জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান

নিজস্ব প্রতিবেদক :

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে নির্বাচিত হলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।

নিউ ইয়র্ক সময় মঙ্গলবার (২ জুন) সকাল ১০টায় ভোট গ্রহণ শুরু হয়। ভোটে অংশ নিতে পৌনে ১০টার দিকে জাতিসংঘ সদর দফতরে প্রবেশ করেন খলিলুর রহমান। এসময় তার সঙ্গে ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ূন কবির। ইউএনএইচকিউর জেনারেল অ্যাসেম্বলি হলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত আঞ্চলিক আবর্তন অনুযায়ী, সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপ থেকে এবার নির্বাচিত হওয়ার কথা ছিল। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং সাইপ্রাসের বহুপাক্ষিকতা-বিষয়ক বিশেষ দূত রাষ্ট্রদূত আন্দ্রেয়াস কাকুরিস এক বছরের জন্য জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতিত্বের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। নির্বাচনে ১৯০টি ভোটের মধ্যে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান পেয়েছেন ৯৯টি এবং প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের আন্দ্রেয়াস এস কাকৌরিস পেয়েছেন ৯১টি।

নির্বাচিত খলিলুর রহমান আগামী এক বছরের জন্য জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বর্তমান সভাপতি এবং জার্মানির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনালেনা বেয়ারবকের স্থলাভিষিক্ত হবেন তিনি।

প্রায় ৪০ বছর পর বাংলাদেশ আবারও এই গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। এর আগে ১৯৮৬ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী।

প্রাথমিকভাবে চার বছর আগে সভাপতি পদে প্রার্থিতা ঘোষণা করা হলেও রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তা স্থগিত ছিল। পরবর্তীতে ফিলিস্তিনের প্রার্থিতা ঘোষণা ও প্রত্যাহারের পর পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়। ফিলিস্তিনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলে মুসলিম ভোট বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কাও তখন আলোচনায় আসে।

সর্বশেষ পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের বর্তমান সরকার নতুন করে প্রার্থী হিসেবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানকে মনোনয়ন দেয়।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের নিয়ম অনুযায়ী, ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের প্রত্যেকটি একটি করে ভোট প্রদান করে এবং গোপন ব্যালটের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পাওয়া প্রার্থী সভাপতি নির্বাচিত হন।

ড. খলিলুর রহমান ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। এর আগে তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং রোহিঙ্গা ইস্যুতে উচ্চ প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ড. রহমান ১৯৭৭ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম নিয়মিত বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করে ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সেবায় যোগ দেন। একই বছরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিতে এমএ পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত তিনি যুক্তরাষ্ট্রের টাফটস বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্লেচার স্কুল অব ল অ্যান্ড ডিপ্লোমেসি এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কেনেডি স্কুল অব গভর্নমেন্টে অধ্যয়ন করেন এবং সেখান থেকে ল অ্যান্ড ডিপ্লোমেসিতে এমএ এবং অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

১৯৮৩ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং নিউইয়র্কে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অর্থনৈতিক ও আর্থিক কমিটিতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। এছাড়া তিনি স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনের সভাপতির সহকারী ছিলেন।

১৯৯১ সালে তিনি জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা (ইউএনসিটিএডি)-এ জেনেভায় বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে জাতিসংঘের কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তী ২৫ বছর তিনি নিউইয়র্ক ও জেনেভায় জাতিসংঘের বিভিন্ন উচ্চপদে কাজ করেন এবং জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ প্রধান প্রকাশনাগুলোর প্রধান লেখক ও বিষয়বস্তু অবদানকারী হিসেবে ভূমিকা রাখেন।

ড. রহমান ঢাকায় ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা এবং ২০২৪ সালের নভেম্বর পর্যন্ত এর ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য ছিলেন। এরপর তিনি রোহিঙ্গা ইস্যুতে উচ্চ প্রতিনিধি এবং পরে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পান।

তিনি বিবাহিত এবং তার দুই কন্যা ও চারজন নাতি-নাতনি রয়েছে।

জনপ্রিয় খবর

আবহাওয়া

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান

প্রকাশের সময় : ০৯:৫২:৫৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২ জুন ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক :

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে নির্বাচিত হলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।

নিউ ইয়র্ক সময় মঙ্গলবার (২ জুন) সকাল ১০টায় ভোট গ্রহণ শুরু হয়। ভোটে অংশ নিতে পৌনে ১০টার দিকে জাতিসংঘ সদর দফতরে প্রবেশ করেন খলিলুর রহমান। এসময় তার সঙ্গে ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ূন কবির। ইউএনএইচকিউর জেনারেল অ্যাসেম্বলি হলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত আঞ্চলিক আবর্তন অনুযায়ী, সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপ থেকে এবার নির্বাচিত হওয়ার কথা ছিল। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং সাইপ্রাসের বহুপাক্ষিকতা-বিষয়ক বিশেষ দূত রাষ্ট্রদূত আন্দ্রেয়াস কাকুরিস এক বছরের জন্য জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতিত্বের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। নির্বাচনে ১৯০টি ভোটের মধ্যে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান পেয়েছেন ৯৯টি এবং প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের আন্দ্রেয়াস এস কাকৌরিস পেয়েছেন ৯১টি।

নির্বাচিত খলিলুর রহমান আগামী এক বছরের জন্য জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বর্তমান সভাপতি এবং জার্মানির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনালেনা বেয়ারবকের স্থলাভিষিক্ত হবেন তিনি।

প্রায় ৪০ বছর পর বাংলাদেশ আবারও এই গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। এর আগে ১৯৮৬ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী।

প্রাথমিকভাবে চার বছর আগে সভাপতি পদে প্রার্থিতা ঘোষণা করা হলেও রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তা স্থগিত ছিল। পরবর্তীতে ফিলিস্তিনের প্রার্থিতা ঘোষণা ও প্রত্যাহারের পর পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়। ফিলিস্তিনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলে মুসলিম ভোট বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কাও তখন আলোচনায় আসে।

সর্বশেষ পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের বর্তমান সরকার নতুন করে প্রার্থী হিসেবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানকে মনোনয়ন দেয়।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের নিয়ম অনুযায়ী, ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের প্রত্যেকটি একটি করে ভোট প্রদান করে এবং গোপন ব্যালটের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পাওয়া প্রার্থী সভাপতি নির্বাচিত হন।

ড. খলিলুর রহমান ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। এর আগে তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং রোহিঙ্গা ইস্যুতে উচ্চ প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ড. রহমান ১৯৭৭ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম নিয়মিত বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করে ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সেবায় যোগ দেন। একই বছরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিতে এমএ পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত তিনি যুক্তরাষ্ট্রের টাফটস বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্লেচার স্কুল অব ল অ্যান্ড ডিপ্লোমেসি এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কেনেডি স্কুল অব গভর্নমেন্টে অধ্যয়ন করেন এবং সেখান থেকে ল অ্যান্ড ডিপ্লোমেসিতে এমএ এবং অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

১৯৮৩ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং নিউইয়র্কে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অর্থনৈতিক ও আর্থিক কমিটিতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। এছাড়া তিনি স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনের সভাপতির সহকারী ছিলেন।

১৯৯১ সালে তিনি জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা (ইউএনসিটিএডি)-এ জেনেভায় বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে জাতিসংঘের কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তী ২৫ বছর তিনি নিউইয়র্ক ও জেনেভায় জাতিসংঘের বিভিন্ন উচ্চপদে কাজ করেন এবং জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ প্রধান প্রকাশনাগুলোর প্রধান লেখক ও বিষয়বস্তু অবদানকারী হিসেবে ভূমিকা রাখেন।

ড. রহমান ঢাকায় ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা এবং ২০২৪ সালের নভেম্বর পর্যন্ত এর ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য ছিলেন। এরপর তিনি রোহিঙ্গা ইস্যুতে উচ্চ প্রতিনিধি এবং পরে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পান।

তিনি বিবাহিত এবং তার দুই কন্যা ও চারজন নাতি-নাতনি রয়েছে।