নিজস্ব প্রতিবেদক :
রমজানের কারণে এসএসসি পরীক্ষা নির্দিষ্ট সময়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না জানিয়ে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, শিক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও পড়াশোনা রিভিউয়ের সুযোগ দিতে রোজার পরেই পরীক্ষা নেওয়া হবে। আপাতত এসএসসি পরীক্ষা পেছানোর কোনো কারণ দেখা যাচ্ছে না।
সোমবার (৩১ আগস্ট) দুপুরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সভাকক্ষে সাম্প্রতিক চীন সফর নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
ড. মিলন বলেন, এসএসসি পরীক্ষার সময়সূচি নির্ধারণে সামগ্রিক বিষয় বিবেচনা করা হয়েছে। জানুয়ারিতে পরীক্ষা শুরু করলে তা এক মাস ধরে চলবে এবং ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত গড়াবে। এরপর ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে রমজান শুরু হয়ে ১০ মার্চ পর্যন্ত চলবে। ফলে এ সময়ের মধ্যে পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব নয়।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এসএসসি পরীক্ষাকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিয়ে আসাই সরকারের মূল লক্ষ্য। দেশে সাধারণত বর্ষা বা বৃষ্টির মৌসুমে এসএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এখন পরীক্ষাটিকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। একইভাবে এসএসসি পরীক্ষার সঙ্গে সমন্বয় করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষাগুলোও নির্দিষ্ট সময়ে নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
তিনি বলেন, বিদেশে যেসব শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য যায়, তাদের ক্ষেত্রেও দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সময়সূচির সঙ্গে বিষয়টি সমন্বয় করা হয়। সবকিছু বিবেচনায় বাংলাদেশের জন্য ফেব্রুয়ারি মাসকে এসএসসি পরীক্ষার সবচেয়ে উপযুক্ত সময় মনে করা হচ্ছে। তবে রমজানের কারণে এবার ফেব্রুয়ারিতে পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
রমজানের আগে পরীক্ষা এগিয়ে আনার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের অনুরোধে পরীক্ষা এগিয়ে আনার বিষয়টি বিবেচনা করা হয়েছিল। কিন্তু দেখা গেছে, দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ক্লাস ও সিলেবাস শেষ হলেও নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা রিভিউ করার পর্যাপ্ত সুযোগ হচ্ছে না। এই রিভিউ প্রক্রিয়াও শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, রমজানের পরে পরীক্ষা নেওয়া হলে সেটি আবার অনেকটা বিলম্বিত হয়ে যায়। রমজান একটি বাস্তবতা হওয়ায় এর সঙ্গে সময়সূচি সমন্বয় করতে হবে। আবার জানুয়ারিতে পরীক্ষা নিলে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা রিভিউয়ের জন্য পর্যাপ্ত সময় পাবে না।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, সবকিছু বিবেচনা করে এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করেই পরীক্ষা এগিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু রমজানের কারণে এবার তা সম্ভব হচ্ছে না। সরকার শিক্ষার্থীদের কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে চায় না। তাদের পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে, বিশেষ করে পড়াশোনা রিভিউয়ের জন্য। এ কারণে সব দিক বিবেচনা করে আবারও সিদ্ধান্ত হয়েছে, এসএসসি পরীক্ষা রমজানের পরেই নেওয়া হবে।
রমজানের আগে পরীক্ষা নেওয়ার দাবির বিষয়ে ড. মিলন বলেন, কেউ কেউ রমজানের আগেই পরীক্ষা নেওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতিতে তা সম্ভব হচ্ছে না।
এসএসসি পরীক্ষা আরও পেছানোর আশঙ্কা নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, আপাতত পরীক্ষা পেছানোর কোনো কারণ দেখা যাচ্ছে না। জাতীয় পর্যায়ে কোনো বিশেষ পরিস্থিতি তৈরি না হলে বর্তমানে পরীক্ষা পেছানোর কোনো কারণ নেই। শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির জন্য যথেষ্ট সময় দেওয়া হয়েছে। প্রায় দেড় বছর আগেই তাদের পরীক্ষার বিষয়ে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং তারা সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নিচ্ছে।
বাংলাদেশের কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে শিল্পের চাহিদাভিত্তিক করতে চীনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, কারিগরি শিক্ষার সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে কারিকুলাম, ল্যাব, শিক্ষক প্রশিক্ষণসহ পুরো ব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনা হবে। চীনের শিল্প-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংযোগের মডেল অনুসরণ করে বাংলাদেশেও এ ধরনের ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ বাংলাদেশ। জনসংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে কীভাবে মানবসম্পদে রূপান্তর করা যায়, সেটিই এখন বড় বিষয়। এ লক্ষ্যেই সরকার কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী এবার শিক্ষা খাতে বাজেট বাড়ানোর পাশাপাশি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ খাতকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। সেজন্য, বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষাকে আরও মানসম্মত ও কার্যকর করতে চীনের সঙ্গে কয়েকটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চীনের শিল্প ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে যে সংযোগ রয়েছে, সেটি বাংলাদেশেও প্রতিষ্ঠা করতে চায় সরকার। চীনের বিভিন্ন কোম্পানি বিশ্বজুড়ে কাজ করছে এবং তাদের বিপুল দক্ষ জনশক্তির প্রয়োজন রয়েছে। বাংলাদেশ কীভাবে সেই চাহিদা পূরণ করতে পারে, তা নিয়েও চীনের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।
তিনি বলেন, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির জন্য সরকারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে কারিগরি শিক্ষার প্রতিষ্ঠান, প্রশিক্ষণ, কারিকুলাম ও শিল্পের চাহিদাকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। চীনে গিয়ে আমরা দেখেছি, দেশটির কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থা শিল্পের চাহিদাভিত্তিক। সেখানে কারিকুলাম থেকে শুরু করে ল্যাব ও শিক্ষকসহ সবকিছু একটি সমন্বিত ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে।
বাংলাদেশেও একই ধরনের ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, কারিগরি শিক্ষার দুর্বলতাগুলো সরকার চিহ্নিত করেছে। কোথায় কী ধরনের ঘাটতি রয়েছে, সেগুলো পর্যালোচনা করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। অবকাঠামো তৈরি করার পাশাপাশি কারিকুলাম পরিবর্তন, ল্যাব শক্তিশালী করা এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকট প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে ড. মিলন বলেন, শুধু গত দুই বছর নয়, দীর্ঘদিন ধরেই কারিগরি শিক্ষা খাতে বিপুলসংখ্যক শিক্ষক প্রয়োজন। বিভিন্ন খাতে হাজার হাজার শিক্ষকের পদ রয়েছে এবং এসব নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়মিত পদ্ধতিতে সম্পন্ন করতে হয়। সরকার বিষয়টি সমন্বয় করছে। তবে গত ছয় মাসে এ বিষয়ে দৃশ্যমান ফল দেখাতে না পারলেও কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
চীন সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা কার্যকর করতে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘ইকোসিস্টেম’ প্রয়োজন। শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী কারিকুলাম তৈরি, আধুনিক ল্যাব স্থাপন, প্রশিক্ষিত শিক্ষক তৈরি এবং শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। চীনের অভিজ্ঞতা থেকে এ বিষয়গুলোই আমরা দেখেছি এবং বাংলাদেশে তা কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
চীনা ভাষাকে কারিগরি শিক্ষায় গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, সব জায়গায় একই ভাষা চালু করার পরিকল্পনা নেই। যে দেশে যে ভাষার প্রয়োজন, সেই অনুযায়ী ভাষা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। যেখানে জাপানি কোম্পানি বেশি, সেখানে জাপানি ভাষা এবং যেখানে দক্ষিণ কোরীয় বা আরব দেশের প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বেশি, সেখানে সংশ্লিষ্ট ভাষাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। চীনের ক্ষেত্রে চীনা ভাষায় জোর দেওয়া হবে। কারণ চীনা কোম্পানিগুলো তাদের ভাষায় প্রশিক্ষণ নেওয়া ও কাজ করতে সক্ষম জনশক্তিকে অগ্রাধিকার দেয়।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের চীনা কোম্পানিতে প্রশিক্ষণ ও ইন্টার্নশিপের সুযোগ তৈরি করা গেলে তাদের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও বাড়বে। এ বিষয়ে সরকার কাজ করতে পারে এবং চীনের সঙ্গে আলোচনায় বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। দেশে অনেক পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, ভোকেশনাল সেন্টার এবং টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ তৈরি করা হয়েছে। অবকাঠামো উন্নয়ন হচ্ছে। কিন্তু একইসঙ্গে কারিকুলাম সময়োপযোগী করা, ল্যাব শক্তিশালী করা এবং শিক্ষক প্রস্তুত করার বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। বিদ্যমান দুর্বলতাগুলো পর্যালোচনা করে সমন্বিতভাবে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কারিগরি শিক্ষায় নতুন বিষয় যুক্ত করা এবং ল্যাবরেটরি উন্নয়নের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, কারিগরি শিক্ষাকে কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। কারিগরি শিক্ষা হচ্ছে জীবনব্যাপী শিক্ষা। এর মাধ্যমে দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করাই সরকারের লক্ষ্য।
তিনি বলেন, কারিগরি শিক্ষার ক্ষেত্রে বিদ্যমান শক্তি ও দুর্বলতা চিহ্নিত করে সেগুলোকে কীভাবে আরও কার্যকর করা যায়, সে বিষয়ে কাজ শুরু হয়েছে। এ খাতে সরকারের প্রয়োজনীয় সহায়তা, কারিগরি সহযোগিতা ও বাজেট সহায়তার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী এরইমধ্যে এ খাতে বাজেট বাড়িয়েছেন। ফলে আগামী দিনগুলোতে এসব উদ্যোগের বাস্তব অগ্রগতি দেখা যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
এ সময় প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. দাউদ মিয়া উপস্থিত ছিলেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















