নিজস্ব প্রতিবেদক :
ঈদুল ফিতরকে ঘিরে ১৫ দিনের যাতায়াতে দেশের সড়কে প্রাণহানির উদ্বেগজনক চিত্র দেখা গেছে। ১৪ মার্চ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত ৩৭৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২৯৮ জন, অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে সড়কে। আহত হয়েছেন দুই হাজারের বেশি মানুষ। বিশেষভাবে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা সব থেকে বেশি প্রাণহানির কারণ ছিল। নিহতদের মধ্যে নারী ৪৬ জন এবং শিশু ৬৭ জন শিশুও ছিল।
বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) সংবাদমাধ্যমে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমানের পাঠানো দুর্ঘটনা প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়। ফাউন্ডেশনটি ৯টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি জাতীয় ও আঞ্চলিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম এবং নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে।
বিবৃতির তথ্য অনুযায়ী, মোট দুর্ঘটনার বড় অংশই মোটরসাইকেলকেন্দ্রিক। ১৪৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১১৬ জন, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৩৯ শতাংশ। পথচারী নিহত হয়েছেন ৪৭ জন এবং চালক ও সহকারী মিলিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ৩৬ জন। একই সময়ে নৌ ও রেলপথেও দুর্ঘটনা ঘটেছে। ১১টি নৌ দুর্ঘটনায় ৯ জন নিহত, ২৩ জন আহত এবং ২ জন নিখোঁজ রয়েছেন। অন্যদিকে ২৯টি রেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৪১ জন এবং আহত হয়েছেন ২০৯ জন।
দুর্ঘটনার স্থানভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে আঞ্চলিক সড়কে (৪৩.১৬ শতাংশ)। এরপর জাতীয় মহাসড়ক (৩০.৮৩ শতাংশ), গ্রামীণ সড়ক (১২.৮৬ শতাংশ) এবং শহরের সড়ক (১১.২৬ শতাংশ) রয়েছে।
দুর্ঘটনার ধরনে নিয়ন্ত্রণ হারানোই বড় কারণ হিসেবে সামনে এসেছে। মোট দুর্ঘটনার ৪০.৭৫ শতাংশই ঘটেছে যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণে। এছাড়া মুখোমুখি সংঘর্ষ, পথচারীকে চাপা দেওয়া এবং পেছন থেকে ধাক্কা দেওয়ার ঘটনাও উল্লেখযোগ্য।
যানবাহনভিত্তিক চিত্রে মোটরসাইকেলের অংশগ্রহণ সবচেয়ে বেশি (২৪.৭৫ শতাংশ)। এরপর থ্রি-হুইলার ২২.৩৩ শতাংশ এবং ভারী যানবাহন যেমন ট্রাক-পিকআপ প্রায় ১৯.৫৭ শতাংশ দুর্ঘটনায় জড়িত ছিল।
সময় বিশ্লেষণে দেখা যায়, সকালে ও দুপুরে দুর্ঘটনার হার বেশি। সকাল ২৪.৩৯ শতাংশ এবং দুপুরে ২৩.০৫ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে। তবে রাতেও দুর্ঘটনার হার কম নয়, প্রায় ২০ শতাংশ।
বিভাগভিত্তিক হিসেবে চট্টগ্রাম বিভাগে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি হয়েছে। ৯৩টি দুর্ঘটনায় এই বিভাগে ৭৪ জন নিহত হয়েছেন। বিপরীতে বরিশাল বিভাগে প্রাণহানি সবচেয়ে কম, ১২ জন।
ঈদযাত্রায় প্রায় এক কোটির বেশি মানুষ রাজধানী ছেড়ে বিভিন্ন জেলায় গেছেন এবং সারাদেশে প্রায় চার কোটি মানুষ যাতায়াত করেছেন। দীর্ঘ ছুটির কারণে চাপ কিছুটা ছড়িয়ে পড়লেও পরিবহন ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এবং অব্যবস্থাপনা যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়িয়েছে।
গত বছরের তুলনায় এ বছর দুর্ঘটনা ৬.৪২ শতাংশ বাড়লেও প্রাণহানি কমেছে ১২.২৪ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কোনো ইতিবাচক উন্নতির ইঙ্গিত নয়; বরং জ্বালানি সংকটের কারণে মোটরসাইকেল ব্যবহার কিছুটা কম থাকায় প্রাণহানি সামান্য কমেছে।
ঈদযাত্রা ও দুর্ঘটনা পর্যালোচনা
এবারের ঈদুল ফিতরে রাজধানী ঢাকা থেকে ১ কোটির অধিক মানুষ ঘরমুখী যাত্রা করেছেন এবং দেশের অভ্যন্তরে প্রায় ৪ কোটি মানুষ যাতায়াত করেছেন। আগেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি ঘোষণা এবং ঈদের আগে-পরে দীর্ঘ ছুটি থাকার কারণে ঘরমুখী ও ফিরতি ঈদযাত্রায় একমাত্র ট্রেন ব্যতীত সড়ক ও নৌপথে ভিড় তুলনামূলক কম হয়েছে। তবে অব্যবস্থাপনার কারণে সড়ক, রেল ও নৌপথে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হয়েছে, যা সরকার রোধ করতে পারেনি। ফলে মানুষের ভোগান্তি হয়েছে বলে জানিয়েছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন।
এবারের ঈদ উদযাপনকালে সড়ক দুর্ঘটনা অনেক বেশি মর্মান্তিক ছিল। সদরঘাটে দুই লঞ্চের মাঝে চাপা পড়ে ২ জন নিহত, জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে ড্রামসেতু উল্টে ৪ শিশু নিহত, কুমিল্লার পদুয়ারবাজারে রেলক্রসিংয়ে বাসে ট্রেনের ধাক্কায় ১৪ জন নিহত এবং দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে ডুবে ২৬ জন নিহতের ঘটনা দেশবাসীকে শোকে বিহ্বল ও বাকরুদ্ধ করেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে এসব দুর্ঘটনা ঘটেছে। তাই এগুলো কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড বলে উল্লেখ করেছে ফাউন্ডেশনটি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ঈদুল ফিতরের আগে-পরে ১১ দিনে ২৫৭টি দুর্ঘটনায় ২৪৯ জন নিহত হয়েছিলেন। প্রতিদিন গড়ে ২৩.৩৬টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন ২২.৬৩ জন। এ বছর ঈদুল ফিতরের ১৫ দিনের ঈদযাত্রায় প্রতিদিন গড়ে ২৪.৮৬টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৯.৮৬ জন। এই হিসাবে গত বছরের তুলনায় দুর্ঘটনা বেড়েছে ৬.৪২ শতাংশ এবং প্রাণহানি কমেছে ১২.২৪ শতাংশ। প্রাণহানি কমার এই হার কোনো উন্নতির সূচক নির্দেশ করে না। কারণ পরিবহন খাতে কোনো প্রকার ব্যবস্থাপনাগত উন্নতি ঘটেনি। মূলত জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে ঈদ উদযাপনকালে মোটরসাইকেলের ব্যবহার কমেছে। তাই প্রাণহানি কিছুটা কম হয়েছে। এরপরও কিশোর-যুবকদের বেপরোয়া মোটরসাইকেলের ধাক্কায় ৯ জন পথচারী নিহত হয়েছেন। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আক্রান্তদের মধ্যে ৫৩ শতাংশের বয়স ১৪ থেকে ২০ বছর।
সুপারিশ হিসেবে বলা হয়েছে— জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল পুনর্গঠন করে এই কাউন্সিলের অধীনে বিআরটিএ, বিআরটিসি এবং ডিটিসিএ পরিচালনা করতে হবে। কাউন্সিলের হাতে আইন, বিধি ও নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষমতা থাকতে হবে। বিআরটিএ, বিআরটিসি এবং ডিটিসিএর ব্যবস্থাপনা ও কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে এবং এসব টেকনিক্যাল প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতে হবে।
এছাড় মোটরযানে আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে; সড়ক থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন প্রত্যাহার করতে হবে; রাজধানীতে রুট রেশনালাইজেশনের মাধ্যমে কোম্পানিভিত্তিক আধুনিক বাসসেবা চালু করতে হবে। বিআরটিসির বাসের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং পরিবহন সেবা উন্নত করে সরকারের পরিবহন সক্ষমতা বাড়াতে হবে; দক্ষ চালক তৈরির প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ বৃদ্ধি করে তাদের বেতন, কর্মঘণ্টা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। স্বল্পগতির ছোট যানবাহনের জন্য সকল মহাসড়কে সার্ভিস রোড নির্মাণসহ নিরাপদ রোড ডিজাইন করতে হবে; সকল রেলক্রসিংয়ে গেটকিপার নিয়োগ করতে হবে।
এছাড়াও সড়ক ব্যবহারকারীদের সচেতন করতে ও দক্ষতা বাড়াতে জাতীয় বাজেটে অর্থ বরাদ্দ করতে হবে; প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে।
টেকসই পরিবহন কৌশলের অধীনে সড়ক, রেল ও নৌপরিবহন একত্রিত করে একটি অভিন্ন যোগাযোগ মন্ত্রণালয় গঠন করতে হবে এবং সময়োপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের জন্য শিক্ষা-সচেতনতা কার্যক্রমের মাধ্যমে নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। তবে এক্ষেত্রে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা অতীব জরুরি।
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















