নিজস্ব প্রতিবেদক :
শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচারকাজ মাত্র ছয় কার্যদিবসে সম্পন্ন হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট মো. আসাদুজ্জামান। আইনি সব প্রক্রিয়া (ডেথ রেফারেন্স ও আপিল) শেষে আগামী তিন মাসের মধ্যে এই ফাঁসির রায় কার্যকর করা সম্ভব হবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন তিনি।
রোববার (৭ জুন) সচিবালয়ে আইন মন্ত্রণালয়ে নিজ দপ্তরে রামিসা হত্যা মামলার রায় ঘোষণার পর সাংবাদিকদের কাছে দেওয়া তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি এসব কথা বলেন।
আইনমন্ত্রী বলেন, ‘রামিসা হত্যাকাণ্ড জাতির কাছে অত্যন্ত দুঃখ ও বেদনার। আমরা রামিসাকে তার বাবা-মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিতে পারব না, কিন্তু আমাদের যতটুকু করার আমরা করেছি। আইনি সব প্রক্রিয়া মেনেই মাত্র ছয় কার্যদিবসের মধ্যে আমরা বিচার করতে সক্ষম হয়েছি। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি প্রথম।
তিনি বলেন, আমাদের উপমহাদেশের ইতিহাসে ১৮৮২ সালে নদীয়ার একটি ঘটনায় নদীয়া সেশন কোর্টে মুল্লুক চাঁদ নামে এক ব্যক্তি তার নয় বছর বয়সী কন্যাকে হত্যার মামলার বিচার একদিনে সম্পন্ন হয়েছিল। এরপর এত দ্রুত বিচার আর সম্ভব হয়নি। আমরা আইনের প্রতিটি ধাপ অনুসরণ করে মাত্র ছয় কার্যদিবসের মধ্যে রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচার সম্পন্ন করেছি। ঘোষিত শাস্তিতে আমরা আপাতত সন্তুষ্ট। আশা করি, উচ্চ আদালতেও এ রায় বহাল থাকবে।
আসাদুজ্জামান বলেন, রামিসার এই ঘটনায় জাতি বেদনাহত ছিল। এর পরেও আমরা রামিসাকে ফিরিয়ে আনতে পারব না। তার বাবা-মার কাছে তাকে ফিরিয়ে দিতে পারব না। কিন্তু আমাদের যতটুকু করার আমরা সেটা করার চেষ্টা করেছি। ১৯ মে ঘটনা ঘটেছে, সেই ঘটনা তদন্ত করে ২৪ মে এর মধ্য চার্জশিট দিতে সক্ষম হয়েছি। ২৫ মে থেকে ৩১ মে অবধি সরকারি ছুটি ছিল। আমাদের নিম্ন আদালতগুলো ১ মে থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত সরকারি ছুটি ছিল। সরকারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, এক মাসের মধ্যে এই বিচারকার্য শেষ করতে আমরা বদ্ধপরিকর। নিম্ন আদালতের ছুটি বাতিলের জন্য একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। এরপর মাননীয় প্রধান বিচারপতি সম্মতি দিয়েছিলেন দেশের শিশু ট্রাইবুনাল এই ছুটির আওতামুক্ত থাকবে। এর ফলেই চার্জশিট দাখিলের পর সিএমএম কোর্ট থেকে এই চার্জশিট ট্রাইবুনালে যায়।
তিনি বলেন, ১ জুন চার্জ গঠনের জন্য দিন ধার্য করেন। কার্যত ৬ কার্যদিবসের মধ্যে আমরা রামিসার এই বেদনাদায়ক ঘটনার বিচার করতে সক্ষম হয়েছি। এটা দেশের ইতিহাসে বিরল। এই উপমহাদেশে নদীয়ায় একবার এমন একটা ঘটনার বিচারকার্য এক দিনে শেষ করা হয়েছিল। এই ঘোষিত শাস্তিতে আমরা আপাতত সন্তুষ্ট। উচ্চ আদালতে গেলেও এই রায় কার্যকর থাকবে বলে আশা রাখি।
এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, সাত দিনের মধ্যে এই ফাইল হাইকোর্ট বিভাগে চলে যাবে। সেখানে যাওয়ার পর এসব মামলায় পেপারবুক প্রস্তুত করতে হয়, যা বাইরে করার সুযোগ নেই; সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানেই হবে। এরপর ধারাবাহিকভাবে মৃত্যুদণ্ডের মামলাগুলোর নিষ্পত্তি করবেন সুপ্রিম কোর্ট।
তিনি বলেন, আমি অ্যাটর্নি জেনারেল থাকা অবস্থায় প্রধান বিচারপতির আদেশে দুটি মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে সক্ষম হয়েছিলাম। তার একটি ছিল মেজর সিনহা হত্যা মামলা। আরেকটি ছিল বুয়েটের আবরার ফাহাদ মামলা।
তিনি বলেন, ‘রামিসার এ বিষয়ে আমি প্রধান বিচারপতির সঙ্গে কথা বলেছি। এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন। যত দ্রুত সম্ভব এটি নিষ্পত্তি করব।’
রায় কার্যকর না হওয়ায়ই সমাজে এমন ঘটনা বারবার ঘটছে কিনা, প্রশ্নে মন্ত্রী বলেন, কার্যকর না হওয়া যেমন একটি হতাশার জায়গা। আবার এই কারণে এমন ঘটনা ঘটছে, সেটা আপনারা হয়ত কেউ কেউ বলতে পারেন। কিন্তু আমার কাছে সেটা মনে হচ্ছে না। এটা অন্যতম কারণ হতে পারে। ধরেন, রামিসার হত্যাকারী সোহেল মানসিকভাবে অপরাধী। এমন একটি ঘটনা ঘটিয়ে তারা ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। বিচারকে অন্যখাতে প্রবাহিত করতে মামলার রেকর্ডে নেই এমন আরেকজনকে টেনে আনতে চেয়েছে। উদ্দেশ্য ছিল, বিচারপ্রক্রিয়া কতটা বিলম্বিত করা যায়।
সোহেল তো মানসিকভাবে অপরাধী। সে কত বড় ক্রিমিনাল এটা বোঝা যায়; সে বিচারকার্য বিলম্বিত করতে রেকর্ডে নেই এমন একজনকে টেনে আনতে চেষ্টা করেছে। সে চেয়েছে মানুষ এই ঘটনা ভুলে যায় কিনা। কিন্তু আমরা বিচারে ফোকাসড ছিলাম।
শিশু রাজন, রাকিব ও আছিয়া হত্যার রায় উচ্চ আদালতে বছরের পর বছর আটকে থাকার বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, বিষয়টি হতাশার এবং আপনাদের প্রশ্নটি যৌক্তিক। আমি অ্যাটর্নি জেনারেল থাকাকালে মেজর সিনহা ও বুয়েটের আবরার হত্যা মামলা বিশেষ আদেশে দ্রুত নিষ্পত্তি করতে সক্ষম হয়েছিলাম। রামিসার পাশাপাশি আটকে থাকা অন্যান্য মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়ে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে কথা হয়েছে। এ বিষয়ে সলিসিটর উইং এবং অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস যৌথভাবে উদ্যোগ নেবে।
শিশুর প্রতি সহিংসতা রোধে সরকারের পদক্ষেপের কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, পূর্বে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলাগুলো সাধারণ ট্রাইব্যুনালে যেত। আমরা আইনের রূপান্তর ঘটিয়ে শিশুর প্রতি সহিংসতার জন্য আলাদা আদালত প্রতিষ্ঠা করেছি, যাতে এসব মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি হয়।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















