Dhaka বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬, ৯ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশি অপারেটরের হাতে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা নেই : নৌপরিবহনমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর কোনো বিদেশি অপারেটরের হাতে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা সরকারের নেই।

বুধবার (২২ এপ্রিল) সংসদে লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সরকারি দলের সদস্য মো. শাহাদাত হোসেনের টেবিলে উত্থাপিত তারকাচিহ্নিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।

নৌ-পরিবহন মন্ত্রী বলেন, পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ অথোরিটি (পিপিপিএ) অথবা সরকার কর্তৃক জারিকৃত অথবা অনুমোদনকৃত ক্ষেত্রে শুধুমাত্র বন্দরের টার্মিনাল পরিচালনার লক্ষ্যে অপারেটর নিয়োগ করা হয়। এক্ষেত্রে দেশি এবং বিদেশি উভয় ধরনের অপারেটর বিবেচনা যোগ্য।

তিনি বলেন, বর্তমানে বন্দরের আধুনিকায়ন এবং দেশের আমদানি রপ্তানি বাণিজ্যের অব্যাহত অগ্রগতির সাথে তাল মিলিয়ে বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দেশি-বিদেশি অপারেটর দ্বারা বন্দরের বিভিন্ন টার্মিনাল পরিচালনা করা হচ্ছে। যেমন বন্দরের পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালে (পিসিটি) বিদেশি অপারেটর দ্বারা পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছেন।

এ ছাড়া, কর্ণফুলি নদীর ডান তীরে লালদিয়া চর নামক স্থানে লালদিয়া কন্টেইনার টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য পিপিপি পদ্ধতিতে ডেনমার্কে মার্কস গ্রুপের সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালস বিভি-এর সহিত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে আরও উল্লেখ্য যে, চট্টগ্রাম বন্দর একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আইন, ২০২২ অনুযায়ী একজন চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে বোর্ড এবং সংস্থার কর্মকর্তা/কর্মচারী দ্বারা পরিচালিত। উপরন্তু সরকার কর্তৃক সময় সময় যেসব নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় তা সরকারি নির্দেশনামতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রতিপালন করে থাকে বলে মন্ত্রী উল্লেখ করেন।

সংসদে স্বতন্ত্র সদস্য রুমিন ফারহানার টেবিলে উত্থাপিত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) সারাদেশের নৌপথগুলো সংরক্ষণ ও খননের মাধ্যমে সচল রাখছে। পাশাপাশি নতুন নৌপথ উন্নয়ন ও পুনঃসৃষ্টির লক্ষ্যে একাধিক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তুলাই ও পূনভবা নদীর নাব্যতা উন্নয়ন ও পুনরুদ্ধার (১ম সংশোধিত) প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি ৪৫.৯৮ শতাংশ। মিঠামইন, ইটনা ও অষ্টগ্রাম এলাকার বিভিন্ন নদীর নাব্যতা উন্নয়ন ও পুনরুদ্ধার (১ম সংশোধিত) প্রকল্পের অগ্রগতি ৮৮ শতাংশে পৌঁছেছে। মোংলা বন্দর থেকে চাঁদপুর হয়ে গোয়ালন্দ ভায়া রূপপুর পর্যন্ত নৌপথ উন্নয়ন (১ম সংশোধিত) প্রকল্পের অগ্রগতি ৮৫.০১ শতাংশ। এছাড়া জিনাই, ঘাঘট, বংশী ও নাগদা নদীর প্রবাহ পুনরুদ্ধার, নৌপথ উন্নয়ন ও বন্যা ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের অগ্রগতি ৫.১০ শতাংশ।

তিনি বলেন, ভবিষ্যতে নৌপথ উন্নয়নে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প প্রস্তাবিত রয়েছে। চট্টগ্রাম-হাতিয়া-চেয়ারম্যানঘাট থেকে ভাসান চর পর্যন্ত নৌযোগাযোগ উন্নয়ন প্রকল্পের ডিপিপি অনুমোদনের জন্য ২০২৫ সালের ২১ জুলাই পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। কুমিল্লা ইকোনমিক জোন সংলগ্ন মেঘনা (আপার) নদীর রায়পাড়া থেকে ভাটের চর পর্যন্ত নাব্যতা উন্নয়ন প্রকল্পের ডিপিপি অনুমোদনের জন্য ২০২৬ সালের ১২ মার্চ পরিকল্পনা কমিশনে প্রেরণ করা হয়েছে।

শেখ রবিউল আলম বলেন, বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নাব্যতা বৃদ্ধি, নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, পর্যটন, জলাভূমি ইকোসিস্টেম, সেচ ও ল্যান্ডিং সুবিধা উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি সমন্বিত প্রকল্পের জন্য সরকারি অর্থায়নের বিষয়ে অর্থ বিভাগের সম্মতি চেয়ে ২০২৬ সালের ৬ এপ্রিল পত্র পাঠানো হয়েছে।

তিনি বলেন, এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের নদীগুলোর নাব্যতা বৃদ্ধি, নৌপথ সম্প্রসারণ, বন্যা ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি সঞ্চার করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি পর্যটন, সেচব্যবস্থা ও জলাভূমির পরিবেশ সংরক্ষণেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

পটুয়াখালী-৪ আসনের সরকারি দলের সদস্য এবিএম মোশাররফ হোসেনের উত্থাপিত প্রশ্নের জবাবে শেখ রবিউল আলম বলেন, ২০১৫ সালে যুক্তরাজ্যভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এইচআর ওয়ালিংফোর্ড পায়রা বন্দর স্থাপনের জন্য টেকনো-ইকোনমিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা করে, যা স্বাধীনতার পর দেশে সমুদ্রবন্দর নির্মাণের প্রথম উদ্যোগ হিসেবে চিহ্নিত।

তিনি বলেন, ২০১৬ সালে ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু হয়। ২০১৯ সালে দুটি বড় দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প—বন্দরের প্রথম টার্মিনাল নির্মাণ এবং সড়ক ও সেতু সংযোগ উন্নয়ন—হাতে নেওয়া হয়। ‘প্রকল্পগুলো যথাক্রমে জুলাই ও ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, আন্ধারমানিক নদীর ওপর ১ হাজার ১৮০ মিটার দীর্ঘ চার লেনের সেতু এবং ঢাকাুকুয়াকাটা মহাসড়কের সঙ্গে সংযোগকারী ৬.৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ছয় লেনের টার্মিনাল অ্যাক্সেস সড়ক নির্মাণ কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং ডিসেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার আশা করা হচ্ছে। ‘এসব কাজ শেষ হলে আগামী বছরের শুরু থেকে বন্দরটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হবে।’

তবে তিনি উল্লেখ করেন, বন্দরের প্রধান নৌপথ রাবনাবাদ চ্যানেলে বর্তমানে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত গভীরতা নেই। উচ্চ মাত্রার পলি জমার কারণে নিয়মিত ড্রেজিং প্রয়োজন হবে। এ লক্ষ্যে দুই বছর মেয়াদি ড্রেজিং প্রকল্প এবং দুটি ট্রেইলিং সাকশন হপার ড্রেজার (টিএসএইচডি) ক্রয়ের বিষয়টি বিবেচনাধীন রয়েছে।

বন্দরের গুরুত্ব তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে দেশের প্রায় ৯৬ শতাংশ সামুদ্রিক বাণিজ্য চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পরিচালিত হয়। ‘বর্ধিত বৈদেশিক বাণিজ্যের চাপ সামাল দিতে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে বিকল্প কৌশলগত সুবিধা নিশ্চিত করতে পায়রা বন্দরের উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি।’

তিনি আরও জানান, পায়রা এলাকায় ইতোমধ্যে ২ হাজার ৬৪০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার দুটি কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে, ফলে কয়লা আমদানি পরিচালনার জন্য বন্দরের কার্যক্রম চালু করা প্রয়োজন।

বন্দরটি দেশের দক্ষিণ-মধ্যাঞ্চলে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

অবকাঠামোগত অগ্রগতি তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ৫,৯০০.৯৯ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে এবং পুনর্বাসন কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

এছাড়া নেদারল্যান্ডসের রয়্যাল হাসকোনিংডিএইচভি এবং বুয়েট যৌথভাবে একটি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করেছে। সাতটি সহায়ক জাহাজ সংগ্রহ করা হয়েছে এবং ১ লাখ বর্গমিটার গুদাম সুবিধা নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে।

প্রথম টার্মিনাল প্রকল্পের আওতায় ৬৫০ মিটার জেটি এবং ৩.২৫ লাখ বর্গমিটার ব্যাকআপ ইয়ার্ড নির্মাণ শেষ হয়েছে, যেখানে একসঙ্গে তিনটি ২০০ মিটার দীর্ঘ জাহাজ ভিড়তে পারবে।

তিনি বলেন, ১০০ মিটার সার্ভিস জেটি, কনটেইনার ফ্রেইট স্টেশন, কার ইয়ার্ড এবং প্রয়োজনীয় কার্গো হ্যান্ডলিং যন্ত্রপাতিও স্থাপন করা হয়েছে।

পাশাপাশি টার্মিনাল ভবন, সাবস্টেশন, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক এবং ভেসেল ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (ভিটিএমএস) স্থাপন করা হয়েছে।

কার্যক্রম প্রস্তুতির বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, কাস্টমস ও শিপিং সুবিধা স্থাপন করা হয়েছে এবং আইএসপিএস কোড অনুযায়ী স্মার্ট অ্যাক্সেস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালু করা হয়েছে। ড্রেজিং ব্যয় মেটাতে জাহাজের ওপর যৌক্তিক ফি আরোপের জন্য গেজেট চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

তিনি আরও জানান, রাবনাবাদ চ্যানেলের রক্ষণাবেক্ষণ ড্রেজিং ও দুটি হপার ড্রেজার ক্রয়, বন্দর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আবাসন ও ইউটিলিটি সুবিধা নির্মাণ এবং আইসিটি-ভিত্তিক বন্দর পরিচালনা ব্যবস্থা উন্নয়নসহ কয়েকটি প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

মন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, ডিসেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে পায়রা বন্দরের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হবে।

তিনি আরও বলেন, ড্রেজিং প্রকল্প বাস্তবায়নের পর ২০২৭-২৮ সালের মধ্যে বন্দরটি ২২০ মিটার দৈর্ঘ্য, ১০.৫ মিটার ড্রাফট এবং ৪৫ হাজার মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার জাহাজ পরিচালনা করতে সক্ষম হবে।

এনসিপির সংসদ সদস্য মো. আবুল হাসনাতের প্রশ্নের জবাবে নৌপরিবহন মন্ত্রী বলেন, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন দেশের নদ-নদীর অবৈধ দখলদারের তালিকা হালনাগাদ করা হয়েছে। হালনাগাদ তালিকা মোতাবেক সারাদেশে নদ-নদীর মোট ২১ হাজার ৯৮২ জন অবৈধ দখলদার রয়েছে। ওই তালিকা ওয়েবসাইটে প্রকাশের জন্য এবং নদ-নদীর অবৈধ দখলদার উচ্ছেদের কর্মপরিকল্পনা নেওয়ার জন্য জেলা প্রশাসকদের অনুরোধ জানানো হয়েছে। নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সারাদেশে নদ-নদীর অবৈধ দখলদারদের অবিলম্বে উচ্ছেদযোগ্য এরূপ তালিকা প্রাপ্তি সাপেক্ষে উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।

বিএনপির সংসদ সদস্য মো. মোশারফ হোসেনের প্রশ্নের জবাবে শেখ রবিউল আলম বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) অধীনে চলাচল উপযোগী ৪৭টি ফেরি আছে। এর মধ্যে রো-রো ফেরি ১২ টি, মিডিয়াম ফেরি-১৬টি, ইমপ্রভড মিডিয়াম ফেরি-৮, ইউটিলিটি ফেরি-১১টি।

তিনি বলেন, ‘বিআইডব্লিউটিসির জন্য ৩৫টি বাণিজ্যিক ও ৮টি সহায়ক জলযান সংগ্রহ এবং দুটি নতুন শিল্পওয়ে নির্মাণ’ প্রকল্পের অধীনে ৬টি ইউটিলিটি ফেরি নির্মাণাধীন রয়েছে। যা আগামী জুনের মধ্যে ট্রাফিকে সংযুক্ত হবে। এছাড়া পুরাতন ফেরি প্রতিস্থাপন কল্পে আরও ১৫টি মিডিয়াম ফেরি ও ৫টি ইউটিলিটি ফেরি এবং উপকূলীয় অঞ্চলে চলাচলে উপযোগী দুটি রোপ্যাক্স ফেরি নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

আবহাওয়া

রানা-রিশাদদের সুখবর দিল আইসিসি

চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশি অপারেটরের হাতে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা নেই : নৌপরিবহনমন্ত্রী

প্রকাশের সময় : ০৭:৩৬:৪৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর কোনো বিদেশি অপারেটরের হাতে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা সরকারের নেই।

বুধবার (২২ এপ্রিল) সংসদে লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সরকারি দলের সদস্য মো. শাহাদাত হোসেনের টেবিলে উত্থাপিত তারকাচিহ্নিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।

নৌ-পরিবহন মন্ত্রী বলেন, পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ অথোরিটি (পিপিপিএ) অথবা সরকার কর্তৃক জারিকৃত অথবা অনুমোদনকৃত ক্ষেত্রে শুধুমাত্র বন্দরের টার্মিনাল পরিচালনার লক্ষ্যে অপারেটর নিয়োগ করা হয়। এক্ষেত্রে দেশি এবং বিদেশি উভয় ধরনের অপারেটর বিবেচনা যোগ্য।

তিনি বলেন, বর্তমানে বন্দরের আধুনিকায়ন এবং দেশের আমদানি রপ্তানি বাণিজ্যের অব্যাহত অগ্রগতির সাথে তাল মিলিয়ে বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দেশি-বিদেশি অপারেটর দ্বারা বন্দরের বিভিন্ন টার্মিনাল পরিচালনা করা হচ্ছে। যেমন বন্দরের পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালে (পিসিটি) বিদেশি অপারেটর দ্বারা পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছেন।

এ ছাড়া, কর্ণফুলি নদীর ডান তীরে লালদিয়া চর নামক স্থানে লালদিয়া কন্টেইনার টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য পিপিপি পদ্ধতিতে ডেনমার্কে মার্কস গ্রুপের সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালস বিভি-এর সহিত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে আরও উল্লেখ্য যে, চট্টগ্রাম বন্দর একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আইন, ২০২২ অনুযায়ী একজন চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে বোর্ড এবং সংস্থার কর্মকর্তা/কর্মচারী দ্বারা পরিচালিত। উপরন্তু সরকার কর্তৃক সময় সময় যেসব নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় তা সরকারি নির্দেশনামতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রতিপালন করে থাকে বলে মন্ত্রী উল্লেখ করেন।

সংসদে স্বতন্ত্র সদস্য রুমিন ফারহানার টেবিলে উত্থাপিত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) সারাদেশের নৌপথগুলো সংরক্ষণ ও খননের মাধ্যমে সচল রাখছে। পাশাপাশি নতুন নৌপথ উন্নয়ন ও পুনঃসৃষ্টির লক্ষ্যে একাধিক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তুলাই ও পূনভবা নদীর নাব্যতা উন্নয়ন ও পুনরুদ্ধার (১ম সংশোধিত) প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি ৪৫.৯৮ শতাংশ। মিঠামইন, ইটনা ও অষ্টগ্রাম এলাকার বিভিন্ন নদীর নাব্যতা উন্নয়ন ও পুনরুদ্ধার (১ম সংশোধিত) প্রকল্পের অগ্রগতি ৮৮ শতাংশে পৌঁছেছে। মোংলা বন্দর থেকে চাঁদপুর হয়ে গোয়ালন্দ ভায়া রূপপুর পর্যন্ত নৌপথ উন্নয়ন (১ম সংশোধিত) প্রকল্পের অগ্রগতি ৮৫.০১ শতাংশ। এছাড়া জিনাই, ঘাঘট, বংশী ও নাগদা নদীর প্রবাহ পুনরুদ্ধার, নৌপথ উন্নয়ন ও বন্যা ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের অগ্রগতি ৫.১০ শতাংশ।

তিনি বলেন, ভবিষ্যতে নৌপথ উন্নয়নে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প প্রস্তাবিত রয়েছে। চট্টগ্রাম-হাতিয়া-চেয়ারম্যানঘাট থেকে ভাসান চর পর্যন্ত নৌযোগাযোগ উন্নয়ন প্রকল্পের ডিপিপি অনুমোদনের জন্য ২০২৫ সালের ২১ জুলাই পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। কুমিল্লা ইকোনমিক জোন সংলগ্ন মেঘনা (আপার) নদীর রায়পাড়া থেকে ভাটের চর পর্যন্ত নাব্যতা উন্নয়ন প্রকল্পের ডিপিপি অনুমোদনের জন্য ২০২৬ সালের ১২ মার্চ পরিকল্পনা কমিশনে প্রেরণ করা হয়েছে।

শেখ রবিউল আলম বলেন, বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নাব্যতা বৃদ্ধি, নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, পর্যটন, জলাভূমি ইকোসিস্টেম, সেচ ও ল্যান্ডিং সুবিধা উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি সমন্বিত প্রকল্পের জন্য সরকারি অর্থায়নের বিষয়ে অর্থ বিভাগের সম্মতি চেয়ে ২০২৬ সালের ৬ এপ্রিল পত্র পাঠানো হয়েছে।

তিনি বলেন, এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের নদীগুলোর নাব্যতা বৃদ্ধি, নৌপথ সম্প্রসারণ, বন্যা ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি সঞ্চার করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি পর্যটন, সেচব্যবস্থা ও জলাভূমির পরিবেশ সংরক্ষণেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

পটুয়াখালী-৪ আসনের সরকারি দলের সদস্য এবিএম মোশাররফ হোসেনের উত্থাপিত প্রশ্নের জবাবে শেখ রবিউল আলম বলেন, ২০১৫ সালে যুক্তরাজ্যভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এইচআর ওয়ালিংফোর্ড পায়রা বন্দর স্থাপনের জন্য টেকনো-ইকোনমিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা করে, যা স্বাধীনতার পর দেশে সমুদ্রবন্দর নির্মাণের প্রথম উদ্যোগ হিসেবে চিহ্নিত।

তিনি বলেন, ২০১৬ সালে ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু হয়। ২০১৯ সালে দুটি বড় দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প—বন্দরের প্রথম টার্মিনাল নির্মাণ এবং সড়ক ও সেতু সংযোগ উন্নয়ন—হাতে নেওয়া হয়। ‘প্রকল্পগুলো যথাক্রমে জুলাই ও ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, আন্ধারমানিক নদীর ওপর ১ হাজার ১৮০ মিটার দীর্ঘ চার লেনের সেতু এবং ঢাকাুকুয়াকাটা মহাসড়কের সঙ্গে সংযোগকারী ৬.৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ছয় লেনের টার্মিনাল অ্যাক্সেস সড়ক নির্মাণ কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং ডিসেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার আশা করা হচ্ছে। ‘এসব কাজ শেষ হলে আগামী বছরের শুরু থেকে বন্দরটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হবে।’

তবে তিনি উল্লেখ করেন, বন্দরের প্রধান নৌপথ রাবনাবাদ চ্যানেলে বর্তমানে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত গভীরতা নেই। উচ্চ মাত্রার পলি জমার কারণে নিয়মিত ড্রেজিং প্রয়োজন হবে। এ লক্ষ্যে দুই বছর মেয়াদি ড্রেজিং প্রকল্প এবং দুটি ট্রেইলিং সাকশন হপার ড্রেজার (টিএসএইচডি) ক্রয়ের বিষয়টি বিবেচনাধীন রয়েছে।

বন্দরের গুরুত্ব তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে দেশের প্রায় ৯৬ শতাংশ সামুদ্রিক বাণিজ্য চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পরিচালিত হয়। ‘বর্ধিত বৈদেশিক বাণিজ্যের চাপ সামাল দিতে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে বিকল্প কৌশলগত সুবিধা নিশ্চিত করতে পায়রা বন্দরের উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি।’

তিনি আরও জানান, পায়রা এলাকায় ইতোমধ্যে ২ হাজার ৬৪০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার দুটি কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে, ফলে কয়লা আমদানি পরিচালনার জন্য বন্দরের কার্যক্রম চালু করা প্রয়োজন।

বন্দরটি দেশের দক্ষিণ-মধ্যাঞ্চলে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

অবকাঠামোগত অগ্রগতি তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ৫,৯০০.৯৯ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে এবং পুনর্বাসন কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

এছাড়া নেদারল্যান্ডসের রয়্যাল হাসকোনিংডিএইচভি এবং বুয়েট যৌথভাবে একটি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করেছে। সাতটি সহায়ক জাহাজ সংগ্রহ করা হয়েছে এবং ১ লাখ বর্গমিটার গুদাম সুবিধা নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে।

প্রথম টার্মিনাল প্রকল্পের আওতায় ৬৫০ মিটার জেটি এবং ৩.২৫ লাখ বর্গমিটার ব্যাকআপ ইয়ার্ড নির্মাণ শেষ হয়েছে, যেখানে একসঙ্গে তিনটি ২০০ মিটার দীর্ঘ জাহাজ ভিড়তে পারবে।

তিনি বলেন, ১০০ মিটার সার্ভিস জেটি, কনটেইনার ফ্রেইট স্টেশন, কার ইয়ার্ড এবং প্রয়োজনীয় কার্গো হ্যান্ডলিং যন্ত্রপাতিও স্থাপন করা হয়েছে।

পাশাপাশি টার্মিনাল ভবন, সাবস্টেশন, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক এবং ভেসেল ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (ভিটিএমএস) স্থাপন করা হয়েছে।

কার্যক্রম প্রস্তুতির বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, কাস্টমস ও শিপিং সুবিধা স্থাপন করা হয়েছে এবং আইএসপিএস কোড অনুযায়ী স্মার্ট অ্যাক্সেস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালু করা হয়েছে। ড্রেজিং ব্যয় মেটাতে জাহাজের ওপর যৌক্তিক ফি আরোপের জন্য গেজেট চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

তিনি আরও জানান, রাবনাবাদ চ্যানেলের রক্ষণাবেক্ষণ ড্রেজিং ও দুটি হপার ড্রেজার ক্রয়, বন্দর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আবাসন ও ইউটিলিটি সুবিধা নির্মাণ এবং আইসিটি-ভিত্তিক বন্দর পরিচালনা ব্যবস্থা উন্নয়নসহ কয়েকটি প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

মন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, ডিসেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে পায়রা বন্দরের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হবে।

তিনি আরও বলেন, ড্রেজিং প্রকল্প বাস্তবায়নের পর ২০২৭-২৮ সালের মধ্যে বন্দরটি ২২০ মিটার দৈর্ঘ্য, ১০.৫ মিটার ড্রাফট এবং ৪৫ হাজার মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার জাহাজ পরিচালনা করতে সক্ষম হবে।

এনসিপির সংসদ সদস্য মো. আবুল হাসনাতের প্রশ্নের জবাবে নৌপরিবহন মন্ত্রী বলেন, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন দেশের নদ-নদীর অবৈধ দখলদারের তালিকা হালনাগাদ করা হয়েছে। হালনাগাদ তালিকা মোতাবেক সারাদেশে নদ-নদীর মোট ২১ হাজার ৯৮২ জন অবৈধ দখলদার রয়েছে। ওই তালিকা ওয়েবসাইটে প্রকাশের জন্য এবং নদ-নদীর অবৈধ দখলদার উচ্ছেদের কর্মপরিকল্পনা নেওয়ার জন্য জেলা প্রশাসকদের অনুরোধ জানানো হয়েছে। নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সারাদেশে নদ-নদীর অবৈধ দখলদারদের অবিলম্বে উচ্ছেদযোগ্য এরূপ তালিকা প্রাপ্তি সাপেক্ষে উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।

বিএনপির সংসদ সদস্য মো. মোশারফ হোসেনের প্রশ্নের জবাবে শেখ রবিউল আলম বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) অধীনে চলাচল উপযোগী ৪৭টি ফেরি আছে। এর মধ্যে রো-রো ফেরি ১২ টি, মিডিয়াম ফেরি-১৬টি, ইমপ্রভড মিডিয়াম ফেরি-৮, ইউটিলিটি ফেরি-১১টি।

তিনি বলেন, ‘বিআইডব্লিউটিসির জন্য ৩৫টি বাণিজ্যিক ও ৮টি সহায়ক জলযান সংগ্রহ এবং দুটি নতুন শিল্পওয়ে নির্মাণ’ প্রকল্পের অধীনে ৬টি ইউটিলিটি ফেরি নির্মাণাধীন রয়েছে। যা আগামী জুনের মধ্যে ট্রাফিকে সংযুক্ত হবে। এছাড়া পুরাতন ফেরি প্রতিস্থাপন কল্পে আরও ১৫টি মিডিয়াম ফেরি ও ৫টি ইউটিলিটি ফেরি এবং উপকূলীয় অঞ্চলে চলাচলে উপযোগী দুটি রোপ্যাক্স ফেরি নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।