নিজস্ব প্রতিবেদক :
দেশের সব উপজেলা পর্যায়ের ৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন। একই সঙ্গে তিনি দ্রুততম সময়ের মধ্যে সারা দেশে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছেন।
বুধবার (১০ জুন) জাতীয় সংসদে সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আব্দুল মালিকের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী বর্তমান সরকারের লক্ষ্য হলো সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং প্রত্যেক নাগরিককে মর্যাদা ও সম্মানের সাথে স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করা। সেই আলোকে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর। এখানে উল্লেখ করতে চাই স্বাধীনতার মহান ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে গ্রামের হতদরিদ্র মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করার লক্ষ্যে সর্বপ্রথম বাংলাদেশের সকল থানা সদরে (বর্তমান উপজেলা) ৩১ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন এবং জনস্বাস্থ্যসেবার দ্বার উন্মোচন করেন। পরবর্তীতে তারই উত্তরসূরি আপসহীন নেত্রী সাবেক তিন বারের প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া ক্ষমতায় থাকাকালীন সকল উপজেলা হাসপাতালকে ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করেন এবং স্বাস্থ্যসেবার দ্বার আরও প্রসারিত করেন। একই পরিবারের গর্বিত সদস্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী উপজেলা পর্যায়ের সব ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালকে ১০১ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন এবং এরই মধ্যে মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের কার্যক্রম শুরু করেছে।
তিনি বলেন, শূন্য পদে জনবল নিয়োগ একটি চলমান প্রক্রিয়া, যার অংশ হিসেবে ৪৫তম বিসিএসে ৪৫০ জন, ৪৬তম বিসিএসে ১৬৮২ জন, ৪৭তম বিসিএসে ১৩৩১ জন এবং ৫০তম বিসিএসে ৬৫০ জন সহকারী সার্জন নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সিনিয়র স্টাফ নার্সের শূন্য পদ পূরণের লক্ষ্যে সরকারি কর্ম কমিশনের মাধ্যমে নিয়োগ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। মিডওয়াইফ পদ পূরণের লক্ষ্যে ১৯/০৪/২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন সচিবালয়ে ‘মিডওয়াইফ’ (১০ম গ্রেড) পদে নিয়োগ পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়। এছাড়া বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন অতিদ্রুত এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে। অতি দ্রুত নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে কয়রা এবং পাইকগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শূন্য পদে পদায়ন করা হবে।
সংসদ সদস্য খায়রুল কবির খোকন (নরসিংদী-১) এর এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকের অনুমোদিত মোট ৪১ হাজার ৮০৬টি পদের মধ্যে বর্তমানে ৯ হাজার ৪০৭টি পদ শূন্য রয়েছে।
তিনি আরও জানান, নার্সদের জন্য অনুমোদিত ৪৯ হাজার ৫০১টি পদের মধ্যে ৫ হাজার ৩২টি পদ খালি রয়েছে।
এ ছাড়া সরকারি হাসপাতালগুলোতে অনুমোদিত ২৬ হাজার ৫৪৪টি স্বাস্থ্যকর্মীর পদের বিপরীতে ৮ হাজার ৭৮৪টি পদ বর্তমানে শূন্য রয়েছে বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য বীথিকা বিনতে হোসাইন এ সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের সকল নাগরিকের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে, সকল মানুষের নিকটস্থ সেবা আরও সহজতর করার লক্ষ্যে সারা বাংলাদেশের ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালকে ১০১ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে রূপান্তরিত করার ঘোষণা দিয়েছেন। শুধু হাসপাতাল না সাথে জনবল অস্ত্র, মানে যন্ত্রপাতি আইসিইউ এবং পোস্ট অপারেটিভ সেন্টার। সরি মানে স্পিকার স্যার সাহেব সরি। অস্ত্র না আমি বলেছি যন্ত্রপাতি। আর অস্ত্র পাচারের জন্য যন্ত্রপাতি এমনকি মাদার ব্রেস্টফিডিং কর্নারের পর্যন্ত প্রস্তাবনা রাখা হয়েছে।
সম্পুরক প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, আমাদের সরকার অতীত থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত স্বাস্থ্যখাতে কী করেছে বা কোন জায়গায় এসেছে। স্বাধীনতার মহান ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশের নিম্নবিত্ত মধ্যবিত্ত আত্মপীড়িত জনগণের স্বাস্থ্য সেবা দেওয়ার লক্ষ্যে সর্বপ্রথম সারা দেশব্যাপী তৎকালীন প্রত্যেকটি থানায় ৩০ থেকে ৩১ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল স্থাপন করে জনগণের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তৎপরবর্তীতে কোনও সরকার এই খাতে মনোনিবেশ করেননি। ১৯৯১ সালে বেগম খালেদা জিয়া যখন দ্বিতীয়বারের মত ২০২১ এ ক্ষমতায় আসলেন বাংলাদেশের মানুষ স্বাস্থ্য সেবাকে নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সেই দলেরই প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সারা দেশব্যাপী সকল উপজেলা হাসপাতালকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করে স্বাস্থ্যসেবা আরও উন্নত করেন।
তিনি আরও বলেন, একই দলের একই পরিবারের সন্তান বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের সকল নাগরিকের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সকল মানুষের নিকটস্থ সেবা আরও সহজতর করার লক্ষ্যে সারা বাংলাদেশে ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালকে ১০১ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে রূপান্তরিত করার ঘোষণা দিয়েছেন। শুধু হাসপাতাল না সাথে জনবল অস্ত্র মানে যন্ত্রপাতি আইসিইউ এবং পোস্ট অপারেটিভ সেন্টার, সরি মানে স্পিকার স্যার সাহেব সরি। অস্ত্র না আমি বলেছি যন্ত্রপাতি।
এ সময় সংসদ সদস্যদের অনেকেই হেসে ওঠেন। সাথে সাথে স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেও হাসতে থাকেন। হাসতে হাসতে কথা বলতে থাকেন। তিনি বলেন, আর অস্ত্র পাচারের জন্য যন্ত্রপাতি এমনকি মাদার ব্রেস্টফিডিং কর্নারের পর্যন্ত প্রস্তাবনা রাখা হয়েছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী সেটা করেছেন।
চট্টগ্রাম-১৬ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ জহিরুল ইসলামের তারকা চিহ্নিত ও সম্পূরক লিখিত প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সসহ দেশের সব হাসপাতালে কুকুরে কামড়ানোর প্রতিষেধক সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত সারা দেশে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৬৭৫ ভায়াল বা ৫ লাখ ৫৮ হাজার ৭০০ ডোজ ভ্যাকসিন সরবরাহ করা হয়েছে।
নির্দিষ্ট এলাকার তথ্য তুলে ধরে তিনি জানান, ১০ জুন পর্যন্ত বাঁশখালী উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সে অ্যান্টি-র্যাবিস ভ্যাকসিনের ৫০টি ভায়াল মজুত আছে। এছাড়া শরীরের ওপরের অংশে কুকুর কামড়ালে তড়িৎ অ্যান্টিবডি তৈরির জন্য ব্যবহৃত ইমিউন গ্লোবুলিন ভ্যাকসিনের মজুত রয়েছে ৬৫ ভায়াল বা ২৬০ ডোজ।
পরবর্তীতে ওই সংসদ সদস্যের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরবরাহ ব্যবস্থার বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আমরা সারা বাংলাদেশে তিন স্তরে স্টক (মজুত) রেডি রেখেছি। শুধু এটি নয়, প্রতিটি ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রেই উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে পর্যাপ্ত পরিমাণ মজুত রাখা হয়েছে।
জরুরি পরিস্থিতিতে ভ্যাকসিনের জোগান নিশ্চিত করতে সরকারের ‘চার স্তরের’ প্রস্তুতির কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, আমাদের পরিষ্কার নির্দেশনা রয়েছে, যদি কোনো উপজেলায় মাত্রাতিরিক্ত রোগী আসে এবং স্টক শেষ হয়ে যায়, তবে পাশের উপজেলা থেকে তাৎক্ষণিকভাবে সংগ্রহ করতে হবে। সেখানে শেষ হয়ে গেলে জেলা থেকে নেবে। জেলার মজুতও যদি শেষ হয়ে যায়, তবে কেন্দ্র বা সিএমএসডি থেকে ভ্যাকসিন সরবরাহ না হওয়া পর্যন্ত জেলা প্রশাসক (ডিসি) তাৎক্ষণিকভাবে কিনে দেবেন।
সংসদ সদস্য ও দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, চার স্তরে আমরা মজুত রেখেছি। মাননীয় সংসদ সদস্যকে নিশ্চয়তা প্রদান করছি, ইনশাআল্লাহ এই আশ্বিন মাসে কুকুরে বেশি কামড়ালেও আল্লাহর রহমতে আমাদের ভ্যাকসিনের কোনো অভাব হবে না।
ট্যানারির বিষাক্ত বর্জ্য দিয়ে তৈরি পোলট্রি ও ফিশ ফিড ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে কি না জানতে চান সংরক্ষিত নারী আসনের বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনির। জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘হ্যাঁ, বিষয়টি সম্পূর্ণ সত্য। বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদন থেকে এর প্রমাণ পাওয়া যায়।’
তিনি বলেন, ‘চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় ক্রোমিয়ামসহ বিভিন্ন ভারী ধাতু ব্যবহার করা হয়। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এসব বিষাক্ত চামড়ার বর্জ্য ব্যবহার করে কম খরচে পোলট্রি ও মাছের খাদ্য তৈরি করে থাকে।’
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সংসদকে জানান, এ ধরনের খাদ্য খাওয়ানো মুরগির মাংস ও ডিমে বিষাক্ত ‘হেক্সাভ্যালেন্ট ক্রোমিয়াম’ জমা হয়, যা রান্নার তাপেও নষ্ট হয় না। এই মুরগি বা মাছ মানবদেহে প্রবেশ করলে তা থেকে ক্যানসার, লিভার সিরোসিস, আলসার এবং কিডনি নষ্ট হওয়ার মতো মারাত্মক জটিল রোগের ঝুঁকি তৈরি হয়।
তিনি সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, এ ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় সরকার ইতিমধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করেছে। জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষার স্বার্থে ঢাকার হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি শিল্প সাভারের হেমায়েতপুরে চামড়া শিল্পনগরীতে স্থানান্তর করা হয়েছে। ২০১৭ সালে হাইকোর্টের নির্দেশের পর হাজারীবাগের ট্যানারিগুলোর গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে স্থানান্তর কার্যকর করা হয়।
মন্ত্রী বলেন, ‘সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে একটি কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) স্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে চামড়াশিল্পের রাসায়নিক বর্জ্য পরিশোধনের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে তা পরিবেশে ছড়িয়ে না পড়ে বা পোলট্রি ফিড তৈরিতে অবৈধভাবে ব্যবহার করা না যায়।’ এ ছাড়া হাজারীবাগ ও আশপাশের এলাকায় ট্যানারির বর্জ্য ব্যবহার করে পোলট্রি ও মাছের খাদ্য উৎপাদনকারী অবৈধ কারখানার বিরুদ্ধে র্যাব ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ভ্রাম্যমাণ আদালত নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করেছে বলেও জানান তিনি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, এসব অভিযানে অনেক কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ট্যানারি বর্জ্য থেকে তৈরি পোলট্রি ফিডের ক্যানসারের ঝুঁকি বৈজ্ঞানিকভাবে একটি প্রমাণিত সত্য। এই স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে ট্যানারি স্থানান্তর ও দূষণ রোধে ইতিমধ্যে দৃশ্যমান পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হয়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















