নিজস্ব প্রতিবেদক :
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত বলেন, ঢাকার বড় বড় হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ কমাতে এবং বারান্দায় রোগীর উপচেপড়া ভিড় দূর করতে জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোকে পূর্ণাঙ্গ সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন করে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।
রোববার (২৮ জুন) সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, সবাই বলেন দেশের মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সদর হাসপাতাল কিংবা বড় বড় হাসপাতালগুলো ঢাকায়। পাঁচশ রোগীর হাসপাতালে দুই হাজার রোগীকে চিকিৎসা দিতে হয়, রোগীরা বারান্দায় থাকে। ঢাকার বড় হাসপাতালের এই ভিড়ের সমাধান ঢাকার ওই হাসপাতালে পাবেন না। এই সমস্যার সমাধান হবে যদি আমরা জেলা হাসপাতালগুলোকে পূর্ণাঙ্গ সব সুবিধা দিয়ে তৈরি করতে পারি। মানুষ তাহলে জেলার ভেতরেই তার কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা পাবে। আমরা সেই ধরনের পরিকল্পনাই করছি।
বিরোধীদের সংখ্যার দিকে না তাকিয়ে বাজেটের ভেতরের মানবিক দিকটি দেখার আহ্বান জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এই বাজেটটি কার জন্য? আপনার যে ভাইটি মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে হার্ট অপারেশনের অপেক্ষায় আছে, এই বাজেট তার প্রাণ রক্ষার বাজেট। যে পাঁচ লাখের বেশি প্রবীণ মানুষ ছানি রোগের কারণে অন্ধত্ব বরণ করে আছেন, এটি তাদের সাশ্রয়ী মূল্যে দৃষ্টি ফিরে পাওয়ার বাজেট। এটি ঢাকার হাসপাতালের বারান্দায় ঘুমানো ক্যানসার রোগীর জীবন ও জমি রক্ষার বাজেট।
বাজেটকে কেবল অর্থ ও সংখ্যার খেলা মনে করেন না উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিগত ১৫ বছরের দুঃশাসনে আমাদের অর্থনীতি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল। গণ-আন্দোলনের পর গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে এই সংসদ গঠিত হয়েছে। তাই সীমিত সম্পদের মধ্যে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করাই সরকারের দায়িত্ব।
তিনি জানান, ভেঙে পড়া স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে এবার স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ গত বছরের ৩৫ হাজার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে প্রায় দ্বিগুণ—অর্থাৎ ৬৯ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবার জন্য একটি সহজলভ্য (Accessible), সাশ্রয়ী (Affordable) এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক (Inclusive) স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এই বাজেটের মূল লক্ষ্য।
দেশে অসংক্রামক ব্যাধি ও চিকিৎসার ব্যয় বৃদ্ধিকে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে ড. এম এ মুহিত বলেন, বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর ৭১ ভাগই ঘটছে ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন বা কিডনি রোগের মতো অসংক্রামক ব্যাধির কারণে। এর ওপর আরেকটি ভয়ঙ্কর ব্যাপার হলো— চিকিৎসা খরচের ৭৯ শতাংশই রোগীকে নিজের পকেট (আউট অব পকেট এক্সপেন্ডিচার) থেকে দিতে হচ্ছে। যেখানে থাইল্যান্ডে এটি মাত্র ১০ শতাংশ এবং মালদ্বীপে ১৮ শতাংশ।
এই প্রেক্ষাপটে সরকার অপরিকল্পিতভাবে হাসপাতাল ভবন নির্মাণ না করে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা, রেফারাল নেটওয়ার্ক তৈরি এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে শক্তিশালী করতে জোর দিচ্ছে বলে জানান তিনি।
বিরোধী দল স্বাস্থ্য খাতের মূল সংস্কার নিয়ে কথা বলে না দাবি করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিরোধী দল জুলাই সনদের কথা বলে, শুধু সেই সংস্কারের কথা বলে যা তাদের ক্ষমতার ভাগ দেবে। তারা স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার নিয়ে একটি দিনও কথা বলেনি। স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন একটি রিপোর্ট দিয়েছে, বিরোধী দল সেটি নিয়ে কথা বললে আমি খুশি হতাম।
তিনি উল্লেখ করেন, সরকার স্বাস্থ্য খাতের ভৌত কাঠামো, মানবসম্পদ, চিকিৎসা পদ্ধতি এবং কেনাকাটায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কাজ করছে।
তিনি বলেন, এই স্বাস্থ্য বাজেটের মূল লক্ষ্য হলো ভেঙে পড়া স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো এবং একটি সমন্বিত স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী চিকিৎসাসেবা পাবেন। অর্থাৎ একটি সহজপ্রাপ্য, সাশ্রয়ী এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতেই এই বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছে। গত অর্থবছরে যেখানে বরাদ্দ ছিল ৩৫ হাজার কোটি টাকা, এবার তা বাড়িয়ে ৬৯ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। এই বিনিয়োগের উদ্দেশ্য শুধু হাসপাতাল নির্মাণ বা সাময়িক স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন নয়। স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ মানুষের গড় আয়ু বাড়ায়, সুস্থ জীবন নিশ্চিত করে, দারিদ্র্য কমাতে সহায়তা করে এবং কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী গড়ে তোলে।
তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ মানুষের সার্বিক কল্যাণ ও সুখ নিশ্চিত করে, সমাজে বৈষম্য কমায় এবং সামাজিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখে।
দেশের স্বাস্থ্যখাতের চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে ডা. মুহিত বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশই অসংক্রামক রোগের কারণে ঘটে। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি রোগসহ দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন রোগে মানুষ মারা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় অতিমারি ও মহামারির ঝুঁকি, দ্রুত নগরায়ণ এবং প্রযুক্তির অগ্রগতি স্বাস্থ্যখাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে স্বাস্থ্যসেবাকে আরও কার্যকর করতে হবে।
চিকিৎসা ব্যয়ের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, দেশে চিকিৎসা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, চিকিৎসা ব্যয়ের প্রায় ৭৯ শতাংশই রোগীকে নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয়। অথচ থাইল্যান্ডে এ হার মাত্র ১০ শতাংশ এবং মালদ্বীপে ১৮ শতাংশ। আমাদের লক্ষ্য হবে এই ব্যয় কমিয়ে মানুষের চিকিৎসাসেবা আরও সহজলভ্য করা।
তিনি বলেন, এ বাজেটের লক্ষ্য অপরিকল্পিতভাবে ভবন বা হাসপাতাল নির্মাণ নয়; বরং একটি কার্যকর, টেকসই ও জনগণমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা।
বিরোধী দলের সমালোচনার জবাবে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিরোধী দল মাঝেমধ্যেই সংস্কারের কথা বলে, জুলাই সনদের কথা বলে। কিন্তু তারা স্বাস্থ্যখাত সংস্কার কমিশনের সুপারিশ নিয়ে কখনো আলোচনা করেনি। আমি খুশি হতাম, যদি তারা সেই প্রতিবেদনের আলোকে সংসদে আলোচনা করতেন।
তিনি বলেন, আমরা স্বাস্থ্যব্যবস্থার পুনর্গঠন ও সংস্কার চাই। এজন্য স্বাস্থ্যখাতের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, মানবসম্পদ উন্নয়ন, চিকিৎসা পদ্ধতি ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন, বিকেন্দ্রীকরণ এবং ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
শেষে তিনি বলেন, আমরা এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই, যেখানে শহর ও গ্রামের মানুষ সমান মানের স্বাস্থ্যসেবা পাবেন। আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভিত্তি হবে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা। বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি আমরা রোগের চিকিৎসার চেয়ে রোগ প্রতিরোধে বেশি গুরুত্ব দেব।
বক্তৃতার শেষ অংশে নিজের নির্বাচনি এলাকা সিরাজগঞ্জ-৬ (শাহজাদপুর) আসনের নদীভাঙন ও চরাঞ্চলের মানুষের দুর্দশার কথা তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী।
তিনি চরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য জাতীয়ভাবে একটি ‘চর উন্নয়ন ফাউন্ডেশন’ গড়ে তোলার জোর দাবি জানান। একই সঙ্গে তার এলাকার খুকনী, জালালপুর ও সনাতনী ইউনিয়নসহ নদীভাঙন কবলিত চার ইউনিয়নের মানুষের সুরক্ষায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















