করের হার নয়, আওতা বাড়িয়ে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে চায় সরকার : অর্থমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

করের হার বৃদ্ধি নয় বরং করের আওতা সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে চায় সরকার বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

সোমবার (২৯ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সমাপনী বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরে অর্থনীতিতে স্থবিরতা থাকলেও সরকারের চার মাসের বিভিন্ন উদ্যোগে রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় গতি এসেছে। এরই মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রথমবারের মতো চার লাখ কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের মাইলফলক অতিক্রম করেছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকারের লক্ষ্য করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধি এবং কর প্রশাসনকে আরও কার্যকর ও আধুনিক করা। করের হার বাড়ানোর পরিবর্তে নতুন করদাতাদের করের আওতায় এনে রাজস্ব আহরণের ভিত্তি শক্তিশালী করা হবে।

তিনি বলেন, অর্থনীতিতে স্থবিরতা সত্ত্বেও মাত্র চার মাসের মধ্যে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যে আরও গতি আসবে এবং আগামী অর্থবছরে এনবিআরের জন্য নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা চ্যালেঞ্জিং হলেও তা অর্জন করা সম্ভব হবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার সরকারি বাজেট ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে দক্ষতা বৃদ্ধি, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং টেকসই ঋণ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাজেট ঘাটতিকে সহনীয় পর্যায়ে রাখার নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের হয়রানি কমাতে ফ্ল্যাট রেটে ভ্যাট প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সাধারণ মানুষের স্বস্তির কথা বিবেচনায় কাঁচাবাজার ও ছোট মুদি দোকানকে ভ্যাটের আওতার বাইরে রাখা হবে বলে জানিয়ে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আগামী অর্থবছরের জন্য নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা চ্যালেঞ্জিং হলেও তা অর্জন করা সম্ভব। সরকার করের হার বৃদ্ধি না করে করভিত্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে চায়। রাজস্ব ব্যবস্থাপনাকে করদাতা বান্ধব করা এবং রাজস্ব আহরণে স্বচ্ছতা আনা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। এ লক্ষ্যে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা পৃথকীকরণ, কর ব্যবস্থার অটোমেশন, কর ফাঁকি রোধ এবং বিনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সুবিধার্থে এবং হয়রানি বন্ধে সামর্থ্য অনুযায়ী ফ্ল্যাট রেটে ভ্যাট প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, তবে কাঁচা বাজার ও ক্ষুদ্র মুদি দোকান এই ভ্যাটের আওতার বাইরে থাকবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও জনজীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে সরকারের নানা পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির কার্যকর সমন্বয়ের মাধ্যমে বাজারে অর্থ সরবরাহ নিয়ন্ত্রিত রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালীকরণ, টাকার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা, কৃষি ও শিল্পসহ সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে ৬০টি পণ্যের উৎসে কর হ্রাস করা হয়েছে। একই সাথে সরবরাহ ব্যবস্থার ত্রুটিসমূহ দূর করা, বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং অসাধুচক্রের কৃত্রিম সংকট ও কারসাজি প্রবণতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত রয়েছে, যা ধাপে ধাপে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, আগামী অর্থবছরের জন্য প্রাক্কলিত ৬.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রবৃদ্ধি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি অর্থনীতির সামগ্রিক কার্যক্রম, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং আস্থার প্রতিফলন। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্প, কৃষি ও আইসিটিসহ সেবাখাত এবং সব প্রতিশ্রুতিশীল খাতের সম্প্রসারণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি খাতসমূহকে মূলধারায় এনে দেশব্যাপী উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, মানবসম্পদ উন্নয়ন, ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বেসরকারি খাতকে শক্তিশালী করা হবে, যা প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

বাজেট ঘাটতি ও সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সরকারের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি জানান, সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে দক্ষতা বৃদ্ধি ও টেকসই ঋণ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাজেট ঘাটতি সহনীয় পর্যায়ে রাখা হবে। সরকার ক্রমান্বয়ে পরিচালন ব্যয় কমিয়ে উন্নয়ন ব্যয় বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে।

সেই লক্ষ্যে বাজেটে উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ২৭.২৭ শতাংশ হতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৩৩.৭০ শতাংশে উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্যদিকে, পরিচালন ব্যয় ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৭২.৭৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬৬.৩০ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। আগামী অর্থবছরগুলোতে উন্নয়ন ব্যয়ের এই অংশ আরও বৃদ্ধি এবং পরিচালনা ব্যয়ের অংশ ক্রমান্বয়ে কমিয়ে আনা হবে।

পাচার করা অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জোরালো উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানিয়ে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এ পর্যন্ত ১৩টি দেশে ২৩টি আইনি সহযোগিতা অনুরোধ (Mutual Legal Assistance Request) পাঠানো হয়েছে। একইসঙ্গে প্রায় ৭২ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ বা ফ্রিজ করা হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, জনগণের অর্থ আত্মসাৎকারীদের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। অর্থপাচার রোধ ও পাচার হওয়া সম্পদ ফেরাতে কার্যকর কূটনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে।

তিনি বলেন, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে একাধিক দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ চলছে। সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর আওতায় ইতোমধ্যে সম্পদ শনাক্ত, জব্দ ও ফ্রিজ করার কার্যক্রম এগিয়েছে, যা ভবিষ্যতে অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়াকে আরো শক্তিশালী করবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হলো— জনগণের সম্পদ পুনরুদ্ধার এবং আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে দেশি ও বিদেশি আইনি সহায়তা গ্রহণের পাশাপাশি কূটনৈতিক উদ্যোগও জোরদার করা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বাজেটকে কেবল আর্থিক দলিল নয়, বরং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, কাঠামোগত সংস্কার ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির রূপরেখা হিসেবে উল্লেখ করে তা পাসের আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, বাজেট নিয়ে সংসদে দীর্ঘ, প্রাণবন্ত ও গঠনমূলক আলোচনা হয়েছে। সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী সংগঠন, সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যমের মতামতকে সরকার গুরুত্ব দিয়েছে।

সংসদীয় গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হিসেবে তিনি মতের ভিন্নতা সত্ত্বেও জাতীয় স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করার বিষয়টি তুলে ধরেন।

অর্থমন্ত্রী দাবি করেন, সরকার একটি ভঙ্গুর ও বিপর্যস্ত অর্থনীতি উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছে। বিগত সময়ের আর্থিক খাতের দুর্বলতা, বিনিময় হার অস্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক চাপ অর্থনীতিকে চ্যালেঞ্জে ফেলেছে। তবে, সরকার পুনরুদ্ধার, উত্তরণ ও পুনর্গঠনের (৩জ) কৌশলের মাধ্যমে অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছে।

তিনি জানান, সরকারের লক্ষ্য—মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং ৬.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন। মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির সমন্বয়, কর ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন, বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কাজ চলছে।

রাজস্ব আহরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, করহার না বাড়িয়ে করভিত্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজস্ব বৃদ্ধির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এনবিআর ইতোমধ্যে ৪ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের মাইলফলক অতিক্রম করেছে।

ঋণ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরই সরকারের লক্ষ্য। পুঁজিবাজার, বন্ড মার্কেট ও বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনাকে টেকসই করার পাশাপাশি ব্যাংক ঋণনির্ভরতা ধীরে ধীরে কমানো হবে।

তিনি বলেন, বেসরকারি খাতই ভবিষ্যৎ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। বিদেশি বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, এসএমই ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে বিনিয়োগ বৃদ্ধির মূল ভিত্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অর্থমন্ত্রী স্বীকার করেন, বাজেট বাস্তবায়নই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, রাজস্ব ঘাটতি ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এর প্রধান বাধা।

তিনি বলেন, বাজেটের সাফল্য তার ঘোষণায় নয়, বরং বাস্তবায়নে। সরকার একটি সমৃদ্ধ, ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।

জনপ্রিয় খবর

আবহাওয়া

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ডিএনসিসি’র ২৯ খাল দখলমুক্ত করা হবে : ডিএনসিসি প্রশাসক

করের হার নয়, আওতা বাড়িয়ে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে চায় সরকার : অর্থমন্ত্রী

প্রকাশের সময় : ০৯:৪২:৩৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

করের হার বৃদ্ধি নয় বরং করের আওতা সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে চায় সরকার বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

সোমবার (২৯ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সমাপনী বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরে অর্থনীতিতে স্থবিরতা থাকলেও সরকারের চার মাসের বিভিন্ন উদ্যোগে রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় গতি এসেছে। এরই মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রথমবারের মতো চার লাখ কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের মাইলফলক অতিক্রম করেছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকারের লক্ষ্য করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধি এবং কর প্রশাসনকে আরও কার্যকর ও আধুনিক করা। করের হার বাড়ানোর পরিবর্তে নতুন করদাতাদের করের আওতায় এনে রাজস্ব আহরণের ভিত্তি শক্তিশালী করা হবে।

তিনি বলেন, অর্থনীতিতে স্থবিরতা সত্ত্বেও মাত্র চার মাসের মধ্যে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যে আরও গতি আসবে এবং আগামী অর্থবছরে এনবিআরের জন্য নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা চ্যালেঞ্জিং হলেও তা অর্জন করা সম্ভব হবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার সরকারি বাজেট ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে দক্ষতা বৃদ্ধি, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং টেকসই ঋণ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাজেট ঘাটতিকে সহনীয় পর্যায়ে রাখার নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের হয়রানি কমাতে ফ্ল্যাট রেটে ভ্যাট প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সাধারণ মানুষের স্বস্তির কথা বিবেচনায় কাঁচাবাজার ও ছোট মুদি দোকানকে ভ্যাটের আওতার বাইরে রাখা হবে বলে জানিয়ে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আগামী অর্থবছরের জন্য নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা চ্যালেঞ্জিং হলেও তা অর্জন করা সম্ভব। সরকার করের হার বৃদ্ধি না করে করভিত্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে চায়। রাজস্ব ব্যবস্থাপনাকে করদাতা বান্ধব করা এবং রাজস্ব আহরণে স্বচ্ছতা আনা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। এ লক্ষ্যে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা পৃথকীকরণ, কর ব্যবস্থার অটোমেশন, কর ফাঁকি রোধ এবং বিনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সুবিধার্থে এবং হয়রানি বন্ধে সামর্থ্য অনুযায়ী ফ্ল্যাট রেটে ভ্যাট প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, তবে কাঁচা বাজার ও ক্ষুদ্র মুদি দোকান এই ভ্যাটের আওতার বাইরে থাকবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও জনজীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে সরকারের নানা পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির কার্যকর সমন্বয়ের মাধ্যমে বাজারে অর্থ সরবরাহ নিয়ন্ত্রিত রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালীকরণ, টাকার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা, কৃষি ও শিল্পসহ সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে ৬০টি পণ্যের উৎসে কর হ্রাস করা হয়েছে। একই সাথে সরবরাহ ব্যবস্থার ত্রুটিসমূহ দূর করা, বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং অসাধুচক্রের কৃত্রিম সংকট ও কারসাজি প্রবণতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত রয়েছে, যা ধাপে ধাপে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, আগামী অর্থবছরের জন্য প্রাক্কলিত ৬.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রবৃদ্ধি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি অর্থনীতির সামগ্রিক কার্যক্রম, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং আস্থার প্রতিফলন। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্প, কৃষি ও আইসিটিসহ সেবাখাত এবং সব প্রতিশ্রুতিশীল খাতের সম্প্রসারণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি খাতসমূহকে মূলধারায় এনে দেশব্যাপী উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, মানবসম্পদ উন্নয়ন, ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বেসরকারি খাতকে শক্তিশালী করা হবে, যা প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

বাজেট ঘাটতি ও সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সরকারের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি জানান, সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে দক্ষতা বৃদ্ধি ও টেকসই ঋণ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাজেট ঘাটতি সহনীয় পর্যায়ে রাখা হবে। সরকার ক্রমান্বয়ে পরিচালন ব্যয় কমিয়ে উন্নয়ন ব্যয় বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে।

সেই লক্ষ্যে বাজেটে উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ২৭.২৭ শতাংশ হতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৩৩.৭০ শতাংশে উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্যদিকে, পরিচালন ব্যয় ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৭২.৭৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬৬.৩০ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। আগামী অর্থবছরগুলোতে উন্নয়ন ব্যয়ের এই অংশ আরও বৃদ্ধি এবং পরিচালনা ব্যয়ের অংশ ক্রমান্বয়ে কমিয়ে আনা হবে।

পাচার করা অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জোরালো উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানিয়ে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এ পর্যন্ত ১৩টি দেশে ২৩টি আইনি সহযোগিতা অনুরোধ (Mutual Legal Assistance Request) পাঠানো হয়েছে। একইসঙ্গে প্রায় ৭২ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ বা ফ্রিজ করা হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, জনগণের অর্থ আত্মসাৎকারীদের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। অর্থপাচার রোধ ও পাচার হওয়া সম্পদ ফেরাতে কার্যকর কূটনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে।

তিনি বলেন, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে একাধিক দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ চলছে। সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর আওতায় ইতোমধ্যে সম্পদ শনাক্ত, জব্দ ও ফ্রিজ করার কার্যক্রম এগিয়েছে, যা ভবিষ্যতে অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়াকে আরো শক্তিশালী করবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হলো— জনগণের সম্পদ পুনরুদ্ধার এবং আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে দেশি ও বিদেশি আইনি সহায়তা গ্রহণের পাশাপাশি কূটনৈতিক উদ্যোগও জোরদার করা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বাজেটকে কেবল আর্থিক দলিল নয়, বরং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, কাঠামোগত সংস্কার ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির রূপরেখা হিসেবে উল্লেখ করে তা পাসের আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, বাজেট নিয়ে সংসদে দীর্ঘ, প্রাণবন্ত ও গঠনমূলক আলোচনা হয়েছে। সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী সংগঠন, সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যমের মতামতকে সরকার গুরুত্ব দিয়েছে।

সংসদীয় গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হিসেবে তিনি মতের ভিন্নতা সত্ত্বেও জাতীয় স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করার বিষয়টি তুলে ধরেন।

অর্থমন্ত্রী দাবি করেন, সরকার একটি ভঙ্গুর ও বিপর্যস্ত অর্থনীতি উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছে। বিগত সময়ের আর্থিক খাতের দুর্বলতা, বিনিময় হার অস্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক চাপ অর্থনীতিকে চ্যালেঞ্জে ফেলেছে। তবে, সরকার পুনরুদ্ধার, উত্তরণ ও পুনর্গঠনের (৩জ) কৌশলের মাধ্যমে অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছে।

তিনি জানান, সরকারের লক্ষ্য—মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং ৬.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন। মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির সমন্বয়, কর ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন, বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কাজ চলছে।

রাজস্ব আহরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, করহার না বাড়িয়ে করভিত্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজস্ব বৃদ্ধির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এনবিআর ইতোমধ্যে ৪ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের মাইলফলক অতিক্রম করেছে।

ঋণ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরই সরকারের লক্ষ্য। পুঁজিবাজার, বন্ড মার্কেট ও বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনাকে টেকসই করার পাশাপাশি ব্যাংক ঋণনির্ভরতা ধীরে ধীরে কমানো হবে।

তিনি বলেন, বেসরকারি খাতই ভবিষ্যৎ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। বিদেশি বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, এসএমই ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে বিনিয়োগ বৃদ্ধির মূল ভিত্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অর্থমন্ত্রী স্বীকার করেন, বাজেট বাস্তবায়নই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, রাজস্ব ঘাটতি ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এর প্রধান বাধা।

তিনি বলেন, বাজেটের সাফল্য তার ঘোষণায় নয়, বরং বাস্তবায়নে। সরকার একটি সমৃদ্ধ, ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।