Dhaka রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬, ২৯ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ঢাকা শহরে অবৈধ বাস কাউন্টার উচ্ছেদে একমত মালিক সমিতি

  • প্রতিনিধির নাম
  • প্রকাশের সময় : ০২:৫৫:৪৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬
  • ২০১ জন দেখেছেন

রাজধানীর যত্রতত্র গড়ে উঠেছে দূরপাল্লার বাসের শত শত কাউন্টার। আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনের পাশাপাশি ফুটপাত, এমনকি ব্যস্ত সড়কের পাশে এসব কাউন্টার পরিচালিত হচ্ছে। ফলে যেখানে-সেখানে গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করছেন চালকরা। এতে সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত সড়কগুলোতে তীব্র যানজট বাঁধছে।

একই সঙ্গে বাসের জন্য ফুটপাত বা সড়কের ধারে মালামাল নিয়ে অপেক্ষায় থাকা যাত্রীরা নিজে যেমন রোদ-বৃষ্টিতে ভোগান্তিতে পড়ছেন, তেমনি পথচারীরা দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। এ অব্যবস্থাপনা সবচেয়ে বড় বিপত্তি সৃষ্টি করছে প্রগতি সরণিতে। এছাড়া যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, ধোলাইপাড়, জুরাইন, কমলাপুর, আরামবাগ, ফকিরাপুল,পান্থপথ, কলাবাগান, শ্যামলী, গাবতলী, উত্তরা ও আবদুল্লাহপুরে অনেক বাস কাউন্টার গড়ে উঠেছে। যার অধিকাংশের অনুমোদন নেই। সেখানে রাস্তার পাশে বা মোড়ে যাত্রী ওঠানামা করানো হয়। এতে সড়কের একাংশ কার্যত দখল হয়ে যায়। ফলে যানবাহনের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত এবং দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে অফিস সময় ও সন্ধ্যায় সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করে। ঢাকা শহরে অবৈধ বাস কাউন্টার উচ্ছেদে একমত মালিক সমিতি।

নগরবাসীর অভিযোগ, প্রতিদিনের যানজট ও জনদুর্ভোগের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে অবৈধ বাস কাউন্টারগুলো। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে বসানো এসব কাউন্টার কার্যত রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থা বিশৃঙ্খল করে তুলছে। অথচ ঢাকা থেকে দূরপাল্লার বাস চলাচলের জন্য নির্ধারিত টার্মিনাল- সায়েদাবাদ, মহাখালী, গাবতলী ও ফুলবাড়িয়া রয়েছে। কিন্তু এসব টার্মিনাল ব্যবহার না করে পরিবহন মালিকরা শহরের ভেতরে সুবিধাজনক জায়গায় কাউন্টার স্থাপন করছেন, যাতে যাত্রী সংগ্রহ সহজ হয়। এতে তাদের ব্যবসায়িক লাভ বাড়লেও নগরবাসীকে ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

যদিও সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালের আশপাশ থেকে প্রায় আড়াইশ অবৈধ কাউন্টার অপসারণে টানা অভিযান পরিচালনা করছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। কিন্তু এর বাইরে অন্য এলাকার অবৈধ কাউন্টার উচ্ছেদে তাদের কোনো পরিকল্পনা জানা যায়নি। অন্যদিকে, প্রগতি সরণিসহ ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকার অবৈধ কাউন্টার অপসারণেও কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।

প্রগতি সরণি, যার বর্তমান নাম বীর উত্তম রফিকুল ইসলাম অ্যাভিনিউ, এর কুড়িল ফ্লাইওভার থেকে বাড্ডা-রামপুরা হয়ে মালিবাগের আবুল হোটেল পর্যন্ত অংশের দূরত্ব প্রায় ১৪ কিলোমিটার। নগরীর অন্যতম ব্যস্ত এ সড়কের উভয় পাশে রয়েছে অসংখ্য বাস কাউন্টার। বিশেষ করে উত্তর, মধ্য ও দক্ষিণ বাড্ডায় প্রগতি সরণির পূর্ব পাশে কাউন্টারের সংখ্যা বেশি। যার বেশির ভাগই বাসাবাড়ি ও বাণিজ্যিক ভবনের নিচতলায় পরিচালনা করা হয়।

গত বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) বিকেলে বাড্ডায় প্রতিটি কাউন্টারেই যাত্রী চাপ দেখা গেছে। কাউন্টারগুলো থেকে ঢাকা-মাইজদির লাল সবুজ এসি বাস, খুলনার শ্যামলী এনআর ট্রাভেলস, লিটন ট্রাভেলস ও কেকে ট্রাভেলস, গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়ার স্টার এক্সপ্রেস, ঢাকা-বরিশালের রয়্যাল এক্সপ্রেস, ঢাকা-পটুয়াখালীর দিগন্ত পরিবহন, ঢাকা-বরগুনার শতাব্দী পরিবহন, ঢাকা-মাগুড়ার পূর্বাশা পরিবহন, ঢাকা-নড়াইলের হামদান এক্সপ্রেস, ঢাকা-চট্টগ্রাম-বান্দরবান-কক্সবাজারের সাকুরা পরিবহন ও সৌদিয়া কোচ সার্ভিস এবং ঢাকা-সিলেটে ইউরো কোচ লিমিটেডের বাস যাত্রী পরিবহন করছিল। গাড়িগুলো থামার জন্য নির্দিষ্ট কোনো জায়গা না থাকায় যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা করানো হচ্ছিল।

মধ্য বাড্ডার তাজ হোটেলের নিচ তলায় ছোট একটি কক্ষে কাউন্টার চালায় এনা পরিবহন। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, কাউন্টার থেকে টিকিট নিয়ে ভেতরে বসে আছেন ১০ থেকে ১৫ যাত্রী। নির্দিষ্ট সময় পরপর বাস হোটেলের নিচে থামছে। তারপর আট থেকে ১০ মিনিট ধরে যাত্রী ওঠানামা করছেন। একইভাবে আশপাশে আরও ১৫ থেকে ২০টি কাউন্টারের সামনে এক-দুই মিনিট পরপর বাস থামতে দেখা গেছে। এতে সড়কে তীব্র যানজট সৃষ্টি হচ্ছিল।

এনা পরিবহনের টিকিট বিক্রয়কর্মী আলাউদ্দিন বলেন, তারা এনা পরিবহন থেকে অনুমতি নিয়ে এখানে টিকিট বিক্রি করছেন। প্রতিটি টিকিটের জন্য তারা নির্দিষ্ট কমিশন পান। এ কাজ পরিচালনার জন্য সিটি করপোরেশন থেকে ট্রেড লাইসেন্স নিয়েছেন।

বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে উত্তর বাড্ডার বাসিন্দা হায়দার আলী বলেন, ঢাকা শহরে যে কয়েকটা ব্যস্ত রাস্তা রয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে ব্যস্ত প্রগতি সরণি। এ সড়কে প্রতিদিন সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। এর অন্যতম কারণ দূরপাল্লার বাস চলাচল। এসব বাসের টিকিট কাউন্টার সড়কের দুই পাশের ভবনে গড়ে উঠেছে। ফলে সেখানে বাস থেমে যাত্রী নিচ্ছে। এমন অব্যবস্থাপনা রাজধানীর অন্য কোথাও দেখা যাবে না। অথচ এসব কাউন্টার উচ্ছেদে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

আরামবাগে নটর ডেম কলেজের বিপরীত পাশে কুমিল্লাসহ চট্টগ্রাম বিভাগের বেশ কয়েকটি জেলার বাসের বড় বড় কাউন্টার। এসব বাস এখান থেকেই যাত্রী নিয়ে নিজ নিজ গন্তব্যে যায়, আবার বিভিন্ন জেলা থেকে যাত্রী এনে এখানেই নামায়। অথচ এসব বাস থামার জন্য আলাদা কোনো জায়গা নেই। প্রতিটি গাড়ি যাত্রী ওঠানামা করে সড়কের ওপর। ফলে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।

নির্দিষ্ট জায়গা ছাড়া কীভাবে এসব বাস কাউন্টার স্থাপন করা হলো ও যাত্রী পরিবহনের অনুমোদন পেলো, তা নিয়ে প্রশ্ন এলাকাবাসীর। আরামবাগের বাসিন্দা ইকরামুল হক বলেন, অনেক কাউন্টার ফুটপাত দখল করে স্থাপন করা হয়েছে। ফলে পথচারীদের চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। বাধ্য হয়ে তাদের সড়কে নেমে হাঁটতে হয়, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। এছাড়া, বাসের অপেক্ষায় থাকা যাত্রীদের ভিড় ও শব্দদূষণ আশপাশের পরিবেশ অস্বস্তিকর করে তুলছে। অথচ আইন অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন ও সংশ্লিষ্ট পরিবহন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া এ ধরনের কাউন্টার স্থাপন অবৈধ। যদি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অনুমতি দিয়েও থাকে, তা হলে তারা কীসের ভিত্তিতে অনুমতি দিয়েছে, তার জবাব জনগণকে দিতে হবে।

ঢাকা শহরে সায়েদাবাদ, গাবতলী ও মহাখালীতে আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল রয়েছে। এর মধ্যে সায়েদাবাদ থেকে চট্টগ্রাম, বরিশাল ও সিলেট বিভাগের বাস ছাড়ে। মহাখালী ও গাবতলী থেকে ময়মনসিংহ, সিলেট ও রাজশাহী বিভাগে যাত্রী পরিবহন চলে। সেই সঙ্গে ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল থেকে দক্ষিণাঞ্চলের বেশ কিছু জেলায় যাত্রী পরিবহন করা হয়। এ চারটি টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্বে আছে ডিএসসিসি ও ডিএনসিসি।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি সূত্র জানায়, কালক্রমে এই চারটি টার্মিনালের বাইরে অসংখ্য টিকিট কাউন্টার চালু করেন অসাধু বাস মালিকরা। উৎকোচের বিনিময়ে তাদের সুবিধা দিয়ে আসছেন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ ও সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্টরা। ফলে এই প্রক্রিয়া বন্ধে মালিক সমিতি কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছে না।

ডিএসসিসির উদ্যোগে গত ১০ মার্চ ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ, ঢাকা সড়ক পরিবহন বাস মালিক সমিতি, সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল পরিবহন মালিক সমিতি ও পরিবহন শ্রমিক কমিটির এক সমন্বয় সভা হয়। এতে ডিএসসিসির সংশ্লিষ্টরা জানান, সায়েদাবাদ টার্মিনালের আশপাশে ২৪০টি অবৈধ বাস কাউন্টার রয়েছে। এগুলোর কারণে টার্মিনাল এলাকার সড়কে বিশৃঙ্খলা ও যানজট সৃষ্টি হয়। তাই টিটিপাড়া মোড় থেকে ধোলাইপাড় পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকার অনুমোদনহীন ও অবৈধ বাস কাউন্টারগুলো উচ্ছেদ করা জরুরি।

সভার সিদ্ধান্তের আলোকে টার্মিনালের আশপাশে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা বাস কাউন্টার উচ্ছেদে গত ৮ এপ্রিল থেকে অভিযান পরিচালনা শুরু করে ডিএসসিসি। শনিবার (১১ এপ্রিল) তৃতীয় দিনের মতো ওই এলাকায় অভিযান পরিচালনা করেন ডিএসসিসির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম।

তবে সরেজমিনে দেখা যায়, অভিযানের আগাম খবর পেয়ে অধিকাংশ কাউন্টার আগেই বন্ধ করে সটকে যান সেখানকার লোকজন। এর মধ্যে যেসব কাউন্টারের সামনে সাইনবোর্ড ছিল, সেগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। আবার বেশ কিছু কাউন্টার সিলগালা করে দেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

ডিএসসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা রাসেল রহমান বলেন, সায়েদাবাদ এলাকায় অবৈধ বাস কাউন্টার স্থাপনের ফলে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র যানজট ও যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছিল। জনস্বার্থে এবং নগর ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরাতে ডিএসসিসি এ কঠোর অবস্থান (উচ্ছেদ করা) নিয়েছে। অবৈধ কাউন্টারগুলো সম্পূর্ণ নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত অভিযান অব্যাহত থাকবে। কিন্তু এর বাইরে শহরের অন্য এলাকায় যেসব অবৈধ বাস কাউন্টার রয়েছে, সেগুলো অপসারণে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক কাজী জুবায়ের মাসুদ বলেন, ‘ঢাকা শহরে অবৈধ বাস কাউন্টার উচ্ছেদে একমত মালিক সমিতি। যারা নিয়ম না মেনে অবৈধভাবে কাউন্টার স্থাপন করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব সিটি করপোরেশন ও পুলিশের। তারা মালিক সমিতির সহযোগিতা চাইলে, আমরা সহযোগিতা করবো।’

দূরপাল্লার বাসের জন্য আধুনিক ও পর্যাপ্ত টার্মিনাল সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যাত্রীদেরও সচেতন হতে হবে। নির্ধারিত স্থান ছাড়া অন্য কোথাও থেকে বাসে ওঠা থেকে বিরত থাকতে হবে। ঢাকা শহরের যানজট কমাতে এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। না হলে অবৈধ বাস কাউন্টারগুলো ভবিষ্যতে আরও বড় সংকটের জন্ম দেবে, যা সামাল দেওয়া কঠিন হবে।’

যোগাযোগ করা হলে ট্রাফিক গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মিজানুর রহমান সেলিম বলেন, নিয়ম অনুযায়ী বাস বে তে বাস থামবে। মাসের পর মাস চেষ্টা করে কুড়িলে এ নিয়ম মানতে চালকদের বাধ্য করেছি। এখন সেখানে কেউ নিয়ম লঙ্ঘন করেন না। তবে শহরে বাস বে নেই। তাই অনেক চালক আইন মানতে চান না। তারা যত্রতত্র বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করেন। তখন তাদের মামলা দিই। আর প্রগতি সরণির বাসাবাড়ির নিচে যেসব বাস কাউন্টার গড়ে উঠেছে, সেগুলো অপসারণে পরিকল্পনা রয়েছে।’ তবে ঠিক কবে নাগাদ তা অপসারণ করা হবে তা তিনি নির্দিষ্ট করে বলেননি।

আবহাওয়া

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলতে সরকার জোর তৎপরতা চালাচ্ছে : মাহদী আমিন

ঢাকা শহরে অবৈধ বাস কাউন্টার উচ্ছেদে একমত মালিক সমিতি

প্রকাশের সময় : ০২:৫৫:৪৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬

রাজধানীর যত্রতত্র গড়ে উঠেছে দূরপাল্লার বাসের শত শত কাউন্টার। আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনের পাশাপাশি ফুটপাত, এমনকি ব্যস্ত সড়কের পাশে এসব কাউন্টার পরিচালিত হচ্ছে। ফলে যেখানে-সেখানে গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করছেন চালকরা। এতে সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত সড়কগুলোতে তীব্র যানজট বাঁধছে।

একই সঙ্গে বাসের জন্য ফুটপাত বা সড়কের ধারে মালামাল নিয়ে অপেক্ষায় থাকা যাত্রীরা নিজে যেমন রোদ-বৃষ্টিতে ভোগান্তিতে পড়ছেন, তেমনি পথচারীরা দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। এ অব্যবস্থাপনা সবচেয়ে বড় বিপত্তি সৃষ্টি করছে প্রগতি সরণিতে। এছাড়া যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, ধোলাইপাড়, জুরাইন, কমলাপুর, আরামবাগ, ফকিরাপুল,পান্থপথ, কলাবাগান, শ্যামলী, গাবতলী, উত্তরা ও আবদুল্লাহপুরে অনেক বাস কাউন্টার গড়ে উঠেছে। যার অধিকাংশের অনুমোদন নেই। সেখানে রাস্তার পাশে বা মোড়ে যাত্রী ওঠানামা করানো হয়। এতে সড়কের একাংশ কার্যত দখল হয়ে যায়। ফলে যানবাহনের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত এবং দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে অফিস সময় ও সন্ধ্যায় সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করে। ঢাকা শহরে অবৈধ বাস কাউন্টার উচ্ছেদে একমত মালিক সমিতি।

নগরবাসীর অভিযোগ, প্রতিদিনের যানজট ও জনদুর্ভোগের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে অবৈধ বাস কাউন্টারগুলো। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে বসানো এসব কাউন্টার কার্যত রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থা বিশৃঙ্খল করে তুলছে। অথচ ঢাকা থেকে দূরপাল্লার বাস চলাচলের জন্য নির্ধারিত টার্মিনাল- সায়েদাবাদ, মহাখালী, গাবতলী ও ফুলবাড়িয়া রয়েছে। কিন্তু এসব টার্মিনাল ব্যবহার না করে পরিবহন মালিকরা শহরের ভেতরে সুবিধাজনক জায়গায় কাউন্টার স্থাপন করছেন, যাতে যাত্রী সংগ্রহ সহজ হয়। এতে তাদের ব্যবসায়িক লাভ বাড়লেও নগরবাসীকে ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

যদিও সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালের আশপাশ থেকে প্রায় আড়াইশ অবৈধ কাউন্টার অপসারণে টানা অভিযান পরিচালনা করছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। কিন্তু এর বাইরে অন্য এলাকার অবৈধ কাউন্টার উচ্ছেদে তাদের কোনো পরিকল্পনা জানা যায়নি। অন্যদিকে, প্রগতি সরণিসহ ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকার অবৈধ কাউন্টার অপসারণেও কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।

প্রগতি সরণি, যার বর্তমান নাম বীর উত্তম রফিকুল ইসলাম অ্যাভিনিউ, এর কুড়িল ফ্লাইওভার থেকে বাড্ডা-রামপুরা হয়ে মালিবাগের আবুল হোটেল পর্যন্ত অংশের দূরত্ব প্রায় ১৪ কিলোমিটার। নগরীর অন্যতম ব্যস্ত এ সড়কের উভয় পাশে রয়েছে অসংখ্য বাস কাউন্টার। বিশেষ করে উত্তর, মধ্য ও দক্ষিণ বাড্ডায় প্রগতি সরণির পূর্ব পাশে কাউন্টারের সংখ্যা বেশি। যার বেশির ভাগই বাসাবাড়ি ও বাণিজ্যিক ভবনের নিচতলায় পরিচালনা করা হয়।

গত বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) বিকেলে বাড্ডায় প্রতিটি কাউন্টারেই যাত্রী চাপ দেখা গেছে। কাউন্টারগুলো থেকে ঢাকা-মাইজদির লাল সবুজ এসি বাস, খুলনার শ্যামলী এনআর ট্রাভেলস, লিটন ট্রাভেলস ও কেকে ট্রাভেলস, গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়ার স্টার এক্সপ্রেস, ঢাকা-বরিশালের রয়্যাল এক্সপ্রেস, ঢাকা-পটুয়াখালীর দিগন্ত পরিবহন, ঢাকা-বরগুনার শতাব্দী পরিবহন, ঢাকা-মাগুড়ার পূর্বাশা পরিবহন, ঢাকা-নড়াইলের হামদান এক্সপ্রেস, ঢাকা-চট্টগ্রাম-বান্দরবান-কক্সবাজারের সাকুরা পরিবহন ও সৌদিয়া কোচ সার্ভিস এবং ঢাকা-সিলেটে ইউরো কোচ লিমিটেডের বাস যাত্রী পরিবহন করছিল। গাড়িগুলো থামার জন্য নির্দিষ্ট কোনো জায়গা না থাকায় যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা করানো হচ্ছিল।

মধ্য বাড্ডার তাজ হোটেলের নিচ তলায় ছোট একটি কক্ষে কাউন্টার চালায় এনা পরিবহন। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, কাউন্টার থেকে টিকিট নিয়ে ভেতরে বসে আছেন ১০ থেকে ১৫ যাত্রী। নির্দিষ্ট সময় পরপর বাস হোটেলের নিচে থামছে। তারপর আট থেকে ১০ মিনিট ধরে যাত্রী ওঠানামা করছেন। একইভাবে আশপাশে আরও ১৫ থেকে ২০টি কাউন্টারের সামনে এক-দুই মিনিট পরপর বাস থামতে দেখা গেছে। এতে সড়কে তীব্র যানজট সৃষ্টি হচ্ছিল।

এনা পরিবহনের টিকিট বিক্রয়কর্মী আলাউদ্দিন বলেন, তারা এনা পরিবহন থেকে অনুমতি নিয়ে এখানে টিকিট বিক্রি করছেন। প্রতিটি টিকিটের জন্য তারা নির্দিষ্ট কমিশন পান। এ কাজ পরিচালনার জন্য সিটি করপোরেশন থেকে ট্রেড লাইসেন্স নিয়েছেন।

বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে উত্তর বাড্ডার বাসিন্দা হায়দার আলী বলেন, ঢাকা শহরে যে কয়েকটা ব্যস্ত রাস্তা রয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে ব্যস্ত প্রগতি সরণি। এ সড়কে প্রতিদিন সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। এর অন্যতম কারণ দূরপাল্লার বাস চলাচল। এসব বাসের টিকিট কাউন্টার সড়কের দুই পাশের ভবনে গড়ে উঠেছে। ফলে সেখানে বাস থেমে যাত্রী নিচ্ছে। এমন অব্যবস্থাপনা রাজধানীর অন্য কোথাও দেখা যাবে না। অথচ এসব কাউন্টার উচ্ছেদে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

আরামবাগে নটর ডেম কলেজের বিপরীত পাশে কুমিল্লাসহ চট্টগ্রাম বিভাগের বেশ কয়েকটি জেলার বাসের বড় বড় কাউন্টার। এসব বাস এখান থেকেই যাত্রী নিয়ে নিজ নিজ গন্তব্যে যায়, আবার বিভিন্ন জেলা থেকে যাত্রী এনে এখানেই নামায়। অথচ এসব বাস থামার জন্য আলাদা কোনো জায়গা নেই। প্রতিটি গাড়ি যাত্রী ওঠানামা করে সড়কের ওপর। ফলে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।

নির্দিষ্ট জায়গা ছাড়া কীভাবে এসব বাস কাউন্টার স্থাপন করা হলো ও যাত্রী পরিবহনের অনুমোদন পেলো, তা নিয়ে প্রশ্ন এলাকাবাসীর। আরামবাগের বাসিন্দা ইকরামুল হক বলেন, অনেক কাউন্টার ফুটপাত দখল করে স্থাপন করা হয়েছে। ফলে পথচারীদের চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। বাধ্য হয়ে তাদের সড়কে নেমে হাঁটতে হয়, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। এছাড়া, বাসের অপেক্ষায় থাকা যাত্রীদের ভিড় ও শব্দদূষণ আশপাশের পরিবেশ অস্বস্তিকর করে তুলছে। অথচ আইন অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন ও সংশ্লিষ্ট পরিবহন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া এ ধরনের কাউন্টার স্থাপন অবৈধ। যদি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অনুমতি দিয়েও থাকে, তা হলে তারা কীসের ভিত্তিতে অনুমতি দিয়েছে, তার জবাব জনগণকে দিতে হবে।

ঢাকা শহরে সায়েদাবাদ, গাবতলী ও মহাখালীতে আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল রয়েছে। এর মধ্যে সায়েদাবাদ থেকে চট্টগ্রাম, বরিশাল ও সিলেট বিভাগের বাস ছাড়ে। মহাখালী ও গাবতলী থেকে ময়মনসিংহ, সিলেট ও রাজশাহী বিভাগে যাত্রী পরিবহন চলে। সেই সঙ্গে ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল থেকে দক্ষিণাঞ্চলের বেশ কিছু জেলায় যাত্রী পরিবহন করা হয়। এ চারটি টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্বে আছে ডিএসসিসি ও ডিএনসিসি।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি সূত্র জানায়, কালক্রমে এই চারটি টার্মিনালের বাইরে অসংখ্য টিকিট কাউন্টার চালু করেন অসাধু বাস মালিকরা। উৎকোচের বিনিময়ে তাদের সুবিধা দিয়ে আসছেন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ ও সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্টরা। ফলে এই প্রক্রিয়া বন্ধে মালিক সমিতি কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছে না।

ডিএসসিসির উদ্যোগে গত ১০ মার্চ ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ, ঢাকা সড়ক পরিবহন বাস মালিক সমিতি, সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল পরিবহন মালিক সমিতি ও পরিবহন শ্রমিক কমিটির এক সমন্বয় সভা হয়। এতে ডিএসসিসির সংশ্লিষ্টরা জানান, সায়েদাবাদ টার্মিনালের আশপাশে ২৪০টি অবৈধ বাস কাউন্টার রয়েছে। এগুলোর কারণে টার্মিনাল এলাকার সড়কে বিশৃঙ্খলা ও যানজট সৃষ্টি হয়। তাই টিটিপাড়া মোড় থেকে ধোলাইপাড় পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকার অনুমোদনহীন ও অবৈধ বাস কাউন্টারগুলো উচ্ছেদ করা জরুরি।

সভার সিদ্ধান্তের আলোকে টার্মিনালের আশপাশে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা বাস কাউন্টার উচ্ছেদে গত ৮ এপ্রিল থেকে অভিযান পরিচালনা শুরু করে ডিএসসিসি। শনিবার (১১ এপ্রিল) তৃতীয় দিনের মতো ওই এলাকায় অভিযান পরিচালনা করেন ডিএসসিসির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম।

তবে সরেজমিনে দেখা যায়, অভিযানের আগাম খবর পেয়ে অধিকাংশ কাউন্টার আগেই বন্ধ করে সটকে যান সেখানকার লোকজন। এর মধ্যে যেসব কাউন্টারের সামনে সাইনবোর্ড ছিল, সেগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। আবার বেশ কিছু কাউন্টার সিলগালা করে দেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

ডিএসসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা রাসেল রহমান বলেন, সায়েদাবাদ এলাকায় অবৈধ বাস কাউন্টার স্থাপনের ফলে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র যানজট ও যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছিল। জনস্বার্থে এবং নগর ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরাতে ডিএসসিসি এ কঠোর অবস্থান (উচ্ছেদ করা) নিয়েছে। অবৈধ কাউন্টারগুলো সম্পূর্ণ নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত অভিযান অব্যাহত থাকবে। কিন্তু এর বাইরে শহরের অন্য এলাকায় যেসব অবৈধ বাস কাউন্টার রয়েছে, সেগুলো অপসারণে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক কাজী জুবায়ের মাসুদ বলেন, ‘ঢাকা শহরে অবৈধ বাস কাউন্টার উচ্ছেদে একমত মালিক সমিতি। যারা নিয়ম না মেনে অবৈধভাবে কাউন্টার স্থাপন করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব সিটি করপোরেশন ও পুলিশের। তারা মালিক সমিতির সহযোগিতা চাইলে, আমরা সহযোগিতা করবো।’

দূরপাল্লার বাসের জন্য আধুনিক ও পর্যাপ্ত টার্মিনাল সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যাত্রীদেরও সচেতন হতে হবে। নির্ধারিত স্থান ছাড়া অন্য কোথাও থেকে বাসে ওঠা থেকে বিরত থাকতে হবে। ঢাকা শহরের যানজট কমাতে এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। না হলে অবৈধ বাস কাউন্টারগুলো ভবিষ্যতে আরও বড় সংকটের জন্ম দেবে, যা সামাল দেওয়া কঠিন হবে।’

যোগাযোগ করা হলে ট্রাফিক গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মিজানুর রহমান সেলিম বলেন, নিয়ম অনুযায়ী বাস বে তে বাস থামবে। মাসের পর মাস চেষ্টা করে কুড়িলে এ নিয়ম মানতে চালকদের বাধ্য করেছি। এখন সেখানে কেউ নিয়ম লঙ্ঘন করেন না। তবে শহরে বাস বে নেই। তাই অনেক চালক আইন মানতে চান না। তারা যত্রতত্র বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করেন। তখন তাদের মামলা দিই। আর প্রগতি সরণির বাসাবাড়ির নিচে যেসব বাস কাউন্টার গড়ে উঠেছে, সেগুলো অপসারণে পরিকল্পনা রয়েছে।’ তবে ঠিক কবে নাগাদ তা অপসারণ করা হবে তা তিনি নির্দিষ্ট করে বলেননি।