নিজস্ব প্রতিবেদক :
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, দেশে জ্বালানি তেলের সংকট নেই। ডিজেল মজুত আছে ১ লাখ ৭০ হাজার মেট্রিক টন। ৩০ এপ্রিলের মধ্যে আসবে আরও ১ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন। বিভিন্ন তেলের পাম্পে দীর্ঘলাইন নেই। তাই সংকট শিগগিরই দূর হবে।
মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন।
দেশের বিভিন্ন জ্বালানি পাম্পে তেলের জন্য দীর্ঘ লাইন আর দেখা যাচ্ছে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, পরিস্থিতির উন্নতি ঘটছে এবং খুব শিগগির জ্বালানি সংকট পুরোপুরি দূর হয়ে যাবে।
তিনি বলেন, জাতীয় সম্পদ রক্ষায় বিজিবি প্রায় এক লাখ লিটার জ্বালানি তেল (ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল) পাচার রোধে সক্ষম হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ৩৫ শতাংশ বেশি সাফল্য। পাশাপাশি মানবপাচার প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি ও আইনি প্রয়োগের ফলে এ খাতে ২৫ শতাংশ ইতিবাচক উন্নতি হয়েছে।
বিদ্যুৎখাতে লোডশেডিং প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, ২৬ এপ্রিল সারাদেশে বিদ্যুতের মোট চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৩৫২ মেগাওয়াট, সরবরাহ ছিল ১২ হাজার ৪৮৭ মেগাওয়াট এবং ঘাটতি ছিল এক হাজার ৮৬৫ মেগাওয়াট। ২৬ এপ্রিল সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয় ময়মনসিংহ জোনে- তিন ঘণ্টা।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, ২৮ এপ্রিল রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের ফিজিক্যাল স্টার্টআপ (ফুয়েল লোডিং) উদ্বোধন করবেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। এসময় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ উপস্থিত থাকবেন। ফুয়েল লোডিং শেষ হলে বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহে জাতীয় গ্রিডে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যোগ হবে। পরে ধাপে ধাপে জানুয়ারিতে পূর্ণ সক্ষমতায় ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় সঞ্চালন লাইনে যুক্ত হবে।
দ্বিতীয় ইউনিটের বিদ্যুৎ ২০২৭ সালের শেষের দিকে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে জানিয়ে তিনি বলেন, দুটি ইউনিটের বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত হলে মোট চাহিদার ১০ শতাংশ পূরণ হবে। এতে প্রায় দুই কোটি মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধা পাবেন।
গণমাধ্যমে ভুল তথ্য বা অপপ্রচার রোধে কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা। তিনি জানান, ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারের বিষয়টি সরকার কোনোভাবেই সহ্য করবে না। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং যৌক্তিক সমালোচনার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, সরকার চায় গণমাধ্যম আরও বেশি বেশি যৌক্তিক সমালোচনা করুক। কিন্তু দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়ে কোনো ধরনের অপতথ্য প্রচার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। সংবাদকর্মীদের তিনি দায়িত্বশীল এবং বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার আহ্বান জানান।
দেশে জঙ্গিবাদ পরিস্থিতি নিয়ে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের অস্তিত্ব একেবারে নেই, সেটি যেমন সত্য নয়, তেমনি এর ঝুঁকি নিয়ে জনভীতির কোনো কারণ আছে—তাও সঠিক নয়।
তিনি মনে করেন, অতীতের বিভিন্ন সময়ে জঙ্গি নিয়ে যে মাত্রায় প্রচার চালানো হয়েছে তা অনেক ক্ষেত্রে ছিল অতিরঞ্জিত। আবার অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুর দিকে যে দাবি করা হয়েছিল যে দেশে কোনো জঙ্গিই নেই, সেটিও বাস্তবসম্মত ছিল না। বর্তমানে কিছুটা ঝুঁকি থাকলেও তা স্বাভাবিক পর্যায়েই আছে।
সীমান্ত হত্যা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে উপদেষ্টা জানান, গত সময়ের তুলনায় সীমান্তে হত্যার হার প্রায় ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। তবে সরকারের লক্ষ্য হলো সীমান্তে সব ধরনের হত্যাকাণ্ডের ইতি ঘটানো এবং একে পুরোপুরি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন কূটনৈতিক তৎপরতা বজায় রাখলে এই লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে। সীমান্ত সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য বর্তমান সরকার কূটনৈতিক সব পথ খোলা রেখেছে এবং এ বিষয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
হাম-রুবেলার টিকাদান কার্যক্রম চলমান রয়েছে জানিয়ে উপদেষ্টা বলেন, প্রতিরোধযোগ্য এই রোগে আর একটি মৃত্যুও যাতে না হয়, সরকার সেই চেষ্টা করছে।
সচিবালয়ের তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলনকক্ষে আজ মঙ্গলবার এক ব্রিফিংয়ে তথ্য উপদেষ্টা এসব তথ্য জানান।
জাহেদ উর রহমান বলেন, হাম-রুবেলার টিকার ক্যাম্পেইন চলমান। ২৭ এপ্রিল (সোমবার) সন্ধ্যা পর্যন্ত ৯৪ লাখ ২৩ হাজার ৭৯৯টি শিশু হামের টিকা পেয়েছে।
উপদেষ্টা বলেন, ‘চলতি সপ্তাহে হামে আরও কিছু শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যুর সংবাদ পেয়েছি। আগেও বলেছি এই সংকটটা আমাদের দায় না। তবে মৃত্যুগুলো কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আমরা আমাদের সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিজ্ঞা করছি, প্রতিরোধযোগ্য রোগে সরকারের অবহেলার জন্য একটি মৃত্যুও যেন না হয়, সেই চেষ্টা আমরা সর্বত্র করব। টিকার মাধ্যমে যে রোগগুলো থেকে আমরা মুক্ত থাকতে পারি, সেগুলোর মধ্যে একটি শিশুর মৃত্যুও আসলে কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া যেতে পারে না, এটা খুবই মর্মান্তিক!’
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আমরা দেখেছি যে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা বলেছেন দেশে আসলে জঙ্গি নেই; জঙ্গি আছে কি না এই সরকার কী মনে করে এবং নাশকতা যদি হয়, এটা নিয়ে আসলে সরকারের ইন্টেলিজেন্সের কাছে কী ধরনের তথ্য আছে? এমন প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা বলেন, ‘প্রথম কথা হচ্ছে সরকারের কাছে কতখানি তথ্য আছে এটা বলা যাবে না। এটা একটা সেনসিটিভ তথ্য। এই তথ্যটা গোপন থাকবে। কিন্তু যেটুকু তথ্য সরকার জানিয়েছে এটা ফ্যাক্ট— বাংলাদেশে জঙ্গি আছে।’
‘কিন্তু এখানে দুটো এক্সট্রিম (চরমপন্থা) আছে, আমি দুটো এক্সট্রিমের কথা বলি। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে জঙ্গি সমস্যাকে যেই স্কেলে দেখানো হয়েছে, এটা তাদের ক্ষমতায় থাকার একটা ন্যারেটিভ হিসেবে তারা ব্যবহার করেছিলেন যে বাংলাদেশে জঙ্গি আছে, জঙ্গিরা সব দখল করবে। সুতরাং আমি নির্বাচন করলাম কি না দেখার দরকার নেই, আমাকে ক্ষমতায় রাখো। দ্যাট ওয়াজ এ ন্যারেটিভ। এটা একজাজারেটেড (অতিরঞ্জিত) হয়েছিল ওই সরকারের সময়ে।’ বলেন ডা. জাহেদ উর রহমান।
তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এই আলাপ কেউ কেউ করার চেষ্টা করেছে যে, বাংলাদেশে কোনো জঙ্গি নেই। এটাও আরেকটা এক্সট্রিম, এটাও ভুল কথা। বাংলাদেশে একটা পর্যায়ে মিলিট্যান্সি, জঙ্গিবাদ ছিল, আছে। সেটাকে আমরা আসলে কমব্যাট করতে চাই।’
প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, ‘এবার এই সতর্কতার মানে হচ্ছে- এটা খানিকটা ঝুঁকি তৈরি করেছে, কারণ দেড় বছর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আমরা খেয়াল করেছি এই প্রবণতার মানুষদের অনেক বেশি সংগঠিত হওয়া বা পাবলিকলি আসা বা ওপেনলি আসার প্রবণতা তৈরি হয়েছিল। সেটারই খানিকটা, খানিকটা ইমপ্যাক্ট আমরা বলতে পারি। এই সরকার এগুলো কমব্যাট করবে।’
তিনি বলেন, ‘জনগণকে এটুকু বলতে চাই- এই ঝুঁকি এমন না যে এটার জন্য ভয় পেতে হবে। কিন্তু সেই পুরোনো কথা- আমরা যদি কোনো একটা সংকটকে বা ডিজিজকে স্বীকার না করি, ওটার চিকিৎসা হবে না। সো ইটস দেয়ার, আমরা এটাকে একেবারে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার চেষ্টা করছি।’
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট অনেক জঙ্গি জেল থেকে বেরিয়ে গেছে- এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, ‘কিছু মানুষ বেরিয়েছিলেন। বেরিয়েছিলেন, এখন সরকারের নিয়মিত কার্য…, এটা একদম নিয়মিত কর্মকাণ্ডের বা কাজের পার্ট যে সরকার এগুলো কমব্যাট করবে। কারণ বাংলাদেশে এই ধরনের একটা প্রবণতা এভাবে আমরা যদি চিন্তা করি, এটা সরকারের জন্য কোনো কমফোর্টেবল ব্যাপার না, জনগণের জন্য তো নাই-ই।’
আরেক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, ‘জঙ্গিবাদ জিরোর কোঠায় নিয়ে আসা আমাদের লক্ষ্য। সেটা কতটা পেরে উঠবো আমরা জানি না, কিন্তু আমরা চেষ্টা করবো জিরোর কাছে নিয়ে আসার জন্য, কারণ আমরা এই প্রবলেমটা স্বীকার করি এবং এটা আমরা অনেক বেশি বাড়াতে চাই না।’
‘গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী সময় থেকে সমাজের একটা অংশের, এটা খুব বড় অংশ না, তারা কেউ কেউ এই যে বিপ্লব শব্দটা…এটা নিয়ে একসময় আমরা প্রচুর ডিবেট করেছি। কেউ কেউ বলেছে সংবিধান স্থগিত করো, কারও কারও স্বপ্ন ছিল এখানে এক ধরনের বিশেষ শরিয়াভিত্তিক রাষ্ট্র কায়েম করবেন। কিছু কিছু মানুষের এ ধরনের চিন্তা ছিল। শেষ পর্যন্ত সেটা না হয়ে যেহেতু বাংলাদেশ একটা উদার গণতান্ত্রিক পথে গেছে, সেটা কারও কারও ভালো নাও লাগতে পারে। মে বি, এটা আমি একটা অনুমান করছি বিশ্লেষক হিসেবে।’
তিনি বলেন, ‘এরা দেশের ভেতরে আছে এবং তাদের পেট্রোনাইজ করার মতো মানুষ বাইরেও থাকতে পারে। আমি জাস্ট অ্যানালিস্ট হিসেবেও বলছি।’
জামিনে থাকা জঙ্গিদের নিয়ে আরেক প্রশ্নের জবাবে জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘কেউ যদি একই ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত আছেন মনে হয়, আবার এটার যদি মোটামুটি বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়, সেক্ষেত্রে জামিন বাতিল হবে এবং সরকার সেই জামিন বাতিলের জন্য স্ট্রংলি আপিল করবে। জামিন থাকবে কি থাকবে না, তা আসলে সরকারের সিদ্ধান্ত না, এটা আদালতের সিদ্ধান্ত। কিন্তু সরকার প্রটেস্ট করবে স্ট্রংলি যাতে তাদের জামিন বাতিল হয়, সিওর এটা হবে।’
গণঅভ্যুত্থানের সময় জেল থেকে বেরিয়ে যাওয়া জঙ্গিদের নজরদারিতে রাখছেন কি না- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা একেবারেই থাকবে। মানে আবারও একটু বলা ভালো— সেটা হচ্ছে জঙ্গি বলে আমরা যেভাবে মানুষকে বলছি, আমরা এভাবে র্যাদার বলি ‘অভিযুক্ত’। কেন বলছি? আদালত কাউকে পূর্ণাঙ্গভাবে কোনো অপরাধের জন্য যদি একিউজ (অভিযুক্ত) না করে, কনভিক্ট না করে, তাহলে আসলে এভাবে বলা ঠিক না। সো জঙ্গিবাদের অভিযোগে— এই অভিযোগ কেন বলছি কথাটা? আগের রেজিমের সময়, শেখ হাসিনার রেজিমের সময় বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ আছে এমন মানুষ তো আছেই, কিন্তু অভিযোগ নেই এমন মানুষকেও গ্রেফতার করা হয়েছে।’
‘সেজন্য আমরা বলছি নজরদারিতে নিশ্চয়ই থাকবেন, কিন্তু আমরা এই যে জঙ্গি শব্দটা যেন খুব বেশি জেনারালাইজ করে না ফেলি। কোনো কিছু হলেই জঙ্গি ট্যাগ দিয়ে তাকে এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিলিং— মাঝে মাঝে আমরা দেখতাম না একটা বাড়ি ঘিরে আছে, হঠাৎ করে ওখানে নাকি বোমা বানাচ্ছে, র্যাব গেছে, গিয়ে ওখানে ক্রসফায়ারে মারা গেছে— এসব স্টোরি ক্লিয়ারলি ছিল আমাদের অতীতে। সুতরাং এই শব্দটার ক্ষেত্রে আমরা এভাবে সতর্ক থাকব।’ যোগ করেন প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা।
বিভিন্ন ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের ছাড় দেওয়ার মনোভাব ছিল বলেও জানিয়েছেন ডা. জাহেদ উর রহমান।
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















