গাজীপুর জেলা প্রতিনিধি :
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, গত ২০ বছরে আমরা ভূগর্ভস্থ যে পরিমাণ পানি নিচে থেকে টেনে ওপরে তুলেছি, খাল ও নদী খনন করে এবং বর্ষা মৌসুমের অতিরিক্ত পানি যদি আমরা ছড়িয়েও দিই, তবু আগামী ২০ বছরের তা রিচার্জ হবে না। তাই কোনোভাবেই ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করা যাবে না। ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার আমাদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে যাচ্ছে।’ সবার জন্য পানি পেতে পদ্মা ব্যারাজের পাশাপাশি বিএনপি তিস্তা ব্যারাজেও হাত দেবে।
বুধবার (২০ মে) বিকেল ৩টার দিকে গাজীপুরের টঙ্গী সাতাইশ এলাকায় জাতীয় দুর্যোগ ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন উদ্বোধন অনুষ্ঠান ও সুধী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
তারেক রহমান বলেন, আমাদের নির্বাচনী যে মেনিফেস্টো ছিল, যে মিটিং ছিল সেখানে উল্লেখ করেছি- আমরা খাল খনন কর্মসূচি শুরু করবো। আমরা সরকার গঠন করেছি এবং আমাদের প্রতিশ্রুত সেই খাল খনন শুরু করেছি। কারণ এই খাল খনন কর্মসূচির সাথে মানুষের জীবন ওতপ্রোতভাবে জড়িত, কৃষি জড়িত, ভূমিকম্প পর্যন্ত জড়িত।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কক্সবাজারে সমুদ্রের তীর ধরে একটি রাস্তা নির্মাণ হচ্ছে। সেখানে দেখলাম ৩ শতাধিক গাছ কেটে ফেলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি তাৎক্ষণিক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানালাম। যাতে ডিজাইনটা পরিবর্তন করা হয়। গাছ যাতে রক্ষা পায়।
তিনি বলেন, আমরা গত ২০ বছরে যে পরিমাণ পানি মাটির তলদেশ থেকে টেনে তুলেছি, এই পরিমাণ পানি যদি খাল খননের মাধ্যমে সারাদেশে ছড়িয়েও দেই, বিশেষ করে বর্ষাকালে আসা পানি যদি এই খালের মধ্যমে সারা দেশে ছড়িয়ে দেই, তবুও ২০ বছর সময় লাগবে ঘাটতি পূরণ করতে। এই ২০ বছরে দেশের জনসংখ্যা আরও বাড়বে। এর ফলের খাদ্য উৎপাদন আমাদের আরও বাড়াতে হবে। আমাদেরকে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করা কমাতে হবে। এটি আমাদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে যাবে। এ বিষয়টিও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সাথে জড়িত। তাই আমাদের খাল খনন করতে হবে।

তারেক রহমান বলেন, আপনারা জানেন যে দেশের উত্তর এবং দক্ষিণাঞ্চলে পদ্মা নদীতে একটি ব্যারাজ তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সীমান্তের ওপারে তারা ব্যারাজ তৈরি করে বিভিন্নভাবে পানি সংগ্রহ করছে। এ কারণে শুষ্ক মৌসুমে আমরা নদীতে পানি কম পাচ্ছি। এ কারণে নদীতে দ্রুত পানি কমে যাচ্ছে, ধীরে ধীরে আশপাশগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। ছোটবেলায় আমরা দেখেছি পদ্মার এপার থেকে ওইপাড় দেখা যায় না। এখন দেখা যায় না। শুধু আগে পানি ছিল, আর এখন পানি নেই। ব্যারাজটি এ কারণেই করতে চাচ্ছি যাতে শুষ্ক মৌসুম অথবা বর্ষা মৌসুমেও আমাদের দেশের মানুষ যাতে পানি সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে। আরেকটি বিপজ্জনক বিষয় হলো ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের ফলে আমাদের নদীতে পানি কম। যার ফলে সুমদ্র থেকে নোনা জল ধীরে ধীরে দক্ষিণাঞ্চলে উঠে আসছে। এতে সুন্দরবনসহ ওইসব এলাকার ফসলি জমি, পশুপাখি, ও জনাপদ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ কারণে আমরা ব্যারাজ নির্মাণের মাধ্যমে বর্ষা মৌসুমে যে পানিটি ধরে রাখতে সক্ষম হবো, সেই পানি শুষ্ক মৌসুমে ওই অঞ্চলের মানুষের কাজে ব্যবহার করবো।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষের জন্য এই বিএনপি সরকার আগামীতে পদ্মা ও তিস্তা নদীতে ব্যারাজ নির্মাণ প্রকল্পে হাত দেবে। যারা বিভিন্ন বড় বড় কথা বলছেন তাদের পরিষ্কারভাবে বলতে চাই- দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রীর নেতৃত্বে এই বিএনপি সরকার তিস্তা পাড়ে কর্মসূচি পালন করেছে। এটা অন্য কোনো সরকার করে নাই। তাই বলতে চাই এই তিস্তা ব্যারাজও বিএনপি সরকার বাস্তবায়ন করব। যেহেতু আমরা দুর্যোগকে থামাতে পারবো না সেহেতু আমরা কীভাবে দুর্যোগ মোকাবিলা করা যায় সেটি সম্পর্কে সচেতন হই।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতি ইঙ্গিত করে তারেক রহমান বলেন, যারা বড় বড় কথা বলছে, তাদের উদ্দেশ্যে পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, এই যে আজকে এখানে দুর্যোগমন্ত্রী (আসাদুল হাবিব দুলু) বসে আছেন, এই লোকটার নেতৃত্বেই তিস্তায় বিএনপি কর্মসূচি পালন করেছে; যা বাংলাদেশে অন্য কোনো রাজনৈতিক দল করে নাই। তারা হয়ত বড় বড় কথা বলেছে, গরম গরম কথা বলেছে। কিন্তু কাজ যদি কেউ করে থাকে, ডেলিভারি যদি কেউ করে থাকে, পরিস্থিতি যদি কেউ তৈরি করে থাকে সেটা বিএনপিই করেছে।

পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণ কেন জরুরি, তার ব্যাখ্যা দিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, “আপনারা পত্রিকায় দেখেছেন কয়েকদিন আগে আমরা একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে উত্তরাঞ্চল, দক্ষিণাঞ্চলে বিশেষ করে রাজবাড়ীতে আমরা পদ্মা নদীতে ব্যারাজ তৈরি করব। পদ্মা ব্যারেজ এইজন্য আমরা তৈরি করব যে সীমান্তের ওপারে তারা (ভারত) ব্যারাজ তৈরি করার মাধ্যমে বিভিন্নভাবে পানি নিচ্ছে। কিন্তু আমাদের কাছে যে পানিটি আসছে শুকনা মৌসুমে, হয়ত আমরা কম পাচ্ছি। ফলে যেটা হচ্ছে নদীতে পানির স্রোত কমে যাওয়ায় অনেক সমস্যা হচ্ছে। আস্তে আস্তে আশপাশগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। আপনারা নিশ্চয়ই দেখেছেন, ছোটবেলায় আমরা দেখেছি পদ্মা নদীর এপার থেকে ওপার দেখা যায় না। এখনো দেখা যায় না। তবে তখন পানি ছিল এখন পানি শূন্য।
তিনি বলেন, পদ্মা ব্যারাজটি আমরা এই জন্য করতে চাচ্ছি, যেন বর্ষা এবং শুকনা মৌসুমে কৃষকই হোক বা যে কোন মানুষ তারা যাতে পানি পায়। আরেকটা বিপদজনক ব্যাপার হচ্ছে, এই ফারাক্কা বাঁধ হওয়ার কারণে যেটি হচ্ছে ধীরে ধীরে, যেহেতু পানির পরিমাণ কমৃসেজন্য ধীরে ধীরে যেটি হচ্ছে সমুদ্রের পানি দক্ষিণ অঞ্চলে ঢুকছে। ফলে সুন্দরবনসহ ওই সকল অঞ্চলে যেই সমস্যাগুলো আছে, লবণাক্ত পানি বেশি পরিমাণে ভিতরে চলে আসার কারণে গাছপালা নষ্ট হচ্ছে, বিভিন্ন পশু বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। কাজেই আমরা যদি সেই প্রেসারটাকে রাখতে চাই আমাদেরকে ব্যারাজটা নির্মাণ করতে হবে এবং ব্যারেজের মধ্যে আমরা পানি ধরে রাখবো। যখন বাড়তি পানি, বর্ষার মৌসুমে যে পানিটা আসে সেই পানিটি আমরা ধরে রাখতে পারব। যাতে করে সেই পানিটি আমরা আমাদের মানুষের জন্য কাজে ব্যবহার করতে পারি। সেই পানিটিকে আমরা আরো যাবতীয় কাজে ব্যবহার করতে পারি।
জলবায়ু বদলে যাচ্ছে, এ কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী দুটি ঘটনার কথা বলেন। তিনি বলেন, যখন স্কুলে তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম শ্রেণিতে পড়তেন তখন গরম নিয়ে খুব সম্ভবত এত নালিশ করতেন না, এত গরম পড়তো না।
অনেক বছর দেশের বাইরে থাকার কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, শীতের সময়ে যখন দেশে বিএনপি নেতাদের সঙ্গে কথা হতো, তখন তারা বলতেন শীত পড়েনি। ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসেও বলতেন শীত পড়েনি। অথচ তিনি যখন স্কুলে পড়তেন ২৬ মার্চে স্কুলে যে প্রোগ্রাম হতো…যখন রিহার্সেল দিতেন স্কুলে, সেই সময় সোয়েটার পড়ে থাকতেন, শীত থাকতো।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “অর্থাৎ আমাদের ক্লাইমেট বা আবহাওয়া যেটাই বলি, এগুলো কিন্তু চেঞ্জ হয়ে যাচ্ছে।”
জনসংখ্যার ক্রমবর্ধমান বৃদ্ধির কারণে জায়গাও সংকুচিত হচ্ছে তুলে ধরে তিনি বলেন, পরিবেশের দিকে আমাদের নজর দিতে হবে।
কক্সবাজারে মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের অস্থায়ী বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে গিয়ে বিপুল সংখ্যা বৃক্ষ নিধনের কথা তুলে ধরেন সরকারপ্রধান।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের বাসস্থান তৈরি করা হয়েছে। অর্থাৎ হাজার হাজার গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। কিছুদিন আগে আমি হঠাৎ করে একদিন সকালে পত্রিকায় দেখলাম যে কক্সবাজার থেকে সৈকতের পাশ দিয়ে একদম উখিয়া পর্যন্ত একটা রাস্তা করা হচ্ছে…যেকোনো কারণেই হোক, রোডের ডিজাইনের কারণে প্রায় তিন হাজার গাছ কেটে ফেলতে হবে।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীকে ফোন করে সংবাদটি পাঠানোর কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, আমি বললাম যে ওদের সাথে কথা বলেন। ডিজাইনটাকে একটু পরিবর্তন করা যদি সম্ভব হয় ভালো হয়। এই গাছ কাটা যাবে না। কি করবে না করবে, সেটা তারা ঠিক করুক। কিন্তু এই গাছ কাটা যাবে না।
জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট করার পেছনে দুই লক্ষ্যের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এই প্রতিষ্ঠানটি তৈরি হওয়ার পরে এখানে আমাদের ক্লাইমেট বা আবহাওয়ার যে পরিবর্তন হচ্ছে সেটি সম্পর্কে গবেষণা করা। কীভাবে এই বিষয়গুলোকে আমরা মোকাবিলা করব। একই সঙ্গে, সেটি ভূমিকম্প হোক, সেটি জলোচ্ছ্বাস যেটি হোক সেখান থেকে আমরা কীভাবে আমাদের সম্পদ এবং মানুষকে আমরা রক্ষা করব।
শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণে খাল খনন কর্মসূচির প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, “খাল খনন কর্মসূচির সাথে মানুষের জীবন ওতপ্রতভাবে জড়িত। এর সাথে কৃষি জড়িত… যেভাবেই হোক আমাদেরকে খাল খনন কর্মসূচি চালিয়ে যেতে হবে।”
দুর্যোগ মোকাবিলায় মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি নিজেদের সচেতন হওয়ার শপথ নেওয়া উচিত বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী।

এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, আমরা দুর্যোগকে থামাতে পারবো না। আসুন দুর্যোগ কোনটি হলে কীভাবে আমরা মানুষ এবং সম্পদকে রক্ষা করতে পারি, কীভাবে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে পারি, নিজেকে কীভাবে রক্ষা করতে পারি, আরেকজনকে কীভাবে রক্ষা করতে পারি, কীভাবে মানুষের সম্পদ রক্ষা করতে পারি? আসুন সেটিই হোক আমাদের আজকের এই অনুষ্ঠানের শপথ।
বাংলাদেশ একটি গরীব দেশ, সম্পদও কম- এ বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, আমরা যদি সম্পদকে রক্ষা করতে পারি, আমরা যদি আমাদের সম্পদকে সঠিকভাবে দেশ এবং মানুষের কাজে ব্যবহার করতে পারি, ধীরে ধীরে আমরা অন্য একটি উন্নত দেশের মত গড়ে উঠতে পারব।
নিজেদের অবহেলা ও অজ্ঞতার কারণে সম্পদ নষ্ট হয়ে যায় তুলে ধরে সরকারপ্রধান বলেন, আসুন আমরা আজকে এখানে শপথ গ্রহণ করি, আমরা নিজেরা সচেতন হব, অন্যকে সচেতন করব। পরিবেশকে আমাদের রক্ষা করতে হবে। আমরা খাল খনন করি, আমরা বৃক্ষরোপণ করি। আমরা পানির পানি নষ্ট আমরা কম করি।
জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন, সচিব সাইদুর রহমান খান, জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রেজানুর রহমান।
অনুষ্ঠানে দুযোর্গ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় থেকে মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু এবং জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসক নুরুল করীম ভুঁইয়া আলাদাভাবে স্মারক শুভেচ্ছা প্রদান করেন। সেখানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম শামসুল ইসলাম, সংসদ সদস্য মনজুরুল করিম রনি, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শওকত হোসেন সরকার।
গাজীপুর জেলা প্রতিনিধি 






















