Dhaka রবিবার, ১৭ মে ২০২৬, ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সরকারি বিজ্ঞাপন বণ্টনে প্রচলিত পদ্ধতি থেকে সরে আসার ঘোষণা

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

গণমাধ্যমে একটি স্বাধীন, দক্ষ ও গ্রহণযোগ্য কমিশন গঠনের ওপর জোর দিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। একইসঙ্গে মনগড়া টিআরপি ও প্রচার সংখ্যার ভিত্তিতে সরকারি বিজ্ঞাপন বণ্টনের প্রচলিত পদ্ধতি থেকে সরে আসার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।

রোববার (১৭ মে) সচিবালয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর সম্পাদক ও সংবাদ প্রধানদের নিয়ে গঠিত ‘টেলিভিশন এডিটরস কাউন্সিল’ টিইসির নেতাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন।

তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী বলেন, ভুয়া বা যাচাইহীন তথ্যের ওপর ভিত্তি করে গণমাধ্যমে সুযোগ-সুবিধা বণ্টনের প্রক্রিয়া আর চলবে না। বর্তমানে টেলিভিশন চ্যানেলের দর্শকসংখ্যা নির্ধারণে ব্যবহৃত টিআরপি এবং পত্রিকার প্রচার সংখ্যা নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। ডিজিটাল যুগে কোনো চ্যানেল কত মানুষ দেখছে, তার নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান বের করা কঠিন নয়।

জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, টিআরপি এবং পত্রিকা ছাপার সংখ্যা যেহেতু এই দুইটা হচ্ছে আউটলেট। আপনার ভিজ্যুয়াল মিডিয়ায় কত লোক দেখে, কত লোক দেখে না এটার একটা পরিসংখ্যান ব্যবস্থা আজকালকার ডিজিটাল যুগে কোনো কঠিন কাজ না।

তিনি বলেন, মাত্র কয়েকশ’ টিআরপি’র নমুনা দিয়ে দেশের কোটি কোটি দর্শকের রুচি ও দেখার অভ্যাস নির্ধারণ করা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। একইভাবে মনগড়া প্রচার সংখ্যার ভিত্তিতে পত্রিকাকে বিজ্ঞাপন সুবিধা দেওয়ার নীতিতেও পরিবর্তন আনা হবে।

কোন পত্রিকা কত কপি ছাপা হচ্ছে তা পাওয়ার এখন পর্যন্ত ডিজিটাল পদ্ধতি সরকারের কাছে নেই বলে জানান তথ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘এই না থাকার সুযোগে মাত্র ৫০০টা টিআরপি দিয়ে…অথবা সেই মিথ্যাকে গ্রহণ করব, অথবা পত্রিকার ছাপাকে আমি আমার মনগড়া একটা সংখ্যার ভিত্তিতে বিজ্ঞাপনের সুযোগ-সুবিধা বণ্টন করব—এই নীতিমালা থেকে তথ্য মন্ত্রণালয় বেরিয়ে আসবে।

সঠিক পদ্ধতিতে টিআরপি এবং পত্রিকার প্রচারসংখ্যা নির্ধারণের পর সুযোগ-সুবিধার কোনো পরিবর্তন হবে না বলে জানান তথ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘কিন্তু যে তথ্য-পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে আমরা এই সিদ্ধান্ত নেব, সেখানে কোনো মিথ্যার আশ্রয়ের মধ্যে তথ্য মন্ত্রণালয় আর থাকবে না।

তথ্যমন্ত্রী বলেন, একবার যখনই একটা রাইট ডিজিটাল টিআরপি সিস্টেম দাঁড় করতে পারব এবং একটা রাইট ডিজিটাল প্রিন্ট কাউন্টিং দাঁড় করতে পারব, তখন তার ভিত্তিতে আমি সব ধরনের সুযোগ এবং অধিকারের বণ্টনটাও করতে পারব।

জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, তথ্য মন্ত্রণালয় ভবিষ্যতে এমন কোনো তথ্য-উপাত্তের ওপর নির্ভর করবে না, যার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবে নতুন ব্যবস্থায় সুযোগ-সুবিধার কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন নাও আসতে পারে, কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তি হবে নির্ভুল ও যাচাইকৃত তথ্য।

তিনি বলেন, সরকার নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল টিআরপি ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল প্রিন্ট কাউন্টিং পদ্ধতি চালুর পরিকল্পনা করছে। এই দুটি ব্যবস্থা কার্যকর হলে গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন ও অন্যান্য সুবিধা বণ্টন আরো স্বচ্ছ ও বাস্তবভিত্তিক হবে।

দেশের গণমাধ্যম খাতে একটি স্বাধীন, দক্ষ ও গ্রহণযোগ্য কমিশন গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ করে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, গণমাধ্যম পরিচালনায় কেবল নিয়ন্ত্রণমূলক দৃষ্টিভঙ্গি নয়, বরং সব অংশীজনকে নিয়ে জবাবদিহিমূলক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। এজন্য সরকার সব পক্ষের সঙ্গে মতবিনিময় করছে।

তিনি বলেন, দেশে গণমাধ্যম ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরে একটি ‘ধারণাগত ঘাটতি’ রয়েছে। মালিক, উদ্যোক্তা, সাংবাদিক ও সরকারের মধ্যে গণমাধ্যমকে আধুনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার বিষয়ে সমন্বিত চিন্তার অভাব ছিল। ফলে খাতটি অনেকাংশে ব্যক্তি প্রভাব, বিনিয়োগ ও ক্ষমতার বলয়ে পরিচালিত হয়েছে।

তথ্যমন্ত্রী বলেন, গণমাধ্যম এমন একটি জগৎ, যেখানে সরকার নিজেও একটি অংশীজন। তাই সরকারকে একদিকে নিজের দায়িত্ব পালন করতে হবে, অন্যদিকে অন্য অংশীজনদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, অতীতে সরকারগুলো গণমাধ্যমকে মূলত নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টিতে দেখেছে। এর ফলে গণমাধ্যম খাতে অনিয়ম, প্রভাব বিস্তার ও অস্বচ্ছতা তৈরি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অবৈধ আয় রক্ষার হাতিয়ার হিসেবেও গণমাধ্যম ব্যবহার হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তথ্যমন্ত্রী বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করতে একটি ‘কোয়াসি জুডিশিয়াল কমিশন’ বা স্বাধীন কর্তৃপক্ষ গঠন ছাড়া বিকল্প নেই। তবে সেই কমিশন যেন আবার কোনো সরকারের রাজনৈতিক হাতিয়ার না হয়ে ওঠে, সেদিকেও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।

জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, নামে কমিশন, কিন্তু বাস্তবে যেন কোনো ফ্যাসিস্ট সরকারের ইন্সট্রুমেন্ট না হয়—সেটা নিশ্চিত করতে হবে।

টেলিভিশন এডিটরস কাউন্সিল গঠনকে ঐতিহাসিক উদ্যোগ উল্লেখ করে তথ্যমন্ত্রী বলেন, এ ধরনের পেশাভিত্তিক সংগঠন গণমাধ্যম সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি সম্পাদকদের মালিকপক্ষ, কেবল অপারেটর, ব্রডকাস্টিং ইঞ্জিনিয়ার, গ্রাফিকস ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের সঙ্গেও মতবিনিময়ের আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, গণমাধ্যম শিল্পে শ্রম আইন, কর ব্যবস্থা, বেতন-ভাতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে কোনো প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নবায়ন হওয়া উচিত নয়। তবে এসব সিদ্ধান্ত যেন রাজনৈতিক দর-কষাকষির হাতিয়ার না হয়, সেজন্যই স্বাধীন কমিশনের প্রয়োজন রয়েছে।

তথ্যমন্ত্রী বলেন, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত বিকাশের কারণে বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যম ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে রাষ্ট্র ও সমাজ এখনো পুরোপুরি খাপ খাওয়াতে পারেনি।

তিনি বলেন, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স মানুষের সক্ষমতাকে কোটি গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে সাংবাদিকতাসহ অনেক পেশার চরিত্র বদলে যাচ্ছে। এই বাস্তবতায় গণমাধ্যম খাতকে নতুনভাবে ভাবতে হবে।

গণমাধ্যমে কল্যাণমুখী স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়ে তথ্যমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বের কোনো বিরোধ নেই। নৈরাজ্যপূর্ণ স্বাধীনতা অর্জিত সভ্যতাকেও ধ্বংস করতে পারে।

সভায় তিনি সরকারের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। পাশাপাশি সব অংশীজনকে নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য ঐকমত্য তৈরির আহ্বান জানান।

বৈঠকে সংগঠনটির আহ্বায়ক বাংলাভিশনের প্রধান সম্পাদক ও বার্তা প্রধান ড. আবদুল হাই সিদ্দিক বলেন, বিগত সময়ে টেলিভিশন সম্পাদকদের নিয়ে একটি পকেট সংগঠন গঠিত হয়েছিল। যারা অপতথ্য, গুজব, হিংসা বিদ্বেষ ছড়ানো এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি ছাড়া জনগণকে কিছুই দিতে পারেনি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

টেলিভিশনের একটি বেতন কাঠামো গঠন করাসহ ওয়েজ বোর্ড করার দাবি জানান আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ডিবিসি নিউজের সম্পাদক লোটন একরাম। এ ছাড়া টেলিভিশনের জন্য একটি বিজ্ঞাপন নীতিমালা তৈরি করতেও সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন সংগঠনির অন্যান্য নেতারা।

সংগঠনির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সচিব সময় টিভির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ জুবায়ের আহমেদ বাবু ছাড়াও আহ্বায়ক কমিটির সদস্য একাত্তর টিভির বার্তা প্রধান ও সিওও শফিক আহমেদ, বৈশাখী টেলিভিশনের বার্তা প্রধান জিয়াউল কবির সুমন, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রধান বার্তা সম্পাদক মোস্তফা আকমল, চ্যানেল নাইনের নির্বাহী সম্পাদক ফরহাদুল ইসলাম ফরিদ, গাজী টিভির বার্তা প্রধান গাউসুল আজম বিপু, দেশ টিভির বার্তা প্রধান ও নির্বাহী কর্মকর্তা মহি উদ্দিনসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা বৈঠকে অংশগ্রহণ করেন।

 

 

আবহাওয়া

সরকারি বিজ্ঞাপন বণ্টনে প্রচলিত পদ্ধতি থেকে সরে আসার ঘোষণা

প্রকাশের সময় : ০১:৪৬:৫০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৭ মে ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

গণমাধ্যমে একটি স্বাধীন, দক্ষ ও গ্রহণযোগ্য কমিশন গঠনের ওপর জোর দিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। একইসঙ্গে মনগড়া টিআরপি ও প্রচার সংখ্যার ভিত্তিতে সরকারি বিজ্ঞাপন বণ্টনের প্রচলিত পদ্ধতি থেকে সরে আসার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।

রোববার (১৭ মে) সচিবালয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর সম্পাদক ও সংবাদ প্রধানদের নিয়ে গঠিত ‘টেলিভিশন এডিটরস কাউন্সিল’ টিইসির নেতাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন।

তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী বলেন, ভুয়া বা যাচাইহীন তথ্যের ওপর ভিত্তি করে গণমাধ্যমে সুযোগ-সুবিধা বণ্টনের প্রক্রিয়া আর চলবে না। বর্তমানে টেলিভিশন চ্যানেলের দর্শকসংখ্যা নির্ধারণে ব্যবহৃত টিআরপি এবং পত্রিকার প্রচার সংখ্যা নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। ডিজিটাল যুগে কোনো চ্যানেল কত মানুষ দেখছে, তার নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান বের করা কঠিন নয়।

জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, টিআরপি এবং পত্রিকা ছাপার সংখ্যা যেহেতু এই দুইটা হচ্ছে আউটলেট। আপনার ভিজ্যুয়াল মিডিয়ায় কত লোক দেখে, কত লোক দেখে না এটার একটা পরিসংখ্যান ব্যবস্থা আজকালকার ডিজিটাল যুগে কোনো কঠিন কাজ না।

তিনি বলেন, মাত্র কয়েকশ’ টিআরপি’র নমুনা দিয়ে দেশের কোটি কোটি দর্শকের রুচি ও দেখার অভ্যাস নির্ধারণ করা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। একইভাবে মনগড়া প্রচার সংখ্যার ভিত্তিতে পত্রিকাকে বিজ্ঞাপন সুবিধা দেওয়ার নীতিতেও পরিবর্তন আনা হবে।

কোন পত্রিকা কত কপি ছাপা হচ্ছে তা পাওয়ার এখন পর্যন্ত ডিজিটাল পদ্ধতি সরকারের কাছে নেই বলে জানান তথ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘এই না থাকার সুযোগে মাত্র ৫০০টা টিআরপি দিয়ে…অথবা সেই মিথ্যাকে গ্রহণ করব, অথবা পত্রিকার ছাপাকে আমি আমার মনগড়া একটা সংখ্যার ভিত্তিতে বিজ্ঞাপনের সুযোগ-সুবিধা বণ্টন করব—এই নীতিমালা থেকে তথ্য মন্ত্রণালয় বেরিয়ে আসবে।

সঠিক পদ্ধতিতে টিআরপি এবং পত্রিকার প্রচারসংখ্যা নির্ধারণের পর সুযোগ-সুবিধার কোনো পরিবর্তন হবে না বলে জানান তথ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘কিন্তু যে তথ্য-পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে আমরা এই সিদ্ধান্ত নেব, সেখানে কোনো মিথ্যার আশ্রয়ের মধ্যে তথ্য মন্ত্রণালয় আর থাকবে না।

তথ্যমন্ত্রী বলেন, একবার যখনই একটা রাইট ডিজিটাল টিআরপি সিস্টেম দাঁড় করতে পারব এবং একটা রাইট ডিজিটাল প্রিন্ট কাউন্টিং দাঁড় করতে পারব, তখন তার ভিত্তিতে আমি সব ধরনের সুযোগ এবং অধিকারের বণ্টনটাও করতে পারব।

জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, তথ্য মন্ত্রণালয় ভবিষ্যতে এমন কোনো তথ্য-উপাত্তের ওপর নির্ভর করবে না, যার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবে নতুন ব্যবস্থায় সুযোগ-সুবিধার কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন নাও আসতে পারে, কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তি হবে নির্ভুল ও যাচাইকৃত তথ্য।

তিনি বলেন, সরকার নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল টিআরপি ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল প্রিন্ট কাউন্টিং পদ্ধতি চালুর পরিকল্পনা করছে। এই দুটি ব্যবস্থা কার্যকর হলে গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন ও অন্যান্য সুবিধা বণ্টন আরো স্বচ্ছ ও বাস্তবভিত্তিক হবে।

দেশের গণমাধ্যম খাতে একটি স্বাধীন, দক্ষ ও গ্রহণযোগ্য কমিশন গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ করে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, গণমাধ্যম পরিচালনায় কেবল নিয়ন্ত্রণমূলক দৃষ্টিভঙ্গি নয়, বরং সব অংশীজনকে নিয়ে জবাবদিহিমূলক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। এজন্য সরকার সব পক্ষের সঙ্গে মতবিনিময় করছে।

তিনি বলেন, দেশে গণমাধ্যম ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরে একটি ‘ধারণাগত ঘাটতি’ রয়েছে। মালিক, উদ্যোক্তা, সাংবাদিক ও সরকারের মধ্যে গণমাধ্যমকে আধুনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার বিষয়ে সমন্বিত চিন্তার অভাব ছিল। ফলে খাতটি অনেকাংশে ব্যক্তি প্রভাব, বিনিয়োগ ও ক্ষমতার বলয়ে পরিচালিত হয়েছে।

তথ্যমন্ত্রী বলেন, গণমাধ্যম এমন একটি জগৎ, যেখানে সরকার নিজেও একটি অংশীজন। তাই সরকারকে একদিকে নিজের দায়িত্ব পালন করতে হবে, অন্যদিকে অন্য অংশীজনদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, অতীতে সরকারগুলো গণমাধ্যমকে মূলত নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টিতে দেখেছে। এর ফলে গণমাধ্যম খাতে অনিয়ম, প্রভাব বিস্তার ও অস্বচ্ছতা তৈরি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অবৈধ আয় রক্ষার হাতিয়ার হিসেবেও গণমাধ্যম ব্যবহার হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তথ্যমন্ত্রী বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করতে একটি ‘কোয়াসি জুডিশিয়াল কমিশন’ বা স্বাধীন কর্তৃপক্ষ গঠন ছাড়া বিকল্প নেই। তবে সেই কমিশন যেন আবার কোনো সরকারের রাজনৈতিক হাতিয়ার না হয়ে ওঠে, সেদিকেও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।

জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, নামে কমিশন, কিন্তু বাস্তবে যেন কোনো ফ্যাসিস্ট সরকারের ইন্সট্রুমেন্ট না হয়—সেটা নিশ্চিত করতে হবে।

টেলিভিশন এডিটরস কাউন্সিল গঠনকে ঐতিহাসিক উদ্যোগ উল্লেখ করে তথ্যমন্ত্রী বলেন, এ ধরনের পেশাভিত্তিক সংগঠন গণমাধ্যম সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি সম্পাদকদের মালিকপক্ষ, কেবল অপারেটর, ব্রডকাস্টিং ইঞ্জিনিয়ার, গ্রাফিকস ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের সঙ্গেও মতবিনিময়ের আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, গণমাধ্যম শিল্পে শ্রম আইন, কর ব্যবস্থা, বেতন-ভাতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে কোনো প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নবায়ন হওয়া উচিত নয়। তবে এসব সিদ্ধান্ত যেন রাজনৈতিক দর-কষাকষির হাতিয়ার না হয়, সেজন্যই স্বাধীন কমিশনের প্রয়োজন রয়েছে।

তথ্যমন্ত্রী বলেন, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত বিকাশের কারণে বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যম ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে রাষ্ট্র ও সমাজ এখনো পুরোপুরি খাপ খাওয়াতে পারেনি।

তিনি বলেন, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স মানুষের সক্ষমতাকে কোটি গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে সাংবাদিকতাসহ অনেক পেশার চরিত্র বদলে যাচ্ছে। এই বাস্তবতায় গণমাধ্যম খাতকে নতুনভাবে ভাবতে হবে।

গণমাধ্যমে কল্যাণমুখী স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়ে তথ্যমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বের কোনো বিরোধ নেই। নৈরাজ্যপূর্ণ স্বাধীনতা অর্জিত সভ্যতাকেও ধ্বংস করতে পারে।

সভায় তিনি সরকারের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। পাশাপাশি সব অংশীজনকে নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য ঐকমত্য তৈরির আহ্বান জানান।

বৈঠকে সংগঠনটির আহ্বায়ক বাংলাভিশনের প্রধান সম্পাদক ও বার্তা প্রধান ড. আবদুল হাই সিদ্দিক বলেন, বিগত সময়ে টেলিভিশন সম্পাদকদের নিয়ে একটি পকেট সংগঠন গঠিত হয়েছিল। যারা অপতথ্য, গুজব, হিংসা বিদ্বেষ ছড়ানো এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি ছাড়া জনগণকে কিছুই দিতে পারেনি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

টেলিভিশনের একটি বেতন কাঠামো গঠন করাসহ ওয়েজ বোর্ড করার দাবি জানান আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ডিবিসি নিউজের সম্পাদক লোটন একরাম। এ ছাড়া টেলিভিশনের জন্য একটি বিজ্ঞাপন নীতিমালা তৈরি করতেও সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন সংগঠনির অন্যান্য নেতারা।

সংগঠনির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সচিব সময় টিভির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ জুবায়ের আহমেদ বাবু ছাড়াও আহ্বায়ক কমিটির সদস্য একাত্তর টিভির বার্তা প্রধান ও সিওও শফিক আহমেদ, বৈশাখী টেলিভিশনের বার্তা প্রধান জিয়াউল কবির সুমন, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রধান বার্তা সম্পাদক মোস্তফা আকমল, চ্যানেল নাইনের নির্বাহী সম্পাদক ফরহাদুল ইসলাম ফরিদ, গাজী টিভির বার্তা প্রধান গাউসুল আজম বিপু, দেশ টিভির বার্তা প্রধান ও নির্বাহী কর্মকর্তা মহি উদ্দিনসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা বৈঠকে অংশগ্রহণ করেন।