গাজীপুর জেলা প্রতিনিধি :
কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী।
বুধবার (৩ জুন) রাতে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তিনি মুক্ত হন। কারামুক্ত হওয়ার সময় কারাগারের বাইরে তার আইনজীবী ও পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারামহাপরিদর্শক (এআইজি-মিডিয়া) মো. জান্নাত-উল ফরহাদ সাবেক মেয়র আইভীর মুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, বুধবার ১২টি মামলায় সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর জামিনের আদেশ কারাগারে পৌঁছায়। তার বিরুদ্ধে অন্য কোনো আটকাদেশ না থাকায় সব আইনি প্রক্রিয়া শেষে বুধবার রাত ১০টা ৮ মিনিটের দিকে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (এ আইজি) জান্নাত উল ফরহাদ বলেন, বুধবার হাইকোর্টের ক্রিমিনাল মিস নং-১৩৪১২/২৬ এবং নারায়ণগঞ্জের চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের স্মারক নং-৭৭৩ অনুযায়ী জামিনের আদেশ কারা কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছায়। এছাড়া নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারের স্মারক নং-১৪৫৭ অনুযায়ী নারায়ণগঞ্জের ৯টি মামলায় সেলিনা হায়াৎ আইভীর জামিনের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। তার বিরুদ্ধে অন্য কোনো আটকাদেশ না থাকায় বুধবার রাতে তিনি মুক্তি পেয়েছেন।
কারা কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ৯ মে সেলিনা হায়াৎ আইভীকে নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগের নিজ বাসা থেকে গ্রেপ্তারের পর গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারে স্থানান্তর করা হয়।
আইভীর মুক্তির সময় কারাগার ফটকে তার আইনজীবী ও স্বজনেরা উপস্থিত ছিলেন। কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর আইভী একটি গাড়িতে ওঠেন। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কোনও কথা বলেননি।
আইভীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট আওলাদ হোসেন বলেন, ‘আইভীর বিরুদ্ধে হওয়া মামলাগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। মামলাগুলোর সঙ্গে আইভী কোনোভাবেই জড়িত নন। গত বছরের মে মাসে নারায়ণগঞ্জের বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এক বছরেরও বেশি সময় তিনি কারাবন্দি ছিলেন। আমরা আইনিভাবে ওনার মুক্তির জন্য সর্বোচ্চ আদালত থেকে ন্যায় বিচার পেয়েছি। তবে হাইকোর্ট তাকে জামিন দেওয়ার পরও রাষ্ট্রপক্ষ জামিনের আদেশ বাতিল করার জন্য চেম্বার জজে যায়। আপিল বিভাগ শুনানি শেষে হাইকোর্টের দেওয়া আদেশ বহাল রাখে। এতে আইভির মুক্তি পেতে বাধা কাটে।’
তিনি বলেন, ‘মুক্তির পর সরাসরি নারায়ণগঞ্জের দেওভোগে তার বাড়ির পথে রওয়ানা হয়েছেন। তিনি আইনি লড়াই চালিয়ে যাবেন এবং ভবিষ্যতে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে অংশ নেওয়ারও পরিকল্পনা রয়েছে।’
আইভির বিরুদ্ধে মোট ১২টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে গত ১০ মে ১০টি মামলায় তার জামিন বহাল রাখেন আপিল বিভাগ।
এর আগে হাইকোর্ট তাকে জামিন দিয়েছিলেন। ওই আদেশ বহাল থাকায় তার মুক্তির পথ অনেকটাই উন্মুক্ত হয়। বাকি দুটি মামলায়ও হাইকোর্ট থেকে জামিন পাওয়ার পর রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে আবেদন করে। পরে ১৭ মে আপিল বিভাগ ওই দুই মামলাতেও হাইকোর্টের জামিন আদেশ বহাল রাখেন। ফলে আইভীর বিরুদ্ধে থাকা সব মামলায় জামিন কার্যকর হওয়ায় তার মুক্তির আর কোনো আইনি বাধা নেই বলে তখন জানান সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা।
এদিকে আইভীর সম্ভাব্য মুক্তির খবরে নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা শুরু হয়েছে। তার সমর্থক ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন।
গত বছরের ৯ মে ভোরে নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগের নিজ বাসা থেকে আইভীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তাঁকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র–জনতার আন্দোলনের ঘটনায় হওয়া তিনটি হত্যা মামলা ও দুটি হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
এই পাঁচ মামলায় হাইকোর্ট গত বছরের ৯ নভেম্বর সেলিনা হায়াৎ আইভীর জামিন মঞ্জুর করে রায় দেন। এ জামিনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে পৃথক পাঁচটি আবেদন করে। চেম্বার আদালত গত বছরের ১২ নভেম্বর হাইকোর্টের দেওয়া জামিন স্থগিত করে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনগুলো আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে শুনানির জন্য পাঠান।
এর ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রপক্ষ পৃথক পাঁচটি লিভ টু আপিল করে। লিভ টু আপিলগুলো খারিজ করে ১০ মে আদেশ দেন আপিল বিভাগ। ফলে পাঁচ মামলায় আইভীর জামিন বহাল থাকে।
তবে প্রথম দফার ওই পাঁচ মামলায় হাইকোর্ট জামিন দেওয়ার পর আইভীকে আরও পাঁচ মামলায় গত বছরের নভেম্বরে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এই পাঁচ মামলার মধ্যে চারটি ফতুল্লা থানায় করা হত্যা মামলা। অপরটি হামলা ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে নারায়ণগঞ্জ সদর থানায় করা মামলা।
দ্বিতীয় দফার পাঁচ মামলায় গত ২৬ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট জামিন প্রশ্নে রুল দিয়ে আইভীকে ছয় মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেন। এই জামিন আদেশের বিরুদ্ধেও রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে আবেদন করে। গত ৫ মার্চ চেম্বার আদালত শুনানি নিয়ে হাইকোর্টের দেওয়া জামিন স্থগিত করেন। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনগুলো আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে পাঠান।
দ্বিতীয় দফার এই পাঁচ মামলায় আইভীকে হাইকোর্টের দেওয়া জামিনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের করা পৃথক লিভ টু আপিল ১০ মে আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় ওঠে। সেদিন আপিল বিভাগ আইভীর জামিনে ইতিপূর্বে চেম্বার আদালতের দেওয়া স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে হাইকোর্টে রুল (জামিন প্রশ্নে) নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন। রাষ্ট্রপক্ষের পৃথক পাঁচটি লিভ টু আপিল নিষ্পত্তি করে এ আদেশ দেওয়া হয়। ফলে দ্বিতীয় দফার পাঁচ মামলায় আইভীকে হাইকোর্টের দেওয়া জামিন বহাল হয়।
গাজীপুর জেলা প্রতিনিধি 




















