নিজস্ব প্রতিবেদক :
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, ‘রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক আইনি সুরক্ষা কেবল তিনি দায়িত্বে থাকা পর্যন্ত কার্যকর থাকে। দায়িত্ব শেষ হলে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে সচিবালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি এ কথা বলেন।
সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে কি না? এমন এক প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশের একজন রাষ্ট্রপতি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় তার বিরুদ্ধে কোনো আইনি কার্যক্রম শুরু করা যায় না। তবে এই সুরক্ষা কেবল তার দায়িত্বকালীন সময়ের জন্য প্রযোজ্য। তিনি দায়িত্ব ছাড়ার পর, দায়িত্ব গ্রহণের আগে বা পরে সংঘটিত কোনো অভিযোগ বা আইনগত বিষয়ে প্রয়োজন হলে তার বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
তিনি বলেন, আদালতের সামনে সরকার একটি পক্ষ মাত্র। আদালত একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। সরকারের বিরুদ্ধে অনেক রিট হয় এবং অসংখ্য রিটে সরকার উচ্চ আদালতে পরাজিত হয়। সরকার কিছু করছে না-এটুকু আমি নিশ্চিত করতে পারি। আদালত স্বাধীনভাবে তার কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, তিনি বর্তমান বিদায়ী রাষ্ট্রপতিকে উদ্দেশ্য করে এ মন্তব্য করছেন না, বরং এটি একটি সাধারণ সাংবিধানিক ব্যাখ্যা। এ বিষয়ে যে বিভ্রান্তি ছিল, তা দূর হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
আদালতের স্বাধীনতা নিয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, আদালত সরকার নয়, আদালত একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালসহ সব আদালতেই জনগণ ন্যায়বিচারের জন্য যেতে পারেন।
তিনি বলেন, কোনো কোনো মামলায় সরকার একটি পক্ষ হতে পারে, তবে আদালত স্বাধীনভাবেই সিদ্ধান্ত দেয়। আবার অনেক ক্ষেত্রেই সরকার কোনো মামলার পক্ষও থাকে না।
তিনি আরও বলেন, সরকারের বিরুদ্ধেও অসংখ্য রিট হয় এবং উচ্চ আদালতে বহু মামলায় সরকার পরাজিত হয়। তাই সরকার বিচার প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করছে এমন অভিযোগের ভিত্তি নেই।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, আমি আপনাকে নিশ্চিত করতে পারি, এখন আদালতে সবকিছুই যাচ্ছে এবং আদালত স্বাধীনভাবে তার কাজ করছে।
জুলাই আন্দোলনে ৭.৬২ মিলিমিটার বুলেট ব্যবহার করা হয়েছিল এবং এ নিয়ে স্নাইপার ব্যবহারের যে আলোচনা বা প্রচারণা চলছে, তা বিভ্রান্তিকর বলে মন্তব্য করে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, ৭.৬২ মিলিমিটার বুলেট নিয়ে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক তৈরি করা হচ্ছে। এ ধরনের গুলি কোনো রহস্যময় বা বিশেষ অস্ত্রের নয়, দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ পুলিশের ব্যবহৃত চীনা টাইপ-৫৬ রাইফেলে এই ক্যালিবারের গুলি ব্যবহার করা হয়।
তিনি বলেন, আমি অবাক হয়েছি, কেউ কেউ এমনভাবে বলছেন যেন ৭.৬২ মিলিমিটার বুলেট মানেই স্নাইপার রাইফেলের গুলি। বিষয়টি মোটেও তা নয়। পুলিশের হাতে বহু বছর ধরেই টাইপ-৫৬ রাইফেল রয়েছে, যা ৭.৬২ মিলিমিটার গুলি ব্যবহার করে।
তথ্য উপদেষ্টা বলেন, টাইপ-৫৬ একটি সামরিক মানের রাইফেল, যা আগে সেনাবাহিনীর কাছে ছিল। পরে এটি সীমান্তরক্ষী বাহিনী এবং সর্বশেষ পুলিশের কাছে আসে। এ অস্ত্রের কার্যকর পাল্লা প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ মিটার পর্যন্ত হওয়ায় সাধারণ পুলিশের হাতে এমন অস্ত্র থাকা নিয়ে অতীতেও তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন।
তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের সময় আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) পক্ষ থেকে এমন একটি ধারণা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হচ্ছে যে, সরকারবিরোধী আন্দোলনকারীরা স্নাইপার ব্যবহার করে মানুষ হত্যা করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, পুলিশের কাছেই ৭.৬২ মিলিমিটার গুলি ব্যবহারকারী রাইফেল ছিল। বিজিবির কাছেও একই ধরনের অস্ত্র ছিল। গুলি চালানোর ছবি ও ভিডিওও রয়েছে।
তিনি আরো বলেন, তাই কোথাও থেকে অজ্ঞাত কোনো স্নাইপার এসে গুলি করেছে, এ ধরনের প্রচারণার বাস্তব ভিত্তি নেই। তদন্তে এসব ঘটনার প্রকৃত চিত্র উঠে আসবে।
ডা. জাহেদ উর রহমানের বলেন, পুলিশের কাছে প্রাণঘাতী অস্ত্র থাকার বিষয়টি নতুন কিছু নয়। তবে জননিয়ন্ত্রণে সাধারণত স্বল্প-পাল্লার অস্ত্র ব্যবহারের প্রচলন থাকলেও ৭.৬২ মিলিমিটার রাইফেলের মতো দীর্ঘ-পাল্লার অস্ত্র ব্যবহারের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের ঘটনাগুলোর তদন্তে কারা কী ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করেছে, তা আইনগত প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে। তবে ৭.৬২ মিলিমিটার বুলেটকে কেন্দ্র করে স্নাইপার তত্ত্ব ছড়িয়ে বিভ্রান্তি তৈরির সুযোগ নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য নয়, পর্যবেক্ষক হিসেবে আমন্ত্রণ পাওয়ার বিষয়টি রয়েছে। ফলে সরকারের পর্যায়ে সিদ্ধান্ত হবে, প্রধানমন্ত্রী সেখানে যাবেন কি না। তিনি গেলে বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের সুযোগও থাকবে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি এবং এ নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়েছে বলেও তার জানা নেই।
বাংলাদেশ রেলওয়ের আয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বেড়েছে এবং ভবিষ্যতে এটিকে একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়ে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ রেলওয়ের মোট আয় হয়েছে ২ হাজার ৬৬ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আয় ছিল ১ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে রেলের আয় বেড়েছে ২২১ কোটি টাকার বেশি।
তথ্য উপদেষ্টা বলেন, বর্তমানে রেলের ব্যয় এখনো আয়ের চেয়ে বেশি হওয়ায় সরকারকে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। তবে আয় বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ রেলওয়েকে একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা সম্ভব হবে বলে সরকার আশাবাদী।
সংবাদ সম্মেলনে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, স্বাস্থ্যগত কারণে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেছেন। সংবিধানের বিধান অনুযায়ী তার পদত্যাগপত্র গ্রহণের পর জাতীয় সংসদের স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য সংসদ অধিবেশন প্রয়োজন এবং সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, সম্প্রতি তিনটি প্রতিষ্ঠানের তিনটি পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিনের এই সমস্যা সমাধানে সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে সরকারি খাদ্যগুদামে ২৩ লাখ ৯৬ হাজার ৭৫৩ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য মজুত রয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য চলমান খোলা বাজারে বিক্রয় (ওএমএস) কর্মসূচির আওতায় প্রতিদিন ১ হাজার ১৯৫ মেট্রিক টন চাল এবং ১ হাজার ৪৪৩ মেট্রিক টন আটা ভর্তুকি মূল্যে বিক্রি করা হচ্ছে। অর্থনৈতিক পরিস্থিতির আরও উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে সহায়তা অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম তুলে ধরে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, নতুন প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বীর মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধার পরিবার এবং খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী ভাতা ও বিভিন্ন আর্থিক সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। নতুন হার অনুযায়ী বীর উত্তম খেতাবপ্রাপ্তরা মাসিক ৩০ হাজার টাকা সম্মানী ভাতা পাবেন। এছাড়া চিকিৎসা ভাতা, বিজয় দিবস ও বাংলা নববর্ষ ভাতাসহ অন্যান্য সুবিধাও বৃদ্ধি করা হয়েছে।
বীর বিক্রম ও বীর প্রতীক খেতাবপ্রাপ্তদের মাসিক সম্মানী ভাতা ২৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। একইভাবে শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের মাসিক সম্মানী ভাতা, চিকিৎসা ভাতা, উৎসব ভাতা ও বাংলা নববর্ষ ভাতাও বাড়ানো হয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৪০০ থেকে ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। এর ফলে শিল্প, আবাসিক গ্রাহক এবং সিএনজি স্টেশনগুলোতে গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে অন্তত এক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের সংকট মোকাবিলায় স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াতে চতুর্থ ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। মালয়েশিয়া থেকে আইএসও ট্যাংকের মাধ্যমে এলএনজি আমদানির সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। এছাড়া ভোলার গ্যাস স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি মূল ভূখণ্ডে সরবরাহের জন্য পাইপলাইনসহ বিভিন্ন পরিবহন ব্যবস্থা পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও জানান, কৃষক কার্ড কর্মসূচির প্রস্তুতিও এগিয়ে চলছে এবং এ বিষয়ে সরকার প্রয়োজনীয় কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।
দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া বেশিরভাগ টুথপেস্টেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এ ব্যাপারে সরকার ব্যবস্থা নেবে কি না জানতে চাইলে উপদেষ্টা বলেন, সরকার এই জননিরাপত্তার ব্যাপারটা খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। কিন্তু মাইক্রোপ্লাস্টিক টুথপেস্ট তো বটেই, মানে এটা একটা বিরাট ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়েছে। আপনি ওই টুথপেস্ট ব্যবহার না করলেও বিভিন্ন জায়গা থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক তৈরি হচ্ছে, সেগুলো আসলে আমাদের খাবারে, আমাদের পানিতে ছড়িয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, একটা সমন্বিত পদক্ষেপ লাগবে। একটা সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া আসলে টুথপেস্ট বা অন্য সবকিছু মানে একটা জায়গায় ব্যবস্থা নিলেই হয়ে যাবে তা না। তবে যেহেতু এগুলো এই পরিমাণ দেখা গেছে, সরকারের সংস্থা আছে নিশ্চয়ই এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেবে।
তিনি আরও বলেন, আমরা এটা খেয়াল করছি যে জনগণের এখন হেলথ কনশাসনেস বাড়ছে, তারা এটা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে প্রচুর কথা বলেছেন। এবং একটা জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার, জনগণের স্বার্থে পদক্ষেপ অবশ্যই নেবে।
প্রেস ব্রিফিংয়ে তথ্য অধিদফতরের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ এবং মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব ড. মো. আলম মোস্তফা উপস্থিত ছিলেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















