নিজস্ব প্রতিবেদক :
রাজধানী ঢাকা তথা দেশজুড়ে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজি-বাইকের মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি, তীব্র যানজট এবং সড়ক দুর্ঘটনা রোধে একটি সুনির্দিষ্ট সুসমন্বিত নির্দেশনা আসতে যাচ্ছে সরকারের পক্ষ থেকে। ঢাকা সিটিতে একটি আধুনিক মাল্টিমোডাল বা বহুমাত্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এরইমধ্যে সরকার সমন্বিতভাবে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। যার অংশ হিসেবে এই ব্যাটারিচালিত যানগুলোর নিয়ন্ত্রণ ও সঠিক ব্যবস্থাপনা কেমন হতে পারে তা নিয়ে বর্তমানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে বলে জাতীয় সংসদ জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
সোমবার (১৩ জুলাই) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ২৩তম দিনে সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য শওকত আরা আক্তারের ৭১ বিধিতে দেওয়া এক জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন নোটিশের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন।
সংসদ সদস্য শওকত আরা আক্তার তার নোটিশে দেশের ক্রমবর্ধমান কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করতে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় দেশের সব গণপরিবহনকে বৈদ্যুতিক বা পরিবেশবান্ধব জ্বালানিতে রূপান্তর করার জোরালো প্রস্তাব উত্থাপন করেন।
তিনি উল্লেখ করেন যে, বিশ্বব্যাপী কার্বন নিঃসরণ বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশ মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে, যার ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার মতো সংকট তৈরি হচ্ছে। পরিবহন খাত থেকে দেশে বছরে প্রায় ১১.৬ মিলিয়ন টন কার্বন-ডাই অক্সাইড নির্গমন হয়, যার সিংহভাগই আসে সড়ক পথের ডিজেলচালিত বাস ও ট্রাক থেকে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে তিনি স্থায়ী সমাধান হিসেবে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়ে গণপরিবহনকে বৈদ্যুতিক যানবাহনে রূপান্তর, সিএনজি-এলএনজির ব্যবহার বৃদ্ধি, এবং সবুজ হাইড্রোজেন ও সৌর বিদ্যুতের ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।
পরে সম্পূরক প্রশ্নে শওকত আরা আক্তার ঢাকার রাস্তায় তীব্র যানজট ও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে লাখ লাখ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচলকে দায়ী করেন। তবে তিনি একইসঙ্গে উল্লেখ করেন যে, কম খরচে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানো এবং চালকের শারীরিক পরিশ্রম কম হওয়ার কারণে যাত্রী ও চালক উভয়ই এতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। পরিবেশবান্ধব এই বাহনগুলোকে পুরোপুরি বন্ধ না করে, এগুলোর মান উন্নয়ন এবং নির্দিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে এনে রাস্তায় শৃঙ্খলা ফেরানোর কোনো পরিকল্পনা সরকারের আছে কিনা মন্ত্রীর কাছে তা জানতে চান তিনি।
সংসদ সদস্যের এই প্রশ্নের জবাবে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী জানান, ঢাকা মহানগরীর অভ্যন্তরীণ এই যানগুলো মূলত সিটি কর্পোরেশন এবং ট্রাফিক বিভাগ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে, যেখানে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সরাসরি হস্তক্ষেপের সুযোগ কম। তবে ঢাকার সামগ্রিক যানজট নিরসন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়নে সরকার বসে নেই।
তিনি আরও জানান, ব্যাটারিচালিত রিকশার সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলমান রয়েছে। খুব শিগগিরই ঢাকা সিটিসহ সারা বাংলাদেশের ব্যাটারিচালিত যান নিয়ন্ত্রণ অথবা সুচারুভাবে পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও নির্দেশনা জারি করা হবে। যার আলোকেই পরবর্তীতে স্থানীয় প্রশাসন ও সরকার সমন্বিতভাবে কাজ করবে।
লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. শাহাদাত হোসেনের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) আইন ও সংশ্লিষ্ট নীতিমালা নিখুঁতভাবে অনুসরণ করে বাংলাদেশ ও ডেনমার্ক সরকারের সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) কাঠামোর আওতায় সম্পূর্ণ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় এই চুক্তিটি সম্পাদন করা হয়েছে।
সংসদকে নৌমন্ত্রী জানান, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই অবকাঠামো উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে ২০২১ সালের ৩০ জুন বাংলাদেশ ও ডেনমার্ক সরকারের মধ্যে প্রথম একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালের ২১ মে ডেনমার্কভিত্তিক মার্স্ক গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালস কর্ণফুলী নদীর ডান তীরে লালদিয়াচর এলাকায় একটি কন্টেইনার টার্মিনাল নির্মাণের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেয়। পরবর্তীতে, ২০২৩ সালের ২৯ নভেম্বর অর্থনৈতিক বিষয়ক সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি প্রকল্পটিকে নীতিগত অনুমোদন দেয় এবং ২০২৪ সালের ৩ জানুয়ারি বাংলাদেশ-ডেনমার্ক প্রথম পিপিপি জয়েন্ট প্ল্যাটফর্ম সভায় ডেনমার্ক সরকার এপিএম টার্মিনালসের মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে চূড়ান্ত সম্মতি জানায়। এরপর ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) ট্রানজ্যাকশন অ্যাডভাইজার হিসেবে প্রয়োজনীয় ডিউ ডিলিজেন্স ও সব আইনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করার পর ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও এপিএমটি বিভি- এর মধ্যে ঐতিহাসিক কনসেশন চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়।
মন্ত্রী এই প্রকল্পের সময়সীমা উল্লেখ করে জানান, চুক্তিটির মোট মেয়াদ ৩৩ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে, যার মধ্যে প্রথম তিন বছর নির্মাণকাল এবং পরবর্তী ৩০ বছর পরিচালনাকাল হিসেবে গণ্য হবে। তবে চুক্তির শর্তানুযায়ী পরবর্তীতে আরও ১৫ বছর এই মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ রাখা হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের খালি জায়গায় নির্মিতব্য এই অত্যাধুনিক টার্মিনালে ডেনমার্কভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করবে। বিপুল পরিমাণের এই আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের কন্টেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে, দেশের অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং বৈশ্বিক উন্নত প্রযুক্তি স্থানান্তরের এক বিশাল সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. নুরুল ইসলামের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে নৌ-পরিবহনমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের সামুদ্রিক বাণিজ্য অবকাঠামোয় এক ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করতে যাচ্ছে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর। আগামী ২০২৯ সালের মধ্যে এই বন্দরটি চালু হলে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রায় ৮ হাজার ২০০ টিইইউ ধারণক্ষমতার বিশাল কনটেইনারবাহী মাদার ভেসেল এবং ১ লাখ ডেডওয়েট টনের মালবাহী জাহাজ সরাসরি ভিড়তে পারবে। বর্তমান চট্টগ্রাম বন্দরের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি ধারণক্ষমতার জাহাজ বার্থিংয়ের এই অনন্য সুযোগ দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে আমূল পরিবর্তন আনবে। এর ফলে আমদানিকারকদের সিঙ্গাপুর, কলম্বো, মালয়েশিয়াসহ আঞ্চলিক বিভিন্ন ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরের ওপর নির্ভর করতে হয়। সেখানে পণ্য খালাস করে ছোট ফিডার ভেসেলে করে বাংলাদেশে আনার কারণে প্রতি চালানে অতিরিক্ত ট্রান্সশিপমেন্ট ব্যয় ও পরিবহন সময় বৃদ্ধি পায়, যা সামগ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
সংসদকে মন্ত্রী জানান, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরে প্রায় ১৬ মিটার গভীরতার একটি নৌ-চ্যানেল এবং আধুনিক কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ করা হচ্ছে। এই বন্দরটি চালু হলে চট্টগ্রাম বন্দরে বর্তমানে আগত জাহাজের তুলনায় প্রায় চারগুণ বেশি ধারণক্ষমতার জাহাজ সরাসরি বার্থিং নিতে পারবে। এতে বিদেশি বন্দরের ওপর নির্ভরশীলতা কমার পাশাপাশি পণ্য পরিবহন ও খালাস কার্যক্রম আরও দ্রুত, সাশ্রয়ী ও দক্ষ হবে, যা দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা অনেক বাড়িয়ে দেবে। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর কেবল দেশের বাণিজ্যের সক্ষমতাই বাড়াবে না, এটি ভবিষ্যতে আঞ্চলিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাব হিসেবে গড়ে উঠবে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ট্রানজিটেও বড় ভূমিকা রাখবে।
মাতারবাড়ী প্রকল্পের পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন নৌমন্ত্রী। তিনি বলেন, ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সরাসরি শিপিং চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে জাহাজ থেকে কনটেইনার খালাস ও ডেলিভারি কার্যক্রমের ৮০ শতাংশ ডিজিটালাইজেশন করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) পরিচালনা এবং নতুন বে-টার্মিনাল নির্মাণের কাজও উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে চলছে।
মন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন যে, কর্ণফুলী চ্যানেলের বর্তমান গভীরতা ৮.৫ থেকে ১০ মিটার এবং এটি জোয়ার-ভাটানির্ভর হওয়ায় বর্তমানে সর্বোচ্চ ১০ মিটার গভীরতার এবং গড়ে প্রায় ৩ হাজার টিইইউ ধারণক্ষমতার জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়তে পারে। তবে বে-টার্মিনাল ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর পুরোপুরি চালু হলে ১২ থেকে ১৪ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভিড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে, যা জাহাজের অপেক্ষার সময় কমিয়ে আনবে। এছাড়া বন্দরের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে এবং স্বল্প সময়ে কম খরচে পণ্য খালাস নিশ্চিত করতে বেসরকারি আইসিডির মাধ্যমে কনটেইনার ডেলিভারি জোরদার করা, বন্দরে পড়ে থাকা ১০ হাজারের বেশি টিইইউ কনটেইনার কাস্টমসের মাধ্যমে নিলামে নিষ্পত্তি করা এবং জাহাজ বন্দরে পৌঁছানোর আগেই পণ্য ছাড়করণের জন্য প্রি-অ্যারাইভাল প্রসেস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে মন্ত্রী সংসদকে অবহিত করেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 
























