নিজস্ব প্রতিবেদক :
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় আওয়ামী লীগ আর গণতন্ত্র কখনো একসঙ্গে যায় না। ১৯৭৫ সালের একদলীয় বাকশালের সময়ও যায়নি, আর বিগত ১৫ বছরের ভয়াবহ ফ্যাসিবাদের দুঃশাসনেও তা আবারও প্রমাণিত হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ‘সংবাদপত্রের কালো দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) যৌথভাবে এ সভার আয়োজন করে।
তিনি বলেন, আমার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন থেকে আমি একটা জিনিস উপলব্ধি করেছি যে, আওয়ামী লীগ আর গণতন্ত্র কখনোই একসঙ্গে যায় না। আগেও যায়নি, অর্থাৎ আওয়ামী লীগের জন্মের পরেও যায়নি এবং বিগত ফ্যাসিবাদের সময় তো একেবারেই যায়নি। ভবিষ্যতেও একসঙ্গে যাবে না।
মির্জা ফখরুল বলেন, বিগত ১৫ থেকে ১৬ বছর ধরে প্রতি বছরই আমরা সাংবাদিক নেতাদের সঙ্গে এই কালো দিবস পালন করে আসছি। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনার সংগ্রামে সাংবাদিকরা সবসময় আমাদের পাশে ছিলেন। বিশেষ করে আমাদের অত্যন্ত কঠিন সময়ে সাংবাদিক বন্ধুদের ভূমিকা কখনো ভোলা সম্ভব নয়। ফ্যাসিবাদের আক্রমণের মুখে সাংবাদিকরা যেভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সংবাদ কাভার করে জনগণের সামনে তুলে ধরেছেন, সেজন্য তিনি সাংবাদিকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষায় বর্তমান সরকারের প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, একটি রক্তাক্ত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমরা কিছুটা স্বাধীনতা পেয়েছি। এখন অন্তত সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করবার একটি ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে এবং বর্তমান সরকার এই স্বাধীনতা রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে কাজ করছে।
তবে সংবাদপত্রের ভেতরের সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে কিছু হাউজের মালিকরা অন্যায়ভাবে সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছেন। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতিকে জোরপূর্বক পদত্যাগ করতে বলা হয়েছে, যা কোনো সভ্যতার মধ্যে পড়ে না। তিনি এর তীব্র নিন্দা জানান এবং সাংবাদিকদের এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার অনুরোধ করেন।
সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষার্থে সব সময় পাশে থাকার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আপনাদের (সাংবাদিক) মাঝে যে কোনো সময় আমাকে দেখেছেন। আমি আজকে বলে যেতে চাই যে, আপনাদের অধিকার রক্ষার্থে আমি আপনাদের সঙ্গে ছিলাম, আছি এবং থাকব।
মির্জা ফখরুল বলেন, ১৬ জুনে আমরা আজকে সেই কালো দিবসকে মনে করব। শুধু মনে করলে হবে না, এ দিবস যেন ফিরে না আসে আমাদের, আমাদের রাষ্ট্রেই, আমাদের রাজনৈতিক জীবনে —সে কথাটা আমাদের নিশ্চিত করতে হবে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, দেখুন যখন একটা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমরা যখন একটা স্বাধীনতা পেয়েছি, সেখানে কিছুটা এখন একটু অন্তত সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে নিশ্চিত করার একটা ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। আমরা এখন পর্যন্ত লক্ষ্য করছি যে বর্তমান সরকার এই সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে রক্ষা করবার জন্য কমিটি আছে এবং তারা কাজ করছে।
সংবাদপত্রের মালিকেরা সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছেন বলে মন্তব্য করে মন্ত্রী বলেন, সংবাদপত্রের মালিকেরা যারা বিভিন্ন হাউসে আছেন, বিজনেস হাউজেস তারা অন্যায়ভাবে সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছেন।
১৯৭৫ বা ৭৬ সালে সাংবাদিকেরা যে অবস্থায় ছিলেন, এখন সেই অবস্থায় নেই—মন্তব্য করে মির্জা ফখরুল বলেন, ১৯৭৫ বা ৭৬ সালে সাংবাদিকেরা যে অবস্থায় ছিলেন সেই অবস্থা এখন আর নাই। এরপরও দেখছি অনেক সাংবাদিক ভাই এখন পর্যন্ত বেকার হয়ে আছে। আমরা তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারিনি।
বন্ধ হয়ে গণমাধ্যম চালু ও নতুন সংবাদমাধ্যম সৃষ্টি করার মধ্য দিয়ে কর্মসংস্থানের কথা জানান মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম। তিনি বলেন, আমি আশা করব যে আমাদের একজন যোগ্য তথ্যমন্ত্রী আছেন। তথ্যমন্ত্রীর প্রচেষ্টা এবং আমি সাংবাদিক ভাইকে অনুরোধ করব, আমাদের বন্ধ হয়ে যাওয়া যে সমস্ত সংবাদমাধ্যমগুলো রয়েছে (দৈনিক বাংলা, টাইমস), এগুলোকে চালু করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এমনকি যদি আমার মনে হয় বিচিত্রাকে চালু করতে হবে। কারণ, এটা এগুলো আপনার ঐতিহ্যগত একটা ব্যাপার আছে। সুতরাং, এটাকে আপনার সামনে নিয়ে আসার জন্য ব্যবস্থা করতে হবে এবং প্রয়োজনে বিভিন্নভাবে যারা পারবেন, তাদের দিয়ে একসাথে করে নতুন সংবাদমাধ্যম সৃষ্টি করে সাংবাদিকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে সৃষ্টি করতে হবে।’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্বে আসার পর সংবাদপত্রের স্বাধীনতার কথা বারবার বলেছেন বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার মধ্যে আপনাদের সংবাদ স্বাধীনতাকে নিশ্চিত করার ব্যাপারটা তিনি বারবার করে বলেছেন। ইতোমধ্যে তিনি আপনাদের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন। তিনি গোটা সংবাদমাধ্যমে যেন একটা শুভ বাতাস, সুবাতাসময় —সেই রকম একটা পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করছেন বলে জানান মির্জা ফখরুল।
বিভিন্নভাবে বিভিন্ন গোষ্ঠী মাথাচাড়া দিয়ে উঠছেন বলে মন্তব্য করে মন্ত্রী বলেন, আজকে আবার বিভিন্ন গোষ্ঠী মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। তারা বিভিন্নভাবে সমস্যা তৈরি করছে। অনেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নষ্ট করছে। সোশ্যাল মিডিয়াতে যে সমস্ত আপনার প্রচার-প্রচারণা হচ্ছে, যে সমস্ত অপপ্রচার হচ্ছে —এই সবকিছু মিলিয়ে সমাজকে আবার ভিন্ন পথে পরিচিত করবার একটা উদ্যোগ তাদের আছে, একটা কনশাস এফোর্ট আছে। সেই এফোর্টটাকে যেন আমরা সবাই মিলেই এটাকে প্রতিরোধ করতে পারি, প্রতিহত করতে পারি এবং সঠিকভাবে এগিয়ে যেতে পারি। সেই চেষ্টাটা আমাদের করা দরকার।
বিএনপি একটা লিবারেল ডেমোক্র্যাট পার্টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমি লিবারেল ডেমোক্রেটিকে বিশ্বাসী। এখানে আপনার কোনো ধর্ম-বর্ণ বা অন্য কোনো কিছুর ভিত্তিতে এখানে বিভাজনের পক্ষে নই। আমি সকলকে সমান অধিকার দেওয়ার পক্ষপাতী একজন মানুষ। এ জন্যই আমি সব সময় বলে থাকি যে বিএনপিকে আপনারা যদি কেউ মনে করেন যে বিএনপি একটা বিপ্লবী দল। বিএনপি আসলে বিপ্লবী দল নয়, বিএনপি একটা লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি। এটাকে সব সময় আমাদের মনে রাখতে হবে। এ জন্যই আমরা মনে করি যে বিএনপি হচ্ছে সবচাইতে নিরাপদ একটা রাজনৈতিক দল। যে দলের মধ্যে সাংবাদিক বলুন বা অন্যান্য পেশাজীবী যারা আছেন, তারা কিন্তু সব সময় নিরাপদ থাকতে পারেন। কারণ, বিএনপি অন্যের মতো সহ্য করবার একটি রাজনৈতিক দল এবং সেইটাই আমরা বরাবর করে এসেছি।
বিএনপি যখনই সরকারে এসেছে সাংবাদিক দমন বা নির্যাতন কিন্তু সবচেয়ে কম হয়েছে—মন্তব্য করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বিএনপি সরকার আসলে সাংবাদিক নির্যাতন হয়েছে, আপনি এটা খুব বেশি খুঁজে পাবেন না। এ সময় আওয়ামী লীগের ৭২ সাল থেকে ৭৫ সাল পর্যন্ত ও পরবর্তী শেখ হাসিনার ১৫ বছরের দুঃশাসনের কথা তুলে ধরেন তিনি।
ডিইউজের সভাপতি মো. শহীদুল ইসলামের সভাপতিত্বে এবং ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক দিদারুল আলমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন বিএফইউজের মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী। আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। এতে আরও বক্তব্য রাখেন বিএনপির চেয়ারপারসনের সাবেক প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি কবি হাসান হাফিজ এবং বাংলাভিশনের প্রধান সম্পাদক আব্দুল হাই সিদ্দিকসহ অন্য সাংবাদিক নেতারা।
নিজস্ব প্রতিবেদক 
























