যাদের অনেকে গুম-খুনের শিকার হয়েছে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপতি।
তিনি বলেন, “নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে সেই ফ্যাসিবাদের বশংবদ দেশ থেকে পালাতে বাধ্য হয়েছে।”
রাষ্ট্রপ্রধান বলেন, এখন প্রতিশোধ নয়, প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতে হবে। অপরাধীদের প্রকৃত আইনানুগ শাস্তির আওতায় আনতে হবে। আমি বিশ্বাস করি, শুধু অপরাধীদের শাস্তি দিয়ে রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হবে না। যেসব পরিবার বছরের পর বছর প্রিয়জনের অপেক্ষায় সীমাহীন অনিশ্চয়তা, আর্থিক সংকট, মানসিক যন্ত্রণা বহন করেছে তাদের মর্যাদা, সামাজিক নিরাপত্তা, চিকিৎসা, শিক্ষা জীবিকা ও পুনর্বাসনের দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই বহন করতে হবে, গ্রহণ করতে হবে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই যেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থাকবে না। মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু ভয়ের সংস্কৃতি থাকবে না। আইনশৃঙ্খলা থাকবে, আইনের নামে মানধিকার ও সুবিচার লঙ্ঘনের সুযোগ থাকবে না। রাষ্ট্রের ক্ষমতা থাকবে, কিন্তু সেই ক্ষমতার ওপর থাকবে সংবিধান ও আইনের নিয়ন্ত্রণ।
শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে উন্নয়নের সাফল্য পরিমাণ করা যায় না, এ কথা মনে করিয়ে দিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, “একটি রাষ্ট্র কতটা গণতান্ত্রিক, কল্যাণমুখী, কতটা ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক এবং নাগরিক কতটা নিরাপদ অর্থপূর্ণ জীবনযাপন করে, সেটি একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়নচিত্র তুলে ধরে। আর এমন একটি নতুন বাংলাদেশ গড়তে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আজম খানের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন, গুমের শিকার সংসদ সদস্য মীর আহমদ বিন কাশেম আরমান, সানজীদা ইসলাম তুলি, তাহসিনা রুশদীর লুনা, আনিসুর রহমান তালুকদার, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ।
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















