নিজস্ব প্রতিবেদক :
রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যাকাণ্ডের ঘটনার বিচার খুব সম্ভবত ৫-৭ দিনের মধ্যেই সমাপ্ত হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। একই সঙ্গে আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার কথাও জানান তিনি।
রোববার (২৪ মে) সচিবালয়ে গণমাধ্যম কেন্দ্রে বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএসআরএফ) আয়োজিত ‘বিএসআরএফ সংলাপ’-এ সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
সরকার পল্লবীর ঘটনায় আসলে অনেক আন্তরিকতা দেখিয়েছে, গতকাল প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন। কিন্তু এরই মধ্যে আমরা দেখলাম যে গতকালই আবার কলাবাগানে একই ঘটনা ঘটেছে, আট বছরের শিশুর ক্ষেত্রে। যারা এ ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছে তাদের কাছে সরকার কি আসলে সঠিক মেসেজটা দিতে পারছে না? এ প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, এটা আসলে সামাজিক অবক্ষয়, সামাজিক মূল্যবোধ। এখানে সমাজ সংস্কারের দরকার। যেখানে সামাজিক মূল্যবোধকে তুলে ধরা দরকার, আমাদের ধর্মীয় মূল্যবোধের ভিত্তিতে, কালচারের ভিত্তিতে। কিন্তু কিছু কিছু অপসংস্কৃতির আছর আমাদের সমাজে পড়েছে। কিছু কালচার এমন হয়েছে, এটা অপসংস্কৃতির কারণে। ধর্ষণের মাত্রা বা ধর্ষণের যে অবস্থা, সংখ্যা, ঘটনা—এটা আমাদের সহ্যসীমার বাইরে চলে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, আমরা কী করতে পারি? সরকার হিসেবে আমরা করতে পারি যে তার আইনানুগ ব্যবস্থা এবং বিচারের ব্যবস্থাটা নিশ্চিত করা। আমরা সবচাইতে মনোযোগ এখানেই দিয়েছি, দ্রুততম সময়ে যাতে অভিযুক্ত বা অপরাধীরা গ্রেপ্তার হয়। সেই জায়গায় আমরা এই তিন মাসে প্রত্যেকটি ঘটনায় সফল হয়েছি, ইনশাআল্লাহ। আর আল্লাহর রহমতে ভবিষ্যতেও আমরা এই জাতীয় যেকোনো ঘৃণ্য অপরাধের অভিযুক্ত বা অপরাধীদের কোনোভাবেই ছাড় দেবো না।
রামিসাকে ধর্ষণ এবং হত্যা করার পর আসামিকে সাত ঘণ্টার ভেতরে গ্রেপ্তার করা হয়েছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। সেই ১৬৪-এর স্টেটমেন্টে সহযোগী অপরাধী হিসেবে তার স্ত্রীকেও, তার নামও এসেছে; তাকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আমরা খুব দ্রুততার সঙ্গে আদালতের অনুমতি নিয়ে ডিএনএ টেস্ট করিয়েছি। সেই টেস্ট তিনদিনের সময় লাগে, তিনদিনের মধ্যে সেটা সমাপ্ত হয়েছে। রিপোর্ট কালকে বিকেলে জমা হয়েছে। পোস্টমর্টেম রিপোর্টটা আমরা হাতে পেয়েছি ইতোমধ্যেই।
তিনি বলেন, এগুলো সব একসঙ্গে কম্পাইল করে চার্জশিট প্রণয়নের কাজটা কালকে রাতের মধ্যে সমাপ্ত হয়েছে। আজকে দিনে আদালতে সেটা সোপর্দ করা হবে, হয়তো ইতোমধ্যে হয়ে গেছে। আদালত এর মধ্যে ছুটিতে যাবে আপনারা অনেকে জানেন। কিন্তু এই বিশেষ আদালতের ছুটি চিফ জাস্টিস বাতিল করার চিন্তা করছেন; এখনো হয়েছে কি না আমি জানি না, এটা আইন মন্ত্রণালয় ডিল করছে।
তিনি বলেন, আমরা একজন স্পেশাল পিপি নিয়োগ করেছি শুধুমাত্র এই মামলাটা ডিল করার জন্য। সবকিছু বিবেচনায় আমরা আশা করছি যে আজকের মধ্যে তো চার্জশিট দেওয়া হবেই এবং খুব সম্ভবত পাঁচ থেকে সাত দিনের ভেতরে এই বিচার কার্য সমাপ্ত হবে।
ঢাকায় প্রায় ৮০ হাজার মাদকের মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অফলাইন ও অনলাইনসহ সব ধরনের জুয়া, বেটিং রোধে আইন করছে সরকার। এ সংক্রান্ত ১৮৬৭ সালের আইনের সংস্কার করা হবে। আগামী সংসদেই আইনটি উত্থাপিত হবে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটেছে, সমাজ সংস্কার প্রয়োজন। কিছু কিছু অপসংস্কৃতির ছায়া আমাদের সমাজে পড়েছে। ধর্ষণের ঘটনা সহ্যসীমার বাইরে চলে যাচ্ছে। দ্রুততম সময়ে যেন অপরাধীরা গ্রেপ্তার হয়, সেদিকে সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দেয়া হচ্ছে। গত ৩ মাসে এ ধরনের প্রতিটি ঘটনায় অপরাধীদের গ্রেপ্তারে সফল হয়েছি। ভবিষ্যতেও এ জাতীয় ঘৃণ্য অপরাধে জড়িতদের কোনোভাবেই ছাড় দেয়া হবে না।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সামনে যে পাসপোর্ট ইস্যু করা হবে তাতে আগের মতোই ‘এক্সপেক্ট ইসরায়েল’ যুক্ত করবো। এটি দেশের গণমানুষের চাহিদাও বটে। বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের সময় ভিসা পেইজে ব্যক্তিতান্ত্রিক চর্চা লক্ষ্য করা গেছে। যেটি দেশের অধিকাংশ জনগণ এবং সংস্কৃতিকে প্রতিনিধিত্ব করে না। সে ক্ষেত্রে এখন পাসপোর্ট পেইজকে দেশের মানুষের চাহিদা অনুসারে সাজানোর চেষ্টা করছি। বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি-প্রতিনিধিত্ব, সংস্কৃতি দেখা যাবে পাসপোর্টে, সেখানে কোনো দলীয় চিন্তা দেখা যাবে না। এ সময় ভবিষ্যতে মুদ্রার মধ্যে বীর শ্রেষ্ঠদের ছবি দেখা যাবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির লক্ষ্যে ৩১ দফার মধ্যে একটি দফা রাখা হয়েছিল- আমরা ভবিষ্যতে একটি রিকনসিলিয়েশন কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেবো। সে জায়গায় এখনও আছি। কিন্তু সেটি এখনই করা হবে কিনা, এ বিষয়টি বিবেচনায় রাখিনি; কারণ আমাদের অগ্রাধিকারের মধ্যে আরও অনেক কাজ আছে। যখন প্রয়োজন হবে অবশ্যই আমরা রিকনসিলিয়েশন গঠনের উদ্যোগ নেবো। তার টার্মস ও রেফারেন্স কি হবে সেটি তখন নির্ধারণ হবে।
এ সময় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা থাকা দরকার বলেও উল্লেখ করেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তবে, সামাজিক মাধ্যমে যেসব অসামাজিক কার্যকলাপ হয়, সেই ব্যাপারে সাংবাদিকদের ভূমিকা থাকা উচিত বলে মনে করেন মন্ত্রী।
তিনি বলেন, দেশের সার্বিক শৃঙ্খলা সৃষ্টি ও বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির লক্ষ্যে বিএনপির ৩১ দফার মধ্যে রিকন্সিলিয়েশন কমিশন করার একটি ধরে রাখা হয়েছিল। সেই অবস্থানে এখনো সরকার রয়েছে। তবে এটা করা হবে কি না, সেটা এখনই বলা সম্ভব নয়। অগ্রধিকারমূলক কাজগুলোর মধ্যে এটি এখনও নেই।
সরকার চায় শেখ হাসিনা বিচারের মুখোমুখি হোন এমন মন্তব্য করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা এখনো চাই আইনানুগ প্রক্রিয়ায় দুই দেশের মধ্যকার প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী ভারত সরকার তাকে (শেখ হাসিনা) ফেরত পাঠাবে। আমরা তো চাই তিনি বিচারের মুখোমুখি হোন।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে আসবেন বলে বলেছেন, আমরা বিভিন্ন মিডিয়াতে জানতে পেরেছি। ওনার ট্রাভেল পাস চাওয়ার ক্ষেত্রে আলোচনা হচ্ছে, এ ব্যাপারে আপনাদের বাংলাদেশের প্রস্তুতি বা কোনো তথ্য আছে কি না- জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে আমি আরও অনেক আগে বলেছি। আমরা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভারত সরকারের কাছে তার এক্সট্রাডিশনের জন্য চিঠি পাঠিয়েছি অনেক আগে, রিপিটেডলি। আমরা এখনো চাই আইনানুগ প্রক্রিয়ায় তিনি এক্সট্রাডিশন চুক্তি ইন বিটুইন (দুই দেশের মধ্যকার প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী) মানে এক্সট্রাডিশন ট্রিটি ইন বিটুইন টু কান্ট্রিস (দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তি) এই বিধান মতে ভারত সরকার তাকে ফেরত পাঠাবেন। আমরা তো চাই তিনি বিচারের মুখোমুখি হোন।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, জুয়া, ব্যাটিং, অনলাইন জুয়া কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের জন্য আলাদা একটা আইন প্রণয়ন হাতে নিয়েছেন।
মন্ত্রী বলেন, আশা করি ইনশাআল্লাহ, আগামী সেশনে সেই আইনটা আমরা পাবো। এখন পর্যন্ত যে আইনটা আছে সেটা একদম মান্ধাতা আমলের। ১৮৬৭ সালের বোধহয় একটা আইন রয়েছে। সেই আইনটাকে আমরা রিপিল করে একটা যুগোপযোগী আধুনিক অপরাধ আর কি বর্তমানে যে সমস্ত হয়, যে অনলাইন জুয়া, অফলাইন জুয়া, ইন্টারনেটের মাধ্যমে ব্যাটিং ইত্যাদি অপরাধের ধরন বেড়েছে, সবগুলোকে এড্রেস করে আমরা যুগোপযোগী একটা আইন আনতে পারবো।
বিএসআরএফ’র সভাপতি মাসউদুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংলাপে উপস্থিত ছিলেন প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন আয়োজন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক উবায়দুল্লাহ বাদল।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















